৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)
৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
স্বামীজীর পত্রাবলী থেকে উদ্ধৃত
১৮৯৪ সালে স্বামী অখণ্ডানন্দকে লেখা ২য় পত্রের ছায়া অবলম্বনে -
স্বামীজীর কাছে ধর্মের দুটো দিক ছিল - একটি সজীব ধর্ম অপরটি নির্জীব ধর্ম। যে ধর্ম সম্মুখপানে ধাবিত হয়ে আপামর সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধনে সদাই ব্যস্ত থাকে, সেটাই সজীব ধর্ম। যে ধর্ম গরিব মানুষের উপকার করতে পারেনা, ঠাকুরঘরের চালকলা আর শঙ্খধ্বনির মধ্যে প্রাত্যহিক ধর্মচারণকে চারদেয়ালের মধ্যে সমাপ্ত করে, সেটি নির্জীব ধর্ম। এই ধর্ম মানুষের কোনো উপকারে আসেনা, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনাও সীমিত পরিসরে ঘোরাফেরা করে, উপাসক যিনি, তিনি নিজের পুত্র-কন্যা, নাতি-নাতনির কল্যাণ সাধনায় এতটাই সময় ব্যয় করে ফেলেন যে পাশের বাড়ির মানুষগুলির কল্যাণ সাধনার জন্য আর সময় ব্যয় করতে পারেন না।
স্বামীজীর মতে, চিত্ত শুদ্ধি যদি না হয় তাহলে মানুষের প্রার্থনা ভস্মে ঘি ঢালার মতো নিস্ফল হবে। সমগ্র মানবজাতির মঙ্গল কামনার মধ্যে সার্বজনীন ঐক্যের যে বীজ লুকিয়ে আছে আর সেই বীজটি পরিবারের মধ্যে রোপিত হয়ে তার ব্যাপ্তি সমাজ সংসারে ছড়িয়ে পরে। এই চিত্তশুদ্ধি হলো, সেই আত্মার উন্মেষ, যা ভারতবর্ষের চিরন্তন আধ্যাত্মবাদের মূল সুরের কথা বলে।
পরিব্রাজক হিসাবে স্বামীজী ভারতবর্ষের বহু স্থানে ভ্রমন করেছিলেন। তাঁর তীর্থ স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ভারতের পিছিয়ে পড়া গ্রামগুলিতে মানুষের জীবনযাত্রাকে উপলদ্ধি করা। সেই উপলদ্ধি থেকে তাঁর সহকর্মীদের উৎসাহিত করেছেন সেই হতদরিদ্র মানুষের পাশে মৌলিক কিছু কার্যক্রম নিয়ে তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের জীবনের অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের রাস্তা চেনানোর। সেখানে সেই আলোর পথের দিশারীদের জীবনযাত্রা যেন সাধারণ মানুষের অনুকরণযোগ্য হয়। প্রয়োজনে দীর্ঘদিনের খাদ্যাভাসের মতো উপকরণকে বর্জন যদি করতে হয়, সেটাও করতে হবে। ত্যাগের মাহাত্ম কিভাবে সবপেয়েছির মন্ত্র হতে পারে, তা যে কর্মের মাধ্যমে হতে পারে সেটা স্বামীজী তার কর্ম দর্শনের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
এই দৃশ্যমান জগৎ থেকে উদ্ভূত মানবের দুর্দশার চিত্র স্বামীজীর ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে আবিষ্ট করে তোলে। সাধারণ যা দেখেন না অতিমানবরা সেটা দেখতে পারেন। এই মনুষ্যসৃষ্ট দুর্দশা থেকে উত্তরণের জন্য এই সমাজের পক্ষে গ্রহণ যোগ্য পথের সন্ধান ও তাঁর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা স্বামীজী ছোট ছোট বক্তব্যে সহজ সরল করে তুলে ধরেছেন।
স্বামীজীর ভাবনার গভীরে ছিল শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পক্ষে অন্তরায় ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতবাসীর অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও কুসংস্কার। এই অজ্ঞান থেকে জ্ঞানে পৌঁছানোর যাত্রাটা খুব সহজ ছিল না। এই দুর্গম ও দীর্ঘ এই পথ। পথ মধ্যে বিশাল প্রস্তরসম বাঁধা ছিল কুসংস্কার, পারস্পরিক ধর্মান্ধতা যা ছিল শাসকের শক্তিশালী অস্ত্র সমাজে অনৈক্যকে স্থায়িত্ব দেবার, শিক্ষাকে সীমিত করার, নারী শিক্ষাকে উপেক্ষা করার।
স্বামীজী ছিলেন আসলে একজন বিপ্লবী সন্যাসী। তাই তার সহকর্মী ও সৈনিকসম শিষ্যদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন সমাজে এই ভেদাভেদের প্রাচীরকে চূর্ন করে শিক্ষার প্রসারের উপর জোর দিতে। কেননা, এই শিক্ষা সেই নিপীড়িত ভারবাসীদের অন্তঃকরণে আনবে জ্ঞানের জোয়ার আর সেই জোয়ারে উৎপন্ন হবে চৈতন্যের শক্তি, সেই শক্তি ভেঙে ফেলবে সেই একচেটিয়া শোষনের অধিকারকে, আনবে মুক্তি। ঠিক এই শিক্ষা প্রসারের জায়গায় আজকের দিনের শাসকেরা ভীষণ কৃপণ শুধু নয় বরং ধংস করার কারিগর। রাজনৈতিক ও সামাজিক এই উভয় ক্ষেত্রেই স্বামী বিবেকানন্দর রচনা সর্বক্ষেত্রে সময়ের আগে এগিয়ে চলে, তাই তাকে নিয়ে অবিরাম চর্চ্চার প্রয়োজন।
ক্রমশঃ
ব্লগার- রবীন মজুমদার
তারিখ -/১২/২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ