৩৪০ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (৮)

 ৩৪০  কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (৮)


                                                যদি একমত হন, তবে বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 



 চৈত্রের শুকনো হাওয়া যেন হঠাৎ ঝাঁপিয়ে এসে ছিন্নভিন্ন করে দিল চারদিক। ধুলো উড়ছে। মাঠের মাটির গায়ে যে ঘুমিয়ে থাকা বীজ, সে কি জানে—ওর বুকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কুঁড়ি ফোটার অদম্য শক্তি? তবু সে নড়ছে না, জেগে উঠছে না। যেন কেবল নির্দেশের অপেক্ষা।

এই যে আমাদের মানুষ, আজকের এই সমাজ—ওরা কি ওই বীজ নয়?

রীতি-নীতি, সংস্কার, ধর্ম—কথাগুলো বড় চেনা। কিন্তু এদের সঙ্গে কত অদৃশ্য দড়ি জড়িয়ে আছে, তা আমরা দেখি না। পুরনো নিয়ম মানা নাকি ধর্ম, তাই বলে অন্ধের মতো টেনে নিয়ে চলা? গাছের মতো স্থির থেকে যদি ধার্মিক হওয়া যায়, রেলগাড়ির মতো ছক কেটে চলা যদি ভক্তি হয়—তাহলে আমরা মানুষ কেন? পাথর তো কোনো দিন নিয়ম ভাঙে না। গরু কি পাপ করে? যন্ত্রের মধ্যে ইচ্ছা নেই বলেই ওরা এত শান্ত, এত বাধ্য।

কিন্তু মানুষ? মানুষকে আলাদা করেছে ইচ্ছার স্ফুলিঙ্গ। যে প্রাণের ভেতর যত বড় ইচ্ছাশক্তি, সে তত বড়। আর সেই শক্তিকে দমিয়ে রাখার কৌশলটাই যুগ যুগ ধরে শাসকেরা রপ্ত করেছে। তারা প্রথমেই মেরে ফেলে চিন্তার বীজটাকে। শিক্ষাকে বানিয়েছে হাতিয়ার—বইয়ের পাতায় ঠেসে দিয়েছে মুখস্থের পাহাড়, কিন্তু মুক্তির স্বাদ শেখায়নি। নতুন চিন্তা আসবে কোথা থেকে? যখন পুরনোটা ফেলে নতুনকে বুকে নেওয়ার দমই কেটে দেওয়া হয়েছে।

আমরা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছি যন্ত্রচালিত মানুষ। নাকি মানুষরূপী যন্ত্র? অফিসের টাইমকার্ডে সই, ভোটের লাইনে দাঁড়ানো, সোশ্যাল মিডিয়ার গরম হাওয়া—সবই যেন অদৃশ্য কারাগার। কেউ যদি একটু অন্যরকম ভাবে, সামান্য প্রতিবাদ করে, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ভয় আর নিপীড়নের ছুরি। দেহ টিকিয়ে রাখতে চাইলে চেতনাকে জমা রাখতে হবে—এ এক শাসকের ঘোষিত অমোঘ নিয়ম।

আজকের আত্মত্যাগও বদলে গেছে। একসময় যে ত্যাগ ছিল সকলের জন্য, আজ তা গুটিয়ে গেছে গুটি কয়েক লোকের স্বার্থে। দেশের জন্য প্রাণ দিচ্ছি—কথাটা শুনতে ভালো, কিন্তু কার দেশের জন্য? সেই দেশের, যে আমাদেরই হাত গুটিয়ে দাস করে রাখছে? আমরা তো দিনকে দিন বৃক্ষের মতো হয়ে যাচ্ছি। ফল, ফুল, পাতা, এমনকি গাছের ছাল পর্যন্ত কেউ ছিঁড়ে নিলেও প্রতিবাদ নেই। ইচ্ছাশক্তি রোহিত, চেতনা নিস্তেজ।

বিবেকানন্দ সেই ব্রিটিশ আমলেই দেখে গিয়েছিলেন—একটা জাতি কেমন করে ধীরে ধীরে নিজের মেরুদণ্ড হারায়। যেখানে শিক্ষা স্বাধীন চেতনাকে জন্ম দেয় না, সেখানে মানুষ কেবল শ্বাস নেয়। সেখানে সমাজও মৃতবৎ, মনুষ্যসমাজ নয়, জড়ের ভিড়। যে জাতি পৃথিবীর সেরা হবার ক্ষমতা রাখত, সে আজ নিস্তেজ, পরাধীনতার শিকলে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে।

এই ঘুম ভাঙাতে গেলে শুধু স্লোগান নয়, চাই গভীর আত্মবিসর্জন। কিন্তু আত্মবিসর্জন মানে নিজের প্রাণ দিয়ে গরিমা নয়—মানেই বাঁধন ছিঁড়ে মুক্ত হওয়া। কাদা দিয়ে কাদা ধোয়া যায় না, শৃঙ্খল দিয়ে শৃঙ্খল খোলা যায় না। যে সমাজে হৃদয়ের উত্তাপ নেই, যে সমাজে ভাবনার উড়ান নেই, সেই সমাজ আগে থেকেই আত্মা হারিয়েছে। সেখানে ভিখারীর ত্যাগ, সন্ন্যাসীর স্রোত—সবই নিছক মুখোশ।

তাই মানুষকে নিজের মাটি খুঁড়তে হবে, নিজের ইচ্ছাকে জাগাতে হবে। শাসকের মাপজোখে নয়, নিজের স্রোতের খেয়ালেই। এই জাগরণ বাইরে থেকে শেখানো যায় না। প্রেম শেখানো যায় না, বিদ্রোহ শেখানো যায় না। যেমন গাছের বীজে ঘুমিয়ে থাকে ভবিষ্যৎ বন, তেমনই মানুষের ভেতর ঘুমিয়ে আছে বিদ্রোহের চৈতন্য। তাকে জাগাতেই হবে—হৃদয় দিয়ে, বুকের উত্তাপে, নিজের শক্তিতে।

নইলে আমরা চিরকাল বৃক্ষ হয়েই থাকব—দেখতে সবুজ, ভিতরে নিঃশেষ।

ক্রমশঃ 

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -২৫-০৯-২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)