(২৭৮) সংস্কৃতভাষার সাংস্কৃতিক গুণপনা -
(২৭৮) সংস্কৃতভাষার সাংস্কৃতিক গুণপনা -
পণ্ডিত কমে যাবার সাথে কি মূর্খের সংখ্যা বৃদ্ধির কি কোন সম্পর্ক আছে ? থাকলে থাকতেও পারে কিংবা নেই। প্রচলিত ' পণ্ডিত ' উপাধিটির সাথে সংস্কৃত সাহিত্য চর্চার একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। অথচ, এই ভাষাকেই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা জনসাধারণের ভাষা যাতে না হয় তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন।
যে মহাকাব্যগুলি ভারতবাসীকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে সেই চিরনবীন মহাকাব্যগুলি, বেদ-বেদান্ত, উপনিষদ ও অন্যান্য মহামূল্যবান দর্শনগুলি এই সংস্কৃত ভাষাতেই লেখা হয়েছিল। এই ভাষাটির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম এবং সেই অর্থে তাকে নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। ক্ষীণ হলেও বহু ভাষাভাষীর আগমনে তার সাথে সংগ্রাম করে সে তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছিলো।
অবশেষে এলো, ইংরেজ আমল, ভাষাকে দাড়িপাল্লায় বসিয়ে তার ব্যবহারিক মূল্য যখন ভাষা চর্চ্চার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ালো, তখন সংস্কৃত ভাষার চর্চ্চার পরিসর ক্রমেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে লাগলো। যে কোন ভাষাভাষীর কাছে তাদের ভাষা নিজ নিজ হৃদয়ের বিকাশের অন্যতম মাধ্যম।
শব্দ ভাষা তৈরির এক মৌলিক উপাদান , যাকে ছাড়া ভাষাই সৃষ্টি হতো না। সে যেমন একাধারে অর্থকে প্রকাশ করতে পারে আবার বাক্যের গঠনেও তার ভূমিকা আছে।
পর্যাপ্ত শব্দের ভান্ডার বাক্য গঠনের অন্যতম সম্পদ। সু-বাক্য এবং কু-বাক্য একই বাড়ির বাসিন্দা, কেবল মানুষের ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির তারতম্যে শব্দের ঝুলি থেকে তারা আত্মপ্রকাশ করে। এক্ষেত্রে শব্দের ধ্বনির তারতম্য ঘটে উত্তেজনার পারার সন্তুষ্টি প্রদান করতে। তাই সেখানে কখন উচ্চগ্রামে আবার সময়বিশেষে একান্তই নিম্নগ্রামে সুরটি বাধা হয়ে থাকে।
সময়ের সাথে সাথে কখন সংযোজন, আবার কখন বিয়োজন কিংবা অদলবদল আর সব বিষয়ের মতো ভাষার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বাংলা এবং সংস্কৃত ভাষা পাশাপাশি বিচরণ করতে করতে কবে বেশকিছু সংস্কৃত ভাষা বাংলা শব্দ ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছিল, যাকে আমরা তৎসম শব্দ বলে জানি। আবার সংস্কৃত ভাষাকে ভিত্তি করে কিছু অদলবদল করে বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে ঢুকে পড়েছে, যাকে আমরা তদ্ভব শব্দ বলে থাকি।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার বিপুল সাহিত্য ভান্ডারের রসদ কিন্তু কুড়িয়ে এনেছিলেন সংস্কৃত থেকেই।
ফুলের গন্ধের সুবাসে যেমন মক্ষি আকৃষ্ট হয়, ঠিক সেই রকম সংস্কৃত ভাষাকে আঁকড়ে বেড়ে ওঠা পঞ্চতন্ত্র, কথাসরিৎসাগর, গৌতম বুদ্ধের জীবনী যখন পশ্চিমের বাগানে প্রোথিত হলো, তখন তার গন্ধে উৎসাহী পাঠক কুল রচনার মুলে যে মৌলিক উপাদান সেই সংস্কৃত ভাষার সাথে সম্পর্ক পাতাতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। শুরু হলো সংস্কৃতকে অবলম্বন করে বেড়ে ওঠা ছোট বড় সৃষ্টির অন্বেষণ।
চার্লস উইলকিন্সের হাত ধরে 'ভগবতগীতা', 'হিতোপদেশ' , উইলিয়াম জোনসের আনুকূল্যে কালিদাসের ' শকুন্তলা ' এবং ' মনুসংহিতা' ইংরেজিতে অনুবাদ হয়।ভাগ্যান্বেষণে এসে এক বোর্নিয়ে নামে এক ফরাসি দেশে ফিরলেন শাহাজান পুত্র দারাশুকোর সম্পাদনায় রচিত 'উপনিষদের' ফার্শি অনুবাদ। বহু ভাষার অনুবাদকদের হাত ধরে দীর্ঘ যাত্রার শেষে জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ার 'উপনিষদ' পড়ে বলেছিলেন, এই উঁপনিষদ তাঁর সারা জীবনের সান্ত্বনা এবং মৃত্যুকালীন শান্তি। আর ম্যাক্সমূলার সাহেবের অবদান তো সর্বজনবিদিত।
মন্তব্যসমূহ