৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
এই জয় নিয়ে এলো এক অন্তহীন বৈরাগ্য আর অদ্বৈত দর্শনের গম্ভীর ভাবনার ইঙ্গিত। তাইতো মহাভারত হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে হেটে চলেছে নৈতিকতা থেকে মানুষের অস্তিত্বের কথা নিয়ে, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মানব মনের দ্বান্দ্বিকতার বৈশিষ্ট নিয়ে। এই অন্তহীন পথপরিক্রমা চলতেই থাকবে, সেটাই এই মহাকাব্যের মাধুর্য্য।
১৬তম পর্বের শুরু -
সময়ের অনিন্দ বাঁশির সুরে বেজে ওঠা উদাত্ত কলতান কোটি কোটি মানব অন্তরে কখন মৃদু সুরে আবার কখন উচ্চগ্রামে সেই ঘুম ভাঙানির গান যুগের পর যুগ ধরে মহাভারত আমাদের শুনিয়ে আসছে। এই সুর আমাদের মননকে শুধু নাড়া দেয়নি, সে শুনিয়েছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেকার মানুষের ভাবনা ও বাস্তবতার কাহিনী।
পেঁয়াজের খোসার মতো প্রতি প্রলেপে লুকিয়ে আছে কোথাও তৎকালীন মানুষের সামাজিক ভাবনা, বিশ্বজনীনতার গল্প, যেখানে অব্যক্ত থেকে ব্যক্তর পথের দ্বান্দ্বিকতা কিভাবে একটা চরিত্রের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে, তার প্রতিচ্ছবি। রাজনীতির কথা, ধর্ম ও নৈতিকতার সূক্ষ বিচার, সময়ের প্রয়োজনে ধর্মকে কি ভাবে যুক্তি সাজিয়ে ব্যবহার করে হঠাৎ করে উদ্ভূত সংকটকে মোচন করতে হয়- তার প্রতিষেধক। মহাভারত চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়েছে, ধর্ম কোনো স্থবিরতায় আটকে থাকা অচল বস্তু নয়, বরং সে সময়ের সাথে এগিয়ে চলা এক গতিশীল ধারণা।
মহাভারতে সরলীকরণের কোন স্থান নেই। যেমনটি স্বর্ণ নামক ধাতুটি বহু ধাতুর সাথে একত্রিত বসবাস করে, তাকে পেতে হলে অন্য বস্তুর থেকে সযত্নে তাকে আলাদা করতে হবে, একটু কঠিন বৈকি।
চরিত্র বিন্যাসে কি বৈচিত্রতা। যাকে মহাকাব্য মহান সাজিয়েছে, তার কাছ থেকে কি সযত্নে তার কথা বলার শক্তিকে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এর প্রকৃষ্ট উদহারণ হলো পিতামহ ভীষ্ম। কি অদ্ভুত ! একজনের দাঁতগুলি অসম্ভব সুন্দর, মহাভারত তাকে হাসতেই দিলো না, তাই কেউ দেখতেই পেলো না তার দাঁতের সৌন্দর্যতা।
এই নিয়ে শুরু হলো পাঠকের ভাবনা। নিরালায় বসে, পাঠক ভাবতে লাগলো ভীষ্মের কেন এমনটি হলো ? পাঠক ভাবছে -"আচ্ছা! দ্রৌপদীকে রাজসভায় কৌরবদের সভ্যতাবহির্ভূত আচরণের বিরুদ্ধে ভীষ্ম বয়োজোষ্ঠসূলভ আচরণের প্রদর্শন করতে পারতো , কিন্তু বাস্তবে করলো না।" পাঠক মেলাতে শুরু করলো, আজকের নারী নির্যাতন ও নারী হত্যার বিরুদ্ধে শাসকের মৌনতা বা কোন কোন ক্ষেত্রে আড়াল করা কিংবা দিকে দিকে ঘটে যাওয়া ধর্মের নামে গনহত্যা ও গণধর্ষণ সংগঠিত হওয়ার বিরুদ্ধে শাসকদের মৌনতা। শাসকের কাছে "কে আপন আর কেই বা পর" - এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই একপেশে ভাবনার এক পরম্পরার বাস্তব চিত্র। আবার শাসকের কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাও হতে পারে, সেখানে যেন তেন প্রকারে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই প্রাধান্য পায়। আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হবার পরিবর্তে চুপ থাকাটা তৎকালীন শাসক কৌরবদের পক্ষেই পাল্লাভারী ছিল, আজকেও শাসক ও শাসকপরিবারদের তাই আছে। তাই এটাই প্রমাণিত ধর্মের পাল্লাটা বোধহয় নিয়ন্ত্রিত হয় শাসকের আঙ্গুলি লেহনে। সংবিধানের প্রস্তাবনা নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
হাজার হাজার বছর ধরে শাসকের যেমন অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে মেরুদন্ড সোজা করে শাস্তি দিতে যেমন অপরাগ, ঠিক তেমনি শাসকের পেয়াদাদের ভয়ে শাসিতও মেরুদন্ড সোজা করে তেমনটি প্রতিবাদ করে না। তাই পরিবর্তনও ইতিহাসের বুকে কম দেখা যায়। শাসকের কি হয়, জানিনা! কিন্তু অন্যায়কে অন্যায় বলে প্রতিবাদ করতে না পেরে শাসিতর সেই না বলা প্রতিবাদের আওয়াজটা নিজ অন্তর থেকে না বের হতে পেরে সে অন্তঃস্থলে গিয়ে এক রাসায়নিক বিকরণের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে ধীরে ধীরে বিদীর্ন করে দেয় অন্তঃস্থলকে।
এতক্ষন খুব মনোযোগ দিয়ে মধুছন্দা বিভাসের ব্যাখ্যাগুলি শুনে যাচ্ছিল। ভীষ্মের যে দিকটা বিভাস এখনো উল্লেখ করেনি, সেটা শোনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তখন সে বলল - বিভাস দা, ভীষ্ম যে রাজসভায় মুক হয়ে গেল, তার পিছনের কারণ ও বাধ্যবাধকতা কি ছিল সেটা উল্লেখ করো। রাজসভায় কার্য্যটা সবাই প্রত্যক্ষ করলো কিন্তু তার পিছনে কারণটা উল্লেখিত না হলে ব্যাখ্যাটা অসম্পূর্ন রয়ে যাবে।
বিভাস সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে বলল - অবশ্যই। এটাতো সবাই জানে পিতা শান্তনুকে দেওয়া তার প্রতিজ্ঞার কথা। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার প্রতি দায়বব্ধতা তো একটা মিসাইল কিন্তু তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমনিই অমনোনীয় সেখানে ভালো-মন্দের অপেক্ষা করেনা। একবার ছুটে যাবার পর তার গতিপথ রুখবে, সে কার সাধ্যি। সে মানেনকো কোন নীতি। প্রতিজ্ঞাই দখল নিলো ধর্মের জায়গায়। ধর্মের কেন্দ্রীয় স্থানে বসে থাকা প্রতিজ্ঞা দ্বারা পরিচালিত ভীষ্ম ধীরে ধীরে নীতির জায়গার সাথে নিজেকে মেলাতে পারলোনা- সেটাই তার চরিত্রের ট্রাজেডি।
যে দিকটা মহাভারতে একটি দার্শনিক প্রশ্নের অবতারণা করে সেটি হল -" প্রতিজ্ঞা কি নিজেই ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারে, নাকি প্রতিজ্ঞার থেকে বড় হতে পারে তার ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ "?
আমার মনে হয়, চৈতন্যের উপর প্রতিজ্ঞার প্রভাব বিস্তার বাস্তবে অচল। প্রতিজ্ঞা জড় অর্থাৎ সে পরিবর্তিত হতে পারে আর চেতন অপরিবর্তিত থাকে। প্রতিজ্ঞার মধ্যে বাস্তবতা কম অন্ধত্ব বেশি আর অন্ধত্ব পারিপার্শিকতাকে বিশ্লেষেণ করে সিদ্ধান্ত নেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আপনাদের কি মনে হয় ?
ক্রমশঃ