কুরুক্ষেত্রে একটি বিনিদ্র রাত(১৬১) ( ৪ র্থ পর্ব )


 কুরুক্ষেত্রে  একটি  বিনিদ্র রাত(১৬১) ( ৪ র্থ  পর্ব )


এই পৃথিবীর কোন এক আকাশের নিচে যদি জীবনের অন্তিম মুহূর্ত নেমে আসে, সেদিন কিন্তু এই অজ্ঞাত সৈনিকদের আত্মবলিদানকে কোনদিন গৌরবান্বিত করে ইতিহাসের পাতায় তাঁদের স্থান দেবে না, সেটাও আরেকটা ইতিহাসের বাস্তব চেহারা। পৃথিবীর ইতিহাস মাত্রই শাসকের ইতিহাস, বিজয়ীদের আর রাজা মহারাজের উপাখ্যান, ঐতিহাসিকদের খানিকটা ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হবার কাহিনী ,  সেখানে সাধারনের স্থান ভীষণই নগণ্য। 
  কুরুক্ষেত্রের এই যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ হিসাবে ইতিহাসে খ্যাত। হংসরাজরা এই যুদ্ধে অধর্মের ধ্বজ্জা বহনকারী রাজাদের হয়ে সংগ্রামে রত।  তাদের জীবনের   এটাই সান্ত্বনা , যুদ্ধের লক্ষ্য যাই ই হোক না কেন  একজন সৈনিক হিসাবে তাদের ধর্মটা  পালনে তারা কোথাও কোন ফাঁক রেখে যাই নি।   
 কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ভয়াবহতা সামান্য কয়দিনে এমন উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল যে তা শেষ হবার মেয়াদ আর বেশী দেরী নেই। আর অল্প কয়েকদিনে দুপক্ষের এত সৈন্যের মৃত্যু হংসরাজকে  ভাবী পরিণতির কথা  মনে করে দিলো। এই মৃত্যুর মিছিলে সেও তো   একজন অজ্ঞাত সৈনিক হিসাবে  এই সুন্দর পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।  
 বহু নিরীহ প্রাণের অস্তিত্বের  বিপন্নতার  উপর দাঁড়িয়ে  বিজয়ীর বিজয় সৌধ নির্মিত হবে। তারা চলে গেলেও পৃথিবী তার গতিপথ পাল্টাবেনা। সেই চিরপরিচিত পাখিদের কলকন্ঠের মুখরিত শব্দে ভোরের আলো ফুটবে।   আবার যখন দিনের আলো নিভে গিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে তখন গৃহী তার গৃহকোণে  প্রত্যেক দিনের মতো  সাঁঝের বাতি জ্বালিয়ে শাঁখের আওয়াজে তার ইপ্সিত দেবতাকে বন্দনা জানাবে।  এই সবের মধ্যে ভীষণ অসময়ে তাদের শুধু মাত্র অপরের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের জীবনের  আশা আকাঙ্খাকে জলাঞ্জলি দিয়ে এই মৃত্যু সরণীর পথিক হয়ে অনিবার্য পরিণীতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে, এটাই তাদের ভবিতব্য। এইটা ভাবতে গিয়ে হংসরাজের বুকের ভিতর থেকে এক গভীর দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো।
          হংসরাজ চোখ তুলে রুক্মিণীবাইয়ের দিকে তাকালো। রুক্মিনী দেখলো  জোছনার আলোতে হংসরাজের চোখের কোনগুলি চিক চিক করছে। জান রুক্মিণী, আমার ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছা করছে।  কথাটা যেন রুক্মিনীর কানে আর্তনাদের মতো বাজলো। রুক্মিণী, এই প্রথম অনুভব করলো, তার  মন বলে কোন বিষয় আছে, দীর্ঘ ২০ -২২ বছরের জীবনে তার কাছে এই সুরটি ভীষণ অজানা ছিল। এ যেন কোন এক নাম না জানা গ্রহান্তর থেকে সেই স্বরটি ভেসে এসে সারা অঙ্গে কি যেন এক অনুভূতির আবেশে হৃদয়কে প্লাবিত করে দিল। কি অদ্ভুত সেই অনুভতির মাদকতা ! 
  দেহ - মনের মিলনের ঐকতানের সংগীতের মূর্ছনা এক নগরনটির হৃদয়ে আজ এই সর্ব প্রথম আছড়ে পড়লো। সেই সুরের অনুরণনে সে বিহ্বল হয়ে সে  ভাবতে লাগলো , যে জীবন শুধু মাত্র দেহ মাত্রিক নয় , তার বাইরেও এক অচেনা জগৎ আছে।   অনুভূতির ইন্দ্রিয়গুলিকে  তাকে হাতছানি দিয়ে তারই  মনের গহিন  অরণ্যে নিয়ে এলো, যেখানে বিরাজ করছে অপার শান্তি । 
মা -দিদিমার কাছে শুনে এসেছে, তাদের আত্মত্যাগে সমাজে পরিবার নামক সংগঠনটি আঁটোসাঁটো থাকে আর তার ফলে  সমাজে শান্তির বাতাবরণ বজায় থাকে।   রুক্মিনীর  ধারণা ছিল বেঁচে থাকার প্রধান মন্ত্র হল খাদ্যের যোগানের ব্যবস্থা করা অর্থাৎ জীবিকাকেন্দ্রিক জীবন। সেই খাদ্যের যোগানের জন্য অর্থের প্রয়োজন।  সেই দেহকে বারবার পুরুষের ভোগের নৈবিদ্য সাজিয়ে অর্থের বিনিময়ে  নিজ অস্তিত্বকে  রক্ষা করা।  

 জীবনের  থেকে সেই পাঠটাই সে  গ্রহণ করে ছিল,  যে নারী পুরুষের মধ্যে দেহ বিনা কোন সম্পর্কই হতে পারেনা।  
        দেহের সুখ ও দুঃখকে  মনের অনুভূতি হিসাবে এতদিন ভাবত কিন্তু এটাতো একটা ব্যতিক্রমী অনুভূতি।   রুক্মিনীর অবশ্য জানা ছিলনা নারী পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে দেহহীন সম্পর্কও থাকতে পারে আর দেহ ও মন এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ভালোবাসার জন্ম হয়। প্রেমহীন জীবনে এই ভালোবাসার জোয়ার ফল্গু ধারার মতো বইতে লাগলো।    জীবিকার জন্যই শুধু জীবন নয়, জীবন যে জীবনের জন্য, সেটা সে অনুভব করে ভীষণ মজা পেলো।     

      কামার্ত পুরুষ জঙ্গলের হিংস্র পশুর থেকে কোন অংশে কম নয়। সেই পুরুষদের হিংস্রতা বিসর্জনের সোনারকাঠিটা তাদেরই জিয়নে  লুকনো আছে।  দীর্ঘ দাবদাহের পর যেমন আকাশ থেকে অঝোরে বর্ষা নেমে  এসে পৃথিবীকে যেমন  শান্ত করে। ধরণীর এই ক্ষেত্রটাই  সেই ঝড় জল ঝাপ্টা সহ্য করে এই পৃথিবীতে শান্তির প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখে। ঠিক তেমনি তাদের  মতো দেহপোজীবিনীরাই সমাজ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে এই কাজটি নিরবিচ্ছিন্নভাবে করে আসছে স্বর্গ -মর্ত -পাতালে।  

        রুক্মিনীর ঠিক মনে পড়লো না, যে ঠিক কতদিন পর্যন্ত তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নিজের দখল ছিল।  জীবনে নেমে এলো সেই অভিশপ্ত রাত্রি , যেদিন মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম অনুপ্রবেশ ঘটলো এক পূর্ণ যৌবনের শক্তিশালী পুরুষের।   

         জীবনে  সদ্য কুড়ির আগমনের এক  সন্ধিক্ষনের মুহূর্তে  এক হিংস্র জন্তুর  পদার্পনে প্রস্ফুটিত কুঁড়িকে কামের কদর্য নিষ্পেষণে পদদলিত করে বার্তা দিয়ে গেলো যে সে একমাত্র পুরুষের ভোগের উপকরণ ছাড়া আর তার কোন স্বাতন্ত্রতা নেই।    তারপর  নিরবিচ্ছিন্নভাবে একই ধরনের আচরণের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে কখন যে সেটা একটা  অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। 

        জীবনে যত পুরুষের আবির্ভাব হয়েছে তাদের দৃষ্টি  কখনোই  আমার নাভিকুন্ডলীর উপরে উঠেনি , আজ প্রথম একজন পুরুষ সেই পরিচিত গন্ডিকে অতিক্রম করে তার দৃষ্টিকে আরো উঁচুতে গিয়ে হৃদয়ের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ  করলো। যাঁর দ্বারটি  এই প্রথম পথিকের  আগমনে উন্মোচিত হোল। 

  ক্রমশঃ 

বি: দ্রঃ  ভালো লাগলে শেয়ার করুন , কমেন্ট করুন , ফলো করুন আর খারাপ লাগলেও  কমেন্ট করুন'   

 

১৮/০৪/২০২৩ পর্যন্ত   ১৬১টি  ব্লগ পোস্ট করা  হয়েছে 

আত্মদর্শনমূলক ব্লগ - 

  • ওপারের সংগীত 
  • ঐকতান 
  • সভ্যতার নামে  প্রহসন 
  • নাড়ী ছেড়ার গান 
  • আত্মত্যাগ কখনো কখনো আত্মহত্যার সামিল হয় 
  • দলিতের সভ্যাভিমান 
  • একটি প্রান্তিক মানুষের মৃত্যু সভা 
  • ২১শে ফেব্রুয়ারীর মূল্যবোধ  (১৫২)
নিছক প্রেমের গল্প -
  • বনবিতান 
জীবনের সংগ্রামের পাশাপাশি  মানুষের সংগ্রামের কথা   -
  • চে গুয়েভারা দ্য রেভলিউশনারী আইকন অল দ্য টাইম ( ৪টি পর্বে )
পৌরাণিক - বিশ্লেষণমূলক  
  • আমি মহাভারতের পৃথা (১৭টি পর্বে )
  • ব্যাসদেবের জীবনের অপ্রকাশিত ঘটনা 
  • মহাভারতের রাজনীতি ও নারীদের নীরব বলিদান (৬ টি পর্বে )
  • মহাভারতের যাজ্ঞসেনী (৪৬টি পর্বে )
নগর দর্পন -
  • ধর্ম ও শাসক 
  • সমাজের রাজন্যবর্গ 
  • হালচাল 
  • সহাবস্থান 
  • নারদের মর্তে ভ্রমণ ( ১৮+৬=২৪ টি পর্বে )
  • মনীষীরা কি আজকের রাজনীতির কাঁচামাল 
  • ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই এই সুন্দর ভুবনে 
  • রজ্জুতে সর্প দর্শন 
  •  কুরুক্ষেত্রে  একটি  বিনিদ্র রাত (১-৪ পর্ব )
নিছক প্রেমের গল্প -
  • বনবিতান 
দর্শন আশ্রিত ব্লগ -
  • অহংকারের রসায়ন (৮টি পর্ব - এখনো চলছে )
  • আসা আর যাওয়া 
  • সংঘর্ষ 
  • উত্তর মীমাংসা 
  • আগামী 
  • আমরা বাস করি আনন্দে 
  • সৃষ্টির মুলে দন্দ্ব 
  • অখন্ড যখন খণ্ডিত হয় 
  • কোথায় পাব তারে 
  • গোলক ধাঁধা 
  • চির যৌবনা 
  • রূপ ও স্বরূপের লুকোচুরি 
  • একটি অক্ষরের গল্প 
  • মহাভারতের যাজ্ঞসেনী (৪৫ টি পর্বে -এখনো চলবে )
  • সরণি 
  • পরম্পরা 
  • মেলবন্ধন 
  • সন্ধিক্ষণ 
  •  অনুভূতির বহুগামিতা
  • অসুখ 
  •  সংকট কারে কয় 
  • অন্ধজনে দেহ আলো   
  • প্রেমহীনতা কি  সামাজিক ব্যাধি  

  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)