(২৬৭) সময়ের দাবী
(২৬৭) সময়ের দাবী
বর্তমান বিশ্বে যত সমস্যার মুখোমুখি আমরা হচ্ছি, তার বড় একটি কারণ হলো বিভেদ। বিভেদ নানা রকম হতে পারে—ধর্মীয়, লিঙ্গগত ,বর্ণগত, জাতিগত, রাজনৈতিক, ভাষাগত কিংবা অর্থনৈতিক। এসব বিভেদের জন্ম হয় অজ্ঞতা বা গোঁড়ামি থেকে, আবার কখনো তা ক্ষমতালোভী ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠীর কৌশলে উস্কে ওঠে। ছোটখাটো মতভেদ থেকেই বড় রকমের সংঘাত তৈরি হতে পারে। যখন এক শ্রেণী আরেক শ্রেণীকে ছোট করে দেখে, অপমান করে, কিংবা সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখে, তখন সমাজে সৃষ্টি হয় হিংসা, বৈষম্য ও দাঙ্গা। এই বিভেদ মানুষের মনুষ্যত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। মানুষের অহংকারের আঘাত থেকে বিভেদের উৎপত্তি।
*************************************
ত্রিগুন
*************************************
কি দরকার ছিল সৃষ্টি কর্তার ত্রিগুণ(সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) যেমনটি সমানভাবে ছিল অব্যক্ত অবস্থায়, তাকে ব্যক্ত অবস্থায় সাম্যভাবকে ঘুচিয়ে দিয়ে মানুষকে সারা জীবন ধরে সেই না মেলা অঙ্ক কষতে কষতে অবশেষে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ইহকালের পাঠ অসম্পূর্ন রেখে পূর্বের জায়গায় ফিরে যেতে বাধ্য করা। তিনি, ভেবেছিলেন এই উন্নত জীবটি হয়তো পারবে এর সমাধান করতে। অবশ্য এখানেই শেষ নয়, সঙ্গে দিলেন মায়া আর অহংকারকে। কিছু সংখ্যক মানুষ যেমন এই সমস্যার সমাধান করে মহামানব হয়ে গেল আবার এমন কিছু শাসককুল তৈরি হলো, তারা বার বার মনে করিয়ে দিলো তুমি আর তোমার পাশের বাড়ির মানুষটি কিন্তু এক নয়। ওটাই তাদের ইউ. এস. পি.।
পারস্পরিক বিশ্বাস যেখানে মানুষের মানুষত্বের বিকাশ ও সমাজের অগ্রগতির ভিত্তি , সেখানে বিভেদ তিল তিল করে সেই ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়ে বৈষম্যের সাম্রাজ্যকে বিস্তার করে। অজ্ঞানতার একটি স্তরে গিয়ে মানুষ ভাবে সে নিজে অন্যের সাথে পৃথক, তার ধ্যান ধারণা অন্যের থেকে উৎকৃষ্ট। সেখান থেকে বিভেদের দেয়ালটাতে একটা একটা করে ইট পড়তে শুরু করে। সেদিনের বন্ধুত্ব ঈর্ষার হাত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় শত্রুতার দিকে, যে বাহুটা প্রসারিত ছিল অপরের হাতটা ধরার জন্য, তার দূরত্বটা ক্রমশই বাড়তে থাকে। সব মিলিয়ে সমাজে বেড়ে যায় অস্থিরতা, উন্নয়ন সেখানে মুখ থুবড়ে পরে।
*************************************
সামাজিক সচেনতা
*************************************
আধুনিক সমাজে বিভেদ ও তার বিপদ-বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে মানুষ আরও বেশি ভাগ হয়ে পড়ছে। ‘আমি আর তুমি’—এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হতে পারছে না অনেকে। ধর্মীয় উগ্রতা, জাতিগত বিদ্বেষ, এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব সমাজে বিভেদের বিষ বপন করছে। এইসব বিভেদ শুধু সামাজিক শান্তি নষ্ট করে না, বরং একটি জাতিকে পিছিয়ে দেয় যুগের পর যুগ।
উপরোক্ত বাস্তবতা ইঙ্গিত করে এই দ্বৈত ভাবনা "আমি আর তুমি" এক নয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই বিভেদের একমাত্র কারণ। তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের উগ্রতা আর তার সাথে যুক্ত স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের অপপ্রচার।
পন্ডিতগণ বলে ঐক্য চাই। কিন্তু বিভেদের জন্মের ইতিহাস না জানলে তার মৃত্যুর কারণটা বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আসলে, বিদ্বেষ নামক বিষটা কবেই অহংকারের হাত ধরে মনকে অধিকার করে বসে আছে। আসল দ্বন্দের ধন্ধটা লুকিয়ে আছে মানুষের মনোজগতে। সুতরাং, লক্ষ্য হচ্ছে দ্বৈতের স্থানে অদ্বৈতের ধারণার বীজটা পুঁততে হবে অর্থাৎ নিজেকে পরিবর্তনই একমাত্র মুক্তির পথ।
ঐক্যই সমাধান-
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে ঐক্য। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, এবং মানবিকতা—এই তিনটি গুণ যদি আমরা ধারণ করি, তবে সমাজে বিভেদের কোনো ঠাঁই থাকবে না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঐক্যের বার্তা ছড়াতে হবে। শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সহনশীলতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দিতে হবে।
*************************************
বিভেদের ফলাফল ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট
বর্তমান বিশ্বে বিভেদ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, ধর্মীয় উগ্রতা, বর্ণবিদ্বেষ, নারী-পুরুষ বৈষম্য, রাজনৈতিক সহিংসতা ইত্যাদি দিন দিন বাড়ছে।
বিশ্বজুড়ে ইসলামফোবিয়া, বর্ণবৈষম্য, অভিবাসী বিরোধী মনোভাব, এসব বিভেদের বহিঃপ্রকাশ। অনেক উন্নত দেশেও এই সংকীর্ণ মনোভাবের কারণে সমাজে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
আমরা প্রায়শই ধর্ম, রাজনীতি, ভাষা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে ছোট করে দেখি বা ঘৃণা করি। রাজনৈতিক বিভক্তি এতটাই বেড়েছে যে একে অপরকে সহ্য করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর ফলে সমাজে সৌহার্দ্য, সমঝোতা ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মন্তব্যসমূহ