৩৯৪ সভ্যতার দৌড়, কলার খোসা এবং মানুষের চিরন্তন ভুল

 ৩৯৪ সভ্যতার দৌড়, কলার খোসা এবং মানুষের চিরন্তন ভুল 

মানুষ এক বিরল রোগে আক্রান্ত - প্রাণী জগতে তার থেকে বুদ্ধিমান নেই- এই  ভাবনাটিতে আক্রন্ত, অবশ্য  ধারণাটা  পুরোপুরি মিথ্যা নয়; কিন্তু সমস্যাটা হলো মানুষ মাঝে মাঝে এটাকে একটু বেশি সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলে। 

একবার এক অত্যন্ত আধুনিক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। ভদ্রলোক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি—সব বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রাখতেন। অন্তত তিনি নিজে তাই মনে করতেন।

তিনি খুব গর্বের সঙ্গে বললেন—  “দেখুন, মানবসভ্যতা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে আর পিছনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।” 

আমি ভদ্রলোকের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলাম—“আপনি কি কখনও কলার খোসার ওপর পা দিয়েছেন?” 

ভদ্রলোক প্রথমে একটু থতমত খেলেন। তারপর বললেন— “এর সঙ্গে সভ্যতার কি সম্পর্ক?” 

আমি বললাম—

“সম্পর্ক খুবই গভীর। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণীও যখন কলার খোসার ওপর পা দেয় তখন সে বুঝতে পারে—মাধ্যাকর্ষণ নামের এক ভদ্রলোক এখনও পৃথিবীতে যথেষ্ট সক্রিয় আছেন।”  

সভ্যতার ইতিহাসও মোটামুটি এই রকমই। মানুষ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যায়, আর প্রকৃতি মাঝে মাঝে তার সামনে একটি ছোট্ট কলার খোসা রেখে দেয়।

সভ্যতার আলো এবং বারুদের গন্ধ

সভ্যতা দেখতে খুব সুন্দর জিনিস। বাইরে থেকে তাকালে মনে হয়—মানুষ যেন জ্ঞানের আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করে ফেলেছে। সেখানে বিদ্যুৎ আছে, রেলগাড়ি আছে, উড়োজাহাজ আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, দার্শনিক আছে, কবি আছে, আরও কত কি। সব মিলিয়ে মনে হয়—মানুষ সত্যিই অসাধারণ কাজ করেছে। কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায়—এই আলোয় কোথাও না কোথাও বারুদের গন্ধও ভাসছে। 
( অবশ্য এই বারুদের গন্ধ কি করে এলো ?  তাকে খুঁজতে গেলে ভারতীয় দর্শনে ত্রিগুণের মধ্যে খুঁজতে হবে, সৃষ্টির দ্বান্দ্বিকতার ইতিহাসকে অনুসরণ করতে হবে। )

বিজ্ঞান আমাদের অনেক আশীর্বাদ দিয়েছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান মানুষকে আকাশে উড়তে শিখিয়েছে, মহাকাশে যেতে শিখিয়েছে, রোগের বিরুদ্ধে লড়তে শিখিয়েছে।

কিন্তু একই বিজ্ঞান মানুষকে এমন সব অস্ত্রও বানাতে শিখিয়েছে, যেগুলো দিয়ে এক মুহূর্তে একটি শহরকে ইতিহাসের ফুটনোটে পরিণত করা যায়। অর্থাৎ মানুষের বুদ্ধি একদিকে প্রদীপ জ্বালায়, আর অন্যদিকে আগুনও জ্বালাতে শেখে।

এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা কখন ব্যবহার হবে—সেটা ঠিক করে মানুষের মেজাজ, রাজনীতি এবং মাঝে মাঝে তার অহংকার।

প্রতিটি সৃষ্টির ভেতরে ধ্বংসের বীজ

আমাদের গ্রামের এক বৃদ্ধ সাধু ছিলেন। তিনি খুব বড় বড় বই পড়তেন না, কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলতেন যা শুনে মনে হতো—দর্শনের অনেক বই মিলিয়েও হয়তো এত সহজে কথাটা বলা যায় না। আসলে চোখ-কান খোলা রেখে জীবনের পথে চলতে চলতে যে অভিজ্ঞতা মানুষ সঞ্চয় করে - তার থেকে বড়ো শিক্ষা বোধহয় এই পৃথিবীতে নেই। 

একদিন তিনি বললেন—
“যে গাছ জন্মায়, তার ভেতরেই কুড়ালের সম্ভাবনা জন্মায়।”
আমি তখন ছোট ছিলাম। মনে হয়েছিল বুড়ো লোকটা নিশ্চয়ই কাঠুরেদের ওপর খুব রাগ করে আছেন। কিন্তু পরে বুঝলাম—তিনি আসলে প্রকৃতির এক গভীর নিয়ম বলছিলেন।

প্রকৃতির নিয়ম হলো—
যা সৃষ্টি হয়, তার ভেতরেই পরিবর্তনের বীজ থাকে। একটি ফুল ফুটলেই তার মধ্যে ফলের সম্ভাবনা জন্মায়। একটি শিশুর জন্ম মানেই একদিন তার বার্ধক্যের সূচনা।

সভ্যতার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।
একটি সভ্যতা যখন খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন তার ভেতরেই ধীরে ধীরে এমন কিছু শক্তি জন্মাতে থাকে যা একদিন তাকে বদলে দেয়। ইতিহাস পড়লে মনে হয়—সভ্যতাগুলো যেন এক একটি বিশাল নাটকের চরিত্র। তারা মঞ্চে আসে, কিছুদিন খুব আলোচনায় থাকে, তারপর একসময় পর্দা নামলে দর্শকরা নতুন চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

সময়ের গোপন কারখানা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারখানার নাম—সময়। এই কারখানায় কোনো শব্দ নেই, কোনো ধোঁয়া নেই, কিন্তু কাজ চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এখানে সাম্রাজ্য তৈরি হয়, আবার একদিন ভেঙেও যায়। এখানে মতবাদ জন্মায়, আবার কয়েক শতাব্দী পরে সেগুলো হারিয়ে গিয়ে স্মৃতির অন্তরালে চলে যায়, ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়। সময় যেন এক ধৈর্যশীল শিল্পী। সে মানুষের তৈরি প্রতিটি মূর্তিকে একটু একটু করে বদলে দেয়।

আজ যাকে মানুষ খুব গর্ব করে দেখাচ্ছে, কাল সেটাই হয়তো জাদুঘরে কাঁচের বাক্সের ভেতরে রাখা থাকবে।

মানুষের চিরন্তন ভুল

মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলটা হলো—সে ভাবে তার সময়টাই শেষ কথা। রোমানরা ভেবেছিল তাদের সাম্রাজ্য চিরকাল থাকবে। মোগলরা ভেবেছিল দিল্লির সিংহাসন কখনও ফাঁকা হবে না। ইংরেজরা কি ভেবে ছিল তাদের সূর্য অস্তমিত হবে? ইউরোপ একসময় ভেবেছিল পৃথিবীর সভ্যতার কেন্দ্র চিরকাল তার হাতেই থাকবে।

ইতিহাস তখন একটু মৃদু হাসে। ইতিহাসের হাসিটা বড় অদ্ভুত—এটা খুব জোরে শোনা যায় না, কিন্তু তার ফলাফল খুব স্পষ্ট। কিছুদিন পরে দেখা যায় নতুন শক্তি উঠে এসেছে, নতুন চিন্তা এসেছে, নতুন সভ্যতা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ পৃথিবী যেমন এক জায়গায় স্থির না থেকে প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন করে, ঠিক তেমনি সভ্যতাও কখনও এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না। সে সব সময় একটু একটু করে বদলে যায়।

চিরন্তনের নীরব দর্শন

এই সব ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে আমার মনে হয়—পৃথিবীর যত গোলমাল, সবই সৃষ্টি করা জিনিসগুলোকে নিয়ে। যা সৃষ্টি হয়েছে, তা বদলাবে। যা বদলাবে, তা একদিন মিলিয়েও যাবে। সাম্রাজ্য যাবে, মতবাদ যাবে, সভ্যতার রূপ বদলাবে। কিন্তু কিছু জিনিস আছে যেগুলো এই সব কোলাহলের বাইরে।

চিরন্তন সত্যগুলো যেন আকাশের তারার মতো—
মানুষ নিচে যত যুদ্ধ করুক, যত সভ্যতা উঠুক আর পড়ুক, তারা সব নীরবে দেখছে।মানুষের ইতিহাস যেন তাদের কাছে এক দীর্ঘ নাটক— যেখানে চরিত্র বদলাচ্ছে, পোশাক বদলাচ্ছে, সংলাপ বদলাচ্ছে। কিন্তু মঞ্চটা একই আছে।

অবশেষে 

এই জন্যই মাঝে মাঝে আমি ভাবি—মানুষ যদি একটু কম আত্মবিশ্বাসী হতো, তাহলে পৃথিবীটা হয়তো একটু বেশি শান্ত হতো। কিন্তু মানুষ যেহেতু মানুষ, সে আবার নতুন করে সভ্যতার দৌড় শুরু করবে। আর প্রকৃতি?

তিনি নিশ্চয়ই কোথাও একটা কলার খোসা রেখে হাসছেন।

কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষা হলো— মানুষ যত বড়ই হোক, মাঝে মাঝে তাকে মনে করিয়ে দিতে হয়— সে এখনও প্রকৃতির স্কুলের ছাত্র, আর পরীক্ষাটা এখনও শেষ হয়নি।

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ১৬/০৩/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)