আত্ম নির্মাণ (২৩৭ )
"ভক্তির অন্বেষণে"র প্রথম পর্বের পর -
নামটা 'ভক্তির অন্বেষণে ' না দিয়ে 'মুক্তির খোঁজে' নাম দিলে ভালো হতো। যাঁরা আজকে এসেছেন কিংবা কালকে আসবেন বা বিগত দিনগুলিতে এসেছেন, সেখানে প্রত্যেকের মধ্যে বোধ হয় একটা ভাবনাই ভীষণ সক্রিয়, তা হচ্ছে সাময়িক মুক্তি দৈনিন্দন একঘেয়ে জীবন থেকে। এক রকম পালিয়ে আসা আর যতটা মানসিক আনন্দ আঁচলে করে বেঁধে নিয়ে যাওয়া যায়। একটা পরিবেশ থেকে অন্য একটি পরিবেশে পা পড়তেই ভাবনাগুলি তাদের সাথে কেমন যেন একাত্ম হয়ে যায়। আবার পরিবেশের পরিবর্তনে সেই পূর্বের চিন্তাগুলি মনের মধ্যে জেগে ওঠে। আবার একরাশ দুঃখের সাগরে ডুবে গিয়ে সঞ্চিত আনন্দের হাড়ি থেকে রস নিষ্কাশন শুরু হয়ে যায়। প্রকৃতির আচরণের সাথে তাল মিলিয়ে আনন্দ আর দুঃখের জোয়ার-ভাটার আমেজে আমরা অসুস্থ বোধ করি। এটাই আমাদের মধ্যে জাগ্রত করছে মুক্তির আকাঙ্খাকে।
কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম। দূর দূরান্ত থেকে দলে দলে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী, পিতামাতার হাতধরে শিশুরাও এসেছেন, কয়েকজনকে দেখলাম সুদূর ফরাসি দেশ থেকে এসেছে ভারতবর্ষের এই আশ্চর্য্য সাধক ও সন্যাসীদের স্মৃতি বিজড়িত মঠকে দর্শন করতে। যাঁদের সামর্থ আছে তারা এসেছেন নিজের গাড়িতে, কেউবা পাবলিক পরিবহনে। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলাকে দেখলাম সিকিউরিটিকে জিজ্ঞাসা করতে যে শিলিগুড়ি যাবার রেলওয়ে টিকিট কোথায় পাওয়া যাবে; মঠের ভিতরে সম্ভবত রেলের টিকিট কাউন্টার আছে। মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতেই দেখলাম, বেশ আঁটসাঁট নিয়ম-কানুনের শৃঙ্খল দিয়ে গোটা মঠটা পরিবৃত। হয়ত মানুষের চিরন্তন নিয়ম ভাঙ্গার অভ্যাসের কথা মনে রেখেই এই সব করা।
দেখা শুনা হল কিন্তু চেনা জানা হলো না। সেটাই নিরবিচ্ছিন্ন সাধনা। যেভাবে প্রত্যহ ঝাড়ু হাতে পৃথিবীর সব ময়লা সাফা করার সাধনায় ব্রতী হয়েছে আজকের ঝাড়ুদাররা ঠিক তেমনি সুক্ষ মনের আবরণের উপর ময়লা না ঝাড়লে জানাটা অজানাই থেকে যাবে, দেখাটা শুধু অন্তঃসারশূন্য হয়ে থাকবে উপলদ্ধি হবে না।
ভক্তিকেও যে ভক্তিভরে খুঁজতে হয় সেটা সমগ্র বেলুড় মঠ ঘুরে আসার বেশ কিছুদিন পরে আবিষ্কার করলাম। তাই সময় নিয়ে পরবর্তী পর্বটা লিখলাম। একেই বোধহয় নলেজ প্রসেস বলে। বস্তু সম্পর্কিত ধারণা যে নিত্য গতিশীল এটা বারবার স্মরণে রাখা দরকার। মনে হয়, আসলে এই পৃথিবীর সব কিছুর মধ্যেই আমরা নিজেকেই খুঁজি সেটা স্ত্রী, সন্তান, পারিপার্শিক প্রকৃতির যা কিছু সৃষ্টি তার কোন কিছুই সেখানে বাদ যায়না। উপরোধের ঢেঁকি গেলা, সে তো হজম হবার কোন লক্ষণ না দেখিয়ে গলার কাছে পুটুলি হয়ে থাকে। যেখানে নিজেকে খুঁজে পাই সেখানে মন আত্ম-তৃপ্তিতে ভরে ওঠে আর যেখানে পাইনা তাকে নেতিবাচক তকমা দিয়ে নিজ অন্তরের সংকীর্ণতাকে অপর কোন বস্তুর উপর চাপিয়ে দিয়ে দায় মুক্ত হই। এইটি বোধ হয় দুর্বল মানুষের একমাত্র সান্ত্বনা।
রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনের স্রোতে কেউবা অবগাহন করছেন আবার বেশ কিছু মানুষ পাড়ে বসে দূর থেকে সতঃ সলিলা বহমান নদীর লীলাকে পর্যবেক্ষণ করে অনাবিল আনন্দ লাভ করছে। এ এক চিরন্তন তৃষ্ণা, সাময়িক ভাবে গলা ভিজলেও আবার দ্বিগুন উৎসাহে ভাব সাগরের জলকে আকণ্ঠ পান করতে উদ্যত হয়। এ যেন এক না থামা বৃত্ত। সেখানে যতি চিহ্নের প্রবেশ নিষেধ।
প্রকৃতি মানুষের জীবনে অপরিপূর্ণতার বীজ রোপন করে বারবার শুধু পরিপূর্ণতার আকাঙ্খার সাথে সংগ্রামে লিপ্ত করে দেয়। অসহায় মানুষ সারা জীবন ধরে সেই অসমাপ্ত আকাঙ্খার পিছনে ছুটে যায়। মাঝে মাঝে এই অসম দৌড়ের প্রতিযোগিতা থেকে পালতে ভীষণ ইচ্ছা করে। এই গতানুগতিকতাকে ভাঙ্গতে গিয়ে মানুষ নিজ রুচি অনুযায়ী সাময়িকভাবে ব্যতিক্রমী হতে চায়। কারোর কাছে সেই লক্ষ্যহীন যাত্রা শুঁড়িখানায় গিয়ে শেষ হয়, যেখানে কারণসুধার কারণগুণের পরিসমাপ্তির সাময়িক নিবৃত্তিতে এই ধূমায়িত সমাজে আবার ফিরে আসা ঠিক যেন ধর্ম স্থান থেকে ফিরে আসার অনুভূতি। মদ না খেয়েও বার বার মাতাল হয়ে যাচ্ছে অভীষ্টকে লাভ করার অদম্য নেশায়। প্রত্যেকের হয়তো ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যাশা কিন্তু সব কিছুর মধ্যে একটা ভীষণ অপূর্ণতার ছাপ। আমরা প্রতি মুহূর্তেই মনের নির্দ্দিষ্ট ঘর থেকে উদ্বাস্তু হচ্ছি শুধুমাত্র ইচ্ছার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
তারিখ - ২৮/১১/২৪
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন