৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

 ৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)


যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
স্বামীজীর পত্রাবলী থেকে উদ্ধৃত 
১৮৯৪ সালে লেখা একটি পত্রের ছায়া অবলম্বনে -


ধর্ম, পবিত্রতা আধুনিক ভারতের সংকট

স্বামীজীর পত্রগুলি যেন কালকে অতিক্রম করে অনন্তে মিশে গিয়ে তাঁর বাস্তবতা ও প্রাসঙ্গিকতাকে বারবার পাঠককে মনে করাচ্ছে। সত্যিই আজ ভারতবর্ষে ধর্মের উপস্থিতি আজ প্রশ্নের মুখে। এই প্রশ্ন নতুন নয়—স্বামী বিবেকানন্দ এক শতাব্দীরও আগে তীব্র ভাষায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ধর্ম কি আর ভারতে আছে? আজ সেই প্রশ্ন আরও গভীর ও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। কারণ ধর্ম আছে সর্বত্র, কিন্তু ধার্মিকতার অভাব স্পষ্ট।

ভারতের ধর্মচর্চার মূল ধারাগুলি—জ্ঞানমার্গ, ভক্তিমার্গ ও যোগমার্গ—একসময় মানবমুক্তির পথ দেখিয়েছিল। কিন্তু বিবেকানন্দ যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তা আজ বাস্তব। এই পথগুলো বহুক্ষেত্রে সমাজের দায় এড়িয়ে আত্মরক্ষার কৌশলে পরিণত হয়েছে। জ্ঞান হয়েছে তত্ত্বকথা, ভক্তি হয়েছে আবেগের প্রদর্শনী, আর যোগ হয়েছে একান্তে  আত্মকেন্দ্রিকতা। সমাজ, মানুষ ও তাদের দুঃখ—এই ত্রয়ী থেকে ধর্ম ক্রমশ সরে এসেছে।

এই শূন্যতার মধ্যেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন পথ—ছুৎমার্গ। “আমায় ছুঁয়ো না”—এই বাক্যটি আজ কেবল জাতপাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ভাষা, মতাদর্শ ও বিশ্বাস—সবখানেই পবিত্রতা ও অপবিত্রতার কঠোর বিভাজন টানা হয়েছে। ধর্ম আজ অনেকের কাছে আত্মশুদ্ধির সাধনা নয়, বরং অপরকে অশুদ্ধ ঘোষণা করার লাইসেন্স।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন—যে ধর্ম মানবহৃদয়কে স্পর্শ করে না, তা প্রস্তরের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। আজ দেখা যাচ্ছে, মন্দির, আশ্রম ও উপাসনালয় যত বিস্তৃত হচ্ছে, মানুষের হৃদয়ের জায়গা ততই সংকুচিত হচ্ছে। দানের বাক্স উপচে পড়ে, কিন্তু দরিদ্র মানুষের প্রশ্নের উত্তর মেলে না। ঈশ্বর আছেন গম্বুজের নিচে, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে নন।

স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মচিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ—বিশেষত দরিদ্র মানুষ। “দরিদ্রই আমার ঈশ্বর”—এই উচ্চারণ ছিল তাঁর ধর্মের সারকথা। অথচ আজ ঈশ্বরের নামে যে ধর্মচর্চা চলছে, তাতে দরিদ্র প্রায় অদৃশ্য। তার দুঃখ নিয়তি বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, আর তার উপস্থিতি অনেক সময় অপবিত্রতার ভয় তৈরি করে। এই বিচ্ছেদই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংকট।

আজ ঈশ্বর যেন সর্বভূতে নয়, মানবহৃদয়ে নয়—তিনি অবস্থান করছেন ভাতের হাঁড়িতে। অর্থাৎ ধর্ম ক্রমশ লেনদেনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনুদান, চাঁদা, প্রদর্শন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক গভীর হয়েছে, কিন্তু করুণা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধের সঙ্গে তার সংযোগ দুর্বল হয়েছে।

তবু এই অন্ধকার সম্পূর্ণ নয়। সমাজের প্রান্তে এখনও এমন মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে ধর্ম মানে মানুষকে ছুঁতে পারা—ভয় ছাড়াই, ঘৃণা ছাড়াই। যে মায়ের রান্নাঘরে জাত নেই, যে শ্রমিকের ঘামে লজ্জা নেই, যে নাগরিক এখনও অন্যের কষ্টে নিজের দায় খোঁজেন—সেখানেই ধর্ম আজও জীবিত।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের উপরে বিশ্বাস হারানোই সবচেয়ে বড় পাপ। যদি ধর্ম সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে না পারে, তবে তার জাঁকজমক অর্থহীন। ধর্মের ভবিষ্যৎ মন্দিরের উচ্চতায় নয়, মানুষের পাশে আলিঙ্গনের গভীরতায়।

আজ ভারতের সামনে প্রশ্ন একটাই—ধর্ম কি মানুষের মুক্তির পথ হবে, না মানুষের মধ্যে প্রাচীর তোলার অস্ত্র? এই প্রশ্নের উত্তর শাস্ত্রে নয়, প্রতিদিনের আচরণে লেখা হচ্ছে। আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে—ব্রহ্ম থাকবেন ভাতের হাঁড়িতে, না আবার ফিরে আসবেন মানবহৃদয়ের ঘরে।


ক্রমশঃ 
ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -২৪/১২/২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)