৩৪২ এ যেন দানবের ভাষা -

  ৩৪২ এ যেন দানবের ভাষা - 


"উঃ কি যন্ত্রনা ! প্রতিটি পাতায় পাতায়। কি নির্মম সেই সব বাণী। সবই শূদ্র আর নারীকে ঘিরে। " - মনুস্মৃতি পড়তে পড়তে দর্শনের ছাত্রী ললিতার মধ্যে কি যেন অদ্ভুত এক যন্ত্রণার রাসায়নিক বিকিরণ শিরদাঁড়া হয়ে সরাসরি মাথার দিকে ধাবিত হলো। কিন্তু তার পড়া থেমে থাকলো না। পুরো বইটা কয়েকবার পরে, সেখান থেকে নোট নিয়ে ও তার ব্যাখ্যাগুলি একের পর এক সাজাতে লাগলো। 

গ্রীষ্মের রোদ্দুরে পুড়ছে রতনপুর। গঙ্গার তীরের ধুলোয় ছাই রঙের বাতাস। পঞ্চায়েতের মাঠে আজও লাল রঙের সেই অস্থায়ী মঞ্চ। ললিতা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে—শহর থেকে ফিরে আসা কলেজের মেয়ে, চোখে আগুন। চারপাশে গ্রামজোড়া মানুষ: বুড়ো কৃষক, মাছধরা জেলে, মাটির ঘরের মেয়ে, কিশোররা।

ললিতা হাতে পুরনো বই—মনুস্মৃতি। পাতাগুলো হলদেটে, কোথাও কোথাও ছোট ছোট পোকারা হয়তো বা ভাষাগুলি তীব্র দহনে, সেই বই থেকে দূরে থেকেছে। তবুও  অক্ষরগুলো যেন সেঁকো বিষের মতো টলমল করছে। 

সে গলা উঁচু করে পড়তে শুরু করল—

“স্ত্রীলোকের স্বামী ভিন্ন পৃথক যজ্ঞ নেই। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনো ব্রত বা উপবাস নেই।” (৫/১৫৫) 

মাঠে কানাকানি। কেউ হাসছে, কেউ কপাল কুঁচকাচ্ছে। কিন্তু ললিতার কণ্ঠ কাঁপছে না—

“শোনো, মনু বলছে—মেয়ে মানুষ নিজের ধর্মও পালন করতে পারবে না যদি স্বামী অনুমতি না দেয়। নিজের ঈশ্বরকেও ডাকার অধিকার নেই!” 

পেছন থেকে বুড়ো গোপালদা গজগজ করে উঠল, “ওসব তো শাস্ত্রের কথা…!”
ললিতা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল— 
“হ্যাঁ, শাস্ত্রের কথা। যে শাস্ত্র বলছে—‘শয়ন, আসন, ভূষণ, কাম, ক্রোধ, কুটিলতা—এইসবই নারীর স্বভাব।’ (৯/১৭) 
মানে কি? নারীর জন্মই নাকি লালসা আর কুটিলতাকে বয়ে বেড়ানো। তোমাদের মা, তোমাদের মেয়ে—সবাইকে এই নামে ডাকা হচ্ছে।”  
মেয়েদের সারি থেকে এক কিশোরী ফিসফিস করে উঠল, “এ কি সত্যি লেখা আছে?”

ললিতা পাতাটা দেখাল, অক্ষরগুলো যেন কাঁটার মতো ফুটে উঠছে।

সে আবার পড়ল—
পুরুষের দর্শনমাত্রেই স্ত্রীজাতির মনে মিলনের ইচ্ছা জন্মায়।” (৯/১৫)
“তোমাদের বোন, মেয়ে, মা—সবাইকে এক নিশ্বাসে কামুকা বলে দিয়েছে মনু। এ কি মানুষ? না দানব?”

চারপাশে হাহাকার। নারীরা একে একে নিজেদের বুক সোজা করে দাঁড়াচ্ছে।

ললিতা থামছে না—

“আর শোনো—‘স্ত্রীলোকের কোনো মন্ত্র নেই, বেদের ওপর অধিকার নেই, তাই তারা ধর্মজ্ঞ হতে পারে না।’ (৯/১৮)
অর্থাৎ মেয়েদের শিক্ষা নেই, ধর্ম নেই, শুধু ঘরের কোণে সেবা করা।”

একজন বৃদ্ধা এগিয়ে এলেন, কপালে সাদা সিঁদুরের দাগ, কণ্ঠে দপদপে রাগ—
“এই কথাই তো আমার শাশুড়ি বলত। বলত, তুই মন্ত্র পড়তে পারবি না, তোর স্বর্গ পুরুষের হাতের মুঠোয়। আজ বুঝছি কে শিখিয়েছে তাদের।”

গোটা মাঠে গুঞ্জন ছড়িয়ে যায়।

ললিতা বই বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন গঙ্গার বহমান ঢেউ হয়ে—

“মনু কেবল নারীর গলা নয়, মানুষের গলা কেটে গেছে। শাস্ত্রের নামে এইসব কথাই হাজার বছর ধরে আমাদের ঘরের চালে, স্কুলের দরজায়, মন্দিরের ইট কাঠ পাথরে, মানুষের হৃদয়ে ঠেসে রেখেছে। ব্রাহ্মণ্যবাদের নগ্ন প্রচারক। আজও কেউ বলে—মেয়ের বেশি পড়া ঠিক নয়, পিরিয়ডের  সময় অশুচি, মন্দিরে ঢুকতে পারবে না—এইসবই মনুর ছায়া।”

সে আঙুল তুলে আকাশের দিকে দেখাল—

“ মেয়ের দেহে যেমন প্রাণ, তেমনি ছেলের দেহেও। কারও ধর্ম অন্যের দয়ার দান নয়। যে শাস্ত্র নারীর মুখ বন্ধ করতে চায়, তা শাস্ত্র নয়—দানবের লেখা।”

নদীর বাতাস মাঠের ওপর বয়ে গেল। কেউ চিৎকার করল, “জয় হোক নারীশক্তির!”

জেলেপাড়ার কিরণ, যে এতদিন নীরবে দেখছিল, এগিয়ে এসে বলল—

“আমরা গঙ্গার মানুষ, বাঁধ মানি না। মনুর বাঁধ ভাঙতে হলে আমরা একসঙ্গে থাকব।”

মাঠে একসাথে গর্জে উঠল মেয়েদের কণ্ঠ। বৃদ্ধা থেকে কিশোরী—সবাই।

মনুর বইয়ের হলদেটে পাতাগুলো বাতাসে কেঁপে উঠল, যেন ইতিহাসের মুখোশ খুলে যাচ্ছে।

গঙ্গার ঢেউ তীর ছুঁয়ে বলল—
“শাস্ত্র যদি শিকল হয়, তবে সেই শিকল ভাঙার নামই ধর্ম।

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -২৬-০৯-২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

Ani বলেছেন…
সত্যি সত্যি একটা জঘন্য প্রথা কে কি রূপ দিয়েছে?

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)