৩৪১ তৃপ্তি

৩৪১   তৃপ্তি 


কলকাতার এক পুরনো পাড়ায় সন্ধের বাতাসে আজও মিশে থাকে গলির ভিজে গন্ধ, ধোঁয়া আর সস্তা ধূপের মিষ্টি কটু গন্ধ। সেই গলির মধ্যিখানে ঝাপসা আলোয় ঝুলে থাকা ল্যাম্পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে এক নারী—তৃপ্তি। বয়স এখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই, তবু চোখে টান আছে, ঠোঁটে অনর্গল হাসির ভঙ্গি। সময়ের ধুলোমাখা অলংকার যেন। তৃপ্তির ঘরটিতে রাতের পর রাত খসে পড়ে বহু মানুষের গোপন ক্লান্তি।

কখনো সে নিজেকে ‘বেশ্যা’ ভাবে না। ভাবে, এ যেন এক অদৃশ্য দেবালয়—তার শরীর সেই মন্দির। কেউ সেখানে পূজারী, কেউ নিছক অতিথি। কেউ আসে লজ্জা নিয়ে, কেউ কেবল ক্ষুধা নিয়ে। তৃপ্তির কাছে তারা সবাই একই। বিনিময়ে যে টাকা আসে, সে কেবল দেহটাকে টিকিয়ে রাখার দক্ষিণা।

আজ রাতটা একটু অন্যরকম। গলির কোণ ঘুরে এসে দাঁড়ালেন অনিমেষ। চল্লিশোর্ধ্ব এই মানুষটির চোখে গাঢ় ক্লান্তি। দেহে অসুখ বাসা বেঁধেছে, স্ত্রী বিমলা বহুদিন ধরে শয্যাশায়ী—দুই শরীরের মধ্যে অনেক দিন ধরেই নীরবতা। “দেহের সুখ” শব্দটা মুখ ফস্কে বেরিয়ে গিয়েছিল একদিন—অনিমেষ পরে ভেবেছেন, সুখ কি কেবল শরীরের? নাকি কোনও অন্তরের আলোকধারা? তবু শরীরের অপূর্ণতাকে মেনে নেওয়া যায় না।

তৃপ্তি দরজার আড়াল থেকে অনিমেষকে চিনতে পারেন। বহু বছর আগে প্রথম এসেছিলেন তিনি, তখন তৃপ্তির বয়স কেবল উনিশ-কুড়ি। সেই প্রথম সাক্ষাৎকারের পর থেকে বছরগুলো গলে গেছে। অনিমেষ আজও একইরকম নীরব, চোখে সেই অদ্ভুত অন্বেষণ।

ঘরে ঢুকে দু’জনের মধ্যে দীর্ঘ নীরবতা। তৃপ্তি সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ঘিরে ফেলল দেয়ালের চুনকাম।

“কেমন আছেন?” তৃপ্তির গলায় কোনও মায়া নেই, আছে নিত্যদিনের সহজ স্বর।অনিমেষ ঠোঁট নেড়ে বললেন, “যন্ত্রণা...শরীরে, মনে—সবখানে।”

তৃপ্তি চোখ সরিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে রাতের আকাশ দেখল। তারপর ধীরে বলল, “সবাই তো কিছু না কিছু ছাড়তে শেখে, অনিমেষবাবু। কেউ সুখ ছাড়ে, কেউ দুঃখ।”

অনিমেষ বিস্মিত হলেন। এই কথাগুলো কি এক ‘পাইকারি’ নারীর মুখ থেকে শোনার কথা? তিনি বুঝলেন, এই ঘরটা আসলে এক আলাদা জগৎ। এখানে কোনও সম্পর্কের মিথ্যা নেই, নেই  কোন সামাজিক প্রলেপ।

তৃপ্তি এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরল। উষ্ণ, অথচ অনাবেগ। “শরীরের ক্ষুধা শুধু ক্ষুধা নয়,” সে ফিসফিস করে বলল, “এও এক বিসর্জন। আমি আমার ইচ্ছে, আমার স্বপ্ন—সবকিছুকে বিসর্জন দিয়েছি, যাতে তোমাদের মতো মানুষ কিছুক্ষণের আলো খুঁজে পায়।”

অনিমেষ চোখ বুঁজে রইলেন। কোনও কামনা নেই, কেবল এক অদ্ভুত শান্তি। যেন সমস্ত যন্ত্রণা এক নিমেষে গলে যাচ্ছে।

রাত গভীর হলে তৃপ্তি তাঁর পাশে বসে হালকা স্বরে বলল, “আমি যদি আজ সব ছেড়ে দিই—এই ঘর,  এই পেশা—তবে কি কেউ আমাকে মনে রাখবে?”

অনিমেষের মনে প্রশ্ন জাগল—বিমলাও কি একদিন এমন প্রশ্ন করেছে? সে কি নিজের জীবনকে প্রতিদিন বিসর্জন দেয়নি?

ভোরের প্রথম আলোয় অনিমেষ বেরিয়ে এলেন। গলি তখনও ঘুমোচ্ছে। তাঁর ভেতর এক নতুন উপলব্ধি—দেহের ক্ষুধা ক্ষণিক, কিন্তু বিসর্জনের মহিমা চিরস্থায়ী। তৃপ্তির মুখে যে শান্তি তিনি দেখেছেন, সেটাই যেন এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক আলোক।

তৃপ্তি জানলার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। দূরের আকাশে প্রথম পাখির ডাক। সে জানে, আজও নতুন কেউ আসবে, নতুন কেউ ফিরে যাবে। আর সে নিজে? প্রতিদিন নিজের এক অংশ বিসর্জন দিয়ে যাবে—যতদিন না শরীর ফুরোয়।

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -২৫-০৯-২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)