পোস্টগুলি

ujaan

৩৮৮  অপেক্ষা রাত্রির গভীরতম স্তব্ধতা। প্রকৃতি জেনে গেছে এই মুহূর্তে শব্দ করতে নেই। শব্দরা ফিরে গেছে তাদের উৎসের সন্ধানে। আকাশে চন্দ্রামা ধীরে ধীরে আকাশের উপর তাঁর কতৃত্ব বিস্তার করছে। এই মায়াবী রাতে দুই মানব-মানবী খোলা জানালার ধারে  উন্মুখ হয়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য আকন্ঠভরে পান করছে।  কত প্রশ্ন প্রলয়ের মনে এসে একে একে ভিড় করতে লাগলো।  আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই  প্রলয় ধীরে বলল— “ যেখানে দুই নেই, সেখানেই সত্য। অপেক্ষা, প্রেম, মৃত্যু—সবই সেই একের ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গ। ” নন্দিনী অনুভব করল—আজ প্রলয়ের কথাগুলো গল্প নয়, যেন এক গভীর ধ্যান থেকে উৎসারিত কতগুলি জমাট বদ্ধ শব্দ।  'মায়া' সে তো  বহুর আবরণে আচ্ছাদিত  জগৎ যেন এক অনন্ত প্রতিচ্ছবি।  যা দেখি—তা ক্ষণস্থায়ী,  যা ধরি—তা পরিবর্তনশীল, যা ভালোবাসি—তা হারিয়ে যায়।  নন্দিনী ফিসফিস করে বলল,  — “  তাহলে কি সবই মায়া?” প্রলয় শান্ত স্বরে বলল —   “মায়া মানে মিথ্যা নয়। মায়া মানে আচ্ছাদন। যেমন কুয়াশা সূর্যকে ঢাকে, তেমনি মায়া এককে বহু করে দেখায়।” অপেক্ষা—মায়ার ভিতরে সময়ের খেলা। ...

৩৮৭ প্রেমের ভাষা ও ভাষাহীনতা

ছবি
  ৩৮৭  প্রেমের ভাষা ও ভাষাহীনতা  ভাষাহীন ক্রন্দনে প্রেম এক নীরব ভাষা হয়ে অনুভূতির স্কন্ধে চেপে বসে। প্রেমকে কি কোনো ভাষায় ব্যক্ত করা যায়?—এই প্রশ্নটি অবন্তিকা তুলতেই সপ্তর্ষি  হেসে বলল, “ভাষায় যদি প্রেম ধরা পড়ত, তবে কবিদের বেকারত্ব বাড়ত, আর প্রেমিকদের চাকরি যেত!” অবন্তিকা ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল, “তুমি আবার প্রেমকে অর্থনীতির খাতায় নাম লেখালে নাকি?”—এইভাবে শুরু হলো তাদের অনন্ত জিজ্ঞাসার মিষ্টি কাঁটাযুক্ত বাক্যালাপ। প্রেম ভাষাবদ্ধ না ভাষাতীত? অবন্তিকার মতে, প্রেম হলো নীরবতার সুর—যেখানে চোখ কথা বলে, স্পর্শ কবিতা লেখে, আর নিঃশ্বাস উপন্যাস হয়ে ওঠে। ভাষা সেখানে কেবল সাবটাইটেল। সপ্তর্ষি  প্রতিবাদ করল, “ভাষা না থাকলে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি কে আবিষ্কার করত? মানুষ কি শুধু তাকিয়েই সংসার চালায়?” অবন্তিকা মৃদু হেসে বলল, “সংসার ভাষায় চলে, প্রেম চলে ভ্রূকুঞ্চনে।” সুতরাং সিদ্ধান্ত—প্রেম ভাষায় ধরা দেয়, আবার ভাষা ফসকে পালায়ও। যেন সাবান—ধরলেই পিছলে যায়।   প্রেম কি অতলান্তিক? সপ্তর্ষি  বলল, “প্রেম সমুদ্র হলে আমি লাইফজ্যাকেট পরব, ডুবতে চাই না।” অবন্তিকা বলল, “ডুব না দিলে প্রে...

386 আমি যুদ্ধ : এক দার্শনিকের ডায়েরি থেকে হারিয়ে যাওয়া ছেঁড়া পাতা

ছবি
  386 আমি যুদ্ধ : এক দার্শনিকের ডায়েরি থেকে হারিয়ে যাওয়া ছেঁড়া পাতা আমি যুদ্ধ। ভয় পেও না—আজ তলোয়ার নিয়ে আসিনি, আজ কলম হাতে,  অন্তরের সাথে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের  এক ক্লান্ত সৈনিক আমি,  তাই একটু রঙ্গ- রসে ভিজিয়ে কিছু কথা বলতে এসেছি। কারণ বহু যুগ ধরে মানুষ আমাকে এত সিরিয়াসভাবে নিয়েছে যে, মাঝে মাঝে  নিজের ওপর হাসি পায়। মানুষ ভাবে, যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। আগুন, রক্ত, আর একরাশ কান্না। সত্যি বলতে কী, এ আমার এক রূপ—কিন্তু পুরোটা নয়। আমি শুধু কামানের গর্জন নই, আমি মানুষের ভেতরের ছোট্ট ধাক্কা—যে ধাক্কা তাকে বদলাতে বাধ্য করে। আমি সেই অসম্পূর্ণতার অস্বস্তি, যে অস্বস্তি না থাকলে মানুষ কখনো নতুন কিছু খুঁজত না। ভাবো তো, পৃথিবীর প্রথম মানুষটি যদি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ না করত, তবে কি আগুন জ্বলত? চাকা ঘুরত? সভ্যতা দাঁড়াত? দার্শনিকরা আমাকে নিয়ে বড় বড় কথা বলে—“সংঘর্ষই সৃষ্টি।” শুনতে ভারী লাগে, কিন্তু ব্যাপারটা মন্দ নয়। বীজ মাটির সঙ্গে যুদ্ধ না করলে গাছ হয় না, শিশুর কান্না না হলে জন্ম সম্পূর্ণ হয় না, আর মানুষের ভেতরে প্রশ্ন না জাগলে জ্ঞান জন্মায় না। অর্থাৎ, আমি একটু ঝামেলাবাজ ঠিকই, কিন্তু...

৩৮৫ যৌনতা কি একটি বহমান স্রোত ?

ছবি
 ৩৮৫ যৌনতা কি একটি বহমান স্রোত ? মানুষ আগে মানুষ হয়েছে, পরে আর্য্য হয়েছে। এটাই বাস্তবতা যে সভ্যতার প্রথম ভাষা শরীর।  মানুষ যখন সভ্য হয়নি, তখনও সে জন্ম দিত। ধর্ম তখনও গড়ে ওঠেনি, কিন্তু পরিবার গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ সভ্যতার প্রথম প্রতিষ্ঠান—পরিবার, আর তার কেন্দ্রে—যৌনতা। ধর্ম এসেছে পরে, শাস্ত্র এসেছে আরও পরে, কিন্তু জীবন তার আগেই নিজের পথ বানিয়ে নিয়েছে।  আর্য্য আগমন: সংঘর্ষ নাকি সংমিশ্রণ? ঐতিহাসিকভাবে (খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ অব্দে) ইন্দো-আর্য্য গোষ্ঠীর আগমন ঘটে উত্তর-পশ্চিম ভারতভূমিতে। কিন্তু তারা শূন্য দেশে আসেনি। এখানে ছিল— সিন্ধু-উপত্যকার উত্তরাধিকারী জনগোষ্ঠী,  দ্রাবিড় ও অন্যান্য প্রাচীন জাতি,  প্রকৃতি ও উর্বরতা-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি।  আর্য্যরা নিয়ে এলো—  যজ্ঞ ও বৈদিক দেবতা,  পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক রূপ,  বর্ণভিত্তিক শৃঙ্খলার সূচনা।  প্রথমে সংঘর্ষ, কিন্তু ইতিহাসে সংঘর্ষ খুব কমই স্থায়ী—কারণ মানুষ বাঁচতে চায়, আর বাঁচতে হলে মিশতে হয়। অচিরেই মানুষ বুঝতে পারলো সংঘর্ষ মানে নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে তার গতিকে রুদ্ধ করা আর সেখানেই মানব সভ্যতার ইতি। অবশ্য এক...

৩৮৪ একি লজ্জা না অন্যকিছু

৩৮৪ একি লজ্জা না অন্যকিছু    ধর্ম হতে হবে ইতিবাচক — এ কথা শুনলে আজকাল অনেকে ভয় পেয়ে যান। কারণ ইতিবাচক শব্দটা যেন খুব সন্দেহজনক। এতে না আছে তর্ক, না আছে রাগ, না আছে টিভি ডিবেটের চেঁচামেচি। যেন ধর্ম মানেই একটু হাসিমুখ, একটু আলো, আর একটু মানুষ হওয়া— এই বিপজ্জনক প্রস্তাব! আমরা বিশ্লেষণ খুব ভালোবাসি। এমনভাবে বিশ্লেষণ করি যে শেষে জিনিসটার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না— শুধু নেগেটিভের কঙ্কালটা দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ যদি বলে, “দেখো, এই ঘটনার একটা ভালো দিকও আছে”— সঙ্গে সঙ্গে তাকে সন্দেহ করা হয়। যেন সে গোপনে ইতিবাচকতার চোরাচালান করছে। অথচ আমাদের জাতীয় অভ্যাস হলো— আম কেটে খেয়ে আঁটি গুনে বিচার করা, কিন্তু আমটা মিষ্টি ছিল কি না সেটা ভুলে যাওয়া। বইয়ের শিক্ষা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। বই খুললেই জ্ঞান, বই বন্ধ করলেই অজ্ঞতা— এই সহজ সমীকরণে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু বাস্তব বড়ই অশিক্ষিত জিনিস। সে বইয়ের নিয়ম মানে না। বই বলে “সততা সর্বোত্তম নীতি”, আর বাস্তব বলে “আগে লাইনে ঢুকো, পরে নীতি দেখো।” ফলে ছাত্রটি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বেরোয়, কিন্তু বাসে সিট ছেড়ে দিতে গেলে তার গণিত মেলে না। শিক্ষা তখন সার্টিফিকেটে থাকে,...

৩৮৩ আধিপত্যের চঞ্চলতা

৩৮৩   আধিপত্যের চঞ্চলতা  আধিপত্য বড় মজার বস্তু। যে পায়, সে ভাবে—“আমি ঈশ্বরের ছোট ভাই”; আর যে পায় না, সে ভাবে—“সময় এলে দেখিয়ে দেব।” এই দুই ভাবনার মাঝখানে মানবসভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে—এক হাতে রাজদণ্ড, আরেক হাতে হজমের ওষুধ। আদিম কালে মানুষ প্রকৃতির কাছে এমন ধমক খেত যে, আজকের স্কুলের ছাত্রও তেমন খায় না। বজ্রপাত একদিন এমন গর্জে উঠল যে, আদিম মানুষ বলল—“দেখিস, তোকে একদিন ব্যাটারিতে ভরে টর্চ বানাব!” তারপর সত্যিই সে বিদ্যুৎ ধরল, বাল্ব জ্বালাল, পাখা ঘোরাল—কিন্তু লোডশেডিং এলেই আবার মোমবাতির কাছে হাতজোড় করে দাঁড়ায়। প্রকৃতি তখন বলে—“বাবা, আধিপত্য করবি কর, কিন্তু বিলটা আগে দে!” মানুষের আধিপত্যবোধ সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় ঘরের ভেতর। স্বামী সকালবেলা বুক ফুলিয়ে বলে—“এই সংসারের আমি কর্তা!” ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে স্ত্রীর গম্ভীর ডাক—“বাজারের ব্যাগটা নিয়ে এসো।” কর্তা তখন ব্যাগ হাতে এমন দৌড়ায়, যেন সেনাপতি যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছে। অফিসেও একই দশা। বস চেয়ারে বসে গম্ভীর মুখে বলে—“আমিই এই প্রতিষ্ঠানের মস্তিষ্ক।” কিন্তু চা-ওয়ালা দেরি করলে তার মস্তিষ্ক এমন ঝিমিয়ে পড়ে, যেন বিদ্যুৎহীন পাখা। আর ফাইল যদি পিয়নের...

৩৮২ এক যে ছিল জ্ঞানী বুড়ো

  ৩৮২ এক যে ছিল জ্ঞানী  বুড়ো  গ্রামের প্রাচীন বটগাছটার নিচে প্রতিদিন বিকেলে বসতেন বৃদ্ধ শিক্ষক। চারপাশে ছেলেমেয়েরা খেলত, গরু ফিরত খামারে, আর বাতাসে ভেসে আসত শিউলি ফুলের গন্ধ। সেদিন তাঁর সামনে বসেছিল এক কৌতূহলী শিষ্য—নাম তার অনির্বাণ। শিষ্য জিজ্ঞেস করল, — গুরুজি, “শিক্ষা” আর “সাধনা” কি আলাদা জিনিস? শিক্ষক মৃদু হেসে পাশে রাখা একটি মাটির হাঁড়ি আর একটি প্রদীপ দেখালেন। — দেখ অনির্বাণ, এই হাঁড়িটা হলো তোমার মন। আর এই প্রদীপের আগুন তোমার চর্চা। আমি এখন হাঁড়িতে জল ঢালছি—এটা হলো শিক্ষা, বাইরের জগৎ থেকে সংগ্রহ করা অসম্পূর্ন জ্ঞান। বই, মানুষ, অভিজ্ঞতা—এ সব মিলিয়েই  জল, সে  বাড়তেই থাকে। শিষ্য মন দিয়ে দেখছে। শিক্ষক আবার বললেন, — এখন হাঁড়িটা আগুনে বসাই। যখন জল ফুটতে শুরু করবে, তখন অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। যা থাকবে, সেটাই জ্ঞানের নির্যাস—এটাই সাধনা। শিক্ষা তোমাকে ভরায়, সাধনা তোমাকে পরিশুদ্ধ করে। ঠিক তখন পাশ দিয়ে এক রাখাল ছেলে হাঁটছিল। সে হেসে বলল, — গুরুজি, তাহলে বেশি পড়লে কি বেশি জ্ঞানী হওয়া যায়? শিক্ষক হাসলেন, — না রে, শুধু জল ভরলে হাঁড়ি উপচে পড়ে। ...