(২৫৩ ) ফ্যাসিজমের একাল সেকাল

শক্তির সাথে শৃঙ্খলার এক আশ্চর্য মিশেল এই 'ফ্যাসিকো' যার থেকে ফ্যাসিজম কথাটির উৎপত্তি। যে আদর্শের উপর লক্ষ্য রেখে এই শক্তি জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে শাসকের একনায়কতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
**************************************
ইতিহাসে কেউ কেউ জায়গা করে নেয় তাদের কৃতকর্মের মাপকাঠিতে। সেটা অবশ্যিই দৃষ্টান্তমূলক। সেই চরিত্রের দৃষ্টান্তটি মানবিক কিংবা তার অমানবিক কারণও হতে পারে। সেখানে এমনিই একটা নাম হিটলার, যাঁর সাথে ফ্যাসিস্ট শব্দটি সমার্থক হয়ে গেছে। যদিও বেনিতো মুসোলিনি এর উদ্গাতা কিন্তু হিটলার তার রূপকার। এই ধরনের বিরল প্রজাতির মানুষ কোন কোন শতাব্দীতে দুই-একটা জন্মায়। অবশ্য তারা ভীষণ ক্ষণজন্মা। উত্তরসূরি তারা তৈরি করতে পারেনা , কেননা তারা যখন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয় , তখন তাদের উপর এতোখানি ঘৃণা বর্ষিত হয় যে, সাহস করে কেউ সে পথে হাঁটেনা। তাদের জীবনে যবনিকা পরার ইতিহাসটা ভীষণ মর্মান্তিক।
কিন্তু কালের নিয়মে এই ধরনের কিছু প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়, পূর্ণাঙ্গরূপে নয় শুধু তার অপূর্নরূপ মাত্র । অঙ্কুরেই ত্রাহিরব উঠে। পৃথিবী আর চায় না সেই বীভৎসরূপকে আবার দর্শন করতে। যেহেতু মানুষই এর সৃষ্টি কর্তা, তাই মানুষের দায়িত্বের মধ্যেই পরে এই আগাছা উৎপাটনের। তার প্রাথমিক পর্য্যায়ে লক্ষণকে বিলক্ষণ জানতে হবে।
**************************************
বর্তমানে এই ধরনের শাসকরা, 'ধরণ' শব্দটি এই কারণে বলা হল, কেননা আক্ষরিক ফ্যাসিস্টরা এর থেকে আরো বেশি নির্মম। চিত্তাকর্ষক মোড়কের আড়ালে নিজেদের আড়াল করে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়। রোমাঞ্চকর প্রতিশ্রুতির নিয়মিত প্রচারে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাদের অনুকূলে টেনে নিয়ে আসে।
**************************************
মাঝে মাঝে মনে হয় এদের বাল্যখিল্যপনা দেখতে দেখতে প্রকৃতি তার দৈনিন্দন কাজকে শিকেয় তুলে হাসতে থাকে। প্রকৃতির রাজ্যে ভেদাভেদ বলে কোন শব্দ নেই। অবশ্য সে পুঞ্জীভূত অভিমান জমা হলে বর্ষণরূপে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ঠিক সেরকম ইতিহাস ফ্যাসিবাদের কারণ থেকে উদ্ভূত বহুদিনের জমানো বিদ্বেষ প্রচন্ড শক্তি হয়ে এক ভয়ংকর ঝড়ের আবির্ভাবে ঝরা পাতার মতো তাদের সাধের সৌধ মাটির সাথে মিলে মিশে একাকার করে দিল আর তার সাথে শেষ করল সেদিনের মতো একনায়কের একাঙ্ক নাটক।
কালের কি নির্মম পরিহাস, একদিন যার নাম জার্মানির আকাশ বাতাস "হের হিটলার" বলে উচ্চারিত হতো, আজ তার দেহাবসানের সাথে সাথে তার নামটিরও পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে।
**************************************
অবশ্য মানুষ দুঃসাহসিক অভিযানের প্রয়াসী। পর পর দুটো বিশ্ব যুদ্ধের বিভীষিকা যখন তাদের স্মৃতিতে জায়গা করতে পারে না , অগত্যা সাময়িক ভালো লাগাকে তারা জীবনে চলার পথে পাথেয় করতে চায়। সেই সব ইতিহাসের ঘৃণ্য নায়কদের উত্তরসূরি হয়ে বাঁচতে চায়।
ফ্যাসিজমের পূর্বরাগ
পূর্বে অর্থাৎ আদিম ও মধ্যযুগে বিভিন্ন রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শাসক নিরুঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিগত শতাব্দিতে সেই একচেটিয়া শাসনব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্যকে গোপন রেখে বাইরে তাকে পরিচিত করাচ্ছে এটি একটি উৎকৃষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসাবে।
**************************************
কি কি লক্ষণ থাকলে তাকে ফ্যাসিস্ট বলে চিহ্নিত করা যায় -
দেশের জনসাধারণের জাতীয়তাবাদের প্রেরণাকে একটু একটু করে উস্কে দিয়ে ধীরে ধীরে জনগণকে বোঝানো হয়, তাঁরা পৃথিবীর এক ঐতিহ্যশালী জনজাতির প্রতিনিধি। দীর্ঘ দিন ধরে সেই জাতির প্রতি অবহেলা ও অন্য জাতিগুলির প্রাধান্যে তার গৌরব ভ্রুলুন্ঠিত হয়েছে, তাকে পুনুরুদ্ধার করতে হবে এবং তার একমাত্র কারিগর হচ্ছে এই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ও তার শক্তিশালী নেতৃত্ব। সেই কারণে একনায়কের ভীষণ প্রয়োজন, বহুজনে এই মহান কার্য্য সম্পাদন হবেনা।
**************************************
বাস্তবে সমাজে বহু জাতির বাস। তার মধ্যে থেকে একটা জাতিকে শ্রেষ্ঠ প্রমান করতে হলে অবশ্যিই অন্য সংখ্যালঘু জাতিগুলিকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।
জাতীয়তাবাদী দলের এই রাজনৈতিক ভাবাদর্শে জনগণ যেই মুহূর্তে আবেগতাড়িত হয়ে উঠে, তখন তাদের কাছে সেই রাজনৈতিক দলের নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য চাওয়া হয়। আনুগত্য যুক্তির অপেক্ষা করেনা, তার ভিত্তি হচ্ছে অন্ধ বিশ্বাস। যেই যুক্তিতে অন্য জাতির প্রতি ঘৃণার বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, ঠিক একইভাবে গনত্রান্ত্রিক পরিসরে সেই বিদ্বেষ বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি সমভাবে বন্টিত হয়। একনায়কতন্ত্রের আগ্রাসনে ধীরে ধীরে গণতন্ত্র বিদায় নিতে শুরু করে। গণতন্ত্রের অন্যান্য স্তম্ভগুলি যেমন, বিচার ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের উপর একটা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়। সাথে সাথে গণতন্ত্রের গুরত্ব কমতে থাকে। রাজনীতির ক্ষেত্রে যারা প্রতিপক্ষ হিসাবে চিহ্নিত হন, তাদের উপর শাসকের সন্ত্রাস নেমে আসে।
**************************************
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার নির্বাচন, সেই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলে, ভুয়া নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করে। বিরোধী দল ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে দমন করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার ক্রমেই সংকুচিত করে ফেলা হয়।
**************************************
উন্নয়নমূলক কর্ম মিথ্যা প্রচারের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকে
সরকারের অন্যতম কাজ জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। তার জন্য চাই জনমুখী পরিকল্পনা। সরকার যখন সেই কাজ থেকে বিরত থাকে, তখন সেই ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার জন্য প্রয়োজন পরে মিথ্যা প্রচারের চাদরের। সেটাকে মাথায় রেখে শাসক মিডিয়াকে ব্যবহার করে আর সেই মিডিয়া যত্ন সহকারে ভুল তথ্য পরিবেশন করে জনগণকে সরকারি কাজের ফিরিস্তি দিয়ে আল্হাদিত করার চেষ্টা করে।
**************************************
সুস্থ চিন্তা থেকে মানুষের ব্যবধান রচনা করতে কৃত্তিম সংকট প্রচারের জুড়ি মেলা ভার। সেখানে সংবাদ মাধ্যম মিথ্যা ষড়যন্ত্রের গল্প শোনায়।
**************************************
তাতেও ও যদি জনগণ প্রভাবিত না হয়, তখন তাদের দৃষ্টি ঘোরাতে প্রচার করা হয় কোন নির্দ্দিষ্ট গোষ্ঠীর মনগড়া চক্রান্ত বিরুদ্ধে। এর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়, তারা দেশের অখন্ডতার ধংসকারী হিসাবে। তাদের জন্মগত শত্রু হচ্ছে কম্যুনিস্টরা, তারপরে বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘুরা।
**************************************
ষড়যন্ত্রতত্ত্ব
ফ্যাসিস্টদের চিরকালের অভ্যাস নিজেদের ভুলকে ঢাকা দেবার জন্য ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সাজিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা। নিজেদের সংকট মুক্ত করতে সেটা অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র নামক অস্ত্রকে সুচারু রূপে ব্যবহার করে থাকে।
**************************************
অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
এইবার ধীরে ধীরে হাত বাড়ায় একাধারে অর্থনৈতিক ও অন্যদিকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পথে। তার প্রাথমিক পর্য্যায়ে রাষ্ট্রের অধীনে যে সমস্ত ভারী শিল্প ও অন্যান্য পরিষেবামূলক ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। যারা দীর্ঘ দিন ধরে শ্রমিক স্বার্থ বজায় রাখার কাজ যে সব ট্রেড ইউনিয়নগুলি করে আসছিল, তাদের আন্দোলন করার অধিকার কেড়ে নেয়।
**************************************
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ
আগামী দিনে ফ্যাসিবাদীমুখী মতাদর্শকে লালন পালন করার জন্য এবং ভবিষৎ নাগরিক তৈরি করার কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
চিন্তাবিদ এবং মনীষীরা বারংবার বলেছেন, একটি জাতির উন্নতি নির্ভর করে পুরুষ ও নারীর সমঅধিকারের মাধ্যমে। সেখানে ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ কোন অবস্থায় নারীদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। তারা লিঙ্গ বৈষম্যে বিশ্বাসী। তার বিশ্বাস করে নারীরা পরিবারে সুন্দর তাই তাদের পরিবারের বাইরে পা রাখা সমীচীন নয়।
**************************************
কৃত্তিম সংকটের বাতাবরণ
কাল্পনিক ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে সবসময় সংকটের বাতাবরণ তৈরি করে জনসাধারণকে আতঙ্কিত করে রাখে এবং তার সাথে নিজেদের একমাত্র সেই সংকটের ত্রাণকর্তা হিসাবে পরিচিত করায়। সম্ভাব্য বিরোধিতার আশঙ্কায় তারা সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর আক্রমন শানায়।
**************************************
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
বর্তমান পৃথিবীতে এইসব লক্ষণগুলি সর্বত্র সমানভাবে প্রকট না হলেও ফ্যাসিবাদীদের একটি মাত্র উদেশ্য ক্ষমতাকে কেন্দ্রীকরণ করা। সেটা নিজ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হতে পারে বা পৃথিবীর যে কোন অপেক্ষাকৃত কম শক্তিধর রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও হতে পারে।
**************************************
পরিশেষে, দেশের নাগরিকরা যদি কোন রাষ্ট্রনায়ক কিংবা নেতার মধ্যে এই ধরণের লক্ষণ দেখতে পান তবে নিকটবর্তী পুনর্বাসন কেন্দ্রে খবর দিন তাদের অভিবাসনের জন্য।
পরবর্তী সংখ্যায় - এই রোগের কারণ ও প্রতিকার
ক্রমশঃ
ব্লগার -রবীন মজুমদার
তারিখ -১৩/০৩/২৫
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।