আমি মহাভারতের পৃথা -দশম পর্ব
আমি মহাভারতের পৃথা -দশম পর্ব
(নবম পর্বে পৃথা সহ পঞ্চ পাণ্ডব বারানাবাতের জতুগৃহ থেকে গোপনে পলায়ন করে অরণ্যে আত্মগোপন )
"জীবনের সুখ থাকে শুধু স্বল্পক্ষন, জীবনের দুঃখ থাকে সারাটা জীবন" - জীবন দর্শনের এই মহামূল্যবান সত্যটা, মহাভারতের কবি পৃথা চরিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে এই চিরন্তন সত্যটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। সুখের অন্বেষণ করতে গিয়ে জীবনের মধ্যগগনে এসে পৃথা উপলদ্ধি করেছেন এই মহা সত্যটাকে। মাঝখানে সুখ অতিথির মতো তার জীবনে এসে কখন যেন চলে গেছে। জীবনের এই বাস্তবতাই পৃথাকে গভীর সংকটে পড়ে অবিচল থাকার মন্ত্রটা উপলদ্ধি করিয়ে দিয়েছে।
বহুদিনের স্বপ্নপুরন সেদিনই হয়ে গেছিল, যেদিন রাজকুমারদের অস্ত্র পরীক্ষায় শ্রেষ্ঠ ধনুর্বীরের শিরোপাটা তৃতীয় পান্ডবের মস্তকে শোভা পেয়েছিল। পৃথার শুষ্ক হৃদয় সিক্ত হল পুত্রদের কৃতকার্যতায় । একমাত্র বিদুর ছাড়া রাজঅন্তঃপুরে কুশীলবদের উন্নাসিকতা পৃথাকে তার আগামীদিনের কর্মপন্থা নির্ধারণের প্রেরণা জুগিয়েছিল। সেই টুকরো টুকরো রাজবাড়ীর বঞ্চনার স্মৃতিগুলি একযোগে মনের এক কোণে বাসা বেঁধে যাচ্ছিল আর সেই বাসা আরো পোক্ত হল বাস্তবতার নিরিখে, পুত্রদের সামরিক দক্ষতা এবং যুধিষ্ঠিরের বিচক্ষণতা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে। জয়েন্ট পরীক্ষায় বসে পুত্রদের ভালো রেজাল্ট যেমন দুঃখিনী মায়ের মধ্যে আগামীদিনে তাদের প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার পথটা মসৃন করে , যে একটা ভালো চাকরি পেয়ে তার পুত্রের মাধ্যমে আর্থিক সঙ্কটটা মোচন হবে , ঠিক তেমনি পৃথার অন্তঃকরণ পূর্ণ হল আগামীদিনের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তার ভাবনার সিঁড়িটা একধাপ অতিক্রান্ত হবার মধ্যে দিয়ে।
মানবজীবনের ইতিহাসে জয় নামক শব্দটা মোটেই মসৃন পথে আসেনা। তার জন্য জীবনকে দিতে হয় প্রয়োজনীয় সময় , বহু অধ্যবসায় , নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলন,দীর্ঘ দিন ধরে কৃচ্ছসাধন আর সব থেকে বড় যুদ্ধ সেই অন্তঃপ্রকৃতির সাথে নিরন্তর লড়াই শুধু নির্দিষ্ট লক্ষ্যে টিকে থাকার জন্য।
রাজগৃহে মখমলের বিছানা এই মুক্তির সংগীতের অনুশীলনের উপযুক্ত যন্ত্র নয় , তৃণবিছানো শয্যাই তার জন্য উপযুক্ত। পথই বেঁধে দিল তাদের আগামীদিনের গন্তব্যস্থল। হোক সে পথ কঠিন তবুও তারা তো স্বাধীন। লক্ষ্য পূরণের জন্য চাই সাধনা আর সাধনার জন্য চাই মানসিক স্থিরতা আর মানসিক স্থিরতার জন্য এই উদাস প্রকৃতি, মাথার উপর অসীম আকাশ আর আশেপাশে বন্ধুসম গাছপালাই তার একমাত্র উপযুক্ত পরিবেশ। ক্ষত্রিয় নারী পৃথার অন্তরে পার্থিব সুখ না থাকলে কি হবে, প্রগাঢ় শান্তি তাকে এনে দিলো এই অসময়ের বানপ্রস্থ, নিজেকে ফিরে দেখার এক অনন্য সুযোগ। কণ্টকতার আবর্ত থেকে নিজেকে মুক্ত করে শুধু ফুলের সুবাসটা কি করে গ্রহণ করতে হয়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মহাভারতের পৃথা।
ক্রমশঃ
ব্লগার -রবীন মজুমদার
বি দ্রঃ - ভালো লাগলে শেয়ার করুন আর খারাপ লাগলে মন্তব্য করুন।

মন্তব্যসমূহ