(২৭০ ) গানে গানে রবীন্দ্রনাথ (দ্বিতীয় সংখ্যা )

 (২৭০ ) গানে গানে রবীন্দ্রনাথ  (দ্বিতীয় সংখ্যা )


রবীন্দ্রসৃষ্টি নিয়ে একটি কোলাজ (২)

হৃদয়বৃত্তির বিকাশের অভাব  আজ এই সময়ে ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছে।  এই উত্তরণের কান্ডারীকে এই তামসিক দিনে স্মরণ করা ছাড়া উপায়ান্তর নেই। তাই  তারই গানে গানে তারই সৃষ্টির অন্বেষেণ। 

            *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

 "যদি    জানতেম আমার কিসের ব্যথা তোমায় জানাতাম"  

চাওয়ার সাথে পাওয়ার ব্যবধান চিরকালের। সেই চাওয়ার উৎস হয়তো হারিয়ে যায় কিন্তু সেই   না পাওয়ার হারিয়ে যাওয়া বেদনাটা এক অদৃশ্য আকাঙ্খার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় আর সৃষ্টি করে এক চিরন্তন বিষাদকে। এই বিষাদ থেকেই সৃষ্টি হয় কতনা কাব্য ও গান।

               *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

শূন্য হাতে ফিরি, হে নাথ, পথে পথে-"-

 কবির একান্তই অনুভূতি কখন যেন আত্মার চিরন্তন অন্বেষণ ও জীবনের অপূর্ণতার কথা বলে। এটি এক গভীর দার্শনিক অনুভব, যেখানে ব্যক্তি জীবন ও বিশ্ব-সত্তার (ঈশ্বরের) সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা মুখর হয়ে ওঠে এই গানে। 


               *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

  "বাজিল কাহার ও বীণা " 

হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক নবজাগরণের গান। এটি বাংলা সাহিত্যের গীতিকবিতার ঐতিহ্যে এক দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রকৃতি, প্রেম এবং আধ্যাত্মিকতা মিলেমিশে সংগীতের সুরে  এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করেছে। 


           *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

 " গগনে গগনে আপনার মনে কী খেলা তব"

কবির সাথে প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের অসীম, পরিবর্তনশীল, রহস্যময় উপস্থিতিকে উপলদ্ধির করানোর চেষ্টা করেছে আমাদের মনে।  


           *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

  "এ পারে মুখর হল কেকা ওই,     ও পারে নীরব কেন কুহু হায়"

এ যেন প্রকৃতির আগামীর রূপেরেখা, যার  মাধ্যমে মানুষের প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা ও মিলনের অতৃপ্ত বাসনাকে কবি তুলে ধরেছেন। প্রকৃতির উপাদানগুলিকে ব্যবহার করে মানুষের অন্তর্নিহিত অনুভূতিগুলিকে প্রকাশ করেছেন।  


           *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

"আমার প্রাণে গভীর গোপন মহা-আপন সে কি"

গানটির মূল ভাবনা এক অন্তর্নিহিত, অজ্ঞাত, কিন্তু গভীরভাবে অনুভূত সত্তার প্রতি আকর্ষণ। এই সত্তা কখনো অন্ধকারে হঠাৎ দেখা দেয়, কখনো দুর্দমনীয় ঝড়ে হৃদয়ের পাতা উল্টালে তার উপস্থিতি অনুভব হয়।  গানটির প্রতিটি চরণে এই রহস্যময় সত্তার সঙ্গে মিলনের এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত বহন করছে।


           *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

 "তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে" 


গভীর আত্মিক অনুভূতি ও ঈশ্বরের প্রতি নিবেদনের এক অনন্য প্রকাশ। এই কবিতায় কবি বিরহের মধ্যেও প্রিয়তমের (ঈশ্বরের) সান্নিধ্য অনুভব করেন এবং সেই বেদনা ও বিচ্ছেদকে পূজার উপহার হিসেবে অর্পণ করতে চান। 


           *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

 "তোরা  যে যা বলিস ভাই,  আমার সোনার হরিণ চাই"

এ যেন এক  কখনই শেষ না হওয়া  আকাঙ্ক্ষা, যা কখনোই ধরা দেয় না, কিন্তু তার মোহে মানুষ সবকিছু ত্যাগ করতেও প্রস্তুত থাকে। 


               *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

"আমার মাথা নত কোরে  দাও  হে  তোমার "  

জীবনের মধ্যে গগনে এসে  কবির আত্মোপলদ্ধি  হয়েছে তাঁর বন্দীত্বের কারণ কোথায় লুকিয়ে আছে। যে সব সম্পদকে নিজের বলে মনে হয়, আসলে তাঁর কোনটাই নিজের নয়। ভুলক্রমে যাঁর উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলো আসলে সেটাই ছিল বন্ধন বা মায়া। কবির চৈতন্যের  উদয়ে সেই মিথ্যা অহংকারকে জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলে পরমপিতার কাছে আত্মসমপর্ণের মধ্যেই মুক্তির দিশাকে তিনি  প্রত্যক্ষ করছেন। তাকেই তিনি সার্বজনীন করে তুলেছেন তার গানে এবং কবিতায়।  

আসলে, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রার্থনা, যা আমাদের অহংকার ত্যাগ করে ঈশ্বরের চরণে আত্মসমর্পণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

                   *    *    *    *    *    *    *    *    *    *

 

 ক্রমশঃ 

ব্লগার -রবীন মজুমদার 
তারিখ -০৯/০৫/২৫

ভালো লাগলে অন্যকে শেয়ার করুন। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)