পোস্টগুলি

ujaan

৩৯২ ভারত আমাদের কী শেখাতে পারে

ছবি
 ৩৯২   ভারত আমাদের কী শেখাতে পারে  (ফ্রেডরিক মাক্সমুলারের একটি ভাষণ অবলম্বনে ) কলেজস্ট্রিটে বই কিনতে গেলে আমার একটা নৈতিক সংকট হয়। সংকটটা খুব গভীর—আমি বই কিনতে যাই জ্ঞানের জন্য, আর ফিরে আসি পকেট খালি করে। আমার এক বন্ধু বলে, “তোমার সমস্যা হল তুমি বই পড়ার আগে বই কিনে ফেলো।” আমি বলি— “বই কেনা আর বই পড়া দুই আলাদা বিদ্যা। প্রথমটা অর্থনীতির, দ্বিতীয়টা অধ্যবসায়ের।” যাই হোক, সেদিনও সেই একই ঘটনা। কলেজস্ট্রিটের এক ধুলো ধরা দোকানে ঢুকে হঠাৎ চোখে পড়ল একখানা ইংরেজি বই। নাম— What Can India Teach Us? লেখকের নাম দেখে একটু থমকে গেলাম— Friedrich Max Müller। জার্মান পণ্ডিতদের নামের একটা বিশেষত্ব আছে। নামটা শুনলেই মনে হয় লোকটি নিশ্চয়ই অন্তত পাঁচটি ভাষায় ঝগড়া করতে পারেন। বইয়ের নাম পড়ে প্রথমে একটু হাসি পেল। ভারত আবার কাকে কী শেখাবে? আমরা তো বরাবর ছাত্র—কখনো ইংরেজের কাছে, কখনো ইতিহাসের কাছে, কখনো নিজের ভুলের কাছে। কিন্তু মুলার সাহেব বললেন— “না, ভারত শুধু শেখে না, শেখায়ও।” এই কথা শুনে আমার পাশের চায়ের দোকানের গণেশ বলল— “তা হলে তো আমাদের পাড়ার লোকজনই সবচেয়ে বড় শিক্ষক। সারাদিন সবা...

৩৯১ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৪)

ছবি
  ৩৯১ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৪ ) ২১শে সেপ্টেম্বর,১৮৯৪ আমেরিকা থেকে লেখা  চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে - স্বামীজীর এই চিঠিতে তাঁর ব্যক্তিগত মনোজগতের এক গভীর দ্বন্দ্ব ধরা পড়ে। নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দোলাচলে থেকেও তিনি তাঁর দৈনন্দিন কর্মযাত্রার খতিয়ান অকপটে প্রিয়জনদের সামনে তুলে ধরেছেন। সার্বজনীন ধর্মের আদর্শকে সামনে রেখে এবং নিজের কর্মধর্মকে যাত্রাপথের সারথি করে তিনি যে পথে এগিয়ে চলেছিলেন, সেই পথে সংগৃহীত অভিজ্ঞতাই এই চিঠির মূল সুর। মানুষের অস্তিত্বে দেহ ও মন—এই দুই শক্তির মধ্যে যে টানাপোড়েন, স্বামীজী তার বাস্তব অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করেছিলেন। মন যেখানে কাজের জন্য দেহকে উন্মত্ত করে তোলে, সেখানে দেহ সব সময় সেই আহ্বানে সাড়া দিতে পারে না। এই অসামঞ্জস্য থেকেই ক্লান্তি জন্ম নেয়। দেহ ও মনের এই ব্যবধানই মানুষের বাস্তবতা। যতদিন এই দুইয়ের পৃথক অস্তিত্ব রয়েছে, ততদিনই মানুষের চোখের সামনে এই দৃশ্যমান পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকে থাকে; আর যেদিন এই দুই সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যাবে, সেদিনই মানুষের কাছে জগতের দৃশ্যপট মুছে যাবে—এ এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। স্বামীজী অনুভব করেছিলেন,...

৩৯০ প্রশ্ন

ছবি
  ৩৯০ প্রশ্ন  সন্ধ্যা নামছে। গঙ্গার ধারে প্রাচীন অশ্বত্থতলায় গুরু ও শিষ্যের আসন। অনতিদূরে শ্মশানের ধোঁয়া উঠছে। ধুঁয়ার কুন্ডলীর সাথে তাল মিলিয়ে অন্তর থেকে উৎসারিত প্রশ্নের ঝড় শিষ্যের মনকে আন্দোলিত করে তুলছে। একান্ত আবেগে শিষ্য গুরুদেবকে প্রশ্ন করলো -" গুরুদেব ! শুধুমাত্র দেহ সম্বল তো মানুষ নয়  —এ কথা শুনেছি। কিন্তু দেহ ও মনকে   কেন  জড় বলা হয়? প্রাণহীন দেহকে কেন দৃশ্যমান পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়? আর দেহের অধিকারীকে কোন মানদণ্ডে অমরত্ব দেওয়া হয়? যদি সবার অন্তরে এক চৈতন্য থাকে, তবে কেউ সৃষ্টিকর্তা, কেউ ধ্বংসকারী—এই বৈষম্য কেন?" গুরু -   তোমার প্রশ্নগুলো নতুন নয়; অনন্ত কাল ধরে এই একই প্রশ্নের পুনারাবৃত্তি হয়ে আসছে আর একদিন এই প্রশ্ন  তুলেছিল এক কিশোর—নচিকেতা। সেই কাহিনী আছে ' কঠোপনিষদ -'এ। সে যমের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল—মৃত্যুর পর কী থাকে? শিষ্য - দেহ কেন জড়? গুরু - দেহ পঞ্চভূতের সমষ্টি—মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ। এদের   নিজস্ব চেতনা নেই। যেমন মাটির তৈরি একটি প্রদীপ নিজে আলো দেয় না; তেল ও সলতে জ্বালালে সে আলোকিত হয়। তেমনি দেহ নিজে সচেতন নয়—চ...

৩৮৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩)

ছবি
৩৮৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩ ) ১৮৯৪ সালে শিষ্যকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে    ঊনবিংশ শতকের অন্তিম পর্বে ভারতবর্ষ ছিল বহুমাত্রিক সংকটে আবদ্ধ—রাজনৈতিক দাসত্ব, সামাজিক কুসংস্কার, জাতি-বর্ণের বিভাজন, নারীর অবমাননা এবং সর্বোপরি আত্মবিশ্বাসের গভীর অভাব। ১৮৯৪ সালে শিষ্যকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দের চিঠিগুলিতে আমরা যে তীব্র আহ্বান শুনি, তা কেবল আধ্যাত্মিক উপদেশ নয়; তা ছিল জাতির পুনর্জাগরণের এক কর্মমুখর মন্ত্র। তাঁর ভাষা দুরন্ত, তাঁর যাত্রা দুধর্ষ—কারণ তিনি জানতেন, কর্দমাক্ত পথকে মসৃণ করতে হলে প্রথমে মননের শৃঙ্খল ভাঙতে হবে।  শৃঙ্খল: কেবল ইংরেজের নয়, সমাজমননেরও স্বামীজী উপলব্ধি করেছিলেন—শাসকের আরোপিত শৃঙ্খল যেমন জাতিকে বেঁধে রাখে, তার চেয়েও শক্ত বাঁধন হলো সমাজের অন্তর্গত কুশিক্ষা ও কুসংস্কার। জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, অন্ধ আচার—এই সবই মানুষের শক্তিকে ক্ষীণ করে দেয়। তাঁর প্রশ্ন ছিল তীক্ষ্ণ: “শৃঙ্খল কি শুধু ইংরেজরা পরিয়েছে?” এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে ছিল আত্মসমালোচনার আহ্বান। জাতির গতি যখন নিজ মননেই রুদ্ধ, তখন প্রয়োজন প্রগতিশীল ভাবধারার উন্মেষ—যে ...
৩৮৮  অপেক্ষা রাত্রির গভীরতম স্তব্ধতা। প্রকৃতি জেনে গেছে এই মুহূর্তে শব্দ করতে নেই। শব্দরা ফিরে গেছে তাদের উৎসের সন্ধানে। আকাশে চন্দ্রামা ধীরে ধীরে আকাশের উপর তাঁর কতৃত্ব বিস্তার করছে। এই মায়াবী রাতে দুই মানব-মানবী খোলা জানালার ধারে  উন্মুখ হয়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য আকন্ঠভরে পান করছে।  কত প্রশ্ন প্রলয়ের মনে এসে একে একে ভিড় করতে লাগলো।  আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই  প্রলয় ধীরে বলল— “ যেখানে দুই নেই, সেখানেই সত্য। অপেক্ষা, প্রেম, মৃত্যু—সবই সেই একের ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গ। ” নন্দিনী অনুভব করল—আজ প্রলয়ের কথাগুলো গল্প নয়, যেন এক গভীর ধ্যান থেকে উৎসারিত কতগুলি জমাট বদ্ধ শব্দ।  'মায়া' সে তো  বহুর আবরণে আচ্ছাদিত  জগৎ যেন এক অনন্ত প্রতিচ্ছবি।  যা দেখি—তা ক্ষণস্থায়ী,  যা ধরি—তা পরিবর্তনশীল, যা ভালোবাসি—তা হারিয়ে যায়।  নন্দিনী ফিসফিস করে বলল,  — “  তাহলে কি সবই মায়া?” প্রলয় শান্ত স্বরে বলল —   “মায়া মানে মিথ্যা নয়। মায়া মানে আচ্ছাদন। যেমন কুয়াশা সূর্যকে ঢাকে, তেমনি মায়া এককে বহু করে দেখায়।” অপেক্ষা—মায়ার ভিতরে সময়ের খেলা। ...

৩৮৭ প্রেমের ভাষা ও ভাষাহীনতা

ছবি
  ৩৮৭  প্রেমের ভাষা ও ভাষাহীনতা  ভাষাহীন ক্রন্দনে প্রেম এক নীরব ভাষা হয়ে অনুভূতির স্কন্ধে চেপে বসে। প্রেমকে কি কোনো ভাষায় ব্যক্ত করা যায়?—এই প্রশ্নটি অবন্তিকা তুলতেই সপ্তর্ষি  হেসে বলল, “ভাষায় যদি প্রেম ধরা পড়ত, তবে কবিদের বেকারত্ব বাড়ত, আর প্রেমিকদের চাকরি যেত!” অবন্তিকা ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল, “তুমি আবার প্রেমকে অর্থনীতির খাতায় নাম লেখালে নাকি?”—এইভাবে শুরু হলো তাদের অনন্ত জিজ্ঞাসার মিষ্টি কাঁটাযুক্ত বাক্যালাপ। প্রেম ভাষাবদ্ধ না ভাষাতীত? অবন্তিকার মতে, প্রেম হলো নীরবতার সুর—যেখানে চোখ কথা বলে, স্পর্শ কবিতা লেখে, আর নিঃশ্বাস উপন্যাস হয়ে ওঠে। ভাষা সেখানে কেবল সাবটাইটেল। সপ্তর্ষি  প্রতিবাদ করল, “ভাষা না থাকলে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি কে আবিষ্কার করত? মানুষ কি শুধু তাকিয়েই সংসার চালায়?” অবন্তিকা মৃদু হেসে বলল, “সংসার ভাষায় চলে, প্রেম চলে ভ্রূকুঞ্চনে।” সুতরাং সিদ্ধান্ত—প্রেম ভাষায় ধরা দেয়, আবার ভাষা ফসকে পালায়ও। যেন সাবান—ধরলেই পিছলে যায়।   প্রেম কি অতলান্তিক? সপ্তর্ষি  বলল, “প্রেম সমুদ্র হলে আমি লাইফজ্যাকেট পরব, ডুবতে চাই না।” অবন্তিকা বলল, “ডুব না দিলে প্রে...

386 আমি যুদ্ধ : এক দার্শনিকের ডায়েরি থেকে হারিয়ে যাওয়া ছেঁড়া পাতা

ছবি
  386 আমি যুদ্ধ : এক দার্শনিকের ডায়েরি থেকে হারিয়ে যাওয়া ছেঁড়া পাতা আমি যুদ্ধ। ভয় পেও না—আজ তলোয়ার নিয়ে আসিনি, আজ কলম হাতে,  অন্তরের সাথে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের  এক ক্লান্ত সৈনিক আমি,  তাই একটু রঙ্গ- রসে ভিজিয়ে কিছু কথা বলতে এসেছি। কারণ বহু যুগ ধরে মানুষ আমাকে এত সিরিয়াসভাবে নিয়েছে যে, মাঝে মাঝে  নিজের ওপর হাসি পায়। মানুষ ভাবে, যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। আগুন, রক্ত, আর একরাশ কান্না। সত্যি বলতে কী, এ আমার এক রূপ—কিন্তু পুরোটা নয়। আমি শুধু কামানের গর্জন নই, আমি মানুষের ভেতরের ছোট্ট ধাক্কা—যে ধাক্কা তাকে বদলাতে বাধ্য করে। আমি সেই অসম্পূর্ণতার অস্বস্তি, যে অস্বস্তি না থাকলে মানুষ কখনো নতুন কিছু খুঁজত না। ভাবো তো, পৃথিবীর প্রথম মানুষটি যদি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ না করত, তবে কি আগুন জ্বলত? চাকা ঘুরত? সভ্যতা দাঁড়াত? দার্শনিকরা আমাকে নিয়ে বড় বড় কথা বলে—“সংঘর্ষই সৃষ্টি।” শুনতে ভারী লাগে, কিন্তু ব্যাপারটা মন্দ নয়। বীজ মাটির সঙ্গে যুদ্ধ না করলে গাছ হয় না, শিশুর কান্না না হলে জন্ম সম্পূর্ণ হয় না, আর মানুষের ভেতরে প্রশ্ন না জাগলে জ্ঞান জন্মায় না। অর্থাৎ, আমি একটু ঝামেলাবাজ ঠিকই, কিন্তু...