শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৭ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩০)

  ৪৩৭ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩০)


১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে শিষ্যদের উদ্দেশ্য পাঠানো পত্রের  ভাবার্থের অনুসরণে- 

১৮৮৫ সাল। চিঠিটির তারিখ ও স্থান সেখানে উল্লেখিত নেই। শুধু কয়েকটি কথা, কয়েকটি ভাব, যেন সময়ের স্রোত পেরিয়ে এসে আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। কথাগুলি পড়তে পড়তে মনে হওয়া স্বাভাবিক—একজন মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁর সবচেয়ে বড় উপস্থিতি কি তাঁর নামের মধ্যে থাকে, না তাঁর তৈরি করে যাওয়া মানুষগুলির মধ্যে?

প্রশ্নটা সহজ নয়।

কারণ মানুষ চলে যাওয়া মানে অস্তিত্বের অস্তিত্বহীনতা মাত্র। তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত থাকে।  স্বামীজী যেন সেই জায়গাটাতেই হাত রেখেছিলেন।

আদর্শ যদি একটি পতাকা হয়, তবে তাকে শুধু নেতার হাতে থাকলে চলবে কেন? নেতা তো চিরকাল থাকবেন না। একদিন তাঁকে চলে যেতেই হবে। তখন পতাকাটি কে বহন করবে? সেই উত্তরাধিকার যদি আগে থেকে মানুষের ভিতরে তৈরি না হয়, তবে পতাকা একসময় কেবল কাপড় হয়ে যায়—দণ্ড থাকে, রং থাকে, কিন্তু তার মধ্যে আর কোনো হাওয়া থাকে না।

স্বামীজীর চিন্তার ভিতরে তাই একটা অদ্ভুত তাড়া ছিল—মানুষ চাই। শুধু ভক্ত নয়, মানুষ। শুধু অনুসারী নয়, মানুষ।

শুধু তাঁর নাম উচ্চারণ করবে এমন মানুষ নয়—তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে বহন করতে পারবে এমন মানুষ।

 মস্ত কঠিন কাজ এই মানুষ তৈরি।  একটি মন্দির বানানো যায়, একটি প্রতিষ্ঠান গড়া যায়, কিন্তু মনোমন্দির তৈয়ারি সহজে হয় না। 

অন্তরে অন্তর মিলালে তার অন্তরের পরিচয়। কোথায় তার দুর্বলতা তাকে চিনতে হয়।  জীবন থাকবে, কিন্তু জীবনের গ্লানি থাকবে না।

সুখ আসবে, কিন্তু সুখ তোমাকে উন্মত্ত করবে না। দুঃখ আসবে, কিন্তু দুঃখ তোমাকে ভেঙে ফেলবে না। আনন্দ আসবে, কিন্তু আনন্দে তুমি নিজের অস্তিত্ব হারাবে না। তৃষ্ণা আসবে, কিন্তু তৃষ্ণা তোমাকে তার দাস বানাতে পারবে না।

তখনই হয়তো মানুষ প্রথমবার বুঝতে পারে—মুক্তি মানে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। মুক্তি মানে জীবনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে জীবনকে অতিক্রম করা। ভারতীয় দর্শন যার নাম দিয়েছে—জীবন্মুক্তি।

জীবন আছে, অথচ সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। সংসার আছে, অথচ সংসার জীবনের সাথে অন্তরের সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে না। 

কিন্তু আশ্চর্যের কথা, শিষ্য হওয়া যত সহজ, শিষ্যত্ব পালন করা তত সহজ নয়। গুরুর নাম, গুরুর ছবি, গুরুর জন্মদিন পালন করা সহজ। কঠিন হল গুরুর আদর্শের সাথে নিজের জীবনের পথে তাকে পাথেয় করা। সংযোগ সেখানে বহু শিষ্যেরই কেটে যায়। 
গুরুর পথ অনুসরণ করার বদলে তারা গুরুর নাম অনুসরণ করতে শুরু করে। পরোপকারের জায়গায় এসে বসে আত্মপ্রচার। গুরুর সঙ্গে নিজের নামটিকে পাশাপাশি রাখার এক অদ্ভুত বাসনা জন্ম নেয়।
“আমি তাঁর শিষ্য।” 
তারপর ধীরে ধীরে—“আমিই তাঁর প্রকৃত শিষ্য।
”তারপর—“আমাদের পথই তাঁর একমাত্র পথ।
”তারপর আর-একটু পরে—“অন্যরা ভুল।”
সেখান থেকেই শুরু হয় বিভাজন।
প্রচার আর সেবার মধ্যে গড়ে উঠে বিস্তর ফারাক; সেখান থেকে মাথা চারা দেয় এক ধরনের লালসা। আলোটা যেন কেবল নিজের মুখেই পড়ে। আর কেউ যদি সেই আলোয় এসে দাঁড়ায়, মনে হয় নিজের জায়গাটা বুঝি কমে গেল।
অথচ সত্যিকারের আলো কখনও ভাগ করলে কমে না। একটি প্রদীপ আর-একটি প্রদীপ জ্বালালে প্রথম প্রদীপটির আলো তো নিভে যায় না।
স্বামীজীর শিক্ষার সবচেয়ে বড় জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন—গুরুকে নিজের সম্পত্তি কোরো না। আদর্শকে নিজের দলের মধ্যে বন্দি কোরো না। যে সত্য মানুষকে মুক্ত করতে পারে, তাকে চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখলে সত্যও একদিন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়।
কূপের ব্যাঙ সমুদ্রকে অস্বীকার করে কারণ সে সমুদ্র দেখেনি। মানুষও তেমনই।
নিজের ছোট্ট গণ্ডিটাকেই যদি সে পৃথিবী বলে মনে করে, তবে বৃহত্তর সত্য তার কাছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এই কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে স্বামীজীর অস্ত্র ছিল—সেবা। মানুষের কাছে যাও। তার সুখ-দুঃখের, তার ক্ষুধার যন্ত্রণাকে উপলদ্ধি কর। তার শিক্ষার অস্পুর্ণতাকে ভরিয়ে দাও। তার মান-অপমানের সমব্যাথী হও। তবেই তো মন্দির হয়ে উঠবে ধর্মের পীঠস্থান নচেৎ পুরোটাই ফাঁকা। 

স্বামীজীর কাছে ধর্ম তাই খুব জটিল কোনো তত্ত্ব ছিল না। যে মানুষের দুঃখ অনুভব করতে পারে, যে দুঃখের কারণ বুঝতে চায়, যে অন্য মানুষকে সেই দুঃখ থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে—ধর্ম তার মধ্যেই জীবন্ত। বাকি সব? অন্তঃসার শূন্য কতগুলি ফাঁকা বুলি মাত্র। 

তাই শিক্ষা মানে কেবল জ্ঞান দেওয়া নয়। শিক্ষা মানে মানুষের ভিতর থেকে ভয়টাকে সরিয়ে দেওয়া।

স্বামীজী যখন পাশ্চাত্যের মানুষের কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর চোখে হয়তো এই শক্তিটিই ধরা পড়েছিল। কাজের সময় তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অহংকারকে সরিয়ে রেখে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। একজন নেতৃত্ব দেয়, অন্যরা সেই নেতৃত্বকে কাজে পরিণত করে। ব্যক্তিগত স্বার্থ তখন বৃহত্তর কাজের সামনে ছোট হয়ে যায়। সেই জন্যই তারা বড়।

কিন্তু অর্থের প্রশ্নে আবার তাদের মধ্যে অন্য এক মানুষকে দেখা যায়। অর্থের জায়গায় তারা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। সেখানে উদারতার দরজা অনেক সময় বন্ধ থাকে। অর্থাৎ কোনো মানুষই সম্পূর্ণ নয়। কোনো জাতিই সম্পূর্ণ নয়। কোনো সভ্যতাই সম্পূর্ণ নয়।

শিক্ষার কাজ হল—যেখানে শক্তি আছে, তা গ্রহণ করা; যেখানে দুর্বলতা আছে, তা অতিক্রম করা। আর সেই শিক্ষার শেষ ফল কী? লোকশিক্ষা। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া জিনিস মানুষকেই ফিরিয়ে দেওয়া।

একজন মানুষ যতটুকু শিখেছে, যতটুকু পেয়েছে, তার সবটাই তো তার নিজের নয়। তার মধ্যে মিশে আছে সমাজের শ্রম, পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা, শিক্ষকের জ্ঞান, অগণিত মানুষের অদৃশ্য অবদান।

একমুঠো অন্নের পিছনে অনেক মানুষের অবদান আছে। সেটা একা গ্রহণ করলে চলবে না, তাহলে এতো মানুষের কাছে তুমি  ঋণ মুক্ত হতে পারবে না। আর এই ঋণ শোধ করার নামই লোকশিক্ষা।  

আর এখানেই শিক্ষকেরও পরীক্ষা।

শিক্ষকের কাপড় পরলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কয়েকটি বড় বড় কথা বললেই মানুষ শিক্ষিত হয় না। যে শিক্ষা মানুষের ভিতরে সাহস জাগাতে পারে না, যে শিক্ষা তাকে অন্যের দুঃখের দিকে তাকাতে শেখায় না, যে শিক্ষা তাকে নিজের সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে যেতে পারে না—সে শিক্ষা কেবল শব্দের অলঙ্কার।

শিক্ষক তখন শিক্ষক নন। তিনি কেবল শব্দের ব্যবসায়ী। মানুষকে নিজের দিকে টেনে নিও না, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখাও। গুরুর ছায়ায় সারাজীবন বসে থাকা শিষ্য নয়। গুরুর আলো নিজের মধ্যে নিয়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষ চাই।

কারণ গুরু যদি সত্যিই গুরু হন, তবে তিনি নিজের ভক্তের সংখ্যা বাড়াতে চান না; তিনি চান তাঁর পরে আরও কিছু স্বাধীন মানুষ জন্ম নিক। সেই মানুষরা হয়তো তাঁর নামও নেবে না। তাঁর ছবি ঘরে রাখবে না। তাঁর নামে কোনো মিছিলেও হাঁটবে না। কিন্তু একদিন কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কোনো ভীত মানুষের কাঁধে হাত রাখবে। কোনো হতাশ মানুষকে বলবে—“ভয় পেয়ো না।”কোনো অশিক্ষিত শিশুর হাতে বই তুলে দেবে। কোনো অপমানিত মানুষকে তার নিজের মর্যাদা ফিরে পেতে সাহায্য করবে।

সেদিন হয়তো স্বামীজী কোথাও থাকবেন না—কিন্তু তাঁর শিক্ষা থাকবে। তাঁর নাম উচ্চারিত হবে না—কিন্তু তাঁর আদর্শ কাজ করবে। তাঁর পতাকা দেখা যাবে না—কিন্তু তার হাওয়া মানুষের জীবনের ভিতর দিয়ে বয়ে যাবে। সেই তো সত্যিকারের উত্তরাধিকার। পতাকা নয়—পতাকা বহন করার মতো মানুষ। 

আর মানুষ চাই , যে জীবনের মধ্যেই থেকেও জীবনের দাস নয়। যে নিজের মুক্তির সঙ্গে অন্যের মুক্তিকেও এক করে দেখতে শেখে। যে গুরুর নামকে নয়, গুরুর আদর্শকে  বাঁচিয়ে রাখে।

সম্ভবত এই মানুষটির সন্ধানেই স্বামীজীর সমস্ত সাধনা।

চলবে -

লেখনীতে -রবীন মজুমদার 
তারিখ ২২/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 
২১৫

বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

 ৪৩৬ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৯ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

  মানব মনের বৈচিত্রতা ও  সমাজে তার বাস্তব প্রতিফলনের  এক অদ্ভুত ককটেল এই মহাভারত। মহাভারতে দেখি যে দেবতারা  বেদে ভূমিষ্ঠ হলো, তারা এখানে এসে প্রতিষ্ঠা পেলো। এটাও দেবতাদের বিবর্তনের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না। কাব্য কখনো  কখনো বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, কেননা কল্পনা কবির  কাব্য রচনার রসদ। তাই দেখি অস্ত্রের আধুনিকতা সময়কে  ছাপিয়ে গেছে, জন্ম তো জৈবিক নিয়মের ধার ধারেনি, অবশ্য অধিকাংশ রূপকে মোড়া , যত্রতত্র অলৌকিকতার হাতছানি  কিন্তু মহাজাগতিক দর্শন মহাভারতকে দীর্ঘজীবন দিয়েছে। তাইতো, একটা রাজনৈতিক সংঘাত সবকিছুকে ছাপিয়ে একটি নৈতিক মহাকাব্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  

১৯ তম  পর্বের শুরু - 

“যাই বলো ভাই, মহাভারতের অন্তস্থলে প্রবেশের দরজাটা সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু একবার ভিতরে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে বেরোনোর রাস্তাটা যেন আর খুঁজেই পাওয়া যায় না।”

মধুছন্দার কথাটা শুনে বিভাস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “ঠিক বলেছ। কথাটা আমার বেশ মনে ধরেছে।”

দার্জিলিংয়ে এসে অন্যেরা পাহাড় দেখে, মেঘ দেখে, কাঞ্চনজঙ্ঘার রং বদলানো দেখে। আর এরা এক অদ্ভুত দল—পাহাড়ের সৌন্দর্য চোখের সামনে রেখেও মহাভারতের পাতায় মুখ গুঁজে বসে আছে। কেউ দর্শন খুঁজছে, কেউ ইতিহাস, কেউ রাজনীতি, কেউ মানুষের মন। যেন পাহাড়ের চেয়েও বড় কোনও পর্বত তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—তার নাম মহাভারত।

দর্শনের অধ্যাপক বিভাস। ফলে পৃথিবীর দিকে তাঁর তাকানোর ভঙ্গিতেও দর্শনের ছায়া পড়বেই।

তিনি বললেন, “আসলে ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। মহাভারতে আমরা যখন প্রথম প্রবেশ করি, তখন আমরা জাগ্রত থাকি। গল্প শুনি, চরিত্র দেখি, যুদ্ধ দেখি, রাজনীতি বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু সময় যত এগোয়, আমরা ধীরে ধীরে জাগ্রত অবস্থা থেকে স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়ি। জতুগৃহের আগুন থেকে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গন পর্যন্ত ঘটনাগুলি তখন আর বাইরের ইতিহাস থাকে না—আমাদের নিজেদের মনের ভিতরে তারা একের পর এক দৃশ্য হয়ে উঠতে থাকে।

“জতুগৃহের আগুন যেন আমাদের ভিতরের ভয়কে জ্বালিয়ে দেয়। দ্রৌপদীর অপমান আমাদের বিবেকের দরজায় এসে ধাক্কা দেয়। পাশাখেলার শব্দে আমরা নিজেদের দুর্বলতার শব্দ শুনতে পাই। আর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ? সে তো আমাদের মনের ভিতরেই প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শুরু হয়ে যায়।

“তারপর আসে সুষুপ্তি। গভীর নিদ্রার মতো মহাভারত তখন আমাদের চেতনার ভিতরে স্থির হয়ে থাকে। আমরা আর মহাভারত পড়ি না—মহাভারত আমাদের ভিতরে পড়তে থাকে।

“মানুষের জীবনে কত কথা বলা হয় না, কত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায় না, কত অপরাধের বিচার হয় না, কত ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি পায় না—মহাভারতের কুশীলবরা সেই সমস্ত না-বলা কথাগুলিকে এমন জীবন্ত করে তুলেছে যে, একসময় মনে হয়, এরা আর কেউ নয়—এরা আমরাই।

“তাই তো মহাভারত থেকে মন সরে যেতে চায় না।”

লাবণ্য এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার বলল, “আপনি ঠিক বলেছেন বিভাসদা। আমার মনে হয়, মহাভারতকে আত্মস্থ করার পর একটা অদ্ভুত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। আমরা ঘটনা-প্রবাহে ভাসতে ভাসতে কখন যেন হস্তিনাপুরের রাজসভায় গিয়ে বসি। রাজসভার কোনও এক কোণে, বিধানসভার গ্যালারির মতো জায়গায় বসে দেখি—একজন নারীর অপমান হচ্ছে, আর চারদিকে জ্ঞানী, ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী পুরুষেরা নীরব।

“তখন দ্রৌপদী আর শুধু দ্রৌপদী থাকেন না। তাঁর মধ্যে আমরা আমাদের সময়ের অপমানিত নারীদের মুখ দেখতে পাই। বিলকিস বানু, কামদুনি, হাঁসখালি কিংবা আর জি কর—নামগুলি আলাদা, সময় আলাদা, পরিস্থিতি আলাদা; কিন্তু কোথাও যেন সেই একই রাজসভা ফিরে আসে। প্রশ্নটা একই—অন্যায় যখন চোখের সামনে ঘটে, তখন ক্ষমতাবানদের নীরবতার অর্থ কী?

“ভীষ্মের নীরবতা তখন আমাদের অস্বস্তি দেয়। দ্রোণের নীরবতা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। কারণ জ্ঞান যদি অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব হয়ে যায়, তবে সেই জ্ঞানের মূল্য কোথায়?

“আবার পাণ্ডব-কৌরবের রাজনৈতিক সমীকরণ দেখতে দেখতে মনে হয়, ক্ষমতা বোধহয় যুগ বদলালেও তার স্বভাব খুব বেশি বদলায় না। ক্ষমতাসীনরা বিরোধীকে কতটা জায়গা দেবে, কে কথা বলবে, কে চুপ থাকবে, কার কণ্ঠ সভায় পৌঁছবে—এই হিসাব হস্তিনাপুরেও ছিল, আজও আছে।

“আর হিড়িম্বার কথা ভাবলে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে। রাজপরিবারের সামাজিক পরিসরের বাইরে থাকা এক বনবাসী নারীকে ভীমের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা—এটিও তো মহাভারতের ভিতরের এক আশ্চর্য সামাজিক সীমানা অতিক্রম। অর্থাৎ মহাভারত একদিকে সামাজিক বিধিনিষেধকে দেখিয়েছে, অন্যদিকে সেই বিধিনিষেধ ভাঙার সম্ভাবনাও তার ভিতরেই রেখে দিয়েছে।

“সারা পৃথিবীর ইতিহাসে রাজধর্ম পালনের ব্যর্থতা থেকেই তো কত কুরুক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের ভয়াবহতা যখন মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে, তখন সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আবার জন্ম নিয়েছে অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধের নৈতিক শক্তি।

“এই তালিকার বোধহয় কোনও শেষ নেই।”

বিভাস এবার একটু হেসে বলল, “সেই জন্যই মহাভারত শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের চরিত্রের এক বিশাল পরীক্ষাগার।”

সে একটু থামল।

“দ্রোণের কথাই ধরো। তিনি জ্ঞানী, প্রতিভাবান, অস্ত্রশিক্ষায় অতুলনীয়। কিন্তু জ্ঞান যখন মানুষের মুক্তির পরিবর্তে ক্ষমতার সেবায় ব্যবহৃত হয়, তখন সেই জ্ঞানই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যে জ্ঞান সমাজের কোনও কাজে আসে না, অথচ জ্ঞানী মানুষটি নিজের বুদ্ধিকে নৈতিক সাহসের পরিবর্তে স্বার্থ ও পক্ষপাতের কাজে ব্যবহার করেন—দ্রোণ সেই চরিত্রের এক গভীর প্রতীক।”

লাবণ্য বলল, “আর যুধিষ্ঠির?”

“যুধিষ্ঠির আরও জটিল। সত্যবাদিতা তাঁকে মহান করেছে, কিন্তু সত্যের প্রতি আনুগত্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস—দুটো সবসময় এক জিনিস নয়। তিনি সত্য জানতেন, ন্যায় বুঝতেন, কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে তাঁর সেই নৈতিক সাহস বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন—কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া আর সাহসী মানুষ হওয়া যে এক কথা নয়, যুধিষ্ঠির আমাদের সেই অস্বস্তিকর সত্যটি শেখান।” এটা আজ থেকে ১৫ বছর আগেকার পশ্চিমবঙ্গের চেহারার মতো। 

“দুর্যোধন?” লাবণ্য জানতে চাইল।

বিভাস বলল, “দুর্যোধনের মধ্যে অন্যরকম এক বিপজ্জনক শক্তি ছিল। তিনি জানতেন যে তিনি অন্যায় করছেন। তাঁর সমস্যাটি অজ্ঞতা নয়—আত্মসংযমের অভাব। অন্যায় বুঝেও নিজেকে থামাতে তিনি রাজি নন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সাহসের অভাব ছিল না। অর্থাৎ যে সাহস ন্যায়ের কাজে লাগলে মহৎ হতে পারত, আত্মসংযমের অভাবে সেই সাহসই ধ্বংসের অস্ত্র হয়ে উঠল।”

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল।

দূরে পাহাড়ের গায়ে তখন সন্ধ্যা নামছে।

বিভাস ধীরে ধীরে বলল, “এইখানেই মহাভারতের সবচেয়ে বড় জটিলতা। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা সবসময় সাদা-কালো নয়। অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রয়োজন, বৃহত্তর বিপর্যয় ঠেকানো এবং মানুষের ভবিষ্যৎ—এই সমস্ত কিছু এসে ন্যায়ের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করে।

“শ্রীকৃষ্ণ সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ন্যায়ের পক্ষে, কিন্তু ন্যায়কে কোনও জড় বিধি হিসেবে দেখেন না। তিনি জানেন, কখনও কখনও অন্যায়কে ঠেকাতে প্রচলিত নীতির সীমারেখা অতিক্রম করতেও হয়। আর সেই কারণেই কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কুরুক্ষেত্রে নয়—নিজের ভিতরে।

“কারণ প্রয়োজনকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর নিজের নৈতিক সত্তারও একটা সংঘর্ষ ঘটে। এই দ্বন্দ্বই কৃষ্ণকে সহজ নায়ক হতে দেয় না; তাঁকে করে তোলে এক গভীর নৈতিক দার্শনিক।”

মধুছন্দা এতক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। পাহাড়ের গায়ে শেষ আলোটুকু তখন নিভে আসছে।

সে হঠাৎ বলল, “তাহলে কি মহাভারত থেকে সত্যিই বেরোনোর রাস্তা নেই?”

বিভাস এবার আর হাসল না।

“হয়তো নেই। কারণ আমরা মহাভারত থেকে বেরোতে চাই বলেই বেরোতে পারি না। আমরা যখন ভাবি, মহাভারত অতীতের কাহিনি, তখনই সে আমাদের বর্তমানের আয়না হয়ে সামনে দাঁড়ায়। রাজসভা বদলায়, পোশাক বদলায়, ভাষা বদলায়, রাজনীতির পদ্ধতি বদলায়—কিন্তু মানুষের লোভ, ভয়, ভালোবাসা, ঈর্ষা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, নৈতিক দ্বিধা—এসব খুব বেশি বদলায় না।

“তাই মহাভারত শেষ পর্যন্ত হস্তিনাপুরের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের নিজের ভিতরের হস্তিনাপুর।

“আর সেই কারণেই তার প্রবেশদ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু বেরোনোর পথটি কেউ খুঁজে পায় না।”

বাইরে তখন পাহাড় অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

কিন্তু মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।

 ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
 ২০/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৮ তম পর্ব )

 ৪৩৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৮ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

  এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শন, মহাভারত এর উত্তর দিয়ে  গেছে। সময়ের গভীর রায় যদি বলা হয় - 'তুমি কতদিন বেঁচে ছিলে  তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তুমি তোমার সময়কে কি দিয়েছিলে - সেটাই শেষ প্রশ্ন। "

১৮ তম  পর্বের শুরু - 

একটা বিরাট আকারে নরেনের হাই তোলার শব্দে, আলোচনার মোড় ঘুরে গিয়ে ঘড়ির কাটার উপর গিয়ে পড়লো। মধুছন্দা বলল - রাত-তো অনেক হয়েছে এবার রাতের খাওয়ার পালাটা সেরে  ফেলা দরকার। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঠান্ডাটাও বেশ বাড়ছে , ঘরের রুম হিটারগুলি চালিয়ে দিলে ভালো হয়।  আবার লামা ফ্যামিলিও জেগে আছে, সুতরাং কালবিলম্ব না করে ইন্টারকমে রাতের খাবার পাঠিয়ে দেবার অনুরোধ করলো। 

লাবণ্য বলল - দার্জিলিঙে প্রথম যে দিন আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল , তার পিছনে কারণ ছিল ইতিহাসের বিশুদ্ধতা খোঁজার চেষ্টা করা। আর যে কথাটা প্রচলিত আছে যে শাসক থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বহু সময় বেশ কিছু ঘটনাকে সংযোজিত করেছে, আবার কখনো উহ্য রাখার চেষ্টা করেছে - তাকে অনুসন্ধান করা। সেখানে ইতিহাস প্রেমীদের  ভূমিকা কি হওয়া উচিত। অবশ্য নিজেদের মতো করে  ইতিহাসকে সাজিয়ে গুছানোর প্রচেষ্টা  আজকের নয়, তারও একটা দীর্ঘ ধারাবাহিকতা  আছে। 

আমি শুনেছি পুনেতে ভান্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে মহাভারতের ১২৫৯টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে একটা প্রামানিক গ্রন্থ তৈরি করেছিল।  তার সাথে কোথায় কোথায় মূল ঘটনার সাথে অমিল আছে। এই যে পার্থক্য থাকার নিশ্চয় কিছু কারণ আছে এবং তার ব্যাখ্যা থাকাটাও স্বাভাবিক - সেটাই জানতে চাই। আবার ঋগ্বেদের উপর University of Texas-এ বেশ কিছু কাজ হয়েছে, তার বিষয়বস্তুটা  জানতে চাই। 

লাবন্যর এই গভীর জিজ্ঞাসাটা ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক প্রশান্তর  ভীষণ ভালো লাগলো। এই প্রশ্নের মধ্যে এক দার্শনিকসুলভ বুদ্ধিদীপ্ত  ভাবনা আছে সেটা প্রশান্তকে স্পর্শ করলো। 

আজকে ইতিহাসের বিশুদ্ধতাকে নিয়ে মানুষ বহু প্রশ্ন করে, এই প্রশ্নের  সঠিক উত্তর খোঁজবার প্রয়াস আধুনিক কালে সারা বিশ্ব জুড়ে  কাজ চলছে। 

আজ ইতিহাসের সাথে অনুসন্ধান কথাটা জুড়ে গেছে। তাই ইতিহাসের পাঠকের মন তৃপ্ত হয়না শুধু অতীতের কথা শুনতে। তাই  তারা জানতে চায়, এ কথা স্বীকার্য যে আজকের মতো সেদিন ঘটনা পরম্পরাকে  ধরে রাখার মাধ্যমের বড়োই অভাব ছিল।  তাই স্বাভাবিক  ভাবে অতীতকে কি ভাবে মনে রাখা হতো সেটা তো জিজ্ঞাস্য  থাকবেই। আর ঐতিহাসিকদেরও পৌঁছে দিতে হবে আগামীর  কাছে  সেই প্রামাণ্য অতীতের দলিলকে। 

ইতিহাসকে সংরক্ষণের প্রশ্নে ভারতবর্ষ এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।  ভারতের অতীতকে কখনো বেদের, উপনিষদের অন্তরে, রামায়নের গল্পে, মহাভারতের বিপুল ঐশর্য্যে, পূরণের পলে পলে আর শিলালিপি, মুদ্রা ও ধর্মীয় সাহিত্যতে শোভা পাচ্ছে। এই  উপাদানগুলিই  ইতিহাসের বিকল্প হিসাবে পরিচিত ছিল।   

এই জগাখিচুড়ির থেকে চাল আর ডালকে আলাদা করা এক ধৈর্য  এবং পরিশ্রম সাধ্য কাজ ছিল। এই মিশ্রণটি ছিল শুদ্ধতা  হারাবার প্রথম পদক্ষেপ। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল কাব্যিক মাধুর্য্য  মিশ্রিত অতিরঞ্জনের আধিক্য, কখন ধর্মীয় ভাবাবেগ, রাজশক্তির  আবদার, কখন ঔপনিবেশিকদের তাড়না আর আধুনিক  রাজনৈতিক দলগুলির  স্বর্থসিদ্ধির প্রয়াস।  

ঋগ্বেদ ছিল এক শক্তিশালী প্রাচীন সাহিত্যের দলিল বললে ভুল হবেনা। কিন্তু সেটিকে ইতিহাস বলে ভাবলে ভুল হবে। ধর্মের  এমনিই বাতুলতা, যেখানে রাজায় রাজায় যুদ্ধকে অবশেষে  ধর্মের জয় বলে মেনে নিতে হতো। যুদ্ধ ক্ষেত্রে ব্যক্তি রাজার সাফল্য গৌণ হয়ে যেত দেবতার আনুকূল্যের প্রাধান্যে। এই প্রক্রিয়ায় যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, দেবত্ব ও পৌরাণিক স্মৃতি ভারতীয় ইতিহাস চেতনার উপর একটা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। 

কালস্রোতে ভেসে যায় সেদিনের কাহিনীর সত্যতা, তার বদলে বেশ  কয়েক শতাব্দী পরে মানুষ সেই ধর্মীয় কাহিনীকেই ঐতিহাসিক  দলিল বলে গ্রহণ করে। সাহিত্য উৎস হতে পারে, কিন্তু সে  কখনো ইতিহাস হয়ে উঠতে পারেনা। মনে রাখা প্রয়োজন, তখন কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টির প্রকাশ মাধ্যম শ্রুতির মাধ্যমে  প্রসারিত হতো। 

ইতিমধ্যে মানুষ ধীরে ধীরে নগর পত্তন করতে শিখেছে, (যদিও হরপ্পার  ভগ্নাবশের মধ্যে উন্নত নগরীর সন্ধান পাওয়া যায়) বেদের  মধ্যে মানুষ চিন্তা ভাবনার রসদের সাথে নৈতিকতার সংজ্ঞা  খুঁজে পেয়েছে আবার একই সাথে সমাজে নৈতিকতার অভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে, প্রয়োজন হয়েছে ধর্মকে সুরক্ষিত করার তাই এসব ধারার সংমিশ্রনে তৈরি হয়েছে আগামীকে পথ দেখানোর জন্য বাস্তবের পটভূমিতে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে  রচিত  রামায়ণ ও মহাভারতের  মতো মহাকাব্য। 

মানব মনের বৈচিত্রতা ও  সমাজে তার বাস্তব প্রতিফলনের  এক অদ্ভুত ককটেল এই মহাভারত। মহাভারতে দেখি যে দেবতারা  বেদে ভূমিষ্ঠ হলো, তারা এখানে এসে প্রতিষ্ঠা পেলো। এটাও দেবতাদের বিবর্তনের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না। কাব্য কখনো  কখনো বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, কেননা কল্পনা কবির  কাব্য রচনার রসদ। তাই দেখি অস্ত্রের আধুনিকতা সময়কে  ছাপিয়ে গেছে, জন্ম তো জৈবিক নিয়মের ধার ধারেনি, অবশ্য অধিকাংশ রূপকে মোড়া , যত্রতত্র অলৌকিকতার হাতছানি  কিন্তু মহাজাগতিক দর্শন মহাভারতকে দীর্ঘজীবন দিয়েছে। তাইতো, একটা রাজনৈতিক সংঘাত সবকিছুকে ছাপিয়ে একটি নৈতিক মহাকাব্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  

 ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৮/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৪ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৭ তম পর্ব )

 ৪৩৪ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৭ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

  প্রতিজ্ঞার মধ্যে বাস্তবতা কম অন্ধত্ব বেশি আর অন্ধত্ব পারিপার্শিকতাকে বিশ্লেষেণ করে  সিদ্ধান্ত নেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। 

১৭তম  পর্বের শুরু - 

কেউ ইতিহাসের আবার কেউ বা দর্শন নিয়ে আজীবন চর্চা করে আসছো। আমাকে তোমরা বলো, এই যে মহাভারত থেকে মাঝে মাঝে "সময়" কথাটা উচ্চারিত হয়, আসলে  তার স্বরূপটা কি ? - নরেন প্রশ্নটা  যেন হাউসের দিকে ছুড়ে দিল।

ইতিহাসের অধ্যাপিকা ও গবেষক মধুছন্দা প্রশ্নটা যেন লুপে নিলো  -  'সময়'কে অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দিয়ে সীমারেখা টানার চেষ্টা করা হলে সেটা ব্যর্থ হবে কেননা তার ব্যাপ্তি  বিশ্বজনীন।  সব ধরণের পার্থিব ও অপার্থিব  বিষয়ে যার নিরন্তর যাতায়াত তাকে তো কোন  সীমিত পরিসরে বেঁধে রাখে কার সাধ্য।   

নরেন দা, প্রশ্নটা সময়ের স্বরূপ হবে না বরং প্রশ্নটা যদি এমন হতো -"সময় কি বাস্তব, না মানুষ তার চেতনা দিয়ে নির্মাণ করেছে ?"

-আমি যদি বলি, মানুষ যখন কোন শব্দকে ব্যবহার করে তার পিছনে  থাকে বিশেষ কিছু অবস্থাকে উপলদ্ধির জন্য, যেটা এখানে'পরিবর্তন'কে ইঙ্গিত করছে। আরেকটা মজার জিনিস হল  অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের আলাদা আলাদা অস্তিত্ব আছে কি ?  যদি না থাকে, তবে কি তারা  একই সময়ের বিভিন্ন উপলদ্ধি হিসাবে চিহ্নিত ? 

সময়ের এগিয়ে যাওয়াটা সরলরেখার মতো না সে আবার চক্রকারে ফিরে আসে ?

বস্তু জগতে সৃষ্টি থেকে লয়ের যাত্রা, আবার সৃষ্টি আবার লয় - আদি অনন্ত কাল ধরে প্রকৃতির জয়যাত্রার কোনো বিরাম নেই। এই যে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটগুলি সহজ সরল ভাবে সময় চিহ্নিত  করে দেয়। 

মানব মনে প্রশ্ন নাড়া দেয় - পরিবর্তন কি সময়ের কারণে ঘটে, নাকি পরিবর্তনকে  মাপার জন্যিই মানুষ সময়ের ধারণা তৈরি করেছে  ?  

অর্থাৎ সময় ও পরিবর্তনের সম্পর্ক হলো দর্শনের একটা মৌলিক প্রশ্ন। 

অস্তিত্বের বিশেষ অবস্থান নির্ণয় করে সময়। এর সাথে একটা প্রশ্ন  উদয় হয় -"আমি কে " - এই প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত প্রশ্ন -"আমি  কখন। " 

একদিন এক মানবশিশু এই পৃথিবীতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করল, সময়ের সাথে সে ধীরে ধীরে তার শৈশবকে পিছনে ফেলে  কৈশোরে গিয়ে উপস্থিত হল , তার চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছানোর  বিরতি নেই, অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত বার্ধক্যের  প্রান্তে  এসে উপস্থিত হল। সময়ের সব পাল্টালো, এই ভিন্ন ভিন্ন  সময়ের ছবি প্রত্যক্ষ করে সে ভাবলো -এরা সবাই কি "আমি"?

একসাথে মিলে গেলো ব্যক্তির সত্তা, অস্তিত্ব ও সময়। বিচার যদি  করতে হয়, তাহলে কাকে গ্রহণ করবো আর কাকে বাদ দেব ? সুতরাং সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। 

নরেন আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল - সময় কি বাইরে প্রবাহিত হয়, নাকি  মানুষের চেতনার মধ্যে ?

এবার এই প্রসঙ্গটা বিভাসের ভীষণ ভালো লাগলো। সে বলতে লাগলো - অতীত তো স্মৃতিতে বেঁচে থাকে আর সে তো অপরিবর্তনীয়।  অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গে যার মৃত্যু ঘন্টা বেজে  যায়  সেই তো বর্তমান। ভবিষ্যৎ -সে তো কল্পলোকের বাসিন্দা। 

এই বিশ্বে মজার ব্যাপার হচ্ছে , ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাই একদিন  মৃত্যুর পদতলে জীবনকে সমর্পিত করে কিন্তু এই বাস্তবতাকে কেউ মানতে চায় না। 

এবার লাবণ্য জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা বিভাস দা -"মৃত্যু না থাকলে কি  জীবনের অর্থ থাকতো ?"

বিভাস সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে বলল -  এই বিশ্ব সৃষ্টি ও লয়ের  খেলা। শুধু কি মানুষ ! সভ্যতারও বিকাশ আছে, আর বিকাশের  পিছন পিছন সংকট এসে হাজির হয় আবার এক সময়  তারও  পতন হয় আর সেই পতনের মধ্যে থেকে নতুন আর এক সভ্যতার  বিকাশ ঘটে।   

তাই সময়কে যদি বিচার করতে হয় , তাহলে, শুধু ব্যক্তিগত পরিসরে নয় তাকে ঐতিহাসিক পটভূমিতে নিয়ে আসতে হবে। 

সব কিছুর অন্তরালে কিংবা প্রকাশ্যে মানুষ ও তার নৈতিকতা। কেননা নীতি  নির্ধারণ মানুষই করে থাকে। আজ যে কর্মকে মনে হচ্ছে  এইটাই আদর্শ কাজ , কাল সেটা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে  বিচার করে বলবে - ওটা না হলেই ভালো হতো। 

যুগে যুগে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাবান ব্যাক্তিরা নীতি নির্ধারণ করে  এসেছেন। তাই অবধারিত ভাবে সেই প্রশ্নই উদিত হয় - নৈতিক সত্য কি চিরন্তন, না সেটা সময়ের সাথে সাথে নৈতিকতার  সংজ্ঞা পাল্টায়। এখানেই নৈতিকতা বনাম ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। 

যেখানে ক্ষমতাবানের অঙ্গুলিলেহনে, নৈতিকতার চরিত্র সংশোধিত  হয়, সেখানে ইতিহাস যে তাদের মতো করে লেখা হবেনা  তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি ? শুধু পরাজিতরা মনে করে পার্থক্যটা কোথায় ? যেখানে দৈনন্দিন সত্য সংগ্রহীত শাসকের অপছন্দসই সংবাদ  মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায় আর এরা  ইতিহাসকে যে  পাল্টে ফেলবে এ আর এমন কি। 

" সময় কি কেবল চলে যায়, নাকি চলতে চলতে মানুষ, সভ্যতা ও  ইতিহাসের উপর তার রায় লিখে যায় ?"

এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শন, মহাভারত এর উত্তর দিয়ে  গেছে। সময়ের গভীর রায় যদি বলা হয় - 'তুমি কতদিন বেঁচে ছিলে  তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তুমি তোমার সময়কে কি দিয়েছিলে - সেটাই শেষ প্রশ্ন। "

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৭/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম পর্ব )

৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

 এই জয় নিয়ে এলো এক অন্তহীন বৈরাগ্য আর অদ্বৈত দর্শনের গম্ভীর ভাবনার ইঙ্গিত।  তাইতো মহাভারত হাজার হাজার বছর  ধরে মানুষের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে হেটে চলেছে নৈতিকতা থেকে মানুষের অস্তিত্বের কথা নিয়ে, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মানব মনের দ্বান্দ্বিকতার বৈশিষ্ট নিয়ে। এই অন্তহীন পথপরিক্রমা চলতেই থাকবে, সেটাই এই মহাকাব্যের  মাধুর্য্য।  

১৬তম  পর্বের শুরু -

সময়ের অনিন্দ বাঁশির সুরে বেজে ওঠা উদাত্ত কলতান কোটি কোটি মানব অন্তরে কখন মৃদু সুরে আবার কখন উচ্চগ্রামে সেই ঘুম ভাঙানির গান যুগের পর যুগ ধরে মহাভারত আমাদের শুনিয়ে আসছে। এই সুর আমাদের মননকে শুধু নাড়া দেয়নি, সে শুনিয়েছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেকার মানুষের ভাবনা ও  বাস্তবতার কাহিনী। 

পেঁয়াজের খোসার মতো প্রতি প্রলেপে লুকিয়ে আছে কোথাও তৎকালীন মানুষের সামাজিক ভাবনা, বিশ্বজনীনতার গল্প, যেখানে অব্যক্ত থেকে ব্যক্তর  পথের দ্বান্দ্বিকতা কিভাবে একটা চরিত্রের মধ্যে  প্রতিফলিত হয়েছে, তার প্রতিচ্ছবি। রাজনীতির কথা, ধর্ম ও নৈতিকতার সূক্ষ বিচার, সময়ের প্রয়োজনে ধর্মকে কি  ভাবে যুক্তি সাজিয়ে ব্যবহার করে হঠাৎ করে উদ্ভূত সংকটকে মোচন করতে হয়- তার প্রতিষেধক। মহাভারত চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়েছে, ধর্ম কোনো স্থবিরতায় আটকে থাকা অচল বস্তু নয়, বরং সে সময়ের সাথে এগিয়ে চলা এক গতিশীল ধারণা।   

মহাভারতে সরলীকরণের কোন স্থান নেই। যেমনটি স্বর্ণ নামক  ধাতুটি বহু ধাতুর সাথে একত্রিত বসবাস করে, তাকে পেতে হলে অন্য বস্তুর থেকে সযত্নে তাকে আলাদা করতে হবে, একটু কঠিন বৈকি। 

চরিত্র বিন্যাসে কি বৈচিত্রতা। যাকে মহাকাব্য মহান সাজিয়েছে, তার কাছ থেকে কি সযত্নে তার কথা বলার শক্তিকে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।  এর প্রকৃষ্ট উদহারণ হলো পিতামহ ভীষ্ম। কি অদ্ভুত ! একজনের দাঁতগুলি অসম্ভব সুন্দর, মহাভারত তাকে হাসতেই দিলো না, তাই কেউ দেখতেই  পেলো না তার দাঁতের সৌন্দর্যতা। 

এই নিয়ে শুরু হলো পাঠকের ভাবনা। নিরালায় বসে, পাঠক ভাবতে লাগলো ভীষ্মের কেন এমনটি হলো ? পাঠক ভাবছে -"আচ্ছা! দ্রৌপদীকে রাজসভায় কৌরবদের সভ্যতাবহির্ভূত আচরণের বিরুদ্ধে ভীষ্ম বয়োজোষ্ঠসূলভ আচরণের প্রদর্শন করতে পারতো , কিন্তু বাস্তবে করলো না।"  পাঠক মেলাতে শুরু করলো, আজকের নারী নির্যাতন ও নারী হত্যার  বিরুদ্ধে শাসকের মৌনতা বা কোন কোন ক্ষেত্রে আড়াল করা  কিংবা দিকে দিকে ঘটে যাওয়া ধর্মের নামে গনহত্যা ও গণধর্ষণ সংগঠিত হওয়ার  বিরুদ্ধে শাসকদের মৌনতা। শাসকের কাছে "কে আপন আর কেই বা পর" - এই সিদ্ধান্ত  নেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই  একপেশে ভাবনার এক পরম্পরার বাস্তব চিত্র। আবার শাসকের কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাও হতে পারে, সেখানে যেন তেন প্রকারে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই প্রাধান্য পায়।  আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হবার পরিবর্তে চুপ থাকাটা তৎকালীন শাসক   কৌরবদের পক্ষেই পাল্লাভারী ছিল, আজকেও শাসক ও শাসকপরিবারদের   তাই আছে। তাই এটাই প্রমাণিত ধর্মের পাল্লাটা বোধহয় নিয়ন্ত্রিত হয় শাসকের আঙ্গুলি লেহনে। সংবিধানের প্রস্তাবনা নীরবে  নিভৃতে কাঁদে।  

হাজার হাজার বছর ধরে শাসকের যেমন অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে মেরুদন্ড সোজা করে  শাস্তি দিতে যেমন অপরাগ, ঠিক তেমনি শাসকের পেয়াদাদের ভয়ে শাসিতও মেরুদন্ড  সোজা করে তেমনটি প্রতিবাদ করে না। তাই পরিবর্তনও ইতিহাসের বুকে কম দেখা যায়।  শাসকের কি হয়, জানিনা! কিন্তু অন্যায়কে অন্যায় বলে প্রতিবাদ  করতে না পেরে শাসিতর সেই  না বলা প্রতিবাদের আওয়াজটা নিজ অন্তর থেকে  না বের হতে পেরে সে অন্তঃস্থলে গিয়ে এক  রাসায়নিক বিকরণের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে  ধীরে ধীরে বিদীর্ন করে দেয় অন্তঃস্থলকে।  

এতক্ষন খুব মনোযোগ দিয়ে মধুছন্দা বিভাসের ব্যাখ্যাগুলি শুনে যাচ্ছিল। ভীষ্মের যে দিকটা বিভাস এখনো উল্লেখ করেনি, সেটা শোনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তখন সে বলল - বিভাস দা, ভীষ্ম যে রাজসভায় মুক হয়ে গেল, তার পিছনের কারণ ও বাধ্যবাধকতা কি ছিল সেটা উল্লেখ করো। রাজসভায় কার্য্যটা সবাই প্রত্যক্ষ করলো কিন্তু তার পিছনে কারণটা উল্লেখিত না হলে ব্যাখ্যাটা অসম্পূর্ন রয়ে যাবে।

 বিভাস সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে বলল - অবশ্যই। এটাতো সবাই জানে পিতা শান্তনুকে  দেওয়া তার প্রতিজ্ঞার কথা। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার প্রতি দায়বব্ধতা তো একটা মিসাইল কিন্তু তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমনিই অমনোনীয় সেখানে  ভালো-মন্দের অপেক্ষা করেনা। একবার ছুটে যাবার  পর তার গতিপথ রুখবে, সে কার সাধ্যি।  সে মানেনকো কোন নীতি। প্রতিজ্ঞাই দখল নিলো ধর্মের জায়গায়। ধর্মের কেন্দ্রীয় স্থানে বসে থাকা প্রতিজ্ঞা   দ্বারা পরিচালিত ভীষ্ম ধীরে ধীরে নীতির জায়গার সাথে নিজেকে মেলাতে পারলোনা- সেটাই তার চরিত্রের ট্রাজেডি। 

যে দিকটা মহাভারতে একটি দার্শনিক প্রশ্নের অবতারণা  করে সেটি হল -" প্রতিজ্ঞা কি নিজেই  ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারে, নাকি প্রতিজ্ঞার থেকে বড় হতে পারে  তার ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ "?

আমার মনে হয়, চৈতন্যের উপর প্রতিজ্ঞার প্রভাব বিস্তার বাস্তবে অচল। প্রতিজ্ঞা জড় অর্থাৎ সে পরিবর্তিত হতে পারে আর চেতন অপরিবর্তিত থাকে।  প্রতিজ্ঞার মধ্যে বাস্তবতা কম অন্ধত্ব বেশি আর অন্ধত্ব পারিপার্শিকতাকে বিশ্লেষেণ করে  সিদ্ধান্ত নেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। 

আপনাদের কি মনে হয় ?

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৬/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

 ৪৩২ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৫তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভিতরের মানুষটির কাছে ফিরে আসার দিকে।

১৫তম  পর্বের শুরু -

অসহ্য কাঠফাটা রোদে গাছের পাতাগুলি আর আকাশের পানে চেয়ে থাকতে পারছেনা, শুধু সেই আশায় বেঁচে আছে একদিন বৃষ্টি তো আসবেই। আবার বর্ষার একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে বৃক্ষ আবার  আকাশের কাছে প্রার্থনা করবে, অনেক হয়েছে - দীর্ঘদিন সূর্য্যের মুখ দেখিনা। এটাই প্রকৃতির  স্বাভাবিক দ্বান্দ্বিকতা। প্রকৃতিতে যখন দ্বান্দ্বিকতা আছে তখন মানুষের মধ্যে থাকবে না এতো হতে পারে না। এই দ্বান্দ্বিকতাই মহাভারতের ঐশ্বর্য্য। 

মহাভারতে নৈতিকতা আছে কিন্তু সে নৈতিকতা  ধূসর একটা আচ্ছাদনে ঢাকা।  যুধিষ্ঠির মহাভারতে ধর্মরাজের তকমায় ভূষিত কিন্তু তিনি বাজি রেখে পাশা খেলায় অনাসক্তি নেই।  এই 'আসক্ত' শব্দটি যদি কোন চরিত্রের সাথে মাখামাখি হয়ে যায়, মন কি সায় দেয় ধর্মরাজ বলতে ? আবার অহংকারের মতো একটা বলবান বস্তুকে আগলে রেখে কর্ণ কি করে দানবীর হয়ে উঠলেন - সেটাও প্রশ্নের উর্ধে নয়। সমালোচকগণ তো বলতেই পারেন, কর্ণ তার অহংকারকে তৃপ্ত করার জন্য স্থূল বস্তু দান করতেন আর সুক্ষ বস্তুকে আগলে রাখতেন।  

মহাভারতে অন্ধত্বের তকমার অধিকারী অনেকেই ছিলেন। আক্ষরিক অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহে অন্ধ ছিলেন-তা বহু চর্চিত কিন্তু মহাবীর কর্ণও সাথী চিহ্নিত করতে গিয়ে বন্ধুত্বের কারণে অন্ধ ছিলেন। সত্যের অনুসরণকারী ভীষ্মের রাজপরিবারের  প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে রাজসভায় প্রকাশ্যে অন্যায় সংগঠিত  হওয়াতেও প্রতিবাদ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। এটাও ঠিক এক আনুগত্যের প্রতি  দাসত্ব কার্য্য হিসাবে এই মহাকাব্যের পাতায় উল্লেখিত কিন্তু  মানসিক দ্বন্দ্বের অদৃশ্য  কারণ হিসাবে ভীষ্ম ও কর্ণের হৃদয়ে স্পর্শ করেনি, সে কথা  জোর করে বলা যাবে না, যা আমাদের অনুভবের আওতায় পরে। এটাই হচ্ছে জীবনের অপরিপুর্নতার এক পূর্ণাঙ্গ  ছবি। 

কি অসাধারণ মহাভারতের দর্শন। চৈতন্যহীন বস্তু, জগতে যে অসাড়, সেটা বোঝাতে কোন  কষ্ট হয়নি। কুরুক্ষেত্রের মতো এই বিশাল যুদ্ধ, এতো মানুষের জীবনের আহুতিতে  যজ্ঞ থেকে বিজয়  উঠে এলো  আর সঙ্গে নিয়ে এলো একরাশ শূন্যতা। নিঃশব্দে উচ্চারিত হলো  ভারতীয় দর্শনের ভাবনা,  সব ক্ষমতার অলিন্দে  বসে আছে সেই জাগতিক ক্ষমতাই হলো চূড়ান্ত ক্ষমতা আর সেটাই হলো সময়।  

 এই জয় নিয়ে এলো এক অন্তহীন বৈরাগ্য আর অদ্বৈত দর্শনের গম্ভীর ভাবনার ইঙ্গিত।  তাইতো মহাভারত হাজার হাজার বছর  ধরে মানুষের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে হেটে চলেছে নৈতিকতা থেকে মানুষের অস্তিত্বের কথা নিয়ে, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মানব মনের দ্বান্দ্বিকতার বৈশিষ্ট নিয়ে। এই অন্তহীন পথপরিক্রমা চলতেই থাকবে, সেটাই এই মহাকাব্যের  মাধুর্য্য।   

ক্রমশঃ 
কলমে - রবীন মজুমদার 
১৫/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

৪৩১ স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন

৪৩১ স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন 


 খুব নিরীহ একটি কথা -"তুমি দুর্ব্বল নও। " এই কথাতেই অর্ধেক পৃথিবীতে রাজত্ব করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কেঁপে উঠেছিল।  স্মৃতির সত্যিকারের কিংবা ইচ্ছাকৃত  ভ্রমে স্বাধীনতোত্তর দেশীয় রাজপুরুষেরা  ব্রিটিশদের মতো যাঁর নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়, সেই স্বামী বিবেকানন্দই ছিল জাতির মেরুদন্ড গঠন করার কারিগর। এই কথাটি যে কতখানি সঠিক তার প্রমান দিয়েছে ১৯১৮ সালের  Sedition Committee, যাকে Rowlatt Committee-ও বলা হয়, সেই  কমিটির রিপোর্ট। কেন  স্বামীজী আজ উপেক্ষিত, সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ সচেতন মানুষেরা  খুঁজে নেবেন। সেই চর্চার পরে ঈশ্বর বা সত্যকে(সত্য ঈশ্বরের অপর নাম ) জানা না জানার দ্বায়িত্ব তাঁদের। প্রশ্ন কেউ তোলে, আবার কেউ করে। 

সেদিন ছিল একদল পরাধীন মানুষ। যারা দীর্ঘদিনের শাসকের অত্যাচারে মানুষ হিসাবে সেই জাতিটা তাদের আত্মপরিচয়ের তকমাটা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলে ছিল। জাতিকে  এই আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করার জন্য বহু মানুষ বহু পথ হাতড়ে বেরিয়েছেন  কিন্তু সঠিক পথের দিশা কেউ খুঁজে পাননি। 

"অন্তরে অন্তর মিশালে তবে তার অন্তরের পরিচয় "- হয়তো সবার সাথে পরাধীন ভারতের আপামর জনগনের হৃদয়ে সদাই বেজে ওঠা সুরটির অনুরণনটি সঠিক মননের অভাবে  অপর মানুষের হৃদয়ে সঠিক ভাবে পৌঁছাতে পারেনি।  কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ সেটা শুনতে পেয়েছিলেন। আর সেই পোড়া বাঁশির অর্থকে অনুধাবন করে তাঁর আগামীর গান - সে তো ইতিহাস। 

হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা সেই-ই হতে পারে, যাঁর সুরের সাথে শ্রোতার সুরের মেলবন্ধন ঘটে যায়। হৃদয়ে হৃদয় যে যোগ করতে পেরেছে সে তো হৃদয়ের রাজা হয়ে গেছেন। তিনি তো মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের রাজা আর সেই রাজার রাজত্বের পতন যে হয় না, সেটা বুদ্ধিমান শাসকরা জানেন বলেই, তাকে আড়াল করার চেষ্টা। 

গল্পটা এমনিই ছিল -

আজকের দৃষ্টিতে সেদিনের কলকাতাকে দেখলে চলবে না। শহরটা যেন  আড়াআড়ি দুই ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে সাহেবদের কলকাতা - চওড়া রাস্তা, ঘোড়ার গাড়ি, গ্যাসের আলোর রোশনাই, মৃদু মন্দ লয়ে বাজনার সাথে বলরুমে পানীয়র গ্লাস হাতে নিয়ে বিলেতি পোশাক পরে সাহেব-মেমদের নৃত্য।  ঠিক তার পাশে সেই দেশি কলকাতার অলি-গলিগুলি আলোর অভাবে বিষাদহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেরোসিনের টিমটিমে আলোতে ছাই সহযোগে এঁটোকাঁটায় বিদীর্ন কাঁসার থালা বাসন গুলিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ঘর্মাক্ত কলেবরে বাড়ির রমণীরা মাজছে আর ক্ষণে ক্ষনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে।  দেশটা শুধু হেরে যায়নি, দেশের মানুষগুলি যেন এক  সেই জীবন যুদ্ধের পরাজিত সৈনিক। 

ইংরেজরা শুধু ভারত শাসন করছেন না, ভারতীয়দের মনটাকে যেন পকেটে পুরে রেখেছে। আজকের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ছিল না, কিন্তু ইংরেজরা আজকের মতো তাদের হোয়াটস্যাপ য়ুনিভার্সিটির মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারে ভারতীয়দের জর্জরিত  করে তুলেছিল যে, ভারতবর্ষ একটা প্রাচীন,  কুসংস্কারাচ্ছন্ন অতি দুর্ব্বল জাতি। বারবার এই রেকর্ডটি বাজানোর ফলে একসময় ভারতীয়রা ভাবতে শুরু করেছিল সত্যিই তারা দুর্ব্বল জাতি। 

এমন এক দোলাচলের সন্ধিক্ষণে উত্তর কলকাতায় এক তরুণ, যাঁর তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে  আত্মবিশ্বাসের ঝলক, দৃষ্টি যেন সদাই বিশেষ কিছুকে খুঁজে বেড়াচ্ছে , সেই চিরন্তন প্রশ্ন - ঈশ্বর কি আছেন ? আসলে, সত্য যে  লুকিয়ে আছে ঈশ্বরের আড়ালে, তাকেই উন্মোচিত করে পরাধীন দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে যে।  

শুনেছেন  দক্ষিনেশ্বরে এক পুরোহিত আছেন, যিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। সেই উত্তরের তাড়নায় পদব্রজে বারবার তিনি ছুটে যাচ্ছেন সেই দক্ষিনেশ্বরের ব্রাহ্মণ  পুরোহিত শ্রী রামকৃষ্ণের কাছে , তিনিই সেই দত্ত বাড়ির নরেন্দ্র নাথ। তারপরের ইতিহাস তো সবার জানা। শ্রী রামকৃষ্ণের 'মা' যে  আসলে সেই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ সেই ভারত মাতা ভিন্ন আর কেউ নয়। এখানেই দুয়ে দুয়ে চার হয়ে গেলো। 

সেই দিনগুলিতে দরকার ছিল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক স্বাধীনতার থেকে আরো বেশী প্রয়োজনীয়  ছিল ব্রিটিশদের অহংকারের কারাগারে বন্দী  ভারতীয়দের লুন্ঠিত   আত্মপরিচয়কে আজাদ করার।  

অবশেষে এলো সেই সুযোগ। আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতবর্ষ ও তার প্রাচীন সংস্কৃতিকে  তুলে নিয়ে আসবার মাহেন্দ্রক্ষণ।  সময়টা ১৮৯৩ সালের শিকাগোর ধর্মসভার মঞ্চ।   

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা অসংখ্য বিপ্লবী, রাজনৈতিক নেতা এবং সংগ্রামীর নাম পাই, যাঁরা হাসিমুখে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু এই রাজনৈতিক বিপ্লবের অনেক আগে, ভারতের মাটিতে নিঃশব্দে এক অন্যরকম বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। সেই বিপ্লব ছিল আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার বিপ্লব, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির বিপ্লব। আর এই মনস্তাত্ত্বিক মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত সেনাপতি ছিলেন কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, বরং একজন গৈরিক বসনধারী সন্ন্যাসী— স্বামী বিবেকানন্দ।

স্বামীজি নিজে কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করেননি, সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনেও অংশ নেননি। তবু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদানকে ঐতিহাসিকরা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করেন। কিন্তু কেন? কীভাবে একজন সন্ন্যাসী হয়ে উঠলেন বিপ্লবীদের পরম আরাধ্য?

'দুর্বলতাই মৃত্যু' – মনস্তাত্ত্বিকভাবে  দাসত্বের অবসান

দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনে ভারতবাসী যখন সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে তারা একটি হীন, দুর্বল এবং অনুন্নত জাতি, ঠিক সেই চরম হতাশার মুহূর্তে স্বামীজি আবির্ভূত হলেন এক কালবৈশাখীর মতো। তিনি শিকাগো থেকে ফিরে এসে ভারতবাসীকে শোনালেন উপনিষদের সেই অমোঘ বাণী— "উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত" (ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না)।

তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, "ভয় পেয়ো না, তুমি দুর্বল নও। দুর্বলতাই পাপ, দুর্বলতাই মৃত্যু।" তাঁর এই কথাগুলো কেবল আধ্যাত্মিক উপদেশ ছিল না; এটি ছিল পরাধীন, মেরুদণ্ডহীন এক জাতির ধমনীতে মৃতপ্রায় রক্তে নতুন শক্তির সঞ্চার। ব্রিটিশরা যে মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতার বীজ বুনেছিল, স্বামীজি তা সমূলে উৎপাটন করেছিলেন।

 বিপ্লবীদের গীতা: 'বর্তমান ভারত' ও 'কলম্বো থেকে আলমোড়া'

বিশ শতকের শুরুর দিকে ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবীদের দিকে তাকালে একটি অবাক করা বিষয় চোখে পড়ে। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা বিপ্লবীদের এক হাতে থাকত শ্রীমদভগবদ্গীতা, আর অন্য হাতে থাকত স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বই, বিশেষত 'কলম্বো থেকে আলমোড়া' এবং 'বর্তমান ভারত'।

বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) তাঁর মন্ত্রগুপ্তি পেয়েছিলেন স্বামীজির আদর্শ থেকেই। স্বামীজি বলতেন, "লোহার মতো পেশী আর ইস্পাতের মতো স্নায়ু চাই।" বাঘা যতীন সেই আদর্শেই নিজের এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের জীবন গড়েছিলেন।

ঋষি অরবিন্দ স্পষ্ট বলেছিলেন, "বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবনের রূপকার।"

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বামীজিকে তাঁর মানসগুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নেতাজি লিখেছিলেন, "স্বামীজি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে আমি তাঁর পদপ্রান্তে বসে থাকতাম।" নেতাজির আপসহীন সংগ্রামের যে স্ফুলিঙ্গ, তার আদি উৎস ছিল বিবেকানন্দের দর্শন।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন - " স্বামী বিবেকানন্দ যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তাহলে ভারতবর্ষ থেকে সব কুসংকারকে ঝেটিয়ে বিদায় করতেন।"
“প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনের সাধনায় যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি আর কেউ নন—স্বামী বিবেকানন্দ।”
“গ্রহণ করিবার, মিলন করিবার, সৃজন করিবার প্রতিভাই তাঁহার ছিল।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 দেশমাতৃকাই একমাত্র উপাস্য(মনের সংঘব্ধতা আর একই আরাধ্য দেবতা )

সেই যুগে সনাতন ধর্মে অনেক দেব-দেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু স্বামীজি ভারতবাসীকে এক নতুন ধর্মে দীক্ষিত করলেন— দেশপ্রেমের ধর্ম। তিনি বললেন, "আগামী পঞ্চাশ বছর আমাদের একমাত্র উপাস্য দেবতা হবেন আমাদের এই মাতৃভূমি। অন্য সব দেব-দেবীকে আপাতত দূরে সরিয়ে রাখো।"

একজন সন্ন্যাসীর মুখে এমন কথা সেই যুগে ছিল কল্পনাতীত। তাঁর এই বাণী ভারতের তরুণ সমাজকে এতটাই উদ্দীপ্ত করেছিল যে, তারা হাসিমুখে দেশের জন্য প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। তাঁর শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতাও তাঁরই নির্দেশে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে, শিল্পে ও শিক্ষায় যে যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা স্বামীজিরই দেশপ্রেমের সম্প্রসারিত রূপ।

 মানুষের মতো মানুষ গড়ার মন্ত্র 

স্বামীজি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই আসবে এবং টিকবে, যখন দেশের মানুষ আত্মবিশ্বাসী ও চরিত্রবান হবে। তিনি বলেছিলেন, "আমার মানুষ চাই যারা হবে সবল, তেজস্বী ও  বিশ্বাসী তরুণ।" তিনি এমন এক যুবসমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যারা শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় নয়, বরং সাহস, ত্যাগ এবং সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত হবে। তাঁর এই মানুষ গড়ার দর্শনই স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন ব্রিটিশের ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে ভারতের তেরঙা পতাকা উত্তোলন করা হলো, তখন স্বামীজি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। ১৯০২ সালেই ৩৯ বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল। কিন্তু যে সুবিশাল এবং মজবুত ভিত্তির ওপর ভারতের স্বাধীনতার ইমারতটি গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান স্থপতি ছিলেন তিনিই। স্বামী বিবেকানন্দ কেবল ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু নন, তিনি ছিলেন ঘুমন্ত ভারতের জাগরণের সেই প্রলয়-শিঙা, যাঁর ধ্বনিতে পরাধীনতার শিকল প্রথমবার কেঁপে উঠেছিল।

পৃথিবীর ইতিহাস বলে জনজাগরন বা পরিবর্তনের প্রকৃত কান্ডারি তারাই, যাঁরা দেশের জনগনের মানসিক প্রস্তুতি গঠনে সাহায্য করেন। এই ভারতবর্ষের নিঃসন্দেহে সেই কান্ডারি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। 

বৃটিশদের গোয়েন্দা রিপোর্টের অংশ -

এই প্রসঙ্গে Sedition Committee, যাকে Rowlatt Committee-ও বলা হয়, সেখান থেকে উদ্ধৃত ১৯১৮ সালে ভারতে বিপ্লবী ও গোপন রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুসন্ধানের জন্য গঠিত হয়। এর রিপোর্টে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের বৌদ্ধিক ও আদর্শগত উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও স্বামী বিবেকানন্দের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রিপোর্টে বিপ্লবীদের পাঠ্য ও অনুপ্রেরণার প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল যে ভগবদ্গীতা, বিবেকানন্দের রচনা এবং মাজ্জিনি ও গ্যারিবাল্ডির জীবনচরিত তাঁদের শিক্ষার অংশ ছিল। গবেষণামূলক সূত্রে Sedition Committee Report-এর ১৯১৮ সালের সংস্করণের পৃষ্ঠা ১৭-এর উল্লেখ রয়েছে।

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৪/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

  

ujaan

৪৩৭ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩০)

    ৪৩৭   কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩০ ) ১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে শিষ্যদের উদ্দেশ্য পাঠানো পত্রের   ভাবার্থের অনুসরণে...