(২৭৯) আবার মেঘদূত

(২৭৯)  আবার মেঘদূত 


কি রাজসিক তার আয়োজন, আকাশকে রনশয্যায় সাজিয়ে নিয়ে বজ্রের দুন্দভি বাজিয়ে বর্ষার আগমন। মনের মাটিকে সিক্ত করে বাস্তবের মাটিতে আষাঢ়ের বর্ষা ঢলে পড়ে। তাইতো মন তাকেই বারেবারে চায়, মনের শুস্কতা নিবারনের জন্য।

প্রাচীনকালে বর্ষার সময় না করা যেত যুদ্ধ, না করা যেত ব্যবসা বাণিজ্য, প্রায় পূর্ণ সময়টা মানুষ  ছিল কর্মহীন। জলপথে ও স্থলপথে চলাফেরা করা ছিল অসম্ভব। যে সব পুরুষরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকতো, তারাও ঘরে ফিরে আসতেন। যদি কোন কারণে পতি সেই সময়ে ঘরে প্রত্যাবর্তন করতে না পারলে স্ত্রী ও স্বামী উভয়ের কাছে এই সাময়িক বিরহ এক  গভীর বেদনার আকার ধারণ করতো। ভারতীয় কাব্য সাহিত্যে বর্ষা আর বিরহ প্রায় সমার্থক। একটু দিক্পাত করলেই তার যথাযথ উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে। শুধু যদি রামায়নের সময়কাল থেকে ধরা হয়, তাহলে, কিস্কিন্ধ্যাকান্ড, মেঘদূত, জয়দেব ও বৈষ্ণব গীতিকা এবং সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথের সময়কাল পর্যন্ত বর্ষার মেঘ কি ধরনের মায়া বিস্তার করে পাঠককে সহযাত্রী এবং সহমর্মী  করে তুলেছিল, তা আমরা ভুলতে পারিনি। 

বর্ষা যদিবা মানুষকে বহির্মুখী করতে বাধা দান করতে পারে, কিন্তু ভাবনাকে তো আর  বেঁধে রাখতে পারেনা। বিরহে কাতর, আবেগ তাড়িত কবি মনের মধ্যে কাব্যের বীজ বপনের  এটাই উৎকৃষ্ট সময় হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। 

পৃথিবীর সাহিত্য রচনায় দূতের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। এখানে মেঘকে যেমন দূত হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে আবার মহাভারতে  হংসদূত, জাতকে আছে কাকদুত, চীনের কবি সিনকান যক্ষের মতো মেঘকে দূত করে তার প্রিয়ার কাছে সংবাদ প্রেরণ করেছিলেন। 

বিচ্ছেদই বিরহের মৌলিক উপাদান। তাহলে কি জীবনের প্রথমদিনে শিশু যখন মাতৃক্রোড় থেকে সংযোগ মুক্ত হয়ে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে বিশ্ব সংসারের সাথে যুক্ত হয়, তখন তো মাতা ও শিশু অবচেতন ভাবে সেই বিচ্ছেদ বেদনার সাথে প্রথম পরিচিত হয়, সে ও এক ধরনের বিরহ। তাহলে বিরহের প্রকার ভেদ আছে, ধরে নেওয়া যেতে পারে। যেমন প্রথমটি হলো অবচেতন মনের  বিরহ আর অপরটি পূর্ণ চেতনায় বিচ্ছেদঘটিত বিরহ। আবার বিরাহকে স্থায়ী বিরহ এবং ক্ষণস্থায়ী বিরহ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। যক্ষের বিরহ এখানে ক্ষণস্থায়ী বিরহের পর্য্যায়ে পরে। তাতেই সে স্বর্গ-মর্ত মন্থন করে ফেলেছিলেন। 

কিভাবে প্রকৃতিকে নারীরূপে কল্পনা করে বিশেষণকে বিশেষ্যপদবাচ্য  করে শব্দের ব্যবহারে পাঠককূলে যৌনতার বাতাবরণ সৃষ্টি করতে হয়, তার একমাত্র রূপকার  মহাকবি কালিদাস, অবশ্য এই ক্ষমতা সংস্কৃত ব্যাকারনেরই আছে । কবির কোন সম্বোধন যখন স্বাভাবিকত্বর  মাত্রা ছাড়িয়ে নারীর দেহের শারীরিক বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে পরে, তাতে করে সে যে আসলে কামোদ্দীপক ঘটনার অবতারণা করতে চাইছে, সেটা বুঝতে পাঠকের অসুবিধা হয় না।  

আসলে শিল্প কোনদিন কৃত্তিমতাকে অতিক্রম করতে পারেনি, কেননা সে তো রচিত। যা দেখছি এবং যা বুজেছি তারই প্রতিধ্বনি শিল্পীর তুলিতে ফুটে উঠেছে। তবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কৃত্রিমতার আঁচকে অভিনয় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, সেটাই শিল্পীর কৃতিত্ব। 

সম্বোধনের সময়ে যদি নারীদেহের শরীরের একটি অংশকে শব্দের স্বাধীনতা দিয়ে তুলে  ধরে, তবে তো পাঠকের নজর সর্বাগ্রে সেই স্থানে গিয়ে আবদ্ধ হয়ে যাবে। যে কবিতার ডাকে সাড়া দিতে অভ্যস্ত, তাদের  মনে খানিকটা  যৌন অনুভূতির সঞ্চার হবে বৈকি। আর সেটাই কবির দীর্ঘজীবনের জিয়নকাঠি। 

আমরা সত্যিই কি কালিদাস কিংবা বাল্মীকি কিংবা রবীন্দ্রনাথের প্রতি অন্তরের শ্রদ্ধা জানাই না আমাদের অন্তরস্থ ইচ্ছার সাথে তাদের সৃষ্টির কোথাও একটা যোগসূত্র তৈরি হওয়াতে আমরা  আবেগপ্রবণ হয়ে উঠি। তাঁদের বলা আমাদের  অন্তর্নিহিত কথা গুলি  যখন আমাদের কথার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে, তখনিই তাঁরা আমাদের প্রাণের কবি হয়ে ওঠেন।  

যে অভিযানে রোমাঞ্চ আছে, সে তো আমাদের ভীষণ আকর্ষণীয় বস্তু, সুন্দরের হাতছানি, টাইম মেশিনে চেপে হাজার হাজার বছরকে পিছনে ফেলে  পূর্ব মেঘের সাথে হাত ধরে পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী জনপথ পরিক্রমা। আমাদের ভালোলাগে  যক্ষের বিরহের সাথে আমাদের বিরহের মিলটাকে অনুসন্ধান করতে। এই সবের পিছনে বর্ষা ঋতুর অবদানটা কিছুতেই ভুলতে পারিনা।  

আসলে আমরা ক্রীড়ানক প্রকৃতির রাজ্যে,যদি এতো বৈচিত্র না থাকতো, তাহলে  সময়ে সময়ে বিচিত্র ভাবনার উদয় হতো না।  তারই মধ্যে একটি ব্যাসদেব, বাল্মীকি  বা কালিদাস কিংবা একটা আস্ত রবীন্দ্রনাথকে পেয়ে গেলে তো আর কথা  নেই।  

যে ভাবটা অন্তরে বিকশিত হতো কিন্তু প্রকাশিত হবার জন্য শতাব্দীর পর  শতাব্দী অপেক্ষা করতে হতো, এই কবিকুল আমাদের মুখে সেই ভাষাটাই দিয়ে  দিয়েছে। এই ভাবেই একের পর এক উত্তরসূরি তৈরি হয়ে প্রকাশের ক্ষেত্রটাকে  মজবুত করে দিয়েছে। এই পরম্পরার এক অনবদ্য নজির আছে, তা তাদের সৃষ্টির গভীরে গেলেই বোঝা যায়। 

মেঘের আবির্ভাব এমন এক সময়ে, যখন প্রখর রৌদ্রতাপে পৃথিবী দগ্ধ হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে তপ্ত জীবনে শান্তির বারির প্রতিশ্রুতির আগমনী গানটা মেঘের উপস্থিতিতে আমাদের শুষ্ক মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। বৃষ্টি আসার সময়ে উপভোগ করি এক একটা অলস দিন। তাইতো মেঘের এতো চাহিদা। প্রাক-আনন্দের বাণী বহন করা এই  ডাকহরকরা। চাষী যেমন আকাশপানে মেঘ দেখে আনন্দিত হয়, ঠিক তেমনি জানলার ধরে কাগজ পেন নিয়ে বসে থাকা কবিও মনে মনে উত্তেজনা নিয়ে  লেবাররুমে অপেক্ষা করে কখন তার মানস সন্তানটি প্রসবিত হবে। 

কাগজে লেখা নিস্প্রান শব্দগুলি তখনিই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যখন হৃদয়ের তৃষ্ণার সাথে শব্দগুলির অর্থের মেলবন্ধন ঘটে। আর যারা বই আকারে টেবিলে শোভা বর্ধন করে তারা যেন সর্বক্ষনের জ্ঞানতৃষ্ণা মিটাবার কলস।  যখনই তৃষ্ণা অনুভূত হয় তখনি কলস থেকে গড়িয়ে এক ঢোক জল পান করে তৃষ্ণা নিবারণ। 

চলবে ০০০০০০০০০
ব্লগার -রবীন মজুমদার 
তারিখ -১৯/০৬/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে  শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন। 
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)