পোস্টগুলি

ujaan

৩৮৩ আধিপত্যের চঞ্চলতা

৩৮৩   আধিপত্যের চঞ্চলতা  আধিপত্য বড় মজার বস্তু। যে পায়, সে ভাবে—“আমি ঈশ্বরের ছোট ভাই”; আর যে পায় না, সে ভাবে—“সময় এলে দেখিয়ে দেব।” এই দুই ভাবনার মাঝখানে মানবসভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে—এক হাতে রাজদণ্ড, আরেক হাতে হজমের ওষুধ। আদিম কালে মানুষ প্রকৃতির কাছে এমন ধমক খেত যে, আজকের স্কুলের ছাত্রও তেমন খায় না। বজ্রপাত একদিন এমন গর্জে উঠল যে, আদিম মানুষ বলল—“দেখিস, তোকে একদিন ব্যাটারিতে ভরে টর্চ বানাব!” তারপর সত্যিই সে বিদ্যুৎ ধরল, বাল্ব জ্বালাল, পাখা ঘোরাল—কিন্তু লোডশেডিং এলেই আবার মোমবাতির কাছে হাতজোড় করে দাঁড়ায়। প্রকৃতি তখন বলে—“বাবা, আধিপত্য করবি কর, কিন্তু বিলটা আগে দে!” মানুষের আধিপত্যবোধ সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় ঘরের ভেতর। স্বামী সকালবেলা বুক ফুলিয়ে বলে—“এই সংসারের আমি কর্তা!” ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে স্ত্রীর গম্ভীর ডাক—“বাজারের ব্যাগটা নিয়ে এসো।” কর্তা তখন ব্যাগ হাতে এমন দৌড়ায়, যেন সেনাপতি যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছে। অফিসেও একই দশা। বস চেয়ারে বসে গম্ভীর মুখে বলে—“আমিই এই প্রতিষ্ঠানের মস্তিষ্ক।” কিন্তু চা-ওয়ালা দেরি করলে তার মস্তিষ্ক এমন ঝিমিয়ে পড়ে, যেন বিদ্যুৎহীন পাখা। আর ফাইল যদি পিয়নের...

৩৮২ এক যে ছিল জ্ঞানী বুড়ো

  ৩৮২ এক যে ছিল জ্ঞানী  বুড়ো  গ্রামের প্রাচীন বটগাছটার নিচে প্রতিদিন বিকেলে বসতেন বৃদ্ধ শিক্ষক। চারপাশে ছেলেমেয়েরা খেলত, গরু ফিরত খামারে, আর বাতাসে ভেসে আসত শিউলি ফুলের গন্ধ। সেদিন তাঁর সামনে বসেছিল এক কৌতূহলী শিষ্য—নাম তার অনির্বাণ। শিষ্য জিজ্ঞেস করল, — গুরুজি, “শিক্ষা” আর “সাধনা” কি আলাদা জিনিস? শিক্ষক মৃদু হেসে পাশে রাখা একটি মাটির হাঁড়ি আর একটি প্রদীপ দেখালেন। — দেখ অনির্বাণ, এই হাঁড়িটা হলো তোমার মন। আর এই প্রদীপের আগুন তোমার চর্চা। আমি এখন হাঁড়িতে জল ঢালছি—এটা হলো শিক্ষা, বাইরের জগৎ থেকে সংগ্রহ করা অসম্পূর্ন জ্ঞান। বই, মানুষ, অভিজ্ঞতা—এ সব মিলিয়েই  জল, সে  বাড়তেই থাকে। শিষ্য মন দিয়ে দেখছে। শিক্ষক আবার বললেন, — এখন হাঁড়িটা আগুনে বসাই। যখন জল ফুটতে শুরু করবে, তখন অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। যা থাকবে, সেটাই জ্ঞানের নির্যাস—এটাই সাধনা। শিক্ষা তোমাকে ভরায়, সাধনা তোমাকে পরিশুদ্ধ করে। ঠিক তখন পাশ দিয়ে এক রাখাল ছেলে হাঁটছিল। সে হেসে বলল, — গুরুজি, তাহলে বেশি পড়লে কি বেশি জ্ঞানী হওয়া যায়? শিক্ষক হাসলেন, — না রে, শুধু জল ভরলে হাঁড়ি উপচে পড়ে। ...

৩৮১ “মৌলবাদীর খোঁজে বাপু”

  ৩৮১ “মৌলবাদীর খোঁজে বাপু” বাপু একদিন ঠিক করলেন—এই পৃথিবীতে “মৌলবাদী” কাকে বলে, তার হদিস না পেলে আর শান্তি নেই। কারণ চারদিকে শুধু অভিযোগ—“ওই লোকটা মৌলবাদী”, “ওই দলটা সাম্প্রদায়িক”, “ওই মতবাদটা বিপজ্জনক”! বাপু ভাবলেন, এত মৌলবাদী যদি থাকে, তবে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও মৌলবাদীদের একটা ইউনিয়ন অফিস আছে—সেখানে গিয়ে খোঁজ নিলেই সব পরিষ্কার। প্রথমে বাপু গেলেন ধর্মপাড়ায়। সেখানে এক ভদ্রলোক খুব গম্ভীর মুখে বললেন, “আমাদের ধর্মই শেষ কথা। বাকি সব ভ্রান্ত।” বাপু খাতায় টুকে নিলেন— ধর্মীয় মৌলবাদ: উপস্থিত । তারপর বাপু ঢুঁ মারলেন বর্ণপাড়ায়। সেখানে এক দাদা বললেন, “আমাদের বংশই শ্রেষ্ঠ, বাকি সব নিম্নমানের।” বাপু আবার লিখলেন— বর্ণ মৌলবাদ: উপস্থিত । এরপর বাপু হাজির হলেন শ্রেণীপাড়ায়। সেখানে লাল পতাকা উড়ছে, স্লোগান—“দুনিয়ার সর্বহারা এক হও!” এক নেতা বললেন, “আমরা শুধু শ্রমিক  শ্রেণীর পক্ষেই।” বাপু খাতায় লিখলেন— শ্রেণী মৌলবাদ: সম্ভাব্য উপস্থিত । কিন্তু বাপুর কৌতূহল মেটে না। তিনি ভাবলেন—“এত মৌলবাদ যদি চারদিকে থাকে, তবে কি কেউ মৌলবাদী নয়?” তাই বাপু শেষমেশ নিজের বাড়িতে ফিরলেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই জিজ্ঞ...

৩৮০ বাঘের পিঠের সওয়ারী

ছবি
৩৮০ বাঘের পিঠের সওয়ারী  কিছুক্ষন অন্তর অন্তর কলিং বেলের শব্দ। দরজা খুলে দেখি পার্শেল। অতীতে বিশেষ কোনো জরুরি কারণে পার্শেলটি যে এসেছে সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের এক গভীর ধারণা ছিল। আজ সেই  শব্দটির মাহাত্ম কিভাবে হারিয়ে গেলো, তার বাস্তবতাকে  অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখি সমাজটা কি ভাবে আধুনিক শিল্পায়নের এক কঠিন বিচ্যুতির আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে।  সম্ভবতঃ আজ থেকে ২৫-৩০ বছরের আগের কথা , বাজার দখলের কথা প্রসঙ্গে, এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ফার্স্ট লাইন ম্যানেজারের সাথে কথা হচ্ছিলো। প্রসঙ্গটা ছিল  বিদেশী কোম্পানিদের দৃষ্টিতে ভারতীয় মার্কেটে প্রবেশ করার প্রাথমিক এসেসমেন্ট নিয়ে। তাঁরা ভাবে ভারতের যা জনসংখ্যা তার ১০ শতাংশ বাজার ধরতে পারলে ১০ টা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের  সমান।  আজ শুধু কি তাই ? এর সঙ্গে আমরা পেয়েছি এক নতুন সংস্কৃতিকে যা আজ " ভোগবাদী উদ্বৃত্ত সংস্কৃতি " হিসাবে বেশ পরিচিত। এক সংস্কৃতি মানব সভ্যতার বিকাশে দানব হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। তারই  বাস্তবতা কি সেটাই আমরা জানার চেষ্টা করবো। হয়তো আমরা সবাই এই অবস্থার সাথে কম-বেশি পরিচিত। পার্সেলের কলিংবেলটা নিজের বাড়ি...

৩৭৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩)

ছবি
  ৩৭৯  কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩ ) ১৮৯৫ শিষ্যকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে  বিশ্বমঞ্চে মানবতার রণদুন্দুভি: স্বামীজীর কর্মযজ্ঞ ও আগামীর আহ্বান স্বামী বিবেকানন্দের কাছে সন্ন্যাস কেবল গৈরিক বসন পরিধান বা সংসার থেকে পলায়ন ছিল না; তাঁর কাছে সন্ন্যাস ছিল এক জ্বলন্ত মশাল, যা দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে অজ্ঞানতা ও অন্যায়ের অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মানসপটে কোনো কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানা ছিল না। সমগ্র বিশ্বই ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। এক মহা কৃষকের মতো তিনি চেয়েছিলেন এমন এক বীজ বপন করতে, যা একদিন মহীরুহে পরিণত হয়ে ক্লান্ত পৃথিবীকে ছায়া দেবে—যে ছায়ায় জাতপাত, ধনী-দরিদ্র আর হিংসার কোনো স্থান থাকবে না, থাকবে কেবল মানবতার জয়গান। রণকৌশল ও আস্তানা নির্মাণ  যেকোনো মহৎ যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল প্রস্তুতি। স্বামীজী বুঝেছিলেন, কেবল আবেগের বশে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে জগত জয় করা যায় না। অনৈতিকতার বিরুদ্ধে নৈতিকতার এই সংগ্রাম এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। তাই একজন দক্ষ সেনাপতির মতোই তিনি যুদ্ধের রসদ ও সৈন্য সংগ্রহের জন্য দুর্গ তৈ...

৩৭৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২২)

ছবি
    ৩৭৮  কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২২ ) ১৮৯৫ শিষ্যকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে  পথ কখনও মসৃণ হয় না—স্বামী বিবেকানন্দ তা জানতেন। তবু তিনি ভীত হননি। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, বাধা মানেই পরাজয় নয়; বাধা মানেই মানুষের জাগরণের আহ্বান। যুগ যুগ ধরে প্রকৃতি তার ভয়ংকর রূপে মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছে, আবার মানুষও তার জ্ঞান নামক প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে পথ করে নিয়েছে। কখনও তা বন্যা, কখনও ভূমিকম্প, কখনও আবার মানুষেরই নির্মম হাতে গড়া সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ—সব কিছুর মধ্যেই মানুষ এগিয়েছে, কারণ সে জানে—জ্ঞানই তার শেষ আশ্রয়। ইংল্যান্ডের হিমশীতল বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে স্বামীজী দেহের দুর্বলতাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন, কিন্তু আত্মার দীপ্তিকে নিভতে দেননি। শীত তাঁর শরীরকে বিদ্ধ করলেও মনকে করতে পারেনি অবসন্ন। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন—প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বুদ্ধির আলো জ্বেলে প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসই মানুষকে মানুষ করে তোলে। নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি উপলব্ধি তিনি গোপন রাখেননি। তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন—সহকর্মী ও শিষ্যদের হাতে তুলে দিয়ে সমাজের হৃদয়ে ...

৩৭৭ মনের দুয়ারে জ্ঞানবাবুর প্রহরা

  ৩৭৭ মনের দুয়ারে জ্ঞানবাবুর প্রহরা শহরের এক কোণে থাকেন শিবু কাকু। মানুষটা ভীষণই সংবেদনশীল। সামান্য কিছু হলেই তাঁর মনের ভেতরে কখনো স্বর্গ, কখনো নরক খুলে বসে। চা বেশি গরম হলে—নরক। পাড়ার ছেলে নমস্কার করলে—স্বর্গ। একদিন শিবু কাকু হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন— “এই ভালো-মন্দের ঝামেলা আর না! এবার জ্ঞান চর্চা করবো।” পরদিন থেকেই তিনি শুরু করলেন বই পড়া। উপনিষদ, গীতা, দর্শনের বই—সব এনে ফেললেন। আর মনের দরজায় বসালেন এক কল্পিত পাহারাদার— জ্ঞানবাবু । জ্ঞানবাবুর কাজ একটাই— মন্দ অনুভূতিকে ঢুকতে না দেওয়া। একদিন সকালবেলা শিবু কাকু হাঁটতে বেরিয়েছেন। হঠাৎ পেছন থেকে একটা কুকুর “ঘেউ” করে উঠল। ভয় নামক মন্দ অনুভূতি দৌড়ে এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ল। জ্ঞানবাবু গম্ভীর গলায় বললেন— “আপনি কে?” ভয় বলল, “আমি ভয়। একটু ঢুকতে দেবেন? হার্টটা একটু কাঁপিয়ে দিই।” জ্ঞানবাবু হেসে উত্তর দিলেন— “দুঃখিত। এখানে লেখা আছে— ‘ভয়ং ত্যজ’ । আপনি যেতে পারেন।” ভয় ফিরে গেল। শিবু কাকু অবাক—“আরে! আমি তো ভয়ই পেলাম না!” কয়েকদিন পর বাজারে গিয়ে আলু কেজি ৫০ টাকা শুনে রাগ এল। রাগ সোজা মনের দরজায় হাজির। জ্ঞানবাবু বললেন— “ভাই...