শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম পর্ব )

৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

 এই জয় নিয়ে এলো এক অন্তহীন বৈরাগ্য আর অদ্বৈত দর্শনের গম্ভীর ভাবনার ইঙ্গিত।  তাইতো মহাভারত হাজার হাজার বছর  ধরে মানুষের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে হেটে চলেছে নৈতিকতা থেকে মানুষের অস্তিত্বের কথা নিয়ে, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মানব মনের দ্বান্দ্বিকতার বৈশিষ্ট নিয়ে। এই অন্তহীন পথপরিক্রমা চলতেই থাকবে, সেটাই এই মহাকাব্যের  মাধুর্য্য।  

১৬তম  পর্বের শুরু -

সময়ের অনিন্দ বাঁশির সুরে বেজে ওঠা উদাত্ত কলতান কোটি কোটি মানব অন্তরে কখন মৃদু সুরে আবার কখন উচ্চগ্রামে সেই ঘুম ভাঙানির গান যুগের পর যুগ ধরে মহাভারত আমাদের শুনিয়ে আসছে। এই সুর আমাদের মননকে শুধু নাড়া দেয়নি, সে শুনিয়েছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেকার মানুষের ভাবনা ও  বাস্তবতার কাহিনী। 

পেঁয়াজের খোসার মতো প্রতি প্রলেপে লুকিয়ে আছে কোথাও তৎকালীন মানুষের সামাজিক ভাবনা, বিশ্বজনীনতার গল্প, যেখানে অব্যক্ত থেকে ব্যক্তর  পথের দ্বান্দ্বিকতা কিভাবে একটা চরিত্রের মধ্যে  প্রতিফলিত হয়েছে, তার প্রতিচ্ছবি। রাজনীতির কথা, ধর্ম ও নৈতিকতার সূক্ষ বিচার, সময়ের প্রয়োজনে ধর্মকে কি  ভাবে যুক্তি সাজিয়ে ব্যবহার করে হঠাৎ করে উদ্ভূত সংকটকে মোচন করতে হয়- তার প্রতিষেধক। মহাভারত চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়েছে, ধর্ম কোনো স্থবিরতায় আটকে থাকা অচল বস্তু নয়, বরং সে সময়ের সাথে এগিয়ে চলা এক গতিশীল ধারণা।   

মহাভারতে সরলীকরণের কোন স্থান নেই। যেমনটি স্বর্ণ নামক  ধাতুটি বহু ধাতুর সাথে একত্রিত বসবাস করে, তাকে পেতে হলে অন্য বস্তুর থেকে সযত্নে তাকে আলাদা করতে হবে, একটু কঠিন বৈকি। 

চরিত্র বিন্যাসে কি বৈচিত্রতা। যাকে মহাকাব্য মহান সাজিয়েছে, তার কাছ থেকে কি সযত্নে তার কথা বলার শক্তিকে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।  এর প্রকৃষ্ট উদহারণ হলো পিতামহ ভীষ্ম। কি অদ্ভুত ! একজনের দাঁতগুলি অসম্ভব সুন্দর, মহাভারত তাকে হাসতেই দিলো না, তাই কেউ দেখতেই  পেলো না তার দাঁতের সৌন্দর্যতা। 

এই নিয়ে শুরু হলো পাঠকের ভাবনা। নিরালায় বসে, পাঠক ভাবতে লাগলো ভীষ্মের কেন এমনটি হলো ? পাঠক ভাবছে -"আচ্ছা! দ্রৌপদীকে রাজসভায় কৌরবদের সভ্যতাবহির্ভূত আচরণের বিরুদ্ধে ভীষ্ম বয়োজোষ্ঠসূলভ আচরণের প্রদর্শন করতে পারতো , কিন্তু বাস্তবে করলো না।"  পাঠক মেলাতে শুরু করলো, আজকের নারী নির্যাতন ও নারী হত্যার  বিরুদ্ধে শাসকের মৌনতা বা কোন কোন ক্ষেত্রে আড়াল করা  কিংবা দিকে দিকে ঘটে যাওয়া ধর্মের নামে গনহত্যা ও গণধর্ষণ সংগঠিত হওয়ার  বিরুদ্ধে শাসকদের মৌনতা। শাসকের কাছে "কে আপন আর কেই বা পর" - এই সিদ্ধান্ত  নেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই  একপেশে ভাবনার এক পরম্পরার বাস্তব চিত্র। আবার শাসকের কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাও হতে পারে, সেখানে যেন তেন প্রকারে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই প্রাধান্য পায়।  আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হবার পরিবর্তে চুপ থাকাটা তৎকালীন শাসক   কৌরবদের পক্ষেই পাল্লাভারী ছিল, আজকেও শাসক ও শাসকপরিবারদের   তাই আছে। তাই এটাই প্রমাণিত ধর্মের পাল্লাটা বোধহয় নিয়ন্ত্রিত হয় শাসকের আঙ্গুলি লেহনে। সংবিধানের প্রস্তাবনা নীরবে  নিভৃতে কাঁদে।  

হাজার হাজার বছর ধরে শাসকের যেমন অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে মেরুদন্ড সোজা করে  শাস্তি দিতে যেমন অপরাগ, ঠিক তেমনি শাসকের পেয়াদাদের ভয়ে শাসিতও মেরুদন্ড  সোজা করে তেমনটি প্রতিবাদ করে না। তাই পরিবর্তনও ইতিহাসের বুকে কম দেখা যায়।  শাসকের কি হয়, জানিনা! কিন্তু অন্যায়কে অন্যায় বলে প্রতিবাদ  করতে না পেরে শাসিতর সেই  না বলা প্রতিবাদের আওয়াজটা নিজ অন্তর থেকে  না বের হতে পেরে সে অন্তঃস্থলে গিয়ে এক  রাসায়নিক বিকরণের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে  ধীরে ধীরে বিদীর্ন করে দেয় অন্তঃস্থলকে।  

এতক্ষন খুব মনোযোগ দিয়ে মধুছন্দা বিভাসের ব্যাখ্যাগুলি শুনে যাচ্ছিল। ভীষ্মের যে দিকটা বিভাস এখনো উল্লেখ করেনি, সেটা শোনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তখন সে বলল - বিভাস দা, ভীষ্ম যে রাজসভায় মুক হয়ে গেল, তার পিছনের কারণ ও বাধ্যবাধকতা কি ছিল সেটা উল্লেখ করো। রাজসভায় কার্য্যটা সবাই প্রত্যক্ষ করলো কিন্তু তার পিছনে কারণটা উল্লেখিত না হলে ব্যাখ্যাটা অসম্পূর্ন রয়ে যাবে।

 বিভাস সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে বলল - অবশ্যই। এটাতো সবাই জানে পিতা শান্তনুকে  দেওয়া তার প্রতিজ্ঞার কথা। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার প্রতি দায়বব্ধতা তো একটা মিসাইল কিন্তু তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমনিই অমনোনীয় সেখানে  ভালো-মন্দের অপেক্ষা করেনা। একবার ছুটে যাবার  পর তার গতিপথ রুখবে, সে কার সাধ্যি।  সে মানেনকো কোন নীতি। প্রতিজ্ঞাই দখল নিলো ধর্মের জায়গায়। ধর্মের কেন্দ্রীয় স্থানে বসে থাকা প্রতিজ্ঞা   দ্বারা পরিচালিত ভীষ্ম ধীরে ধীরে নীতির জায়গার সাথে নিজেকে মেলাতে পারলোনা- সেটাই তার চরিত্রের ট্রাজেডি। 

যে দিকটা মহাভারতে একটি দার্শনিক প্রশ্নের অবতারণা  করে সেটি হল -" প্রতিজ্ঞা কি নিজেই  ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারে, নাকি প্রতিজ্ঞার থেকে বড় হতে পারে  তার ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ "?

আমার মনে হয়, চৈতন্যের উপর প্রতিজ্ঞার প্রভাব বিস্তার বাস্তবে অচল। প্রতিজ্ঞা জড় অর্থাৎ সে পরিবর্তিত হতে পারে আর চেতন অপরিবর্তিত থাকে।  প্রতিজ্ঞার মধ্যে বাস্তবতা কম অন্ধত্ব বেশি আর অন্ধত্ব পারিপার্শিকতাকে বিশ্লেষেণ করে  সিদ্ধান্ত নেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। 

আপনাদের কি মনে হয় ?

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৬/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

 ৪৩২ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৫তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভিতরের মানুষটির কাছে ফিরে আসার দিকে।

১৫তম  পর্বের শুরু -

অসহ্য কাঠফাটা রোদে গাছের পাতাগুলি আর আকাশের পানে চেয়ে থাকতে পারছেনা, শুধু সেই আশায় বেঁচে আছে একদিন বৃষ্টি তো আসবেই। আবার বর্ষার একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে বৃক্ষ আবার  আকাশের কাছে প্রার্থনা করবে, অনেক হয়েছে - দীর্ঘদিন সূর্য্যের মুখ দেখিনা। এটাই প্রকৃতির  স্বাভাবিক দ্বান্দ্বিকতা। প্রকৃতিতে যখন দ্বান্দ্বিকতা আছে তখন মানুষের মধ্যে থাকবে না এতো হতে পারে না। এই দ্বান্দ্বিকতাই মহাভারতের ঐশ্বর্য্য। 

মহাভারতে নৈতিকতা আছে কিন্তু সে নৈতিকতা  ধূসর একটা আচ্ছাদনে ঢাকা।  যুধিষ্ঠির মহাভারতে ধর্মরাজের তকমায় ভূষিত কিন্তু তিনি বাজি রেখে পাশা খেলায় অনাসক্তি নেই।  এই 'আসক্ত' শব্দটি যদি কোন চরিত্রের সাথে মাখামাখি হয়ে যায়, মন কি সায় দেয় ধর্মরাজ বলতে ? আবার অহংকারের মতো একটা বলবান বস্তুকে আগলে রেখে কর্ণ কি করে দানবীর হয়ে উঠলেন - সেটাও প্রশ্নের উর্ধে নয়। সমালোচকগণ তো বলতেই পারেন, কর্ণ তার অহংকারকে তৃপ্ত করার জন্য স্থূল বস্তু দান করতেন আর সুক্ষ বস্তুকে আগলে রাখতেন।  

মহাভারতে অন্ধত্বের তকমার অধিকারী অনেকেই ছিলেন। আক্ষরিক অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহে অন্ধ ছিলেন-তা বহু চর্চিত কিন্তু মহাবীর কর্ণও সাথী চিহ্নিত করতে গিয়ে বন্ধুত্বের কারণে অন্ধ ছিলেন। সত্যের অনুসরণকারী ভীষ্মের রাজপরিবারের  প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে রাজসভায় প্রকাশ্যে অন্যায় সংগঠিত  হওয়াতেও প্রতিবাদ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। এটাও ঠিক এক আনুগত্যের প্রতি  দাসত্ব কার্য্য হিসাবে এই মহাকাব্যের পাতায় উল্লেখিত কিন্তু  মানসিক দ্বন্দ্বের অদৃশ্য  কারণ হিসাবে ভীষ্ম ও কর্ণের হৃদয়ে স্পর্শ করেনি, সে কথা  জোর করে বলা যাবে না, যা আমাদের অনুভবের আওতায় পরে। এটাই হচ্ছে জীবনের অপরিপুর্নতার এক পূর্ণাঙ্গ  ছবি। 

কি অসাধারণ মহাভারতের দর্শন। চৈতন্যহীন বস্তু, জগতে যে অসাড়, সেটা বোঝাতে কোন  কষ্ট হয়নি। কুরুক্ষেত্রের মতো এই বিশাল যুদ্ধ, এতো মানুষের জীবনের আহুতিতে  যজ্ঞ থেকে বিজয়  উঠে এলো  আর সঙ্গে নিয়ে এলো একরাশ শূন্যতা। নিঃশব্দে উচ্চারিত হলো  ভারতীয় দর্শনের ভাবনা,  সব ক্ষমতার অলিন্দে  বসে আছে সেই জাগতিক ক্ষমতাই হলো চূড়ান্ত ক্ষমতা আর সেটাই হলো সময়।  

 এই জয় নিয়ে এলো এক অন্তহীন বৈরাগ্য আর অদ্বৈত দর্শনের গম্ভীর ভাবনার ইঙ্গিত।  তাইতো মহাভারত হাজার হাজার বছর  ধরে মানুষের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে হেটে চলেছে নৈতিকতা থেকে মানুষের অস্তিত্বের কথা নিয়ে, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মানব মনের দ্বান্দ্বিকতার বৈশিষ্ট নিয়ে। এই অন্তহীন পথপরিক্রমা চলতেই থাকবে, সেটাই এই মহাকাব্যের  মাধুর্য্য।   

ক্রমশঃ 
কলমে - রবীন মজুমদার 
১৫/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

৪৩১ স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন

৪৩১ স্বামী বিবেকানন্দ ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন 


 খুব নিরীহ একটি কথা -"তুমি দুর্ব্বল নও। " এই কথাতেই অর্ধেক পৃথিবীতে রাজত্ব করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কেঁপে উঠেছিল।  স্মৃতির সত্যিকারের কিংবা ইচ্ছাকৃত  ভ্রমে স্বাধীনতোত্তর দেশীয় রাজপুরুষেরা  ব্রিটিশদের মতো যাঁর নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়, সেই স্বামী বিবেকানন্দই ছিল জাতির মেরুদন্ড গঠন করার কারিগর। এই কথাটি যে কতখানি সঠিক তার প্রমান দিয়েছে ১৯১৮ সালের  Sedition Committee, যাকে Rowlatt Committee-ও বলা হয়, সেই  কমিটির রিপোর্ট। কেন  স্বামীজী আজ উপেক্ষিত, সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ সচেতন মানুষেরা  খুঁজে নেবেন। সেই চর্চার পরে ঈশ্বর বা সত্যকে(সত্য ঈশ্বরের অপর নাম ) জানা না জানার দ্বায়িত্ব তাঁদের। প্রশ্ন কেউ তোলে, আবার কেউ করে। 

সেদিন ছিল একদল পরাধীন মানুষ। যারা দীর্ঘদিনের শাসকের অত্যাচারে মানুষ হিসাবে সেই জাতিটা তাদের আত্মপরিচয়ের তকমাটা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলে ছিল। জাতিকে  এই আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করার জন্য বহু মানুষ বহু পথ হাতড়ে বেরিয়েছেন  কিন্তু সঠিক পথের দিশা কেউ খুঁজে পাননি। 

"অন্তরে অন্তর মিশালে তবে তার অন্তরের পরিচয় "- হয়তো সবার সাথে পরাধীন ভারতের আপামর জনগনের হৃদয়ে সদাই বেজে ওঠা সুরটির অনুরণনটি সঠিক মননের অভাবে  অপর মানুষের হৃদয়ে সঠিক ভাবে পৌঁছাতে পারেনি।  কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ সেটা শুনতে পেয়েছিলেন। আর সেই পোড়া বাঁশির অর্থকে অনুধাবন করে তাঁর আগামীর গান - সে তো ইতিহাস। 

হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা সেই-ই হতে পারে, যাঁর সুরের সাথে শ্রোতার সুরের মেলবন্ধন ঘটে যায়। হৃদয়ে হৃদয় যে যোগ করতে পেরেছে সে তো হৃদয়ের রাজা হয়ে গেছেন। তিনি তো মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের রাজা আর সেই রাজার রাজত্বের পতন যে হয় না, সেটা বুদ্ধিমান শাসকরা জানেন বলেই, তাকে আড়াল করার চেষ্টা। 

গল্পটা এমনিই ছিল -

আজকের দৃষ্টিতে সেদিনের কলকাতাকে দেখলে চলবে না। শহরটা যেন  আড়াআড়ি দুই ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে সাহেবদের কলকাতা - চওড়া রাস্তা, ঘোড়ার গাড়ি, গ্যাসের আলোর রোশনাই, মৃদু মন্দ লয়ে বাজনার সাথে বলরুমে পানীয়র গ্লাস হাতে নিয়ে বিলেতি পোশাক পরে সাহেব-মেমদের নৃত্য।  ঠিক তার পাশে সেই দেশি কলকাতার অলি-গলিগুলি আলোর অভাবে বিষাদহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেরোসিনের টিমটিমে আলোতে ছাই সহযোগে এঁটোকাঁটায় বিদীর্ন কাঁসার থালা বাসন গুলিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ঘর্মাক্ত কলেবরে বাড়ির রমণীরা মাজছে আর ক্ষণে ক্ষনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে।  দেশটা শুধু হেরে যায়নি, দেশের মানুষগুলি যেন এক  সেই জীবন যুদ্ধের পরাজিত সৈনিক। 

ইংরেজরা শুধু ভারত শাসন করছেন না, ভারতীয়দের মনটাকে যেন পকেটে পুরে রেখেছে। আজকের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ছিল না, কিন্তু ইংরেজরা আজকের মতো তাদের হোয়াটস্যাপ য়ুনিভার্সিটির মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারে ভারতীয়দের জর্জরিত  করে তুলেছিল যে, ভারতবর্ষ একটা প্রাচীন,  কুসংস্কারাচ্ছন্ন অতি দুর্ব্বল জাতি। বারবার এই রেকর্ডটি বাজানোর ফলে একসময় ভারতীয়রা ভাবতে শুরু করেছিল সত্যিই তারা দুর্ব্বল জাতি। 

এমন এক দোলাচলের সন্ধিক্ষণে উত্তর কলকাতায় এক তরুণ, যাঁর তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে  আত্মবিশ্বাসের ঝলক, দৃষ্টি যেন সদাই বিশেষ কিছুকে খুঁজে বেড়াচ্ছে , সেই চিরন্তন প্রশ্ন - ঈশ্বর কি আছেন ? আসলে, সত্য যে  লুকিয়ে আছে ঈশ্বরের আড়ালে, তাকেই উন্মোচিত করে পরাধীন দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে যে।  

শুনেছেন  দক্ষিনেশ্বরে এক পুরোহিত আছেন, যিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। সেই উত্তরের তাড়নায় পদব্রজে বারবার তিনি ছুটে যাচ্ছেন সেই দক্ষিনেশ্বরের ব্রাহ্মণ  পুরোহিত শ্রী রামকৃষ্ণের কাছে , তিনিই সেই দত্ত বাড়ির নরেন্দ্র নাথ। তারপরের ইতিহাস তো সবার জানা। শ্রী রামকৃষ্ণের 'মা' যে  আসলে সেই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ সেই ভারত মাতা ভিন্ন আর কেউ নয়। এখানেই দুয়ে দুয়ে চার হয়ে গেলো। 

সেই দিনগুলিতে দরকার ছিল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক স্বাধীনতার থেকে আরো বেশী প্রয়োজনীয়  ছিল ব্রিটিশদের অহংকারের কারাগারে বন্দী  ভারতীয়দের লুন্ঠিত   আত্মপরিচয়কে আজাদ করার।  

অবশেষে এলো সেই সুযোগ। আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতবর্ষ ও তার প্রাচীন সংস্কৃতিকে  তুলে নিয়ে আসবার মাহেন্দ্রক্ষণ।  সময়টা ১৮৯৩ সালের শিকাগোর ধর্মসভার মঞ্চ।   

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা অসংখ্য বিপ্লবী, রাজনৈতিক নেতা এবং সংগ্রামীর নাম পাই, যাঁরা হাসিমুখে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু এই রাজনৈতিক বিপ্লবের অনেক আগে, ভারতের মাটিতে নিঃশব্দে এক অন্যরকম বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। সেই বিপ্লব ছিল আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার বিপ্লব, মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির বিপ্লব। আর এই মনস্তাত্ত্বিক মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত সেনাপতি ছিলেন কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, বরং একজন গৈরিক বসনধারী সন্ন্যাসী— স্বামী বিবেকানন্দ।

স্বামীজি নিজে কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করেননি, সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনেও অংশ নেননি। তবু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদানকে ঐতিহাসিকরা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করেন। কিন্তু কেন? কীভাবে একজন সন্ন্যাসী হয়ে উঠলেন বিপ্লবীদের পরম আরাধ্য?

'দুর্বলতাই মৃত্যু' – মনস্তাত্ত্বিকভাবে  দাসত্বের অবসান

দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনে ভারতবাসী যখন সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে তারা একটি হীন, দুর্বল এবং অনুন্নত জাতি, ঠিক সেই চরম হতাশার মুহূর্তে স্বামীজি আবির্ভূত হলেন এক কালবৈশাখীর মতো। তিনি শিকাগো থেকে ফিরে এসে ভারতবাসীকে শোনালেন উপনিষদের সেই অমোঘ বাণী— "উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত" (ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না)।

তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, "ভয় পেয়ো না, তুমি দুর্বল নও। দুর্বলতাই পাপ, দুর্বলতাই মৃত্যু।" তাঁর এই কথাগুলো কেবল আধ্যাত্মিক উপদেশ ছিল না; এটি ছিল পরাধীন, মেরুদণ্ডহীন এক জাতির ধমনীতে মৃতপ্রায় রক্তে নতুন শক্তির সঞ্চার। ব্রিটিশরা যে মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতার বীজ বুনেছিল, স্বামীজি তা সমূলে উৎপাটন করেছিলেন।

 বিপ্লবীদের গীতা: 'বর্তমান ভারত' ও 'কলম্বো থেকে আলমোড়া'

বিশ শতকের শুরুর দিকে ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবীদের দিকে তাকালে একটি অবাক করা বিষয় চোখে পড়ে। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা বিপ্লবীদের এক হাতে থাকত শ্রীমদভগবদ্গীতা, আর অন্য হাতে থাকত স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বই, বিশেষত 'কলম্বো থেকে আলমোড়া' এবং 'বর্তমান ভারত'।

বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) তাঁর মন্ত্রগুপ্তি পেয়েছিলেন স্বামীজির আদর্শ থেকেই। স্বামীজি বলতেন, "লোহার মতো পেশী আর ইস্পাতের মতো স্নায়ু চাই।" বাঘা যতীন সেই আদর্শেই নিজের এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের জীবন গড়েছিলেন।

ঋষি অরবিন্দ স্পষ্ট বলেছিলেন, "বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবনের রূপকার।"

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বামীজিকে তাঁর মানসগুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নেতাজি লিখেছিলেন, "স্বামীজি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে আমি তাঁর পদপ্রান্তে বসে থাকতাম।" নেতাজির আপসহীন সংগ্রামের যে স্ফুলিঙ্গ, তার আদি উৎস ছিল বিবেকানন্দের দর্শন।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন - " স্বামী বিবেকানন্দ যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তাহলে ভারতবর্ষ থেকে সব কুসংকারকে ঝেটিয়ে বিদায় করতেন।"
“প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনের সাধনায় যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি আর কেউ নন—স্বামী বিবেকানন্দ।”
“গ্রহণ করিবার, মিলন করিবার, সৃজন করিবার প্রতিভাই তাঁহার ছিল।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 দেশমাতৃকাই একমাত্র উপাস্য(মনের সংঘব্ধতা আর একই আরাধ্য দেবতা )

সেই যুগে সনাতন ধর্মে অনেক দেব-দেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু স্বামীজি ভারতবাসীকে এক নতুন ধর্মে দীক্ষিত করলেন— দেশপ্রেমের ধর্ম। তিনি বললেন, "আগামী পঞ্চাশ বছর আমাদের একমাত্র উপাস্য দেবতা হবেন আমাদের এই মাতৃভূমি। অন্য সব দেব-দেবীকে আপাতত দূরে সরিয়ে রাখো।"

একজন সন্ন্যাসীর মুখে এমন কথা সেই যুগে ছিল কল্পনাতীত। তাঁর এই বাণী ভারতের তরুণ সমাজকে এতটাই উদ্দীপ্ত করেছিল যে, তারা হাসিমুখে দেশের জন্য প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। তাঁর শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতাও তাঁরই নির্দেশে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে, শিল্পে ও শিক্ষায় যে যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা স্বামীজিরই দেশপ্রেমের সম্প্রসারিত রূপ।

 মানুষের মতো মানুষ গড়ার মন্ত্র 

স্বামীজি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই আসবে এবং টিকবে, যখন দেশের মানুষ আত্মবিশ্বাসী ও চরিত্রবান হবে। তিনি বলেছিলেন, "আমার মানুষ চাই যারা হবে সবল, তেজস্বী ও  বিশ্বাসী তরুণ।" তিনি এমন এক যুবসমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যারা শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় নয়, বরং সাহস, ত্যাগ এবং সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত হবে। তাঁর এই মানুষ গড়ার দর্শনই স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন ব্রিটিশের ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে ভারতের তেরঙা পতাকা উত্তোলন করা হলো, তখন স্বামীজি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। ১৯০২ সালেই ৩৯ বছর বয়সে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল। কিন্তু যে সুবিশাল এবং মজবুত ভিত্তির ওপর ভারতের স্বাধীনতার ইমারতটি গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান স্থপতি ছিলেন তিনিই। স্বামী বিবেকানন্দ কেবল ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু নন, তিনি ছিলেন ঘুমন্ত ভারতের জাগরণের সেই প্রলয়-শিঙা, যাঁর ধ্বনিতে পরাধীনতার শিকল প্রথমবার কেঁপে উঠেছিল।

পৃথিবীর ইতিহাস বলে জনজাগরন বা পরিবর্তনের প্রকৃত কান্ডারি তারাই, যাঁরা দেশের জনগনের মানসিক প্রস্তুতি গঠনে সাহায্য করেন। এই ভারতবর্ষের নিঃসন্দেহে সেই কান্ডারি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। 

বৃটিশদের গোয়েন্দা রিপোর্টের অংশ -

এই প্রসঙ্গে Sedition Committee, যাকে Rowlatt Committee-ও বলা হয়, সেখান থেকে উদ্ধৃত ১৯১৮ সালে ভারতে বিপ্লবী ও গোপন রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুসন্ধানের জন্য গঠিত হয়। এর রিপোর্টে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের বৌদ্ধিক ও আদর্শগত উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও স্বামী বিবেকানন্দের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রিপোর্টে বিপ্লবীদের পাঠ্য ও অনুপ্রেরণার প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল যে ভগবদ্গীতা, বিবেকানন্দের রচনা এবং মাজ্জিনি ও গ্যারিবাল্ডির জীবনচরিত তাঁদের শিক্ষার অংশ ছিল। গবেষণামূলক সূত্রে Sedition Committee Report-এর ১৯১৮ সালের সংস্করণের পৃষ্ঠা ১৭-এর উল্লেখ রয়েছে।

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৪/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

  

বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

৪৩০ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৪তম পর্ব )

 ৪৩০ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৪তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

এই প্রশ্নমুখরতা ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১৪তম  পর্বের শুরু -

চারিদিক শুধুই অন্ধকার। হঠাৎ দূরে কোথাও বাতির ক্ষীণ একটু ছটা দেখা যায়। মুহূর্তেই মনোযোগের সমস্ত আকর্ষণ যেন তাকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। অন্ধকারের মধ্যে আলো যত ক্ষীণই হোক, তার অস্তিত্বই তখন আশার একমাত্র চিহ্ন। অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথ একমাত্র আলোই দেখাতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতির এই ঘনঘটা যেন অন্ধকারেরই অন্য নাম। আলো সেখানে সুদূরপরাহত। দীর্ঘ দিনের পর দিন দিগন্তে দিনমণি তার আলো ছড়িয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করে, তারপর সন্ধ্যার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে ঘরে ফিরে যায়। আবার আসে রাত, আবার তার বুক চিরে ভোরের জন্ম হয়। দিন-রাতের এই চক্র বিশ্বপ্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই দৃশ্যমান দিন-রাত্রির আড়ালেও জীবনের আর-একটি সূক্ষ্ম আলো-অন্ধকারের খেলা চলতে থাকে—যাকে চোখে দেখা যায় না, অথচ অন্তর দিয়ে অনুভব করা যায়।

অন্ধকার আছে বলেই তো আলোর সন্ধান। প্রশ্ন আছে বলেই উত্তরের প্রয়োজন। সংশয় আছে বলেই সত্যের অনুসন্ধান। আর সেই অনুসন্ধানের পথেই যুগে যুগে আলোকবর্তিকা হাতে একদল দিশারী দাঁড়িয়ে থেকেছেন। তাঁদের কেউ দার্শনিক, কেউ ঋষি, কেউ কবি, কেউ বিপ্লবী, কেউ বা নিঃশব্দে মানুষের বিবেককে জাগিয়ে যাওয়া এক অজ্ঞাত পথিক।

সেই পথ একরৈখিক নয়। তার রং বহু, তার অভিজ্ঞতা বহুমাত্রিক। কোথাও সেখানে ইতিহাসের ধুলো, কোথাও পুরাণের প্রতীক, কোথাও দর্শনের প্রশ্ন, কোথাও মানুষের রক্ত-মাংসের জীবন। সেই পথে চলতে গেলে চড়াইয়ের নুড়ি কুড়িয়ে নিতে হয়। একটি নুড়ি হাতে নিয়েই যদি মনে হয় পথের সমস্ত সত্য পাওয়া হয়ে গেছে, তবে অনুসন্ধান অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ঝুড়ি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কুড়িয়ে যেতে হয়—একটির পর একটি অভিজ্ঞতা, একটি প্রশ্নের পর আর-একটি প্রশ্ন, একটি সত্যের পর আরও গভীরতর সত্যের সন্ধান। তবেই হয়তো পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছনো যায়।

মানুষের মনের কালো রঙের আধিপত্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আলোর সুলুকসন্ধান। কারণ অন্ধকারকে অনুভব না করলে আলোর প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায় না। দৃশ্যমানকে অবলম্বন করেই অদৃশ্যের সন্ধানে মানুষের যাত্রা। সৃষ্টির আদিম মুহূর্ত থেকে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল; আজও তার সমাপ্তি হয়নি।

মানুষ বাইরে যতটা পৃথিবীকে জয় করেছে, নিজের ভিতরের অন্ধকারকে ততটা জয় করতে পারেনি। বরং সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও জটিল হয়েছে। ক্ষমতা বেড়েছে, জ্ঞান বেড়েছে, প্রযুক্তি বেড়েছে; কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অহংকার, লোভ, ঈর্ষা, ভয় এবং নিজের কাছে নিজের পরাজয়ের সম্ভাবনাও।

ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা একদল রাজপুরুষের দিকে তাকালেই সেই সত্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে তাঁরা পার্থিব ক্ষমতার অনন্য অধিকারী। তাঁদের হাতে রাজদণ্ড, তাঁদের চারপাশে অনুগত সভাসদ, তাঁদের কথাতেই নির্ধারিত হয় মানুষের ভাগ্য। অথচ সেই ক্ষমতার আবরণ সরিয়ে ভিতরের মানুষটির দিকে তাকালে দেখা যায় অন্য এক ছবি—দুঃসহ যন্ত্রণায় কাতর এক হৃদয়।

ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার মতো জ্ঞান তাঁদের আছে, ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা চিনে নেওয়ার মতো বুদ্ধিও আছে। কিন্তু জ্ঞান থাকা আর সেই জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করতে পারা—এই দুইয়ের মধ্যে যে বিপুল ব্যবধান, সেখানেই তাঁদের ট্র্যাজেডি।

ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার মোহ, অহংকারের আবরণ এবং স্বার্থের অদৃশ্য শিকল তাঁদের মনের বাইরে বেরিয়ে আসতে দেয় না। তাঁরা জানেন, তবু করেন না। তাঁরা বোঝেন, তবু স্বীকার করেন না। তাঁরা বলতে চান, কিন্তু বলতে পারেন না। আর সেই না-বলা কথাগুলোই ধীরে ধীরে মনের ভিতরে জমতে থাকে।

একটি কথার উপর আর-একটি কথা, একটি অভিমানকে ঢেকে আর-একটি অভিমান, একটি অপূর্ণতার পাশে আর-একটি অপূর্ণতা—এইভাবে মনের ভিতরে তৈরি হয় কথার পাহাড়। সেই পাহাড়ের ভিতরে চাপা পড়ে যায় বিবেকের কণ্ঠস্বর।

যেমন কোনো নগরে দীর্ঘদিন কর্পোরেশনের ময়লা পরিষ্কারের গাড়ি না এলে রাস্তার পাশে আবর্জনা জমে ওঠে, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে দুর্গন্ধে, তেমনি মানুষের মন থেকেও যদি দীর্ঘদিন অনুচ্চারিত বেদনা, অপরাধবোধ, ঈর্ষা, হিংসা ও অহংকারের আবর্জনা সরানো না হয়, তবে একসময় সেই মনই দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে।

হস্তিনাপুরের রাজপুরুষদের অন্তরে ঠিক সেই দুর্গন্ধ জমে উঠেছিল।

কোথাও না-পাওয়ার বেদনা, কোথাও না-বলতে পারার বেদনা; কোথাও হিংসার চাপা গর্জন, কোথাও অহংকারের গুমরে গুমরে কান্না। কোথাও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা, কোথাও স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষুধা, কোথাও নিজের অক্ষমতাকে ঢেকে রাখার মরিয়া চেষ্টা। বাইরে রাজপ্রাসাদ যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, ভিতরে ভিতরে তাদের মন যেন অন্ধকারের এক বিশাল কুঠুরি।

আর সেই অন্ধকারেই জন্ম নেয় মহাভারতের প্রকৃত সংকট।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আসলে শুধু দুই পক্ষের সৈন্যসমাবেশের সংঘর্ষ নয়; তার অনেক আগে থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল মানুষের অন্তরে। বাইরে অস্ত্র উঠেছিল পরে, ভিতরে অস্ত্র উঠে গিয়েছিল অনেক আগেই। কুরুক্ষেত্র তাই একটি যুদ্ধক্ষেত্র যেমন, তেমনি মানুষের মনোজগতেরও এক প্রতীকী ভূখণ্ড।

এই কারণেই মহাভারত আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক।

কারণ হস্তিনাপুর কেবল অতীতের কোনো রাজ্য নয়। তার অন্ধকার আজও মানুষের মধ্যে আছে, ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে আছে, রাজনীতির অলিন্দে আছে, পরিবারে আছে, সমাজে আছে—এমনকি আমাদের নিজেদের মনেও আছে।

প্রশ্ন একটাই—সেই অন্ধকারের মধ্যে আলো কোথায়?

সম্ভবত আলো বাইরে কোথাও পড়ে নেই। তাকে খুঁজে নিতে হয় নিজের ভিতরেই। আর সেই অনুসন্ধানই মানুষের চিরন্তন যাত্রা—দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভিতরের মানুষটির কাছে ফিরে আসার দিকে।

ক্রমশঃ 
কলমে - রবীন মজুমদার 
১৩/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

৪২৯ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -ত্রয়োদশ পর্ব )

 ৪২৯ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -ত্রয়োদশ  পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

মহাভারত খুব দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে কর্মফল ও নিয়তির উপস্থিতিকে। প্রতিটি  কাজেরই একটি অনিবার্য পরিণতি আছে। কোন চরিত্রকে মহাভারত  এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে দেয়নি।  একদিকে যেমন, কৌরবরা তাদের  লোভ, অহংকার ও হিংসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, অন্যদিকে পাণ্ডবরাও এই যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও ভুল ভ্রান্তির যোগ্য শাস্তি পেয়েছে।  নিয়তির এই বিধান থেকে এমনকি শ্রীকৃষ্ণও রেহাই পান নি, গান্ধারীর অভিশাপ  সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। 

ত্রয়োদশ  পর্ব

আমরা আজ মূলত খুঁজতে এসেছি মহাভারতের পিছনের দর্শনটা কি ছিল ? তার সাথে এটাও আমাদের প্রশ্ন কেন মহাভারত বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে সময়কে অতিক্রম করে প্রাসঙ্গিক ? যতক্ষন আমাদের জানার সন্তুষ্টির ভান্ডার পূর্ণ হবেনা, ততক্ষণ আমাদের অনুসন্ধান এখানে ওখানে চলতেই থাকবে। 

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু গ্রন্থ আমাদের ভাবনা চিন্তা করতে শিখায়, যেগুলি সাহিত্যের দেহকে অতিক্রম করে  বহুমুখী মনন দিয়ে উদ্ভাসিত করেছে  মানবসভ্যতার বৌদ্ধিক, নৈতিক ও দার্শনিক বিকাশের ভিত্তিস্তম্ভকে তাই সে  আজও সমাদৃত। 

 হোমারের ইলিয়াড ওডিসি বা বাইবেল—এসব গ্রন্থ মানবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু ভারতীয় সভ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে এমন একটি গ্রন্থ আছে, যা একই সঙ্গে ইতিহাস, পুরাণ, নীতিশাস্ত্র, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিকতার এক বিশাল ভাণ্ডার। সেই গ্রন্থটি হলো মহাভারত

প্রচলিত ধারণায় মহাভারতকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ইতিহাস বলা হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মহাভারতের প্রকৃত বিস্তৃতি ও গভীরতার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। যুদ্ধ এখানে একটি উপলক্ষ মাত্র; প্রকৃত বিষয় হলো মানুষ—তার আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব, দুর্বলতা, কর্তব্য, নৈতিকতা এবং আত্ম-অনুসন্ধান।

মহর্ষি ব্যাসদেব এই গ্রন্থকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যাতে মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি প্রশ্নের প্রতিফলন দেখা যায়। পরিবার, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, প্রেম, বন্ধুত্ব, প্রতিশোধ, ক্ষমা, ন্যায়, অন্যায়, মৃত্যু, মুক্তি—কোনো বিষয়ই এর বাইরে নয়। তাই ভারতীয় ঐতিহ্যে একটি সুপরিচিত উক্তি প্রচলিত—

আসলে মহাভারতে আছে, তা পৃথিবীর অন্যত্রও থাকতে পারে; কিন্তু যা মহাভারতে নেই, তা কোথাও নেই।

এটি কোনো অতিরঞ্জিত প্রশংসা নয়; বরং মহাভারতের বিষয়বস্তুর ব্যাপকতার এক প্রতীকী স্বীকৃতি। মানুষের মহাকাব্য যুদ্ধের আবরনে মোরা আর সেখানে আসল যুদ্ধ  ছিল এক অন্তর্জগতের গভীর একটা দ্বান্দ্বিক ক্যানভাস।  

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ  শেষ হতে মাত্র আঠারো দিন লেগেছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধের পেছনে ছিল বহু প্রজন্মের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক জটিলতা, অহংকার, প্রতিজ্ঞা, অভিমান, অন্যায়, নৈতিক ব্যর্থতা এবং ভাগ্যের জটিল বুনন।

যদি যুদ্ধই মহাভারতের মূল বিষয় হতো, তাহলে গ্রন্থটির অধিকাংশ অংশ যুদ্ধবর্ণনায় পূর্ণ থাকত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মহাভারতের বিপুল অংশ জুড়ে রয়েছে—নৈতিকপ্রশ্ন, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, রাজধর্ম, আপৎকালীন ধর্ম মোক্ষধর্ম, জীবনের অর্থ, জ্ঞান ও আত্মার প্রকৃতি, সমাজব্যবস্থা, শিক্ষার উদ্দেশ্য, নারী ও পুরুষের সম্পর্ক, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব।

এখানে যুদ্ধক্ষেত্র হচ্ছে যেন  একটা আধুনিক পরীক্ষাগার যেখানে একে একে মানবচরিত্রগুলি প্রবেশ করছে, যুদ্ধান্তে তাদের শংসা পত্র আপামর জনসাধারণের সম্মুখে উন্মুক্ত হচ্ছে। 

প্রশ্ন উঠতেই পারে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের একটি গ্রন্থ আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কেন  মহাভারত আজও  প্রাসঙ্গিক? বাইরের পরিবর্তনটা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কিন্তু যাকে দেখা যায় না সেই মানুষের অন্তর্জগতের সত্যিই  বিশেষ কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ? উত্তর হবে- তেমনটি হয়নি। 

বরং উদাহরণ সহকারে বলা যায়, সেই ট্রেডিশন সমানে চলেছে। আজও মানুষ—ক্ষমতার জন্য লড়াই করে , সম্পদের জন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করে, নৈতিক সংকটে পড়ে , সত্য ও সুবিধার মধ্যে দোলাচলে থাকে, কর্তব্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাতে সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়ে, ভালোবাসা, ঈর্ষা, অহংকার, ভয় এবং লোভের দ্বারা পরিচালিত হয়।

এই প্রতিটি অভিজ্ঞতার প্রতিফলন মহাভারতে রয়েছে। অর্থাৎ মহাভারত অতীতের নয়; সে যে মানুষের চিরকালীন। যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন মহাভারতও প্রাসঙ্গিক থাকবে।

মহাভারতের দর্শনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে যদি আলোচনা করতে হয় , তাহলে বলতে হয় তার অনন্য  দার্শনিক উদারতা। এখানে কোনো প্রশ্ন নিষিদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি  সত্য প্রশ্নের মধ্য দিয়েই সেটি উদ্ভাসিত হয়েছে।

অর্জুন প্রশ্ন করেছেন—"আমি কেন যুদ্ধ করব?" 
যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করেছেন—"ধর্ম কী?"
যক্ষ প্রশ্ন করেছেন—"পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় কী?"
বিদুর প্রশ্ন করেছেন—"একজন আদর্শ শাসকের গুণ কী?"
যেই পরিসরে ভীষ্মের উত্তর দেবার পালা এসেছে, তিনি উদাত্ত কন্ঠে উত্তর দিয়েছেন রাজধর্ম, দানধর্ম, মোক্ষধর্ম এবং নীতিশাস্ত্রের আলোচনায়।

এই প্রশ্নমুখরতা ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।


ক্রমশঃ 
কলমে - রবীন মজুমদার 
০৮/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬

৪২৮ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -দ্বাদশ পর্ব )


 ৪২৮ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -দ্বাদশ  পর্ব )         


( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

আধুনিক গবেষণায় বেদকে শুধুমাত্র ধর্মীয় সাহিত্যের আবরণে বেঁধে রাখেনি বরং  তাকে এক ঐতিহাসিক দলিল বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। 

দ্বাদশ  পর্ব

 বেদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে পুরুষার্থঃ। খুব ভালো করে যদি বিচার বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এই চতুর্বর্গ পুরুষার্থকে বিভিন্ন ভাবে বারবার বলা হয়েছে।  ব্যবহারিক জীবনে অর্থের প্রয়োজন আছে আর তার জন্য কর্ম করার প্রয়োজন। অপরিমিত আয় মনকে বিশৃঙ্খল করে তোলে, তাই মনকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ধর্মের অনুশীলন প্রয়োজন। একটা সময়ের পর আধ্যাত্মিকতা জীবনে শান্তি এনে দেয়। এই কাম,অর্থ,ধর্ম ও মোক্ষ এই চতুর্বর্গ নিয়ে হচ্ছে বেদের পুরুষার্থ।    

তখনকার দিনে সাধারণ মানুষ এক তীব্র অনুসন্ধিৎসা নিয়ে ঋষিদের কাছে বহু তথ্যের ব্যাখ্যা চাইতে আসতেন। ঋষিরা দেখলেন, তাদের কথার উত্তরগুলি যদি নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে সেটা তার বুঝতে পারবে না। এই কারণে তারা মোটামুটিভাবে যাতে ধর্মের তত্ত্বগুলি বুঝতে  পারে, সেইমতো অসংখ্য পুরাণের জন্ম দিলেন সঙ্গে রামায়ন ও মহাভারতের মাধ্যমে যথা সম্ভব সাধারণ মানুষকে ধর্ম সম্পর্কে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন।  

সৃষ্টির দ্বান্দ্বিকতার হাত ধরে পথ চলতে চলতে মানুষ ঠিক কবে থেকে যেন তার ভালোলাগার মধ্যে সেই মানসিকদন্দ্ব থেকে বাস্তবের যুদ্ধকে ভালোবাসতে  শুরু করে দিয়েছিল, তার  সঠিক দিশা হয়ত কারোর জানা নেই। কিন্তু মহাভারতের এই বিশ্বজোড়া আকর্ষণের  মুলে আছে সেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। যেমন, এই যুদ্ধে ধনুকের ছিলা(জ্যা ) থেকে  যতনা তীর ছোড়া হয়েছে তার থেকে অনেক বেশী মনস্তাত্বিক  তীর  ছোড়া হয়েছে মহাভারতের হৃদয়ে  তার কোন  ইয়ত্তা নেই। 

মহাভারতের ছত্রে ছত্রে কখন মনস্তত্ত্বের কথা, কখন মনে করিয়ে দেয় মানুষের প্রকৃত কর্তব্যের কথা, নৈতিকতার চরম উচ্চতায় পৌঁছে গিয়ে জীবনের চরম সত্যকে  নিয়ে বারবার প্রশ্ন ও তার সাথে উত্তর খোঁজার অবিরাম চেষ্টা চলেছে। 

বিভাসের মতে , মহাভারতের পিছনের মূল দর্শনগুলিকে যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে  প্রধান কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করলে ভালো হয়। অনন্তকাল ধরে মানুষ ধর্মের জটিলতার নাগপাশে কি ভাবে আবদ্ধ এবং তার থেকে মুক্তির উপায়কে খুঁজে ফিরছে, সেই ধর্মের গোলকধাঁধাকে নিয়ে অল্প বিস্তার-
বিভাসের কন্ঠে উচ্চারিত হলো - 

ধর্ম কোথায় ?
মন্দিরের ঘন্টাধ্বনিতে, নাকি আজানের দীর্ঘশ্বাসে ?
শঙ্খের সুতীব্র হুঙ্কারে,
নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে মাতার অশ্রুজলে ?  

ঈশ্বরের ঠিকানা চাইলে 
কেউ বলে, সে তো থাকে ঐ যে আকাশ ঠিক তার ওপারে 
কেউ বলে না না সব মিথ্যে, সে আছে আপন হৃদয়ে। 
খ্যাপা খুঁজে ফিরে পরশপাথর 
কখন বেদে , কোরানে কিংবা বাইবেলে ও ত্রিপিটকে,
কেউ আবার বলে উঠে 
যেখানে সব প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় 
সেখান থেকে শুরু হয় ঈশ্বরকে জানা-শুনা। 

কিন্তু হায়রে ! আপন খেয়ালে 
সে যে দেয়াল তুলেছে নিজ মনে। 
একজনের ঈশ্বর ভীষণ সাদা 
অপর জনের কালো,
একজনের পথ যদি হয় পবিত্র 
তবে অপরজনের পথ ভ্রান্ত। 
আর ঈশ্বর 
সে তো নীরব। 

যুদ্ধ হয়েছে, রক্ত ঝরেছে শহর পুড়েছে যত?
মানুষ মানুষকে হত্যা করে, দিনের শেষে 
সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলেছে শতশত ?
তাতে কি এসেছে শান্তি ?
কি অদ্ভুত এই ধর্ম 
যে মানুষকে অহং মুক্ত হতে শেখায় 
তারই ক্রোড়ে জন্ম নেয় সেই অহংকার। 

যে ধর্ম বলে মানুষকে ভালোবাসতে
তারই নাম করে কখন মানুষ ঘৃণার প্রাসাদ বানায়। 
যে ধর্ম ত্যাগের কথা বলে,
তার পুরোহিতের হাতে কখনও জমে ওঠে 
ক্ষমতা ও সম্পদের পাহাড়। 
তবুও মানুষ ধর্মকে ভালোবাসে 
কেন তা জানো ?
শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে 
"আমি কে ?" 
তাইতো জেনো। 

ধর্মের সূক্ষতা ও আপেক্ষিকতা মহাভারতের সবচেয়ে বড় দর্শন হলো 'ধর্মের' জটিলতা। এখানে ধর্ম তথাকথিত সব মেকি আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করে, চিৎকার করে  বলে উঠেছে, ধর্ম কোন মন্দিরের  ঘন্টা  আর শঙ্খের  ধ্বনি দিয়ে আরাধনা নয়, বরং সময়পোযোগী কর্তব্য পালন ও সঠিক সিদ্ধান্তের মেলবন্ধন। সেখানে বাস্তব পরিস্তিতি কথা বলে,এগিয়ে যাবার পথের নির্দ্দেশ দেয়।  

প্রশ্ন ওঠে গোদা অক্ষরে লেখা নির্দেশিত পথ কি আগামীর ঠিকানা বলে দেবে ? না পথই বলে দেবে গন্তব্যের ঠিকানা কি হবে। বিপদের সময় কি ধর্ম হতে পারে,  তার কি কোন উত্তর বইতে আছে ? তার পরেরটা, সেটা হতে পারে সাধারণ নিয়মের বিরোধী। 

যেমনটি, অস্ত্রহীন কর্নকে বধ করা থেকে শুরু করে  দ্রোণাচার্য্যকে হত্যা করতে গিয়ে ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের অর্ধসত্য বলে যুধিষ্ঠির প্রতিষ্ঠা করতে চাইলো, সেই দৃষ্টান্তটি যেখানে বলা হয় - বৃহ্ত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া যেতে পারে। এই হত্যাগুলিকে সময়োপযোগী বলে মান্যতা দেওয়ার অপচেস্টা চললো।   
নৈতিকতা, মানবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে 'সময়' বীরদর্পে এগিয়ে চলে আর বলে যে  কাজটি  যুদ্ধ ক্ষেত্রে করতে এসেছো সেটাই তোমার ধর্ম আর জয়ী হতে গেলে বাদবাকি  যা কিছু আছে, আপাতত তাদেরকে শিকেয় তুলে রাখাই শ্রেয়। মোরগ খাবে আর মোরগকে হত্যা করবে না - এই দুটি কাজ এক সাথে হতে পারে না। 

মহাভারত দেখিয়েছে ভোকাল টনিকের কি অসাধারণ মাহাত্ম। বেদ থেকে উঠে আসা নিষ্কাম কর্মের মাহাত্ম রয়েছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অন্তরে, তাকে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতের দার্শনিক হৃদয়টিকে তৈরি করেছেন। যেখানে প্রশ্নের সব তীর ভুলন্ঠিত হয়ে যায়।  সব ধরনের বন্ধন থেকে মুক্তি যদি অন্তিম লক্ষ্য  হয় তাহলে এই যুদ্ধ নামক যজ্ঞ থেকে ফলের আশা কোরনা, কেননা ফলের মধ্যেই  লুকিয়ে আছে কামনার বীজ। তাই যুদ্ধ কিংবা যজ্ঞ করুন কিন্তু সেটা  যেন নিষ্কাম হয়, তবেই তুমি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে অর্থাৎ মুক্তি মিলবে। এর পাশাপাশি আত্মজ্ঞান বা আত্মার অমরত্বের ধারণাও এখানে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে শরীর নশ্বর কিন্তু আত্মা শাশ্বত। 

মহাভারত খুব দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে কর্মফল ও নিয়তির উপস্থিতিকে। প্রতিটি  কাজেরই একটি অনিবার্য পরিণতি আছে। কোন চরিত্রকে মহাভারত  এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে দেয়নি।  একদিকে যেমন, কৌরবরা তাদের  লোভ, অহংকার ও হিংসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, অন্যদিকে পাণ্ডবরাও এই যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও ভুল ভ্রান্তির যোগ্য শাস্তি পেয়েছে।  নিয়তির এই বিধান থেকে এমনকি শ্রীকৃষ্ণও রেহাই পান নি, গান্ধারীর অভিশাপ  সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। 

ক্রমশঃ 
কলমে - রবীন মজুমদার 
০৮/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

৪২৭ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -একাদশ পর্ব )

 ৪২৭ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -একাদশ  পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

ঋগ্বেদ কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। এর মাধ্যমে আমরা প্রাচীন মানুষের ধর্মবিশ্বাস, প্রকৃতিচেতনা, রাজনৈতিক সংগঠন, অর্থনৈতিক জীবন, সামাজিক কাঠামো এবং দার্শনিক অনুসন্ধানের একটি জীবন্ত চিত্র পাই। একই সঙ্গে ঋগ্বেদ দেখায় কীভাবে বহুদেবতাবাদ থেকে এক পরম সত্যের ধারণা, যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্ম থেকে দার্শনিক অনুসন্ধান এবং উপজাতীয় সমাজ থেকে সংগঠিত সামাজিক কাঠামোর দিকে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।

একাদশ   পর্ব

 এই পৃথিবীর বুকের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়, বন্যা হয় , ভূকম্পন হয় তারপর তার রেশ বেশ কিছু দিন ধরে মানুষের স্মৃতিতে রয়ে যায়। যদি তার কোন প্রভাবকে স্মরণীয় করে রাখতে হয়, সেখানে মানুষ আশ্রয় নেয় ঘটনাবলীকে আগামীর জন্য রেখে  লিখে রাখার উদ্দেশ্য তৎকালীন  উপস্থিত মাধ্যমের সাহায্যে নেয় , সেই-ই কালে কালে একদিন ইতিহাসের মর্যাদা পেয়ে থাকে। আর ভারতীয় সভ্যতার বিকাশে আর্য্য সংস্কৃতির প্রভাবের বর্ণনা থাকবেনা, এতো হতে পারেনা। এর মধ্যে দিয়ে আজকে ভারতীয়দের  আচার-সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার পদধ্বনি শুনতে পাব। যেটাই আমাদের আলোচনার উপজীব্য বিষয়। 

ইতিহাসের  সত্যতা যাচাই করা ঐতিহাসিকদের প্রাথমিক কর্তব্য। এই পারফেকশনের জন্য  আজও অনুসন্ধান অব্যাহত আছে এবং আগামীতে থাকবে বলে আমাদের ধারণা। 
আজকের আলোচনার সূত্রটা কিন্তু সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ঐতিহাসিক উপাদানের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হল এবং যার সাথে  প্রাচীন উপাদানের সাথে বিস্তর ফারাক। ভাষাবিজ্ঞান এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক উপাদান  যা নতুন করে সাক্ষ্য প্রমাণকে আমাদের সামনে নিয়ে এলো। ইউরোপ থেকে  শুরু করে বেশ কিছু স্থানে ভাষা বিজ্ঞানের প্রসার লাভ করে। সে এক অসাধারন অভিজ্ঞতা, ইউরোপীয় পন্ডিতরা সংস্কৃত ভাষার গঠন ও ধরণের সাথে গ্রীক ও  ল্যাটিন ভাষার অনবদ্য মিল খুঁজে পেলেন। অতীতের সব ধারণার অবসানে উন্মুক্ত হলো সেই তত্ত্ব, যার মাধ্যমে জানা গেল আর্যভাষা ব্যবহারকারীদের  পূর্বসূরিরা যে ভাষা ব্যবহার করতো সেই ভাষা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় জাতির মূল ভাষা। 

জীবন ধারণের টানে পিছনে ফেলে এলো ক্যাস্পিয়ান সাগর ও দক্ষিণ রাশিয়ার স্তেপ  অঞ্চল, শুধু একটু পশু চারণ ভূমির সন্ধানে, কেননা সেটাই ছিল  তাদের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ পুঁজি। সারা বিশ্ব ক্রমেই জানলো, সে এক ভারতবর্ষ বলে এইটা দেশ  আছে যে তাদের জীবনকে ফুলে-ফলে ভরিয়ে দিতে পারে। পরখ  করতে গিয়ে তারা চলতি পথের বাধা-বিঘ্নকে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে কেউবা গ্রীসদেশ  থেকে , কেউবা এশিয়া মাইনর থেকে আবার কিছু মানুষ সুদূর ইরান থেকে  এসে উপস্থিত হলো এই সুজলাং সুফলাং এই  ভারতভূমিতে। 

মানুষ্য সৃষ্ট একের সাথে আরেককে আলাদা করে চিহ্নিত করার একমাত্র ভূষণ  হলো নাম আর রূপ। তারা হলো আর্য্য নামের অধিকারী আর এই বৈদিক  সাহিত্য তাদেরই সৃষ্টি। 

প্রশান্ত আবার বলল - আমি পূর্বেও বলেছি, আবার বলছি বাহ্যিক জগতের চঞ্চলতা  থেকে মন যখন মুক্ত হয়, তখনি মানুষ মনের গভীর অন্দরে প্রবেশ  করার  চাবিকাঠিটি খুঁজে পায়। যুগে যুগে অমানবিক শাসকরা ইচ্ছা করে একটা  কৃত্তিম পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে মনের অন্দরে প্রবেশের দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকে অভাব, মানুষের মানুষে বিভেদ, অস্থির অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের দানবরূপী এক বিশাল পাহারাদার। তাদের অতিক্রম করে মনের গভীরে আর প্রবেশ করা হয়ে ওঠে না।  তাই আজ সৃষ্টিধর্মী  কাজের বড়োই অভাব, যার জন্ম মনের অন্দরমহলে। 

যাদের হাত শক্ত করে ধরে আমরা অতীতের গহ্বরে প্রবেশ করি, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রত্নতাত্তিক উপাদান, ঐতিহাসিক সূত্র এবং বৈদিক সাহিত্য।  যদিও বৈদিক সাহিত্যের বেশ পরে পুরাণের সৃষ্টি, বহু ঐতিহাসিক অসঙ্গতি থাকা সত্বেও, তার মধ্যে এক  ধারাবাহিকতা আছে , যা আমাদের দিনপঞ্জি অনুযায়ী রাজ-রাজাদের কাহিনী  সম্পর্কে অবগত হই। 

খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ শতাব্দীর আশেপাশে পুরাণের কাহিনীগুলি সংগৃহিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই পুরাণকে বেশ কিছু অংশে সংশোধন করে সম্পাদনা করা হয়ে ছিল। কারণ হিসাবে বলা যায়, ভারতীয়দের  ধর্ম বিশ্বাস প্রায় অন্ধত্বের পর্য্যায়ে, সেক্ষেত্রে পুরাণের কাহিনীগুলির ভূমিকা একটা বড় স্থান  অধিকার করে বসে আছে। 

১০২৮টি শ্লোক বিশিষ্ট ঋগ্বেদ রচিত হয়েছিল আর্য্য দেবতাদের বন্দনা করার উদ্দেশে। এর পাশাপাশি আর্যদের জীবন ধারার পরিচয়ও  পেয়ে থাকি। মজার ব্যাপার হলো ঐতিহাসিকভাবে ঋগ্বেদের  সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু পুরাণ এবং রামায়ন ও মহাভারতের ক্ষেত্রে এখনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমানের  অভাব রয়ে গেছে। 

দর্শনের অধ্যাপক বিভাস এতক্ষন চুপচাপ ছিল। হঠাৎ সে বলল, ভারতবর্ষকে চেনার মাপকাঠি শুধু ইতিহাস দিয়ে হবে না, তার পিছনে এক গভীর দর্শন আছে। সেই  দর্শনটাকে আমাদের জানতে হবে। বেদ কিন্তু সেই দর্শনের কথাই বলে। এই বলে সে বলতে শুরু করলো -

"আজি কোন সুরে বাঁধিব" -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই পরমপিতাকে কোন  সুরের দ্বারা বাঁধবেন, তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন, সেখানে  স্বামীজীও  খুঁজে বেড়াচ্ছেন ভারতের জাতীয় সুরকে, অবশেষে তিনি বলেছেন নিবেদিতাকে, সে আর কেউ নয়, সে  হচ্ছে 'বেদ' যাকে প্রথমে শঙ্করাচার্য খুঁজে পেয়েছিলেন। 

প্রত্যেকটি কর্মের পশ্চাতে একটা মূল সুরের অন্বেষণ চলে, আর যেই না মানুষ তাকে  উদ্ধার করে, তখন বাকি গুলি সহজ হয়ে উঠে।

 জাতীয় সুরের দেখা , সেই মহামানবরাই পেয়ে থাকে যারা সর্বস্তরের সুরগুলিকে একই সুতোয়  বেঁধে ফেলতে পারেন। সেগুলি অবশ্যিই যাঁরা একটা দেশকে অধ্যাত্বিকতা , নৈতিকতা, ধার্মিকতা, সামাজিকতা, রাজনীতিকতাকে সার্বিকভাবে  এক সূত্রে বেঁধে ফেলতে পারেন, তারই সেই পর্য্যায়ে যাবার অধীকারী  হন। 

কোরান কিংবা বাইবেলের সাথে বেদের ব্যবধান হচ্ছে তাদের যেমন দ্রষ্টা  এক কিন্তু বেদের দ্রষ্টা  অনেকে। মনকে অতিক্রম করে যে গহীন প্রদেশে উপস্থিত হয়ে যা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার বাইরে  আর কিছুই বেদে নেই। 

জ্ঞানেরই সাবেকি নাম 'বেদ', প্রাচীন হিন্দু ধর্মের একটি প্রামাণ্য ধর্মীয় গ্রন্থমালা। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, যেহেতু প্রাচীন ঋষিরা ধ্যানের গভীরে অর্থাৎ  অবচেতন স্তরে পৌঁছে যেখানে ইন্দ্রিয়ের আনাগোনার বাইরে তাই সেটি অপৌরুষেয়, যার অর্থ মানুষের দ্বারা নয়। এক একটি শব্দকে নিয়ে ঋষিরা  মনের গভীরে প্রবেশ করেন। শব্দের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে তপস্যা  ভঙ্গ করে বেরিয়ে আসেন এবং তাকে শিষ্যদের মাঝে শোনানো হয় আর এই শ্রুতির পরম্পরা আছে। বৈদিক সাহিত্যের  বিশালতা অন্যান্য গ্রন্থ থেকে অনেক বেশি। 

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে  পরম সত্যকে জানা, যাঁকে নামরূপে ভূষিত করেছে 'ব্রহ্ম' নামে। অন্তর্নিহিত সত্তাকে বলা হচ্ছে আত্মা নামে। জ্ঞান ছাড়া সেই চরম সত্যের মুখোমুখি হবার কোন রাস্তা নেই, যা কর্ম ছাড়া কিছুতেই পূর্ণ হবার নয়। এই মৌলিক ধারণার কথা বেদ বলে থাকে।  

একটা বড় বটবৃক্ষের মতো ডালপালা বিস্তার করে আছে যার প্রভাবে প্রভাবিত উপনিষদের দর্শন, বেদান্ত, যোগ, মীমাংসা দর্শন, ন্যায় দর্শন, সুপ্রাচীন সাংখ্য  দর্শন,ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত , সংস্কৃত সাহিত্য, ধর্মীয় আচার ,দর্শন ও আধ্যাত্মিক চিন্তা।  কখন প্রত্যক্ষ আবার কখন পরোক্ষ ভাবে  কাজ করে আসছে। 

আধুনিক গবেষণায় বেদকে শুধুমাত্র ধর্মীয় সাহিত্যের আবরণে বেঁধে রাখেনি বরং  তাকে এক ঐতিহাসিক দলিল বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। 

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
০৭/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

ujaan

৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম পর্ব )

৪৩৩  স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম   পর্ব )  ( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দে...