৩৮৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩)
৩৮৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩)
১৮৯৪ সালে শিষ্যকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে
ঊনবিংশ শতকের অন্তিম পর্বে ভারতবর্ষ ছিল বহুমাত্রিক সংকটে আবদ্ধ—রাজনৈতিক দাসত্ব, সামাজিক কুসংস্কার, জাতি-বর্ণের বিভাজন, নারীর অবমাননা এবং সর্বোপরি আত্মবিশ্বাসের গভীর অভাব। ১৮৯৪ সালে শিষ্যকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দের চিঠিগুলিতে আমরা যে তীব্র আহ্বান শুনি, তা কেবল আধ্যাত্মিক উপদেশ নয়; তা ছিল জাতির পুনর্জাগরণের এক কর্মমুখর মন্ত্র। তাঁর ভাষা দুরন্ত, তাঁর যাত্রা দুধর্ষ—কারণ তিনি জানতেন, কর্দমাক্ত পথকে মসৃণ করতে হলে প্রথমে মননের শৃঙ্খল ভাঙতে হবে।
শৃঙ্খল: কেবল ইংরেজের নয়, সমাজমননেরও
স্বামীজী উপলব্ধি করেছিলেন—শাসকের আরোপিত শৃঙ্খল যেমন জাতিকে বেঁধে রাখে, তার চেয়েও শক্ত বাঁধন হলো সমাজের অন্তর্গত কুশিক্ষা ও কুসংস্কার। জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, অন্ধ আচার—এই সবই মানুষের শক্তিকে ক্ষীণ করে দেয়। তাঁর প্রশ্ন ছিল তীক্ষ্ণ: “শৃঙ্খল কি শুধু ইংরেজরা পরিয়েছে?” এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে ছিল আত্মসমালোচনার আহ্বান। জাতির গতি যখন নিজ মননেই রুদ্ধ, তখন প্রয়োজন প্রগতিশীল ভাবধারার উন্মেষ—যে ভাবধারা মানুষকে নিজের শক্তির প্রতি সচেতন করবে।
স্বামীজীর দর্শনে মানুষই সর্বশক্তিমান। তিনি বারবার বলেছেন, “উঠ, জাগো”—এই আহ্বান ছিল আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করার ডাক। ভারতবাসী এতদিন আত্মিক আহ্বান শুনেছে, কিন্তু সেই আহ্বান অধিকাংশ সময় ছিল পরলোকমুখী; স্বামীজী প্রথম তাকে ইহলোকমুখী, কর্মমুখী ও ইতিবাচক রূপ দিলেন।
আলোকবর্তিকা ও যুগপুরুষ
সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ আলোর অনুসারী। সমাজ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, তখন যুগে যুগে মহাপুরুষেরা আবির্ভূত হন। স্বামী বিবেকানন্দ সেই ধারারই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর আবির্ভাব কেবল ভারতের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও যুগান্তকারী। কারণ তিনি প্রাচ্যের আত্মিক শক্তিকে পাশ্চাত্যের কর্মচেতনার সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন মানবধর্মের রূপরেখা নির্মাণ করেছিলেন।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মানুষ প্রায়ই উপদেশ শুনে সাময়িকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়, পরে পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায়। কেন? কারণ উপদেশ ও জীবনের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয় না। চর্চার অভাবে আদর্শে মরচে ধরে। স্বামীজীর বিশেষত্ব ছিল—তিনি কেবল তত্ত্ব দেননি; তিনি চেয়েছিলেন তত্ত্বের প্রয়োগ।
বাঁধ ও প্লাবনের রূপক: ইন্দ্রিয়নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন
অবাঞ্ছিত জলরাশি রোধ করতে যেমন বাঁধ প্রয়োজন, তেমনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আকর্ষণের অবাধ প্রবেশ মনের জগৎকে দূষিত করে। স্বামীজী বুঝেছিলেন—আত্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া ব্যক্তি ও সমাজ কোনোটিই টেকসই উন্নতির পথে এগোতে পারে না। তাঁর মতে চরিত্রগঠনই জাতি গঠনের প্রথম শর্ত। মহাপুরুষদের উপদেশ কেবল তখনই ফলপ্রসূ, যখন তা দৈনন্দিন জীবনের অনুশীলনে রূপ নেয়। সেই অনুশীলনই বাঁধকে দৃঢ় করে, প্লাবন থেকে রক্ষা করে সমাজকে।
কর্মপরিকল্পনা: ভাবনা থেকে বাস্তবায়ন
স্বামীজীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সংগঠকসত্তা। তিনি কেবল আবেগে উদ্বেল হননি; বাস্তব পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে তিনি ক্রমিক ধাপে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করেছিলেন। শিক্ষার প্রসার, দরিদ্রের সেবা, নারীর উন্নয়ন, জাতিভেদের অবসান—এসব ছিল তাঁর পরিকল্পনার অঙ্গ। তাঁর শিষ্যদের তিনি উদ্দীপিত করেছিলেন—“নিজেদের মধ্যে শক্তি জাগাও, মানুষের সেবা করো, তবেই ঈশ্বরসেবা সম্পূর্ণ হবে।”
এই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় Ramakrishna Mission—যার মূলমন্ত্র ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’। ব্যক্তিগত মুক্তি ও বিশ্বকল্যাণকে এক সূত্রে বাঁধা—এ এক অভিনব দৃষ্টান্ত।
সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
আজ যখন বিশ্ব পুনরায় নানা অসুস্থতায় আক্রান্ত—হিংসা, বিভাজন, মূল্যবোধের অবক্ষয়—তখন স্বামীজীর বাণী নতুন করে স্মরণীয় হয়ে ওঠে। তাঁর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শৃঙ্খল ভাঙতে হলে আত্মশক্তির জাগরণ প্রয়োজন। কেবল বাহ্যিক সংস্কার নয়, অন্তরের সংস্কারই জাতিকে সুস্থ করে।
স্বামী বিবেকানন্দের ১৮৯৪ সালের চিঠির ভাবার্থে যে দুরন্ত বাণী ধ্বনিত হয়, তা নিছক ধর্মীয় উপদেশ নয়; তা এক জাগরণ-সংগীত। তিনি দেখিয়েছিলেন—সমাজের কর্দমাক্ত পথ মসৃণ করা যায়, যদি মানুষ নিজের শক্তিতে বিশ্বাস করে এবং আদর্শকে জীবনে প্রয়োগ করে। তাঁর দুধর্ষ যাত্রা আমাদের শেখায়—যুগে যুগে আলোকবর্তিকা আসে, কিন্তু সেই আলোকে ধারণ করা এবং তাকে কর্মে রূপ দেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব।
আজও তাই তাঁর আহ্বান প্রাসঙ্গিক—উঠে দাঁড়াও, নিজের ভিতরকার শৃঙ্খল ভাঙো, এবং সমাজকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করো।
মন্তব্যসমূহ