সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা 


মুকুল একান্ত অবহেলায় পালিত একটি আম গাছের চারা যে আগামীর স্বপ্নে বিভোর।  আমার এই "মুকুল" নামটা ওই মাতৃহারা পাঁচবছরে ছেলে আকাশের দেওয়া।  এক সন্ধ্যায় মুকুল তার জীবনের অতীতের স্মৃতির দরজায়  হাত লেগে বেজে উঠল। তারপর সবকিছু একদম চুপচাপ। 

বাতাসের সাথে বড্ড ভাব মুকুলের। তার জীবনের সবকিছুকে শুধু বাতাস আর আকাশের সাথে অকপটে ব্যক্ত করে। 

মুকুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাতাসের কথাগুলো তার ছোট্ট পাতাগুলোর মধ্যে যেন মৃদু শিহরণ তুলেছিল। সে আকাশকে প্রতিদিন জানালার ধারে বসে থাকতে দেখেছে। দেখেছে তার দুটি পা  দীর্ঘদিন ধরে অসাড়,  অথচ চোখ দুটি কত দূরে চলে যায়।, সেই দিগন্ত রেখার কিংবা তাকে অতিক্রম করে কোন এক অজানা মহাশুন্যে। 

মুকুল বলল,
—“কিন্তু মন দিয়ে মানুষ কী করতে পারে? সে তো হাঁটতে পারে না, দৌড়তে পারে না, অন্যদের মতো মাঠে গিয়ে খেলতে পারে না।”

বাতাস হেসে উঠল। তার হাসিতে পাতাগুলো একসঙ্গে দুলে উঠল।

—“তুই এখনও ছোট, মুকুল। তাই ভাবছিস মানুষের শক্তি শুধু তার পায়ের মধ্যে। পা মানুষকে পথ দেখায় না, মন পথের সন্ধান করে। চোখ মানুষকে দৃশ্য দেখায়, কিন্তু মন তাকে অর্থ দেয়। হাত দিয়ে মানুষ ঘর বানায়, কিন্তু স্বপ্ন দিয়ে সে সভ্যতা গড়ে।”

মুকুল কিছুক্ষণ নিশ্চুপ।

বাতাস আবার বলল,
—“দেহের ক্ষমতা সীমিত। মন যদি নিজেকে চিনতে পারে, তার সীমা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। যে মানুষ নিজের অক্ষমতাকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলে, সে তার দেহের চেয়েও ছোট হয়ে যায়। আর যে মানুষ তার অক্ষমতাকে অতিক্রম করে নিজের শক্তিকে চিনতে শেখে, সে দেহের সীমার ভিতর থেকেও সীমাহীন হয়ে উঠতে পারে।”

মুকুলের মনে হলো, কথাগুলো যেন শুধু আকাশের জন্য নয়, তার নিজের জন্যও।

সেদিন সন্ধ্যায় আকাশ জানালার ধারে এসে বসেছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুকুলের পাতায় শেষ আলো এসে পড়েছে।

আকাশ বলল,
—“মুকুল, আজ তোকে খুব সুন্দর লাগছে।” 
মুকুলের ইচ্ছে হলো হেসে উঠতে। কিন্তু গাছের হাসি মানুষের মতো শোনা যায় না। তার হাসি শুধু পাতার মর্মরে প্রকাশ পায়।

আকাশ বলল,
—“জানিস, ছোটবেলায় আমি ভাবতাম তুই একদিন আমার চেয়ে অনেক বড় হয়ে যাবি। তখন আমি তোকে দেখতে জানালার ধারে বসে থাকব, আর তুই আমাকে ছায়া দিবি।”

মুকুল মনে মনে বলল,
“তুই ভুল ভাবছিস আকাশ। একদিন তুই এত বড় হবি যে, আমিই তোর ছায়ায় আশ্রয় চাইব।”

কিন্তু সে কথা আকাশ শুনতে পেল না।
তারপর থেকে আকাশের মধ্যে যেন অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখা দিতে লাগল। পরিবর্তনটা প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি।

তার বাবা বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখলেন, ছেলে আগের মতোই জানালার ধারে বসে আছে। কাকিমাও দেখলেন, তার চলাফেরার মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রামুকাকা প্রতিদিনের মতো বাগানে জল দিচ্ছে, আগাছা পরিষ্কার করছে।

শুধু মুকুল বুঝতে পারল—আকাশ বদলেছে। আগে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। এখন সে জানালার বাইরে দেখতে শুরু করল। এই তাকানো আর দেখার মধ্যে বিস্তর  ফারাক, সেটা মুকুলের বোধগম্যের বাইরে নয়। 

আগে আকাশ ভাবত—সে অন্যদের মতো নয়।

এখন সে ভাবতে শুরু করল—
“অন্যদের মতো হওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?”

আগে তার মনে প্রশ্ন ছিল—
“আমি কেন হাঁটতে পারি না?”

এখন প্রশ্ন হলো—
“আমি হাঁটতে না পারলেও কী কী করতে পারি?”
এই একটি প্রশ্নই যেন তার জীবনের দরজা খুলে দিল। 
আকাশ পড়াশোনায় মন দিল। মাস্টারমশাই একদিন বিস্মিত হয়ে কাকিমাকে বললেন, —“আকাশের মধ্যে অসাধারণ স্মরণশক্তি আছে। শুধু পড়াশোনা নয়, যে কোনো বিষয় নিয়ে তার অনন্ত কৌতূহল ।”

কাকিমা মৃদু হেসে বললেন,
—“ও তো ছোট থেকেই এমন।”

কিন্তু মুকুল জানত, এটা শুধু প্রশ্ন করার অভ্যাস নয়। আকাশ এখন নিজের ভিতরটাকে খুঁজছে।

সে বই পড়তে শুরু করল। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য—যা সামনে পায় তাই। তার ঘর ধীরে ধীরে বইয়ে ভরে উঠল। যে জানালার ধারে একদিন সে শুধু বাইরের পৃথিবীকে দেখত, সেই জানালার ধারে এখন বই খুলে বসে সে পৃথিবীকে নিজের ভিতরে আত্মস্থ করতে লাগলো ।

মুকুল বিস্মিত হয়ে ভাবত—
মানুষ কী আশ্চর্য!

যে মানুষ নিজের পায়ে এক পা এগোতে পারে না, তার মন মুহূর্তের মধ্যে পাড়ি দেয় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

আকাশ বইয়ের পাতায় হিমালয় দেখছে, সমুদ্র দেখছে, মরুভূমি দেখছে।  বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ভিতর দিয়ে অজানাকে চিনছে।

তার শরীর জানালার ধারে।
কিন্তু তার মন?
সে তো তখন পৃথিবীর সমস্ত জানালা খুলে দিয়েছে।
একদিন আকাশ মুকুলকে বলল,
—“তুই জানিস, আমি একটা জিনিস বুঝেছি?”
মুকুল পাতাগুলো দুলিয়ে জানতে চাইল, কী?
—“মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগার তার শরীর নয়। তার নিজের ধারণা।”
মুকুল চুপ করে রইল।

আকাশ বলল,

—“আমি এতদিন ভাবতাম, আমি হাঁটতে পারি না, তাই আমি অসম্পূর্ণ। এখন বুঝেছি, আমার পা হয়তো আমাকে বহন করতে পারে না, কিন্তু আমার মন আমাকে বহন করতে পারে। আর মন যদি থেমে যায়, তবে সুস্থ শরীরের মানুষও আসলে পঙ্গু।”

এই কথাটা শুনে মুকুলের মনে হলো, বাতাস সেদিন যা বলেছিল, আকাশ নিজের ভাষায় সেই কথাই বুঝে নিয়েছে।

দিন যেতে লাগল। আকাশ লেখালেখি শুরু করল। প্রথমে ছোট ছোট গল্প। তারপর প্রবন্ধ। তারপর মানুষের জীবন নিয়ে লেখা। তার লেখায় বারবার ফিরে আসত প্রকৃতি।

একটি পাখি কীভাবে উড়ে যায়—এই দৃশ্য তার কাছে শুধু উড়ে যাওয়ার দৃশ্য ছিল না। সেটি ছিল স্বাধীনতার প্রতীক।

একটি গাছ কীভাবে ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে—সেটি তার কাছে শুধু প্রকৃতির ঘটনা ছিল না। সেটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।

একটি বীজ কীভাবে মাটির অন্ধকার ভেদ করে আলোয় উঠে আসে—সেটি তার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় দর্শন।

আর একটি মানুষ কীভাবে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে—সেটিই হয়ে উঠল তার জীবনের প্রধান প্রশ্ন। তার লেখা ধীরে ধীরে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে লাগল। একদিন দূরের একটি কলেজ থেকে তাকে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানানো হলো।

কাকিমা অবাক। বাবা প্রথমবারের মতো ছেলের দিকে নতুন চোখে তাকালেন। আকাশ মৃদু হেসে বলল, —“আমি তো যেতে পারব না।”
কাকিমার মুখটা মলিন হয়ে গেল। 
কিন্তু আকাশ বলল, 
—“আমি যেতে না পারলে ওরা আসবে।” সেদিন সত্যিই কয়েকজন ছাত্র তার বাড়িতে এল। দোতলার সেই বিশাল জানালার ধারে বসেই আকাশ তাদের সঙ্গে কথা বলল। কথা বলতে বলতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল, কেউ বুঝতে পারল না।

একজন ছাত্র শেষে বলেছিল,

—“স্যার, আপনার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, আমরা এতদিন সুস্থ শরীর নিয়েও খুব অসুস্থভাবে বেঁচে ছিলাম।”

আকাশ কিছু বলল না। 
তার চোখ চলে গেল মুকুলের দিকে। মুকুলের পাতাগুলো তখন সন্ধ্যার বাতাসে মৃদু দুলছে।
সেদিন রাতে মুকুল বাতাসকে বলল, 
—“তুমি ঠিকই বলেছিলে।” 
বাতাস বলল, 
—“কী বলেছিলাম?”
—“দেহ নয়, মনই জীবনের পরিচালক।” 
বাতাস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“না মুকুল, কথাটা একটু অন্যভাবে বল। দেহকে অস্বীকার করে মন বড় হয় না। দেহের সীমাকে মেনে নিয়ে মন যখন তার ভিতরকার সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করে, তখনই মানুষ বড় হয়।”

মুকুল বলল,
—“তাহলে আকাশ বড় হয়েছে?”
বাতাস হাসল।
—“না। আকাশ এখনও বড় হচ্ছে। মানুষ যতদিন নিজের ভিতরের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করতে থাকে, ততদিন তার বড় হয়ে ওঠার শেষ নেই।”

বছর কয়েক পরে মুকুল সত্যিই বড় হয়ে উঠল।

তার ডালে ডালে পাখি বসতে লাগল। কাঠবেড়ালিরা ছুটে বেড়াতে লাগল। মৌমাছিরা এসে চাক বাঁধল। বসন্তে তার সমস্ত শরীর ফুলে ফুলে ভরে উঠল।

একদিন আকাশ জানালার ধারে বসে বলল, 
—“মুকুল, তোর স্বপ্নগুলো তো সব সত্যি হয়ে গেল।” 
মুকুল মনে মনে উত্তর দিল, 
“তোর স্বপ্ন?” 
আকাশের চোখে তখন অদ্ভুত এক আলো। 
সে বলল, 
—“আমার স্বপ্ন এখনও শেষ হয়নি।” 
—“কী স্বপ্ন?” 
আকাশ জানালার বাইরে তাকাল।
—“যে মানুষ নিজেকে দুর্বল ভাবে, তাকে নিজের শক্তিটা চিনিয়ে দেওয়া। যে মানুষ ভাবে সে পারবে না, তাকে একবার অন্তত চেষ্টা করতে শেখানো। আর যে মানুষ নিজের শরীরের কোনো সীমাবদ্ধতার কারণে নিজেকে ছোট ভাবে, তাকে বোঝানো—মানুষের মূল্য তার শরীর কত দূর যেতে পারে তাতে নয়; তার মন কত দূর দেখতে পারে, তার উপর।”
মুকুলের সমস্ত পাতা যেন একসঙ্গে কেঁপে উঠল।
সে বুঝল, আকাশ এখন আর সেই ছোট্ট ছেলেটি নেই যে জানালার ধারে বসে তার সঙ্গে কথা বলত।
সে এখন নিজেই একটি আকাশ। 
যে আকাশের কোনো পা নেই, অথচ তার কোনো পথের শেষ নেই।

সেদিন সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় মুকুলের উপর সোনালি আলো পড়েছিল। কয়েকটি পাখি এসে তার ডালে বসেছিল। একটি কাঠবিড়ালি লেজ উঁচু করে এ ডাল থেকে ও ডালে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

আকাশ চুপ করে তাদের দেখছিল।

তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, সে হাঁটছে।

একটি দীর্ঘ পথ।

পথের দুপাশে পাহাড়।

দূরে নদী।

তার ওপারে অজানা কোনো দেশ।

সে হাঁটছে।

কেউ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে না।

কোনো হুইলচেয়ার নেই।

কোনো সহানুভূতি নেই।

কেউ তাকে দুর্বল বলছে না।

সে একা।

কিন্তু একা নয়।

তার সঙ্গে তার মন।

তার সঙ্গে তার স্বপ্ন।

তার সঙ্গে তার সমস্ত অসম্ভবকে সম্ভব করার ইচ্ছা।

হঠাৎ সে শুনতে পেল, মুকুলের পাতাগুলো কাঁপছে।

বাতাস যেন বলছে—

“দেহের যে দরজা বন্ধ, মন তার জানালা খুলে দেয়।”

আকাশ চোখ খুলল।

জানালার বাইরে তখন অসংখ্য তারা।

সে মৃদু হেসে বলল,

—“আমি বুঝেছি।”

মুকুল শুনল।

আকাশ বলল,

—“মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি সে কতটা দূর হাঁটতে পারে, তা নয়। সে কতটা দূর ভাবতে পারে—সেটাই তার আসল শক্তি।”

সেই রাতে মুকুল প্রথমবার বুঝল—

সে আর আকাশের বন্ধু মাত্র নয়।

আকাশ তারও শিক্ষক হয়ে উঠেছে।

আর দোতলার সেই জানালাটি?

সেটি আর কোনো বন্দিত্বের জানালা নয়।

সেটি হয়ে উঠেছে এক অসীম পৃথিবীর দরজা।

যে দরজার ওপারে দেহের কোনো সীমা নেই।

আছে শুধু মন।

আর সেই মনের আকাশ—
যত দূর বিস্তৃত, মানুষের পৃথিবীও তত দূর।

লেখনীতে -রবীন মজুমদার 
তারিখ ২৫/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩১)

  ৪৩৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩১)


১৭ই ফেব্রুয়ারী,১৮৯৫ সালে বিদেশ থেকে শিষ্যদের উদ্দেশ্য পাঠানো পত্রের  ভাবার্থের অনুসরণে- 

সময় বড্ড কম, কিন্তু কাজ যেন অন্তহীন। কাজকে ফেলে রাখাও সম্ভব নয়। সময় আর কাজের অনুপাতে সময় কম। স্বামীজী তার বিশ্রামের সময়টাকে বিলম্বিত করে, সেই সময়টা কাজের জন্য ব্যয় করছেন। দীর্ঘ দিনের এই অভ্যাসের দরুণ দেহ তার পুঞ্জিত প্রাপ্য সেই বিশ্রামকে ফিরে পেতে চায়। স্বামীজী সে ডাকে যথাপোযুক্ত সাড়া না দেওয়ায় দেহ আজ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে।  

কিন্তু স্বামীজীর সামনে থামার কোন অবকাশ নেই। যে কোন মহান কাজের অগ্রগতির পথের মধ্যে বিছানো থাকে,  কণ্টক। লক্ষ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে তার দুর্গমতা বৃদ্ধি পায়।

 স্বামীজীর লক্ষ্য তো কোন ভৌগলিক সীমানায় কিংবা কোন সম্প্রদায় বা কোন বিশেষ ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বামীজীর কাজ সমগ্র  বিশ্ব জুড়ে আর সেই কাজকে বাস্তবায়িত করতে গেলে  যে উপযুক্ত সময়ের প্রয়োজন, তার কাছে সেই সময়টুকু পর্যন্ত নেই। 

মনে রাখতে হবে- স্বামীজীর বয়স তখন মাত্র ৩২ বছর এবং তার শরীর চলে গিয়েছিলো  মাত্র ৩৯ বছর বয়সে।  

জড় সভ্যতার অবগুন্ঠনে ঢাকা এই পাশ্চাত্য  সমাজ শান্তির জন্য লালায়িত। তাদের কাছে সব আছে শুধু শান্তিই নেই। ঘরের আয়তন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু  তার সাথে পাল্লা দিয়ে  মনের বিশালতাকে কমিয়ে দিয়েছে।  

  আর ভারতবর্ষের প্রাচীন সাধনার গভীরে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সেই শান্তির বীজ। ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তঃসলিলায় যে আত্মবোধ, যে সংযম, যে নির্ভয়তা, যে বিশ্বমানবতার কথা যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত হয়েছে, স্বামীজীর সংকল্প ছিল সেই স্রোতকে কেবল ভারতের মাটিতে আবদ্ধ না রেখে বিশ্বমানবের দ্বারে পৌঁছে দেওয়া।

একদল সৈন্য ও আধুনিক অস্ত্র সম্ভার নিয়ে দেশ দখল করা যেমন সেই অর্থে খুবই সহজ  কিন্তু তার থেকে বহুগুনে কঠিন কাজ সেই দেশের মানুষের মগজ দখল করা। তিনি অচিরেই আমেরিকান সভ্যতার একরকমের পীঠস্থান নিউইয়র্কে ও ইংল্যান্ডে এই কাজটিতে করতে অনেকখানি সমর্থ হয়েছেন কিন্তু বাকি রয়ে গেছে বহু। 

ভারতীয় দর্শনের উপরের খোলসটা ছিল বড্ড কঠিন। সেখান থেকে নিস্কাশিত রস মানুষের  পরিপাক যন্ত্রের পক্ষে উপযুক্ত নয় বলে দীর্ঘদিন সেটি সীমিত  মানুষের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। স্বামীজীর কাছে ভীষণ বড় যুদ্ধ ছিল, তাকে সাধারণ মানুষের মতো  করে মূল বিষয়বস্তুকে অপরিবর্তিত রেখে সহজ পাচনযোগ্য করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার। 

দর্শন, জটিল পুরাণ আর মনবিজ্ঞানের কঠিন মোড়কের আড়ালে এতদিন আবদ্ধ যে ধর্ম ছিল, তাকে সেই বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে, তার স্বাদ আল্হাদ বজায় রেখে একাধারে পন্ডিতদের  এবং সেই  সঙ্গে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার যে কঠিন কর্মটি নিজ স্কন্ধে  স্বামীজী বহন  করেছিলেন। তার উদেশ্য ছিল সাধারণ মানুষ তার  অর্থ  বুঝতে পারবে আর বুঝতে পারলে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে আর সেখান থেকে তার হৃদয়ে উত্তরণ হবে। এইভাবেই আগামী দিনে এক বেদান্তিক সমাজ গড়ে উঠবে। 

মানুষের জীবনে দুটি ভয় -মৃত্যুর ও হেরে যাবার। বেদান্ত মানুষকে ভয় দূর করে সাহসী হতে শেখায়। 

বনের বেদান্তকে ঘরের বেদান্তে উন্নীত করাই ছিল স্বামীজীর ব্রত। 

এই যাত্রা পথে কার্য্য সম্পাদন করতে পারবেন, এই বিশ্বাস অর্জন করাটাই ছিল প্রাথমিক কাজ। তাই তিনি বলেন, "কর্মে আমাদের অধিকার, ফলে নহে। "

শিষ্যরা যদি পূর্ণমাত্রায় ত্যাগের ভাব ধারণা করতে না পারেন, তবে সেই শূন্যতাকে পূরণ করে দেবে ভোগ আর বাসনা, কেননা মনে কোন শূন্যতার কোন স্থান  থাকেনা। 

স্বামীজী দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন- " যে মিশনারিরা কামিনীকাঞ্চনের কোন ধার  ধারে না। " 

কথাটি কেবল একটি নৈতিক আদর্শের ঘোষণা ছিল না; তাঁর নিজের জীবনই ছিল তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

স্বামীজিকে উপলদ্ধি করে বিদেশের মানুষ তখন এক নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি  দাঁড়িয়ে গেল।

মানুষ এমনও হতে পারে?

যে পৃথিবীতে সাফল্যের মাপকাঠি সম্পদ, আরাম, ভোগ ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণ —সেই পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ বলছেন, এসবের ঊর্ধ্বেও জীবন থাকতে পারে। একজন মানুষ নিজের ইচ্ছা, নিজের সুখ, নিজের ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে সংযত করে বৃহত্তর মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে।

এই দৃশ্য তাদের কাছে নতুন।

যার যা নেই, তার প্রতিই মানুষের আকর্ষণ বেশি। যে সভ্যতা ভোগের প্রাচুর্য পেয়েছে, সে ত্যাগের সৌন্দর্যকে নতুন চোখে দেখতে পারে। যে সমাজ সম্পদের মূল্য জানে, সে সম্পদকে অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের দিকে বিস্ময়ে তাকায়।

 স্বামীজীর জীবনে তারা সেই বিস্ময়েরই সাক্ষাৎ পেল।

তাঁর বক্তৃতা মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল, কিন্তু তাঁর জীবন মানুষকে থামিয়ে দিয়েছিল।

তাঁর যুক্তি মানুষকে ভাবিয়েছিল, কিন্তু তাঁর ত্যাগ মানুষকে নত করেছিল।

তাঁর বেদান্ত মানুষকে জ্ঞান দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর চরিত্র সেই জ্ঞানকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।

ক্রমে মানুষের ভিড় বাড়তে লাগল। কৌতূহল থেকে শ্রদ্ধা, শ্রদ্ধা থেকে বিশ্বাস, আর বিশ্বাস থেকে এক গভীর আকর্ষণ।

একজন ভারতীয় সন্ন্যাসী তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল ভারতের কোনো প্রাচীন দর্শনের কথা বলছিলেন না। তিনি যেন তাঁদের সামনে অন্য একটি জীবনের সম্ভাবনা খুলে দিচ্ছিলেন—যেখানে মানুষ ভোগের দাস নয়, ভয়-এর দাস নয়, নিজের ক্ষুদ্রতার দাস নয়।

যেখানে মানুষ নিজের ভিতরের শক্তিকে চিনতে পারে।

যেখানে ধর্ম কেবল মন্দিরে থাকে না, দর্শন কেবল পুঁথিতে থাকে না, আর বেদান্ত কেবল অরণ্যের নির্জন কুটিরে বসে শোনা কোনো দুর্বোধ্য মন্ত্র নয়।

বেদান্ত মানুষের জীবনে নামে।

ঘরের ভিতরে, কর্মক্ষেত্রে , দুঃখের মধ্যে , ভয়ের মধ্যে নামে। পরাজয়ের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ায়।  আর তখনই স্বামীজীর কর্মের প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি কেবল ভারতীয় দর্শনকে পশ্চিমে নিয়ে যাননি; তিনি ভারতীয় দর্শনের ভিতরের মানুষটিকে পশ্চিমের মানুষের সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন।

আর সেই মানুষটির পরিচয় ছিল—
নির্ভয়, সংযমী, কর্মী এবং ত্যাগী।

কিন্তু এটুকু ইতিহাস ইতিমধ্যেই জানে—

একজন বত্রিশ বছরের সন্ন্যাসী পৃথিবীর কাছে এসে শুধু একটি দর্শনের কথা বলেননি; তিনি মানুষকে তার নিজের ভিতরের অসীমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।

আর সেই স্মরণই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বিশ্বজয়।

চলবে -

লেখনীতে -রবীন মজুমদার 
তারিখ ২৩/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 
২১৭

শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৭ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩০)

  ৪৩৭ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(৩০)


১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে শিষ্যদের উদ্দেশ্য পাঠানো পত্রের  ভাবার্থের অনুসরণে- 

১৮৮৫ সাল। চিঠিটির তারিখ ও স্থান সেখানে উল্লেখিত নেই। শুধু কয়েকটি কথা, কয়েকটি ভাব, যেন সময়ের স্রোত পেরিয়ে এসে আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। কথাগুলি পড়তে পড়তে মনে হওয়া স্বাভাবিক—একজন মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁর সবচেয়ে বড় উপস্থিতি কি তাঁর নামের মধ্যে থাকে, না তাঁর তৈরি করে যাওয়া মানুষগুলির মধ্যে?

প্রশ্নটা সহজ নয়।

কারণ মানুষ চলে যাওয়া মানে অস্তিত্বের অস্তিত্বহীনতা মাত্র। তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত থাকে।  স্বামীজী যেন সেই জায়গাটাতেই হাত রেখেছিলেন।

আদর্শ যদি একটি পতাকা হয়, তবে তাকে শুধু নেতার হাতে থাকলে চলবে কেন? নেতা তো চিরকাল থাকবেন না। একদিন তাঁকে চলে যেতেই হবে। তখন পতাকাটি কে বহন করবে? সেই উত্তরাধিকার যদি আগে থেকে মানুষের ভিতরে তৈরি না হয়, তবে পতাকা একসময় কেবল কাপড় হয়ে যায়—দণ্ড থাকে, রং থাকে, কিন্তু তার মধ্যে আর কোনো হাওয়া থাকে না।

স্বামীজীর চিন্তার ভিতরে তাই একটা অদ্ভুত তাড়া ছিল—মানুষ চাই। শুধু ভক্ত নয়, মানুষ। শুধু অনুসারী নয়, মানুষ।

শুধু তাঁর নাম উচ্চারণ করবে এমন মানুষ নয়—তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে বহন করতে পারবে এমন মানুষ।

 মস্ত কঠিন কাজ এই মানুষ তৈরি।  একটি মন্দির বানানো যায়, একটি প্রতিষ্ঠান গড়া যায়, কিন্তু মনোমন্দির তৈয়ারি সহজে হয় না। 

অন্তরে অন্তর মিলালে তার অন্তরের পরিচয়। কোথায় তার দুর্বলতা তাকে চিনতে হয়।  জীবন থাকবে, কিন্তু জীবনের গ্লানি থাকবে না।

সুখ আসবে, কিন্তু সুখ তোমাকে উন্মত্ত করবে না। দুঃখ আসবে, কিন্তু দুঃখ তোমাকে ভেঙে ফেলবে না। আনন্দ আসবে, কিন্তু আনন্দে তুমি নিজের অস্তিত্ব হারাবে না। তৃষ্ণা আসবে, কিন্তু তৃষ্ণা তোমাকে তার দাস বানাতে পারবে না।

তখনই হয়তো মানুষ প্রথমবার বুঝতে পারে—মুক্তি মানে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। মুক্তি মানে জীবনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে জীবনকে অতিক্রম করা। ভারতীয় দর্শন যার নাম দিয়েছে—জীবন্মুক্তি।

জীবন আছে, অথচ সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। সংসার আছে, অথচ সংসার জীবনের সাথে অন্তরের সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে না। 

কিন্তু আশ্চর্যের কথা, শিষ্য হওয়া যত সহজ, শিষ্যত্ব পালন করা তত সহজ নয়। গুরুর নাম, গুরুর ছবি, গুরুর জন্মদিন পালন করা সহজ। কঠিন হল গুরুর আদর্শের সাথে নিজের জীবনের পথে তাকে পাথেয় করা। সংযোগ সেখানে বহু শিষ্যেরই কেটে যায়। 
গুরুর পথ অনুসরণ করার বদলে তারা গুরুর নাম অনুসরণ করতে শুরু করে। পরোপকারের জায়গায় এসে বসে আত্মপ্রচার। গুরুর সঙ্গে নিজের নামটিকে পাশাপাশি রাখার এক অদ্ভুত বাসনা জন্ম নেয়।
“আমি তাঁর শিষ্য।” 
তারপর ধীরে ধীরে—“আমিই তাঁর প্রকৃত শিষ্য।
”তারপর—“আমাদের পথই তাঁর একমাত্র পথ।
”তারপর আর-একটু পরে—“অন্যরা ভুল।”
সেখান থেকেই শুরু হয় বিভাজন।
প্রচার আর সেবার মধ্যে গড়ে উঠে বিস্তর ফারাক; সেখান থেকে মাথা চারা দেয় এক ধরনের লালসা। আলোটা যেন কেবল নিজের মুখেই পড়ে। আর কেউ যদি সেই আলোয় এসে দাঁড়ায়, মনে হয় নিজের জায়গাটা বুঝি কমে গেল।
অথচ সত্যিকারের আলো কখনও ভাগ করলে কমে না। একটি প্রদীপ আর-একটি প্রদীপ জ্বালালে প্রথম প্রদীপটির আলো তো নিভে যায় না।
স্বামীজীর শিক্ষার সবচেয়ে বড় জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন—গুরুকে নিজের সম্পত্তি কোরো না। আদর্শকে নিজের দলের মধ্যে বন্দি কোরো না। যে সত্য মানুষকে মুক্ত করতে পারে, তাকে চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখলে সত্যও একদিন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়।
কূপের ব্যাঙ সমুদ্রকে অস্বীকার করে কারণ সে সমুদ্র দেখেনি। মানুষও তেমনই।
নিজের ছোট্ট গণ্ডিটাকেই যদি সে পৃথিবী বলে মনে করে, তবে বৃহত্তর সত্য তার কাছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এই কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে স্বামীজীর অস্ত্র ছিল—সেবা। মানুষের কাছে যাও। তার সুখ-দুঃখের, তার ক্ষুধার যন্ত্রণাকে উপলদ্ধি কর। তার শিক্ষার অস্পুর্ণতাকে ভরিয়ে দাও। তার মান-অপমানের সমব্যাথী হও। তবেই তো মন্দির হয়ে উঠবে ধর্মের পীঠস্থান নচেৎ পুরোটাই ফাঁকা। 

স্বামীজীর কাছে ধর্ম তাই খুব জটিল কোনো তত্ত্ব ছিল না। যে মানুষের দুঃখ অনুভব করতে পারে, যে দুঃখের কারণ বুঝতে চায়, যে অন্য মানুষকে সেই দুঃখ থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে—ধর্ম তার মধ্যেই জীবন্ত। বাকি সব? অন্তঃসার শূন্য কতগুলি ফাঁকা বুলি মাত্র। 

তাই শিক্ষা মানে কেবল জ্ঞান দেওয়া নয়। শিক্ষা মানে মানুষের ভিতর থেকে ভয়টাকে সরিয়ে দেওয়া।

স্বামীজী যখন পাশ্চাত্যের মানুষের কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর চোখে হয়তো এই শক্তিটিই ধরা পড়েছিল। কাজের সময় তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অহংকারকে সরিয়ে রেখে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। একজন নেতৃত্ব দেয়, অন্যরা সেই নেতৃত্বকে কাজে পরিণত করে। ব্যক্তিগত স্বার্থ তখন বৃহত্তর কাজের সামনে ছোট হয়ে যায়। সেই জন্যই তারা বড়।

কিন্তু অর্থের প্রশ্নে আবার তাদের মধ্যে অন্য এক মানুষকে দেখা যায়। অর্থের জায়গায় তারা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। সেখানে উদারতার দরজা অনেক সময় বন্ধ থাকে। অর্থাৎ কোনো মানুষই সম্পূর্ণ নয়। কোনো জাতিই সম্পূর্ণ নয়। কোনো সভ্যতাই সম্পূর্ণ নয়।

শিক্ষার কাজ হল—যেখানে শক্তি আছে, তা গ্রহণ করা; যেখানে দুর্বলতা আছে, তা অতিক্রম করা। আর সেই শিক্ষার শেষ ফল কী? লোকশিক্ষা। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া জিনিস মানুষকেই ফিরিয়ে দেওয়া।

একজন মানুষ যতটুকু শিখেছে, যতটুকু পেয়েছে, তার সবটাই তো তার নিজের নয়। তার মধ্যে মিশে আছে সমাজের শ্রম, পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা, শিক্ষকের জ্ঞান, অগণিত মানুষের অদৃশ্য অবদান।

একমুঠো অন্নের পিছনে অনেক মানুষের অবদান আছে। সেটা একা গ্রহণ করলে চলবে না, তাহলে এতো মানুষের কাছে তুমি  ঋণ মুক্ত হতে পারবে না। আর এই ঋণ শোধ করার নামই লোকশিক্ষা।  

আর এখানেই শিক্ষকেরও পরীক্ষা।

শিক্ষকের কাপড় পরলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কয়েকটি বড় বড় কথা বললেই মানুষ শিক্ষিত হয় না। যে শিক্ষা মানুষের ভিতরে সাহস জাগাতে পারে না, যে শিক্ষা তাকে অন্যের দুঃখের দিকে তাকাতে শেখায় না, যে শিক্ষা তাকে নিজের সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে যেতে পারে না—সে শিক্ষা কেবল শব্দের অলঙ্কার।

শিক্ষক তখন শিক্ষক নন। তিনি কেবল শব্দের ব্যবসায়ী। মানুষকে নিজের দিকে টেনে নিও না, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখাও। গুরুর ছায়ায় সারাজীবন বসে থাকা শিষ্য নয়। গুরুর আলো নিজের মধ্যে নিয়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষ চাই।

কারণ গুরু যদি সত্যিই গুরু হন, তবে তিনি নিজের ভক্তের সংখ্যা বাড়াতে চান না; তিনি চান তাঁর পরে আরও কিছু স্বাধীন মানুষ জন্ম নিক। সেই মানুষরা হয়তো তাঁর নামও নেবে না। তাঁর ছবি ঘরে রাখবে না। তাঁর নামে কোনো মিছিলেও হাঁটবে না। কিন্তু একদিন কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কোনো ভীত মানুষের কাঁধে হাত রাখবে। কোনো হতাশ মানুষকে বলবে—“ভয় পেয়ো না।”কোনো অশিক্ষিত শিশুর হাতে বই তুলে দেবে। কোনো অপমানিত মানুষকে তার নিজের মর্যাদা ফিরে পেতে সাহায্য করবে।

সেদিন হয়তো স্বামীজী কোথাও থাকবেন না—কিন্তু তাঁর শিক্ষা থাকবে। তাঁর নাম উচ্চারিত হবে না—কিন্তু তাঁর আদর্শ কাজ করবে। তাঁর পতাকা দেখা যাবে না—কিন্তু তার হাওয়া মানুষের জীবনের ভিতর দিয়ে বয়ে যাবে। সেই তো সত্যিকারের উত্তরাধিকার। পতাকা নয়—পতাকা বহন করার মতো মানুষ। 

আর মানুষ চাই , যে জীবনের মধ্যেই থেকেও জীবনের দাস নয়। যে নিজের মুক্তির সঙ্গে অন্যের মুক্তিকেও এক করে দেখতে শেখে। যে গুরুর নামকে নয়, গুরুর আদর্শকে  বাঁচিয়ে রাখে।

সম্ভবত এই মানুষটির সন্ধানেই স্বামীজীর সমস্ত সাধনা।

চলবে -

লেখনীতে -রবীন মজুমদার 
তারিখ ২২/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 
২১৫

বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

 ৪৩৬ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৯ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

  মানব মনের বৈচিত্রতা ও  সমাজে তার বাস্তব প্রতিফলনের  এক অদ্ভুত ককটেল এই মহাভারত। মহাভারতে দেখি যে দেবতারা  বেদে ভূমিষ্ঠ হলো, তারা এখানে এসে প্রতিষ্ঠা পেলো। এটাও দেবতাদের বিবর্তনের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না। কাব্য কখনো  কখনো বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, কেননা কল্পনা কবির  কাব্য রচনার রসদ। তাই দেখি অস্ত্রের আধুনিকতা সময়কে  ছাপিয়ে গেছে, জন্ম তো জৈবিক নিয়মের ধার ধারেনি, অবশ্য অধিকাংশ রূপকে মোড়া , যত্রতত্র অলৌকিকতার হাতছানি  কিন্তু মহাজাগতিক দর্শন মহাভারতকে দীর্ঘজীবন দিয়েছে। তাইতো, একটা রাজনৈতিক সংঘাত সবকিছুকে ছাপিয়ে একটি নৈতিক মহাকাব্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  

১৯ তম  পর্বের শুরু - 

“যাই বলো ভাই, মহাভারতের অন্তস্থলে প্রবেশের দরজাটা সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু একবার ভিতরে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে বেরোনোর রাস্তাটা যেন আর খুঁজেই পাওয়া যায় না।”

মধুছন্দার কথাটা শুনে বিভাস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “ঠিক বলেছ। কথাটা আমার বেশ মনে ধরেছে।”

দার্জিলিংয়ে এসে অন্যেরা পাহাড় দেখে, মেঘ দেখে, কাঞ্চনজঙ্ঘার রং বদলানো দেখে। আর এরা এক অদ্ভুত দল—পাহাড়ের সৌন্দর্য চোখের সামনে রেখেও মহাভারতের পাতায় মুখ গুঁজে বসে আছে। কেউ দর্শন খুঁজছে, কেউ ইতিহাস, কেউ রাজনীতি, কেউ মানুষের মন। যেন পাহাড়ের চেয়েও বড় কোনও পর্বত তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—তার নাম মহাভারত।

দর্শনের অধ্যাপক বিভাস। ফলে পৃথিবীর দিকে তাঁর তাকানোর ভঙ্গিতেও দর্শনের ছায়া পড়বেই।

তিনি বললেন, “আসলে ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। মহাভারতে আমরা যখন প্রথম প্রবেশ করি, তখন আমরা জাগ্রত থাকি। গল্প শুনি, চরিত্র দেখি, যুদ্ধ দেখি, রাজনীতি বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু সময় যত এগোয়, আমরা ধীরে ধীরে জাগ্রত অবস্থা থেকে স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়ি। জতুগৃহের আগুন থেকে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গন পর্যন্ত ঘটনাগুলি তখন আর বাইরের ইতিহাস থাকে না—আমাদের নিজেদের মনের ভিতরে তারা একের পর এক দৃশ্য হয়ে উঠতে থাকে।

“জতুগৃহের আগুন যেন আমাদের ভিতরের ভয়কে জ্বালিয়ে দেয়। দ্রৌপদীর অপমান আমাদের বিবেকের দরজায় এসে ধাক্কা দেয়। পাশাখেলার শব্দে আমরা নিজেদের দুর্বলতার শব্দ শুনতে পাই। আর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ? সে তো আমাদের মনের ভিতরেই প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শুরু হয়ে যায়।

“তারপর আসে সুষুপ্তি। গভীর নিদ্রার মতো মহাভারত তখন আমাদের চেতনার ভিতরে স্থির হয়ে থাকে। আমরা আর মহাভারত পড়ি না—মহাভারত আমাদের ভিতরে পড়তে থাকে।

“মানুষের জীবনে কত কথা বলা হয় না, কত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায় না, কত অপরাধের বিচার হয় না, কত ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি পায় না—মহাভারতের কুশীলবরা সেই সমস্ত না-বলা কথাগুলিকে এমন জীবন্ত করে তুলেছে যে, একসময় মনে হয়, এরা আর কেউ নয়—এরা আমরাই।

“তাই তো মহাভারত থেকে মন সরে যেতে চায় না।”

লাবণ্য এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার বলল, “আপনি ঠিক বলেছেন বিভাসদা। আমার মনে হয়, মহাভারতকে আত্মস্থ করার পর একটা অদ্ভুত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। আমরা ঘটনা-প্রবাহে ভাসতে ভাসতে কখন যেন হস্তিনাপুরের রাজসভায় গিয়ে বসি। রাজসভার কোনও এক কোণে, বিধানসভার গ্যালারির মতো জায়গায় বসে দেখি—একজন নারীর অপমান হচ্ছে, আর চারদিকে জ্ঞানী, ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী পুরুষেরা নীরব।

“তখন দ্রৌপদী আর শুধু দ্রৌপদী থাকেন না। তাঁর মধ্যে আমরা আমাদের সময়ের অপমানিত নারীদের মুখ দেখতে পাই। বিলকিস বানু, কামদুনি, হাঁসখালি কিংবা আর জি কর—নামগুলি আলাদা, সময় আলাদা, পরিস্থিতি আলাদা; কিন্তু কোথাও যেন সেই একই রাজসভা ফিরে আসে। প্রশ্নটা একই—অন্যায় যখন চোখের সামনে ঘটে, তখন ক্ষমতাবানদের নীরবতার অর্থ কী?

“ভীষ্মের নীরবতা তখন আমাদের অস্বস্তি দেয়। দ্রোণের নীরবতা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। কারণ জ্ঞান যদি অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব হয়ে যায়, তবে সেই জ্ঞানের মূল্য কোথায়?

“আবার পাণ্ডব-কৌরবের রাজনৈতিক সমীকরণ দেখতে দেখতে মনে হয়, ক্ষমতা বোধহয় যুগ বদলালেও তার স্বভাব খুব বেশি বদলায় না। ক্ষমতাসীনরা বিরোধীকে কতটা জায়গা দেবে, কে কথা বলবে, কে চুপ থাকবে, কার কণ্ঠ সভায় পৌঁছবে—এই হিসাব হস্তিনাপুরেও ছিল, আজও আছে।

“আর হিড়িম্বার কথা ভাবলে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে। রাজপরিবারের সামাজিক পরিসরের বাইরে থাকা এক বনবাসী নারীকে ভীমের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা—এটিও তো মহাভারতের ভিতরের এক আশ্চর্য সামাজিক সীমানা অতিক্রম। অর্থাৎ মহাভারত একদিকে সামাজিক বিধিনিষেধকে দেখিয়েছে, অন্যদিকে সেই বিধিনিষেধ ভাঙার সম্ভাবনাও তার ভিতরেই রেখে দিয়েছে।

“সারা পৃথিবীর ইতিহাসে রাজধর্ম পালনের ব্যর্থতা থেকেই তো কত কুরুক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের ভয়াবহতা যখন মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে, তখন সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আবার জন্ম নিয়েছে অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধের নৈতিক শক্তি।

“এই তালিকার বোধহয় কোনও শেষ নেই।”

বিভাস এবার একটু হেসে বলল, “সেই জন্যই মহাভারত শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের চরিত্রের এক বিশাল পরীক্ষাগার।”

সে একটু থামল।

“দ্রোণের কথাই ধরো। তিনি জ্ঞানী, প্রতিভাবান, অস্ত্রশিক্ষায় অতুলনীয়। কিন্তু জ্ঞান যখন মানুষের মুক্তির পরিবর্তে ক্ষমতার সেবায় ব্যবহৃত হয়, তখন সেই জ্ঞানই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যে জ্ঞান সমাজের কোনও কাজে আসে না, অথচ জ্ঞানী মানুষটি নিজের বুদ্ধিকে নৈতিক সাহসের পরিবর্তে স্বার্থ ও পক্ষপাতের কাজে ব্যবহার করেন—দ্রোণ সেই চরিত্রের এক গভীর প্রতীক।”

লাবণ্য বলল, “আর যুধিষ্ঠির?”

“যুধিষ্ঠির আরও জটিল। সত্যবাদিতা তাঁকে মহান করেছে, কিন্তু সত্যের প্রতি আনুগত্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস—দুটো সবসময় এক জিনিস নয়। তিনি সত্য জানতেন, ন্যায় বুঝতেন, কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে তাঁর সেই নৈতিক সাহস বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন—কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া আর সাহসী মানুষ হওয়া যে এক কথা নয়, যুধিষ্ঠির আমাদের সেই অস্বস্তিকর সত্যটি শেখান।” এটা আজ থেকে ১৫ বছর আগেকার পশ্চিমবঙ্গের চেহারার মতো। 

“দুর্যোধন?” লাবণ্য জানতে চাইল।

বিভাস বলল, “দুর্যোধনের মধ্যে অন্যরকম এক বিপজ্জনক শক্তি ছিল। তিনি জানতেন যে তিনি অন্যায় করছেন। তাঁর সমস্যাটি অজ্ঞতা নয়—আত্মসংযমের অভাব। অন্যায় বুঝেও নিজেকে থামাতে তিনি রাজি নন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সাহসের অভাব ছিল না। অর্থাৎ যে সাহস ন্যায়ের কাজে লাগলে মহৎ হতে পারত, আত্মসংযমের অভাবে সেই সাহসই ধ্বংসের অস্ত্র হয়ে উঠল।”

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল।

দূরে পাহাড়ের গায়ে তখন সন্ধ্যা নামছে।

বিভাস ধীরে ধীরে বলল, “এইখানেই মহাভারতের সবচেয়ে বড় জটিলতা। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা সবসময় সাদা-কালো নয়। অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রয়োজন, বৃহত্তর বিপর্যয় ঠেকানো এবং মানুষের ভবিষ্যৎ—এই সমস্ত কিছু এসে ন্যায়ের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করে।

“শ্রীকৃষ্ণ সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ন্যায়ের পক্ষে, কিন্তু ন্যায়কে কোনও জড় বিধি হিসেবে দেখেন না। তিনি জানেন, কখনও কখনও অন্যায়কে ঠেকাতে প্রচলিত নীতির সীমারেখা অতিক্রম করতেও হয়। আর সেই কারণেই কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কুরুক্ষেত্রে নয়—নিজের ভিতরে।

“কারণ প্রয়োজনকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর নিজের নৈতিক সত্তারও একটা সংঘর্ষ ঘটে। এই দ্বন্দ্বই কৃষ্ণকে সহজ নায়ক হতে দেয় না; তাঁকে করে তোলে এক গভীর নৈতিক দার্শনিক।”

মধুছন্দা এতক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। পাহাড়ের গায়ে শেষ আলোটুকু তখন নিভে আসছে।

সে হঠাৎ বলল, “তাহলে কি মহাভারত থেকে সত্যিই বেরোনোর রাস্তা নেই?”

বিভাস এবার আর হাসল না।

“হয়তো নেই। কারণ আমরা মহাভারত থেকে বেরোতে চাই বলেই বেরোতে পারি না। আমরা যখন ভাবি, মহাভারত অতীতের কাহিনি, তখনই সে আমাদের বর্তমানের আয়না হয়ে সামনে দাঁড়ায়। রাজসভা বদলায়, পোশাক বদলায়, ভাষা বদলায়, রাজনীতির পদ্ধতি বদলায়—কিন্তু মানুষের লোভ, ভয়, ভালোবাসা, ঈর্ষা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, নৈতিক দ্বিধা—এসব খুব বেশি বদলায় না।

“তাই মহাভারত শেষ পর্যন্ত হস্তিনাপুরের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের নিজের ভিতরের হস্তিনাপুর।

“আর সেই কারণেই তার প্রবেশদ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু বেরোনোর পথটি কেউ খুঁজে পায় না।”

বাইরে তখন পাহাড় অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

কিন্তু মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।

 ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
 ২০/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৮ তম পর্ব )

 ৪৩৫ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৮ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

  এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শন, মহাভারত এর উত্তর দিয়ে  গেছে। সময়ের গভীর রায় যদি বলা হয় - 'তুমি কতদিন বেঁচে ছিলে  তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তুমি তোমার সময়কে কি দিয়েছিলে - সেটাই শেষ প্রশ্ন। "

১৮ তম  পর্বের শুরু - 

একটা বিরাট আকারে নরেনের হাই তোলার শব্দে, আলোচনার মোড় ঘুরে গিয়ে ঘড়ির কাটার উপর গিয়ে পড়লো। মধুছন্দা বলল - রাত-তো অনেক হয়েছে এবার রাতের খাওয়ার পালাটা সেরে  ফেলা দরকার। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঠান্ডাটাও বেশ বাড়ছে , ঘরের রুম হিটারগুলি চালিয়ে দিলে ভালো হয়।  আবার লামা ফ্যামিলিও জেগে আছে, সুতরাং কালবিলম্ব না করে ইন্টারকমে রাতের খাবার পাঠিয়ে দেবার অনুরোধ করলো। 

লাবণ্য বলল - দার্জিলিঙে প্রথম যে দিন আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল , তার পিছনে কারণ ছিল ইতিহাসের বিশুদ্ধতা খোঁজার চেষ্টা করা। আর যে কথাটা প্রচলিত আছে যে শাসক থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বহু সময় বেশ কিছু ঘটনাকে সংযোজিত করেছে, আবার কখনো উহ্য রাখার চেষ্টা করেছে - তাকে অনুসন্ধান করা। সেখানে ইতিহাস প্রেমীদের  ভূমিকা কি হওয়া উচিত। অবশ্য নিজেদের মতো করে  ইতিহাসকে সাজিয়ে গুছানোর প্রচেষ্টা  আজকের নয়, তারও একটা দীর্ঘ ধারাবাহিকতা  আছে। 

আমি শুনেছি পুনেতে ভান্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে মহাভারতের ১২৫৯টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে একটা প্রামানিক গ্রন্থ তৈরি করেছিল।  তার সাথে কোথায় কোথায় মূল ঘটনার সাথে অমিল আছে। এই যে পার্থক্য থাকার নিশ্চয় কিছু কারণ আছে এবং তার ব্যাখ্যা থাকাটাও স্বাভাবিক - সেটাই জানতে চাই। আবার ঋগ্বেদের উপর University of Texas-এ বেশ কিছু কাজ হয়েছে, তার বিষয়বস্তুটা  জানতে চাই। 

লাবন্যর এই গভীর জিজ্ঞাসাটা ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক প্রশান্তর  ভীষণ ভালো লাগলো। এই প্রশ্নের মধ্যে এক দার্শনিকসুলভ বুদ্ধিদীপ্ত  ভাবনা আছে সেটা প্রশান্তকে স্পর্শ করলো। 

আজকে ইতিহাসের বিশুদ্ধতাকে নিয়ে মানুষ বহু প্রশ্ন করে, এই প্রশ্নের  সঠিক উত্তর খোঁজবার প্রয়াস আধুনিক কালে সারা বিশ্ব জুড়ে  কাজ চলছে। 

আজ ইতিহাসের সাথে অনুসন্ধান কথাটা জুড়ে গেছে। তাই ইতিহাসের পাঠকের মন তৃপ্ত হয়না শুধু অতীতের কথা শুনতে। তাই  তারা জানতে চায়, এ কথা স্বীকার্য যে আজকের মতো সেদিন ঘটনা পরম্পরাকে  ধরে রাখার মাধ্যমের বড়োই অভাব ছিল।  তাই স্বাভাবিক  ভাবে অতীতকে কি ভাবে মনে রাখা হতো সেটা তো জিজ্ঞাস্য  থাকবেই। আর ঐতিহাসিকদেরও পৌঁছে দিতে হবে আগামীর  কাছে  সেই প্রামাণ্য অতীতের দলিলকে। 

ইতিহাসকে সংরক্ষণের প্রশ্নে ভারতবর্ষ এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।  ভারতের অতীতকে কখনো বেদের, উপনিষদের অন্তরে, রামায়নের গল্পে, মহাভারতের বিপুল ঐশর্য্যে, পূরণের পলে পলে আর শিলালিপি, মুদ্রা ও ধর্মীয় সাহিত্যতে শোভা পাচ্ছে। এই  উপাদানগুলিই  ইতিহাসের বিকল্প হিসাবে পরিচিত ছিল।   

এই জগাখিচুড়ির থেকে চাল আর ডালকে আলাদা করা এক ধৈর্য  এবং পরিশ্রম সাধ্য কাজ ছিল। এই মিশ্রণটি ছিল শুদ্ধতা  হারাবার প্রথম পদক্ষেপ। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল কাব্যিক মাধুর্য্য  মিশ্রিত অতিরঞ্জনের আধিক্য, কখন ধর্মীয় ভাবাবেগ, রাজশক্তির  আবদার, কখন ঔপনিবেশিকদের তাড়না আর আধুনিক  রাজনৈতিক দলগুলির  স্বর্থসিদ্ধির প্রয়াস।  

ঋগ্বেদ ছিল এক শক্তিশালী প্রাচীন সাহিত্যের দলিল বললে ভুল হবেনা। কিন্তু সেটিকে ইতিহাস বলে ভাবলে ভুল হবে। ধর্মের  এমনিই বাতুলতা, যেখানে রাজায় রাজায় যুদ্ধকে অবশেষে  ধর্মের জয় বলে মেনে নিতে হতো। যুদ্ধ ক্ষেত্রে ব্যক্তি রাজার সাফল্য গৌণ হয়ে যেত দেবতার আনুকূল্যের প্রাধান্যে। এই প্রক্রিয়ায় যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, দেবত্ব ও পৌরাণিক স্মৃতি ভারতীয় ইতিহাস চেতনার উপর একটা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। 

কালস্রোতে ভেসে যায় সেদিনের কাহিনীর সত্যতা, তার বদলে বেশ  কয়েক শতাব্দী পরে মানুষ সেই ধর্মীয় কাহিনীকেই ঐতিহাসিক  দলিল বলে গ্রহণ করে। সাহিত্য উৎস হতে পারে, কিন্তু সে  কখনো ইতিহাস হয়ে উঠতে পারেনা। মনে রাখা প্রয়োজন, তখন কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টির প্রকাশ মাধ্যম শ্রুতির মাধ্যমে  প্রসারিত হতো। 

ইতিমধ্যে মানুষ ধীরে ধীরে নগর পত্তন করতে শিখেছে, (যদিও হরপ্পার  ভগ্নাবশের মধ্যে উন্নত নগরীর সন্ধান পাওয়া যায়) বেদের  মধ্যে মানুষ চিন্তা ভাবনার রসদের সাথে নৈতিকতার সংজ্ঞা  খুঁজে পেয়েছে আবার একই সাথে সমাজে নৈতিকতার অভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে, প্রয়োজন হয়েছে ধর্মকে সুরক্ষিত করার তাই এসব ধারার সংমিশ্রনে তৈরি হয়েছে আগামীকে পথ দেখানোর জন্য বাস্তবের পটভূমিতে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে  রচিত  রামায়ণ ও মহাভারতের  মতো মহাকাব্য। 

মানব মনের বৈচিত্রতা ও  সমাজে তার বাস্তব প্রতিফলনের  এক অদ্ভুত ককটেল এই মহাভারত। মহাভারতে দেখি যে দেবতারা  বেদে ভূমিষ্ঠ হলো, তারা এখানে এসে প্রতিষ্ঠা পেলো। এটাও দেবতাদের বিবর্তনের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না। কাব্য কখনো  কখনো বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, কেননা কল্পনা কবির  কাব্য রচনার রসদ। তাই দেখি অস্ত্রের আধুনিকতা সময়কে  ছাপিয়ে গেছে, জন্ম তো জৈবিক নিয়মের ধার ধারেনি, অবশ্য অধিকাংশ রূপকে মোড়া , যত্রতত্র অলৌকিকতার হাতছানি  কিন্তু মহাজাগতিক দর্শন মহাভারতকে দীর্ঘজীবন দিয়েছে। তাইতো, একটা রাজনৈতিক সংঘাত সবকিছুকে ছাপিয়ে একটি নৈতিক মহাকাব্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  

 ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৮/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৪ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৭ তম পর্ব )

 ৪৩৪ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৭ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

  প্রতিজ্ঞার মধ্যে বাস্তবতা কম অন্ধত্ব বেশি আর অন্ধত্ব পারিপার্শিকতাকে বিশ্লেষেণ করে  সিদ্ধান্ত নেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। 

১৭তম  পর্বের শুরু - 

কেউ ইতিহাসের আবার কেউ বা দর্শন নিয়ে আজীবন চর্চা করে আসছো। আমাকে তোমরা বলো, এই যে মহাভারত থেকে মাঝে মাঝে "সময়" কথাটা উচ্চারিত হয়, আসলে  তার স্বরূপটা কি ? - নরেন প্রশ্নটা  যেন হাউসের দিকে ছুড়ে দিল।

ইতিহাসের অধ্যাপিকা ও গবেষক মধুছন্দা প্রশ্নটা যেন লুপে নিলো  -  'সময়'কে অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দিয়ে সীমারেখা টানার চেষ্টা করা হলে সেটা ব্যর্থ হবে কেননা তার ব্যাপ্তি  বিশ্বজনীন।  সব ধরণের পার্থিব ও অপার্থিব  বিষয়ে যার নিরন্তর যাতায়াত তাকে তো কোন  সীমিত পরিসরে বেঁধে রাখে কার সাধ্য।   

নরেন দা, প্রশ্নটা সময়ের স্বরূপ হবে না বরং প্রশ্নটা যদি এমন হতো -"সময় কি বাস্তব, না মানুষ তার চেতনা দিয়ে নির্মাণ করেছে ?"

-আমি যদি বলি, মানুষ যখন কোন শব্দকে ব্যবহার করে তার পিছনে  থাকে বিশেষ কিছু অবস্থাকে উপলদ্ধির জন্য, যেটা এখানে'পরিবর্তন'কে ইঙ্গিত করছে। আরেকটা মজার জিনিস হল  অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের আলাদা আলাদা অস্তিত্ব আছে কি ?  যদি না থাকে, তবে কি তারা  একই সময়ের বিভিন্ন উপলদ্ধি হিসাবে চিহ্নিত ? 

সময়ের এগিয়ে যাওয়াটা সরলরেখার মতো না সে আবার চক্রকারে ফিরে আসে ?

বস্তু জগতে সৃষ্টি থেকে লয়ের যাত্রা, আবার সৃষ্টি আবার লয় - আদি অনন্ত কাল ধরে প্রকৃতির জয়যাত্রার কোনো বিরাম নেই। এই যে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটগুলি সহজ সরল ভাবে সময় চিহ্নিত  করে দেয়। 

মানব মনে প্রশ্ন নাড়া দেয় - পরিবর্তন কি সময়ের কারণে ঘটে, নাকি পরিবর্তনকে  মাপার জন্যিই মানুষ সময়ের ধারণা তৈরি করেছে  ?  

অর্থাৎ সময় ও পরিবর্তনের সম্পর্ক হলো দর্শনের একটা মৌলিক প্রশ্ন। 

অস্তিত্বের বিশেষ অবস্থান নির্ণয় করে সময়। এর সাথে একটা প্রশ্ন  উদয় হয় -"আমি কে " - এই প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত প্রশ্ন -"আমি  কখন। " 

একদিন এক মানবশিশু এই পৃথিবীতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করল, সময়ের সাথে সে ধীরে ধীরে তার শৈশবকে পিছনে ফেলে  কৈশোরে গিয়ে উপস্থিত হল , তার চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছানোর  বিরতি নেই, অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত বার্ধক্যের  প্রান্তে  এসে উপস্থিত হল। সময়ের সব পাল্টালো, এই ভিন্ন ভিন্ন  সময়ের ছবি প্রত্যক্ষ করে সে ভাবলো -এরা সবাই কি "আমি"?

একসাথে মিলে গেলো ব্যক্তির সত্তা, অস্তিত্ব ও সময়। বিচার যদি  করতে হয়, তাহলে কাকে গ্রহণ করবো আর কাকে বাদ দেব ? সুতরাং সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। 

নরেন আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল - সময় কি বাইরে প্রবাহিত হয়, নাকি  মানুষের চেতনার মধ্যে ?

এবার এই প্রসঙ্গটা বিভাসের ভীষণ ভালো লাগলো। সে বলতে লাগলো - অতীত তো স্মৃতিতে বেঁচে থাকে আর সে তো অপরিবর্তনীয়।  অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গে যার মৃত্যু ঘন্টা বেজে  যায়  সেই তো বর্তমান। ভবিষ্যৎ -সে তো কল্পলোকের বাসিন্দা। 

এই বিশ্বে মজার ব্যাপার হচ্ছে , ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাই একদিন  মৃত্যুর পদতলে জীবনকে সমর্পিত করে কিন্তু এই বাস্তবতাকে কেউ মানতে চায় না। 

এবার লাবণ্য জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা বিভাস দা -"মৃত্যু না থাকলে কি  জীবনের অর্থ থাকতো ?"

বিভাস সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে বলল -  এই বিশ্ব সৃষ্টি ও লয়ের  খেলা। শুধু কি মানুষ ! সভ্যতারও বিকাশ আছে, আর বিকাশের  পিছন পিছন সংকট এসে হাজির হয় আবার এক সময়  তারও  পতন হয় আর সেই পতনের মধ্যে থেকে নতুন আর এক সভ্যতার  বিকাশ ঘটে।   

তাই সময়কে যদি বিচার করতে হয় , তাহলে, শুধু ব্যক্তিগত পরিসরে নয় তাকে ঐতিহাসিক পটভূমিতে নিয়ে আসতে হবে। 

সব কিছুর অন্তরালে কিংবা প্রকাশ্যে মানুষ ও তার নৈতিকতা। কেননা নীতি  নির্ধারণ মানুষই করে থাকে। আজ যে কর্মকে মনে হচ্ছে  এইটাই আদর্শ কাজ , কাল সেটা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে  বিচার করে বলবে - ওটা না হলেই ভালো হতো। 

যুগে যুগে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাবান ব্যাক্তিরা নীতি নির্ধারণ করে  এসেছেন। তাই অবধারিত ভাবে সেই প্রশ্নই উদিত হয় - নৈতিক সত্য কি চিরন্তন, না সেটা সময়ের সাথে সাথে নৈতিকতার  সংজ্ঞা পাল্টায়। এখানেই নৈতিকতা বনাম ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। 

যেখানে ক্ষমতাবানের অঙ্গুলিলেহনে, নৈতিকতার চরিত্র সংশোধিত  হয়, সেখানে ইতিহাস যে তাদের মতো করে লেখা হবেনা  তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি ? শুধু পরাজিতরা মনে করে পার্থক্যটা কোথায় ? যেখানে দৈনন্দিন সত্য সংগ্রহীত শাসকের অপছন্দসই সংবাদ  মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায় আর এরা  ইতিহাসকে যে  পাল্টে ফেলবে এ আর এমন কি। 

" সময় কি কেবল চলে যায়, নাকি চলতে চলতে মানুষ, সভ্যতা ও  ইতিহাসের উপর তার রায় লিখে যায় ?"

এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শন, মহাভারত এর উত্তর দিয়ে  গেছে। সময়ের গভীর রায় যদি বলা হয় - 'তুমি কতদিন বেঁচে ছিলে  তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তুমি তোমার সময়কে কি দিয়েছিলে - সেটাই শেষ প্রশ্ন। "

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৭/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম পর্ব )

৪৩৩ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৬ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

 এই জয় নিয়ে এলো এক অন্তহীন বৈরাগ্য আর অদ্বৈত দর্শনের গম্ভীর ভাবনার ইঙ্গিত।  তাইতো মহাভারত হাজার হাজার বছর  ধরে মানুষের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে হেটে চলেছে নৈতিকতা থেকে মানুষের অস্তিত্বের কথা নিয়ে, মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মানব মনের দ্বান্দ্বিকতার বৈশিষ্ট নিয়ে। এই অন্তহীন পথপরিক্রমা চলতেই থাকবে, সেটাই এই মহাকাব্যের  মাধুর্য্য।  

১৬তম  পর্বের শুরু -

সময়ের অনিন্দ বাঁশির সুরে বেজে ওঠা উদাত্ত কলতান কোটি কোটি মানব অন্তরে কখন মৃদু সুরে আবার কখন উচ্চগ্রামে সেই ঘুম ভাঙানির গান যুগের পর যুগ ধরে মহাভারত আমাদের শুনিয়ে আসছে। এই সুর আমাদের মননকে শুধু নাড়া দেয়নি, সে শুনিয়েছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেকার মানুষের ভাবনা ও  বাস্তবতার কাহিনী। 

পেঁয়াজের খোসার মতো প্রতি প্রলেপে লুকিয়ে আছে কোথাও তৎকালীন মানুষের সামাজিক ভাবনা, বিশ্বজনীনতার গল্প, যেখানে অব্যক্ত থেকে ব্যক্তর  পথের দ্বান্দ্বিকতা কিভাবে একটা চরিত্রের মধ্যে  প্রতিফলিত হয়েছে, তার প্রতিচ্ছবি। রাজনীতির কথা, ধর্ম ও নৈতিকতার সূক্ষ বিচার, সময়ের প্রয়োজনে ধর্মকে কি  ভাবে যুক্তি সাজিয়ে ব্যবহার করে হঠাৎ করে উদ্ভূত সংকটকে মোচন করতে হয়- তার প্রতিষেধক। মহাভারত চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়েছে, ধর্ম কোনো স্থবিরতায় আটকে থাকা অচল বস্তু নয়, বরং সে সময়ের সাথে এগিয়ে চলা এক গতিশীল ধারণা।   

মহাভারতে সরলীকরণের কোন স্থান নেই। যেমনটি স্বর্ণ নামক  ধাতুটি বহু ধাতুর সাথে একত্রিত বসবাস করে, তাকে পেতে হলে অন্য বস্তুর থেকে সযত্নে তাকে আলাদা করতে হবে, একটু কঠিন বৈকি। 

চরিত্র বিন্যাসে কি বৈচিত্রতা। যাকে মহাকাব্য মহান সাজিয়েছে, তার কাছ থেকে কি সযত্নে তার কথা বলার শক্তিকে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।  এর প্রকৃষ্ট উদহারণ হলো পিতামহ ভীষ্ম। কি অদ্ভুত ! একজনের দাঁতগুলি অসম্ভব সুন্দর, মহাভারত তাকে হাসতেই দিলো না, তাই কেউ দেখতেই  পেলো না তার দাঁতের সৌন্দর্যতা। 

এই নিয়ে শুরু হলো পাঠকের ভাবনা। নিরালায় বসে, পাঠক ভাবতে লাগলো ভীষ্মের কেন এমনটি হলো ? পাঠক ভাবছে -"আচ্ছা! দ্রৌপদীকে রাজসভায় কৌরবদের সভ্যতাবহির্ভূত আচরণের বিরুদ্ধে ভীষ্ম বয়োজোষ্ঠসূলভ আচরণের প্রদর্শন করতে পারতো , কিন্তু বাস্তবে করলো না।"  পাঠক মেলাতে শুরু করলো, আজকের নারী নির্যাতন ও নারী হত্যার  বিরুদ্ধে শাসকের মৌনতা বা কোন কোন ক্ষেত্রে আড়াল করা  কিংবা দিকে দিকে ঘটে যাওয়া ধর্মের নামে গনহত্যা ও গণধর্ষণ সংগঠিত হওয়ার  বিরুদ্ধে শাসকদের মৌনতা। শাসকের কাছে "কে আপন আর কেই বা পর" - এই সিদ্ধান্ত  নেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই  একপেশে ভাবনার এক পরম্পরার বাস্তব চিত্র। আবার শাসকের কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাও হতে পারে, সেখানে যেন তেন প্রকারে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই প্রাধান্য পায়।  আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হবার পরিবর্তে চুপ থাকাটা তৎকালীন শাসক   কৌরবদের পক্ষেই পাল্লাভারী ছিল, আজকেও শাসক ও শাসকপরিবারদের   তাই আছে। তাই এটাই প্রমাণিত ধর্মের পাল্লাটা বোধহয় নিয়ন্ত্রিত হয় শাসকের আঙ্গুলি লেহনে। সংবিধানের প্রস্তাবনা নীরবে  নিভৃতে কাঁদে।  

হাজার হাজার বছর ধরে শাসকের যেমন অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে মেরুদন্ড সোজা করে  শাস্তি দিতে যেমন অপরাগ, ঠিক তেমনি শাসকের পেয়াদাদের ভয়ে শাসিতও মেরুদন্ড  সোজা করে তেমনটি প্রতিবাদ করে না। তাই পরিবর্তনও ইতিহাসের বুকে কম দেখা যায়।  শাসকের কি হয়, জানিনা! কিন্তু অন্যায়কে অন্যায় বলে প্রতিবাদ  করতে না পেরে শাসিতর সেই  না বলা প্রতিবাদের আওয়াজটা নিজ অন্তর থেকে  না বের হতে পেরে সে অন্তঃস্থলে গিয়ে এক  রাসায়নিক বিকরণের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে  ধীরে ধীরে বিদীর্ন করে দেয় অন্তঃস্থলকে।  

এতক্ষন খুব মনোযোগ দিয়ে মধুছন্দা বিভাসের ব্যাখ্যাগুলি শুনে যাচ্ছিল। ভীষ্মের যে দিকটা বিভাস এখনো উল্লেখ করেনি, সেটা শোনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তখন সে বলল - বিভাস দা, ভীষ্ম যে রাজসভায় মুক হয়ে গেল, তার পিছনের কারণ ও বাধ্যবাধকতা কি ছিল সেটা উল্লেখ করো। রাজসভায় কার্য্যটা সবাই প্রত্যক্ষ করলো কিন্তু তার পিছনে কারণটা উল্লেখিত না হলে ব্যাখ্যাটা অসম্পূর্ন রয়ে যাবে।

 বিভাস সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে বলল - অবশ্যই। এটাতো সবাই জানে পিতা শান্তনুকে  দেওয়া তার প্রতিজ্ঞার কথা। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার প্রতি দায়বব্ধতা তো একটা মিসাইল কিন্তু তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমনিই অমনোনীয় সেখানে  ভালো-মন্দের অপেক্ষা করেনা। একবার ছুটে যাবার  পর তার গতিপথ রুখবে, সে কার সাধ্যি।  সে মানেনকো কোন নীতি। প্রতিজ্ঞাই দখল নিলো ধর্মের জায়গায়। ধর্মের কেন্দ্রীয় স্থানে বসে থাকা প্রতিজ্ঞা   দ্বারা পরিচালিত ভীষ্ম ধীরে ধীরে নীতির জায়গার সাথে নিজেকে মেলাতে পারলোনা- সেটাই তার চরিত্রের ট্রাজেডি। 

যে দিকটা মহাভারতে একটি দার্শনিক প্রশ্নের অবতারণা  করে সেটি হল -" প্রতিজ্ঞা কি নিজেই  ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারে, নাকি প্রতিজ্ঞার থেকে বড় হতে পারে  তার ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ "?

আমার মনে হয়, চৈতন্যের উপর প্রতিজ্ঞার প্রভাব বিস্তার বাস্তবে অচল। প্রতিজ্ঞা জড় অর্থাৎ সে পরিবর্তিত হতে পারে আর চেতন অপরিবর্তিত থাকে।  প্রতিজ্ঞার মধ্যে বাস্তবতা কম অন্ধত্ব বেশি আর অন্ধত্ব পারিপার্শিকতাকে বিশ্লেষেণ করে  সিদ্ধান্ত নেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। 

আপনাদের কি মনে হয় ?

ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
১৬/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

ujaan

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা

৪৩৯ মুকুলের ফিরে দেখা  মুকুল একান্ত অবহেলায় পালিত একটি আম গাছের চারা যে আগামীর স্বপ্নে বিভোর।  আমার এই "মুকুল" নামটা ওই মাতৃহারা প...