৪৩৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৮ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শন, মহাভারত এর উত্তর দিয়ে গেছে। সময়ের গভীর রায় যদি বলা হয় - 'তুমি কতদিন বেঁচে ছিলে তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তুমি তোমার সময়কে কি দিয়েছিলে - সেটাই শেষ প্রশ্ন। "
১৮ তম পর্বের শুরু -
একটা বিরাট আকারে নরেনের হাই তোলার শব্দে, আলোচনার মোড় ঘুরে গিয়ে ঘড়ির কাটার উপর গিয়ে পড়লো। মধুছন্দা বলল - রাত-তো অনেক হয়েছে এবার রাতের খাওয়ার পালাটা সেরে ফেলা দরকার। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঠান্ডাটাও বেশ বাড়ছে , ঘরের রুম হিটারগুলি চালিয়ে দিলে ভালো হয়। আবার লামা ফ্যামিলিও জেগে আছে, সুতরাং কালবিলম্ব না করে ইন্টারকমে রাতের খাবার পাঠিয়ে দেবার অনুরোধ করলো।
লাবণ্য বলল - দার্জিলিঙে প্রথম যে দিন আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল , তার পিছনে কারণ ছিল ইতিহাসের বিশুদ্ধতা খোঁজার চেষ্টা করা। আর যে কথাটা প্রচলিত আছে যে শাসক থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বহু সময় বেশ কিছু ঘটনাকে সংযোজিত করেছে, আবার কখনো উহ্য রাখার চেষ্টা করেছে - তাকে অনুসন্ধান করা। সেখানে ইতিহাস প্রেমীদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত। অবশ্য নিজেদের মতো করে ইতিহাসকে সাজিয়ে গুছানোর প্রচেষ্টা আজকের নয়, তারও একটা দীর্ঘ ধারাবাহিকতা আছে।
আমি শুনেছি পুনেতে ভান্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে মহাভারতের ১২৫৯টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে একটা প্রামানিক গ্রন্থ তৈরি করেছিল। তার সাথে কোথায় কোথায় মূল ঘটনার সাথে অমিল আছে। এই যে পার্থক্য থাকার নিশ্চয় কিছু কারণ আছে এবং তার ব্যাখ্যা থাকাটাও স্বাভাবিক - সেটাই জানতে চাই। আবার ঋগ্বেদের উপর University of Texas-এ বেশ কিছু কাজ হয়েছে, তার বিষয়বস্তুটা জানতে চাই।
লাবন্যর এই গভীর জিজ্ঞাসাটা ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক প্রশান্তর ভীষণ ভালো লাগলো। এই প্রশ্নের মধ্যে এক দার্শনিকসুলভ বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনা আছে সেটা প্রশান্তকে স্পর্শ করলো।
আজকে ইতিহাসের বিশুদ্ধতাকে নিয়ে মানুষ বহু প্রশ্ন করে, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খোঁজবার প্রয়াস আধুনিক কালে সারা বিশ্ব জুড়ে কাজ চলছে।
আজ ইতিহাসের সাথে অনুসন্ধান কথাটা জুড়ে গেছে। তাই ইতিহাসের পাঠকের মন তৃপ্ত হয়না শুধু অতীতের কথা শুনতে। তাই তারা জানতে চায়, এ কথা স্বীকার্য যে আজকের মতো সেদিন ঘটনা পরম্পরাকে ধরে রাখার মাধ্যমের বড়োই অভাব ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবে অতীতকে কি ভাবে মনে রাখা হতো সেটা তো জিজ্ঞাস্য থাকবেই। আর ঐতিহাসিকদেরও পৌঁছে দিতে হবে আগামীর কাছে সেই প্রামাণ্য অতীতের দলিলকে।
ইতিহাসকে সংরক্ষণের প্রশ্নে ভারতবর্ষ এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। ভারতের অতীতকে কখনো বেদের, উপনিষদের অন্তরে, রামায়নের গল্পে, মহাভারতের বিপুল ঐশর্য্যে, পূরণের পলে পলে আর শিলালিপি, মুদ্রা ও ধর্মীয় সাহিত্যতে শোভা পাচ্ছে। এই উপাদানগুলিই ইতিহাসের বিকল্প হিসাবে পরিচিত ছিল।
এই জগাখিচুড়ির থেকে চাল আর ডালকে আলাদা করা এক ধৈর্য এবং পরিশ্রম সাধ্য কাজ ছিল। এই মিশ্রণটি ছিল শুদ্ধতা হারাবার প্রথম পদক্ষেপ। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল কাব্যিক মাধুর্য্য মিশ্রিত অতিরঞ্জনের আধিক্য, কখন ধর্মীয় ভাবাবেগ, রাজশক্তির আবদার, কখন ঔপনিবেশিকদের তাড়না আর আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলির স্বর্থসিদ্ধির প্রয়াস।
ঋগ্বেদ ছিল এক শক্তিশালী প্রাচীন সাহিত্যের দলিল বললে ভুল হবেনা। কিন্তু সেটিকে ইতিহাস বলে ভাবলে ভুল হবে। ধর্মের এমনিই বাতুলতা, যেখানে রাজায় রাজায় যুদ্ধকে অবশেষে ধর্মের জয় বলে মেনে নিতে হতো। যুদ্ধ ক্ষেত্রে ব্যক্তি রাজার সাফল্য গৌণ হয়ে যেত দেবতার আনুকূল্যের প্রাধান্যে। এই প্রক্রিয়ায় যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, দেবত্ব ও পৌরাণিক স্মৃতি ভারতীয় ইতিহাস চেতনার উপর একটা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।
কালস্রোতে ভেসে যায় সেদিনের কাহিনীর সত্যতা, তার বদলে বেশ কয়েক শতাব্দী পরে মানুষ সেই ধর্মীয় কাহিনীকেই ঐতিহাসিক দলিল বলে গ্রহণ করে। সাহিত্য উৎস হতে পারে, কিন্তু সে কখনো ইতিহাস হয়ে উঠতে পারেনা। মনে রাখা প্রয়োজন, তখন কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টির প্রকাশ মাধ্যম শ্রুতির মাধ্যমে প্রসারিত হতো।
ইতিমধ্যে মানুষ ধীরে ধীরে নগর পত্তন করতে শিখেছে, (যদিও হরপ্পার ভগ্নাবশের মধ্যে উন্নত নগরীর সন্ধান পাওয়া যায়) বেদের মধ্যে মানুষ চিন্তা ভাবনার রসদের সাথে নৈতিকতার সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছে আবার একই সাথে সমাজে নৈতিকতার অভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে, প্রয়োজন হয়েছে ধর্মকে সুরক্ষিত করার তাই এসব ধারার সংমিশ্রনে তৈরি হয়েছে আগামীকে পথ দেখানোর জন্য বাস্তবের পটভূমিতে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত রামায়ণ ও মহাভারতের মতো মহাকাব্য।
মানব মনের বৈচিত্রতা ও সমাজে তার বাস্তব প্রতিফলনের এক অদ্ভুত ককটেল এই মহাভারত। মহাভারতে দেখি যে দেবতারা বেদে ভূমিষ্ঠ হলো, তারা এখানে এসে প্রতিষ্ঠা পেলো। এটাও দেবতাদের বিবর্তনের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না। কাব্য কখনো কখনো বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, কেননা কল্পনা কবির কাব্য রচনার রসদ। তাই দেখি অস্ত্রের আধুনিকতা সময়কে ছাপিয়ে গেছে, জন্ম তো জৈবিক নিয়মের ধার ধারেনি, অবশ্য অধিকাংশ রূপকে মোড়া , যত্রতত্র অলৌকিকতার হাতছানি কিন্তু মহাজাগতিক দর্শন মহাভারতকে দীর্ঘজীবন দিয়েছে। তাইতো, একটা রাজনৈতিক সংঘাত সবকিছুকে ছাপিয়ে একটি নৈতিক মহাকাব্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ক্রমশঃ