৩৮৮ অপেক্ষা

রাত্রির গভীরতম স্তব্ধতা। প্রকৃতি জেনে গেছে এই মুহূর্তে শব্দ করতে নেই। শব্দরা ফিরে গেছে তাদের উৎসের সন্ধানে। আকাশে চন্দ্রামা ধীরে ধীরে আকাশের উপর তাঁর কতৃত্ব বিস্তার করছে। এই মায়াবী রাতে দুই মানব-মানবী খোলা জানালার ধারে  উন্মুখ হয়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য আকন্ঠভরে পান করছে। 
কত প্রশ্ন প্রলয়ের মনে এসে একে একে ভিড় করতে লাগলো।  আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই প্রলয় ধীরে বলল—
যেখানে দুই নেই, সেখানেই সত্য। অপেক্ষা, প্রেম, মৃত্যু—সবই সেই একের ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গ।
নন্দিনী অনুভব করল—আজ প্রলয়ের কথাগুলো গল্প নয়, যেন এক গভীর ধ্যান থেকে উৎসারিত কতগুলি জমাট বদ্ধ শব্দ।
 'মায়া' সে তো  বহুর আবরণে আচ্ছাদিত জগৎ যেন এক অনন্ত প্রতিচ্ছবি। যা দেখি—তা ক্ষণস্থায়ী, যা ধরি—তা পরিবর্তনশীল,যা ভালোবাসি—তা হারিয়ে যায়। 
নন্দিনী ফিসফিস করে বলল, “ তাহলে কি সবই মায়া?”
প্রলয় শান্ত স্বরে বলল — “মায়া মানে মিথ্যা নয়। মায়া মানে আচ্ছাদন। যেমন কুয়াশা সূর্যকে ঢাকে, তেমনি মায়া এককে বহু করে দেখায়।”অপেক্ষা—মায়ার ভিতরে সময়ের খেলা। প্রেম—মায়ার ভিতরে একত্বের আকুলতা। আর মৃত্যু—মায়ার আবরণ ভাঙার মুহূর্ত।
 আত্মা তো সে এক  নীরব সাক্ষী। বাতাস থেমে আছে। নন্দিনী নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পেল কিন্তু হঠাৎ মনে হল, সে হৃদয় নয়, শরীর নয়—কিছু এক নীরব সত্তা সবকিছুর সাক্ষী হয়ে আছে।  “এই যে আমি বলে যাকে অনুভব করছি… সে কে?”
প্রলয় বলল,“সে-ই আত্মা। যে জন্মায় না, মরে না, বদলায় না। দেহ অপেক্ষা করে, মন ভালোবাসে, জীবন মরে—কিন্তু আত্মা শুধু দেখে- তাইতো সে দ্রষ্টা আর তাকে কেউ দেখতে পারেনা। 
নন্দিনীর চোখে অদ্ভুত শান্তি নেমে এল। মৃত্যুভয় যেন একটু দূরে সরে গেল।আকাশে প্রথম আলো ফুটছে।  
অন্ধকার আর আলো—দুইয়ের মাঝখানে এক অনির্বচনীয় অবস্থা।
প্রলয় বলল— যেমন নদী সমুদ্রে মিশে নিজেকে হারায় না, বরং বিস্তৃত হয়—তেমনি আত্মা ব্রহ্মে লীন হলে বিনাশ নয়, বিস্তার ঘটে।”
নন্দিনী ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমি আর তুমি?”“দুই নয়। মায়ায় আমরা পৃথক, সত্যে আমরা এক। প্রেম সেই একত্বের স্মৃতি, মৃত্যু সেই একত্বে প্রত্যাবর্তন।”  
মহাজাগরণের দরজা আজ উন্মুক্ত-
শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে—কোনো শব্দ নেই, কোনো ভয় নেই। 
প্রলয়ের কণ্ঠ গভীর— “মৃত্যু শেষ নয়। মৃত্যু মানে ‘আমি’ নামের সীমা ভেঙে যাওয়া। যখন ‘আমি’ মুছে যায়, তখন শুধু ‘সে’ থাকে—আর সেই ‘সে’ই ব্রহ্ম, সে'ই আত্মা ।” 
নন্দিনী চোখ বন্ধ করল। তার মনে হল— মৃত্যু অন্ধকার নয়, মৃত্যু যেন ঘুম থেকে জেগে ওঠা। 
মৃত্যুর জয়যাত্রা—ধ্বংসের নয়, অহংকারের অবসান।
 অদ্বৈতই  প্রেমের চূড়ান্ত রূপ। 
নন্দিনী ধীরে প্রলয়ের হাত ধরল। কিন্তু এবার স্পর্শে আকুলতা নেই, ভয় নেই,শুধু গভীর এক শান্তি।
 “যদি সব এক, তবে প্রেম কী?”
প্রলয় মৃদু হাসল—“প্রেম মানে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’, আর অদ্বৈত মানে ‘আমরা’ থেকেও ‘এক’। প্রেম যাত্রা, অদ্বৈত গন্তব্য।”
ভোর ফুটে উঠল।
আলো আর অন্ধকার মিশে গেল। যেমন জীবন ও মৃত্যু, যেমন তুমি ও আমি, যেমন আত্মা ও ব্রহ্ম।
সময় থেমে নেই, তবু নন্দিনীর ভিতরে সব স্থির। সে অনুভব করল—
অপেক্ষা ছিল মায়ার পথ, প্রেম ছিল একত্বের ডাক, মৃত্যু হলো পর্দা সরার মুহূর্ত। আর তার ওপারে—
না জীবন, না মৃত্যু,না তুমি, না আমি—শুধু এক নীরব, অনন্ত, অখণ্ড সত্তা।
নন্দিনী ধীরে চোখ খুলে ফিসফিস করল—
“অহং ব্রহ্মাস্মি।
অপেক্ষা আমি, প্রেম আমি, মৃত্যু আমি—
আর সেই ‘আমি’ই অনন্ত।” 

কলমে - রবীন মজুমদার 
তারিখ -১৯/০২/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)