৩৯০ প্রশ্ন
৩৯০ প্রশ্ন
সন্ধ্যা নামছে। গঙ্গার ধারে প্রাচীন অশ্বত্থতলায় গুরু ও শিষ্যের আসন। অনতিদূরে শ্মশানের ধোঁয়া উঠছে। ধুঁয়ার কুন্ডলীর সাথে তাল মিলিয়ে অন্তর থেকে উৎসারিত প্রশ্নের ঝড় শিষ্যের মনকে আন্দোলিত করে তুলছে।
একান্ত আবেগে শিষ্য গুরুদেবকে প্রশ্ন করলো -" গুরুদেব ! শুধুমাত্র দেহ সম্বল তো মানুষ নয় —এ কথা শুনেছি। কিন্তু দেহ ও মনকে কেন জড় বলা হয়? প্রাণহীন দেহকে কেন দৃশ্যমান পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়? আর দেহের অধিকারীকে কোন মানদণ্ডে অমরত্ব দেওয়া হয়? যদি সবার অন্তরে এক চৈতন্য থাকে, তবে কেউ সৃষ্টিকর্তা, কেউ ধ্বংসকারী—এই বৈষম্য কেন?"
গুরু - তোমার প্রশ্নগুলো নতুন নয়; অনন্ত কাল ধরে এই একই প্রশ্নের পুনারাবৃত্তি হয়ে আসছে আর একদিন এই প্রশ্ন তুলেছিল এক কিশোর—নচিকেতা। সেই কাহিনী আছে 'কঠোপনিষদ-'এ। সে যমের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল—মৃত্যুর পর কী থাকে?
শিষ্য - দেহ কেন জড়?
গুরু -দেহ পঞ্চভূতের সমষ্টি—মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ। এদের নিজস্ব চেতনা নেই। যেমন মাটির তৈরি একটি প্রদীপ নিজে আলো দেয় না; তেল ও সলতে জ্বালালে সে আলোকিত হয়। তেমনি দেহ নিজে সচেতন নয়—চৈতন্য তার মধ্যে প্রতিফলিত হলে সে চালিত হয়। 'প্রতিফলিত' শব্দটি প্রয়োগ করা হল, কারণ, চৈতন্য এক এবং অদ্বিতীয়। প্রত্যেক জীবকে সে আলোকিত করে থাকে তার আলোর প্রতিফলনের মাধ্যমে ।
ভগবদ্গীতা-য় বলা হয়েছে—দেহ নশ্বর, আত্মা অবিনশ্বর। যখন চৈতন্য দেহকে তার আলোক প্রতিফলন করার কাজটি বন্ধ করে দেয় , তখন দেহ আর সাড়া দেয় না। তাই তাকে ‘জড়’ বলা হয়।
শিষ্য - তাহলে মৃতদেহ সরিয়ে দেওয়া হয় কেন?
গুরু-কারণ চৈতন্যের স্পর্শ সরে গেলে দেহ কেবল অপ্রয়োজনিয় উপাদানে পরিণত হয়ে যায় , যা আবর্জনার সমতুল্য। সমাজ স্বাস্থ্য, শুচিতা ও ধর্মীয় চেতনায় তাকে প্রকৃতির কোলে ফিরিয়ে দেয়—দাহ বা সমাধির মাধ্যমে। এটি অবমাননা নয়; বরং প্রকৃতিতে প্রত্যাবর্তন।
শিষ্য -দেহ তো ক্ষয় হয়। তবে কাকে অমর বলা হয়?
গুরু- দুই অর্থে অমরত্ব—
আধ্যাত্মিক অমরত্ব: আত্মা নিত্য—এ কথা শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিখিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক অমরত্ব: কর্মের দ্বারা স্মৃতিতে বেঁচে থাকা।
ধরো, স্বামী বিবেকানন্দ —দেহ নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও জীবিত। আবার আডলফ হিটলার-ও স্মরণীয়, তবে ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে। দু’জনেই ইতিহাসে অমর—কিন্তু মান আলাদা।
অতএব, মানদণ্ড হলো কর্ম এবং কর্মের দ্বারা মানবসমাজে তার প্রভাব।
শিষ্য -এক চৈতন্য, তবু বৈষম্য কেন? যদি সবার অন্তরে এক চৈতন্য, তবে কেউ সৃষ্টিশীল, কেউ ধ্বংসকারী কেন?
গুরু -সূর্য এক, কিন্তু কাচের রঙ ভেদে আলো ভিন্ন দেখায়। চৈতন্য এক, কিন্তু মন-সংস্কার-অহং-এর আবরণ ভেদে তার প্রকাশ ভিন্ন হয়।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন—“ধর্ম মানে অন্তর্নিহিত দেবত্বের প্রকাশ।” কারও ক্ষেত্রে সেই দেবত্ব স্পষ্ট, কারও ক্ষেত্রে আচ্ছন্ন।
ঐতিহাসিক পটভূমিতে দেখো— সম্রাট অশোক কলিঙ্গযুদ্ধের পর রক্তস্রোত দেখে বদলে গেলেন; তিনি হলেন ‘ধর্মাশোকগ্রস্ত' । আবার ক্ষমতার মোহে বহু শাসক ধ্বংসের পথ বেছে নিয়েছে।
চৈতন্য এক, কিন্তু সংস্কার ও স্বাধীন ইচ্ছা তার দিক নির্ধারণ করে।
শিষ্য-তাহলে কি ধ্বংসকারী আত্মাও প্রয়োজনীয়?
গুরু-ইতিহাসে ধ্বংসও শিক্ষা দেয়। যেমন ঝড় পুরনো পাতা ঝরায়, তেমনি বিপর্যয় সমাজকে জাগ্রত করে। কিন্তু আদর্শ হলো সৃষ্টিশীল ভূমিকা।
উদাহরণ দিই—একই আগুনে অন্ন রান্না হয়, আবার ঘরও পুড়ে যায়। আগুনকে দোষ দেবে, না ব্যবহারের ভঙ্গিকে?
এবার গুরু একটি আয়না তুলে ধরলেন।এই আয়নায় তোমার মুখ দেখা যায়। কিন্তু যদি ধুলো জমে?
শিষ্য-তবে মুখ দেখা যায় না।
গুরু -তেমনি চৈতন্য এক ও নির্মল। মন-অহং-এর ধুলো জমলে তার প্রকাশ বিকৃত হয়। সাধনা মানে সেই ধুলো মুছে ফেলা।
শিষ্য দীর্ঘক্ষণ নীরব। দূরে শ্মশানের ধোঁয়া মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে। অবশেষে শিষ্য উপলদ্ধি করলো - দেহ জড়, কারণ সে ধারক মাত্র; চৈতন্যই চালিকা শক্তি। অমরত্ব কর্মে ও আত্মজ্ঞানেই। আর বৈষম্য চৈতন্যে নয়—তার প্রকাশে।
গুরু-ঠিক তাই। মানুষ তখনই সত্যিকার মানুষ, যখন সে নিজের অন্তর্গত চৈতন্যকে জাগিয়ে সৃষ্টির পক্ষে দাঁড়ায়। দেহ নশ্বর, মন পরিবর্তনশীল, কিন্তু আত্মা—চৈতন্য—নিত্য। ইতিহাস সাক্ষী—যাঁরা সেই আত্মাকে চিনেছেন, তাঁরা সমাজে আলোর দিশা দিয়েছেন। আর যাঁরা অজ্ঞাত থেকেছেন, তাঁরা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন।
অতএব প্রশ্নটি চিরন্তন—
আমরা কি আমাদের অন্তরের চৈতন্যকে জাগিয়ে সৃষ্টির পথ বেছে নেব, না অজ্ঞতার আবরণে ধ্বংসের দিকে যাব?
মন্তব্যসমূহ