৩৯৩ ফিরে দেখা

 ৩৯৩ ফিরে দেখা 


মানুষের বুদ্ধি যে কতখানি বেড়েছে তার প্রমাণ আজকাল আর আলাদা করে দিতে হয় না। আগে মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে ঘর বানাত, এখন বুদ্ধি খাটিয়ে পৃথিবীটাই ভেঙে ফেলার বন্দোবস্ত করছে। এই উন্নতির যুগে দাঁড়িয়ে আমরা বেশ গর্ব করে বলতে পারি—মানবসভ্যতা এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যেখানে চাইলে গোটা বিশ্বকে ভোর হবার আগেই  ধ্বংস করে দেওয়া যায়।

এই উপলব্ধিটাই একদিন দুই জ্ঞানী ভদ্রলোকের মাথায় একটু বেশি জোরে ধাক্কা মেরে ঢুকে গেল। একজন হলেন বিখ্যাত দার্শনিক Bertrand Russell, আর আরেকজন সেই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী Albert Einstein।

দু’জনেই ভাবলেন—বাপু, মানুষকে একটু সাবধান করা দরকার।

এখন সাবধান করার ব্যাপারটা আমাদের বিশ্বে খুব সহজ নয়। এখানে যদি কাউকে বলা হয়, “মশাই, রাস্তার মাঝে দাঁড়াবেন না, গাড়ি চাপা দেবে”, সে সঙ্গে সঙ্গে বলবে—“আপনি আপনার রাস্তা দেখুন।”

কিন্তু রাসেল আর আইনস্টাইন ছিলেন ভদ্রলোক। তাঁরা কাউকে ধমক দিয়ে নয়, চিঠি লিখে বোঝাতে গেলেন। চিঠি লিখে লিখেই একদিন তৈরি হল সেই বিখ্যাত ঘোষণাপত্র—যার নাম পরে হল Russell–Einstein Manifesto।

আইনস্টাইন তখন প্রিন্সটনে বসে আছেন। রাসেল চিঠি পাঠালেন—“দেখুন, পৃথিবীটা বাঁচানো দরকার। আপনি সই করবেন তো?”

আইনস্টাইনও বেশ খুশি মনে লিখলেন—“অবশ্যই করব।”

চিঠিটা পাঠানোর কিছুদিন পরেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেন। ফলে ইতিহাসে এটিই তাঁর শেষ দিককার চিঠিগুলোর একটি হয়ে গেল।

এখানে একটা কথা বলে রাখি—বড় মানুষদের শেষ চিঠি সাধারণত বড় গুরুগম্ভীর হয়। কিন্তু এই চিঠির মর্মার্থ দাঁড়াল—“মানুষরা, দয়া করে নিজেদের উড়িয়ে দিও না।”

এত সরল কথা ইতিহাসে খুব কমই বলা হয়েছে।এবার আসল সমস্যায় আসা যাক। মানুষ বহুদিন ধরেই যুদ্ধ করে আসছে। আগে যুদ্ধের ফল ছিল—কেউ জিতবে, কেউ হারবে। কিন্তু আধুনিক যুগে বিজ্ঞানীরা এমন এক বোমা বানিয়ে ফেলেছেন, যাতে সবাই একসঙ্গে হারবে।

এটা অনেকটা সেই গ্রামের ঝগড়ার মতো—
দুই পক্ষ লাঠি নিয়ে এমন মারামারি করল যে শেষে দু’পক্ষই হাসপাতালে।

এই অবস্থায় রাসেল বললেন—
“ভাই, একটু থামো।”তিনি বললেন—আমরা এতদিন ভাবতাম যুদ্ধ মানে শহর ধ্বংস। কিন্তু এখনকার বোমা এমন যে শহর তো বটেই, মানুষটাকেও ভবিষ্যৎ থেকে মুছে দিতে পারে।

ধরুন, লন্ডন নেই, নিউ ইয়র্ক নেই—তাও পৃথিবী কয়েক শতাব্দীতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু যদি সেই বোমার ধুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তবে মানুষের আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগই নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ সভ্যতার ভবিষ্যৎ এখন দাঁড়িয়ে আছে এমন এক প্রশ্নের সামনে—মানুষ কি যুদ্ধ ছাড়বে, নাকি যুদ্ধ মানুষকে ছেড়ে দেবে না?

রাসেল খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন। তিনি বললেন—
“আপনি যদি কমিউনিস্ট হন, থাকুন। আপনি যদি কমিউনিস্ট-বিরোধী হন, তাও থাকুন। কিন্তু মনে রাখুন—বোমা পড়লে দু’পক্ষেরই সমান মৃত্যু হবে।”এখানে মতাদর্শের বড়াই করে লাভ নেই। এই কথাটা একটু ভাবলে বোঝা যায়—মানুষের ইতিহাসে প্রথমবার এমন অস্ত্র এসেছে যেখানে জয়ী পক্ষ বলে কিছু নেই।

যুদ্ধের শেষে যদি কেউ না থাকে, তবে বিজয় মিছিল করবে কে? তাই রাসেল শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে একটাই অনুরোধ করলেন—“মানুষ হিসেবে ভাবুন। বাকিটা ভুলে যান।”

এই উপদেশটি শুনে পৃথিবী পুরো বদলে গেছে—এ কথা বলা যাবে না। মানুষ এখনও যুদ্ধ করে, বোমা বানায়, বক্তৃতা দেয়।

তবে মাঝে মাঝে যখন পৃথিবী একটু বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তখন এই ঘোষণাপত্রটি আবার বইয়ের তাক থেকে বেরিয়ে আসে।

মানুষ একটু মাথা চুলকায়, একটু ভাবে—“আরে, সত্যিই তো! আমরা কি সত্যিই নিজেদের উড়িয়ে দেওয়ার জন্য এত কষ্ট করে সভ্যতা বানিয়েছি?”

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরো মেলেনি।

কিন্তু প্রশ্নটা টিকে আছে—
এটাই হয়তো মানবসভ্যতার পক্ষে এখনও সবচেয়ে বড় আশার কথা। কিন্তু ভীষণ চিন্তার কথা, ফিরে দেখার অবসর আর মানুষের নেই। 

ব্লগার- রবীন মজুমদার 

তারিখ - ১৪/০৩/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)