সংঘর্ষ (১৩০)
সংঘর্ষ (১৩০)
দ্বৈত এবং অদ্বৈতবাদের মহারণে সাধারণ মানুষ আজ তাকেই গ্রহণ করবে যার মধ্যে যুক্তির সমারোহ আছে এবং প্রমান সাপেক্ষ ব্যাখ্যা আছে।
গত সংখ্যার পর ০ ০ ০ ০ ০
ক্রমবিবর্তনটা কি ভাবে এসেছিল
দ্বৈতবাদীরা বললেন, জীব ও ব্রহ্ম ভিন্ন।
সাময়িকাদ্বৈতবাদীরা বললেন - সংসারে বা অজ্ঞানে থাকাকালীন জীব ও ব্রহ্মের রাস্তা পৃথক হলেও সম্পূর্ণ জ্ঞানদশায় সমস্ত জীব ব্রহ্মে বিলীন হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ তারা বললেন নদী সমুদ্রগর্ভে বিলীন হবার পূর্বে নিজ নিজ পরিচয়কে বহন করে চলে, আর যখন তারা পরিণতিতে মিলে যায় তখন তাদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব থাকেনা অর্থাৎ সাগরে মিলে যায়। ঠিক তেমনি এই সংসার নামক রঙ্গমঞ্চে নিজ নিজ নামরূপে জীব প্রকাশিত হলেও এই দেহের মুক্তিতে তারা পরম ব্রহ্মের সাথে একত্রিত হয়ে যায়। তখন ব্রহ্ম আর জীবের কোন প্রভেদ থাকে না। তাই এই মতবাদ সাময়িকাদ্বৈতবাদ বলে পরিচিত।
দ্বৈতবাদের অনুসরণকারীরা অদ্বৈতবাদকে কিন্তু অস্বীকার করতে পারেন নি, পক্ষান্তরে অদ্বৈতবাদকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন।
জগৎ ব্রহ্ম শক্তির প্রকাশ ও পরিনাম, তাই সে সত্য। বস্তু জগতের নিয়মানুসারে, যে বস্তুর প্রকাশ থাকবে তার পরিনাম অবশ্যই হবে। জীব ও জগৎ ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন হয়েও অভিন্ন। প্রভাকরের(সূর্য) প্রভা(আলো)যেমন প্রভাকরের থেকে আলাদা নয় কিন্তু প্রভাকর, সে তো প্রভার থেকে অধিক।
কোন কোন আচার্য্যদের মতে ব্রহ্ম এক, এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি, তিনি যে বহু তাও সত্য। উদাহরণ স্বরূপ তারা বলছেন, গাছ যেমন তার শাখা প্রশাখা নিয়ে বৃক্ষ রূপে যখন প্রতীয়মান তখন সে এক ; আবার সে যখন শাখা ডালপালা সমারোহে মূর্ত তখন সে বহুরূপে ভাস্বর। এখানে ব্যবধান হলো দৃষ্টিভঙ্গির। যেমন বৃক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যেমন সে এক, আবার ডালপালার দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে দেখলে সে বহু।
সাগর যেমন সাগররূপে এক, তার ফেনারাশি, বহমান তরঙ্গ ইত্যাদি তার রূপ এবং এর কোনটাই মিথ্যা নয়। সোনা যেমন সোনা রূপে এক, আবার গলার হার, চুড়ি ,দূল ইত্যাদিও সোনার বিভিন্ন রূপ, কোনটাই মিথ্যা নয়। প্রভেদটা লুকিয়ে আছে দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকে। সোনার হার, চুড়ি, দূল প্রভৃতিকে গলিয়ে ফেললে সে সোনাতেই বিলীন হয়ে যাবে অর্থাৎ তাদের আলাদা কোন অস্তিত্ব থাকবেনা যেমন তাদের উৎপত্তি যেভাবে সোনা থেকে হয়েছিল।
এইজন্য সমস্ত কারন কার্য্য থেকে ভিন্ন সেটাও যেমন সত্য আবার অভিন্ন সেটাও সত্য। জগৎ ব্রহ্মের কর্মভূমি আবার কর্মের শেষে জগৎ ব্রহ্মে বিলীন , উভয়ই সত্য।
মাটির দ্বারা নির্মিত থালা,বাটী ,গ্লাস, হাড়ি এসবের স্থায়িত্ব খুবই অল্পক্ষনের , এরা মাটির থেকে নাম আর রূপের মাহাত্মে পৃথক কিন্তু এরাই যখন লয় হয় তখন তার আলাদা করে নাম আর রূপ বলে কিছুই থাকেনা , তারা বিবর্ত হয় সেই আদি অকৃত্তিম তাদের যে সত্ত্বা সেই মাটিতেই। তাহলে, এটাই প্রমাণিত হল যে, মাটির দ্বারা তৈরি বস্তু সত্য নয়, সত্য হল মাটি।
যাঁর কোন অস্তিত্ব নেই তাকে উপাসনা করা বাতুলতা
যে ধ্যান ধারণাকে আশ্রয় করে মানুষ দ্বৈতবাদের প্রভাবে অজ্ঞানতা বশত পরমব্রহ্মের সাথে ঈশ্বরকে আলাদা করে বিভিন্ন নাম রূপ দিয়ে তাকে পূজা, যজ্ঞ,পশুবলি ইত্যাদি করে থাকেন। যিনি এক এবং অদ্বৈত, তাই তার আলাদা কোন রূপ বা নাম হয়না, সুতরাং ঈশ্বরকে পরমব্রহ্মের সাথে আলাদা করাটা দ্বৈত বুদ্ধির পরিচয়। যাঁর কোন অস্তিত্বই নেই, তাকে উপাসনা করাটা আর একটা ভ্রমকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার নামান্তর।
কেন এই মিথ্যার সমারোহ
যখন কোন বিশেষ স্বার্থ পূরণের জন্য কিছু স্বার্থন্বেষী মানুষ সাধারণ মানুষকে প্রকৃত সত্যকে গোপন রাখার প্রয়াস করে তখন অসত্যকে সত্য বলে মনে হয়।
যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি পুষ্ট হয়েছে যুগে যুগে একদল ঋষি মুনিদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে, যাদের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে বেদ, বেদান্ত, উপনিষদের মতো যুগান্তসৃষ্টিকারী রচনা আর সেই রচনায় নির্দ্দেশিত হয়েছে মানুষের মুক্তির সঠিক উপায়কে। এতদিন যে অমূল্য সম্পদ যে ভারতবর্ষের চৌহদ্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাকে বিপ্লবী সন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ সমগ্র বিশ্বের দরবারে আজ প্রতিষ্ঠিত করেছেন যুক্তি বিজ্ঞানের হাত ধরে। শুধু তাই নয় দিশা দেখিয়েছেন পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতিকে এক উন্নত জীবনবোধের। আজ এক সংকীর্ণ বাধ্য বাধকতায় সমাজ তথা রাষ্ট্র এই দীর্ঘ শতাব্দী প্রাচীন সংকৃতিকে হত্যা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আজ যদি তা বিশ্লেষিত না হয়, তাহলে অনেক দেরী হয়ে যাবে।
চিন্তা ভাবনার পূর্ণাঙ্গ রূপ হচ্ছে কর্ম। কোন চিন্তাই বাস্তব, সম্পূর্ণ ও জীবন্ত হয়না,যদি কর্ম না থাকে। ক্রিয়া ছাড়া চিন্তা কেবলই ছায়া মাত্র, রক্তহীন। সক্রিয়তায় হচ্ছে চিন্তা ও ক্রিয়ার বাস্তব রূপ।
নেকড়ে বাঘ আর ভেড়ার মধ্যে কখন পবিত্র ঐক্য যেমন কোনদিন গড়ে উঠেনা, ঠিক তেমনি অত্যাচারিতের সাথে অত্যাচারীর পবিত্র ঐক্য হয় না। যেটা হয় বাস্তবে সেটি হচ্ছে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। এই পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অবসানের নিমিত্ত পথ ও মতের নির্ধারণে অদ্বৈত বেদান্তের সার্বজনীন আবেদনে সারা দেওয়াটাই কর্ম।
আজকে মানুষ চাইছে শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান আর এই নূন্যতম বেঁচে থাকার প্রয়োজনকে মিটানোর জন্য নিজ শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের উপযুক্ত পরিবেশ। বাস্তবে তারা পাচ্ছে ধর্মের নামে,বর্ণের নামে বিভাজনের বড়ি। অধার্মিকরা যখন ধর্মের ধজ্জ্বা বয় সমাজ তখন বিষময় হয়ে উঠে।
ক্ৰমশঃ
ব্লগার -রবীন মজুমদার
মহাভারতের যাজ্ঞসেনী- ৫৮ তম অধ্যায় (১২৪)
Searching for hidden Truth (27)

মন্তব্যসমূহ