২৯৬ ইতিহাসের পূর্ণ আলোকে মেঘদূত দর্শন - ১৬ তম পর্ব

 ২৯৬ ইতিহাসের পূর্ণ আলোকে মেঘদূত দর্শন -  ১৬ তম   পর্ব  

রামায়ণ ও কালিদাসের মেঘদূত  এবং পরবর্তী সময়   (৬) 

 সমাজ যত এগিয়ে যায় তখন পিছনে ফেলে যায় অতীতের মূল্যবোধকে , সেই শূন্য স্থানটি দখল করে নেয় কৃত্তিমতা। যারা একদিন বাল্মীকির কাব্যে গ্রাম, অরণ্য ও পাহাড়বাসী  ছিল,  কালিদাসের সময় তারা শালবন কেটে জঙ্গলকে দূরে সরিয়ে রেখে ধীরে ধীরে নগরবাসীতে পরিণত হলো। সহজ সরলভাবে বৃদ্ধি পাওয়া প্রকৃতি সৃষ্ট অরণ্য পরিণত হল মানুষের তৈরি মেকি অরণ্যে, যার নাম উদ্যান ও নগর। 

বাল্মীকির বহু উপমায় যেমন বনের সিংহ, বাঘ, বিসাক্ত সাপ, হাতী ও হরিনের মেলা দেখি আর সেই বনে নিশ্চিন্তে রাম, লক্ষণ ও সীতা নির্ভয়ে নিদ্রা যাচ্ছে। আবার লঙ্কার বর্ণনায় দেখি হাজারো তরুর বনচ্ছায়ায় ঘেরা বাসভূমি। সে যুগের  মানুষেরা প্রতিনিয়ত হিংস্র জন্তুদের উপস্থিতিকে স্বীকার করে নিয়ে, একই সাথে তারা জীবনধারণ করতো।  এ  যেন ঋগ্বেদের অরণ্যের বর্ণনার অসমাপ্ত রেশকে টেনে নিয়ে এগিয়ে  যাচ্ছে।  

কালিদাসের ভারতবর্ধ, আদিম জীবনের স্বাদ আল্হাদ থেকে  বঞ্চিত, সামাজিক বাঁধনের নাগপাশটা মনুর কারখানায় নির্মিত। কবির ভাবনা প্রকাশের স্বাধীনতাও রাজার অনুশাসনের বিধিবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।  তাই কালিদাসের কাব্যে সহজভাবে জীবনকে প্রকাশ করার পক্ষে যতটা অন্তরায় ছিল, ঠিক ততটাই মুক্ত ছিলেন  মহাকবি বাল্মীকি।  

যে সমস্যাটা কখনই বাল্মীকির সামনে উপস্থিত হয় নি কিন্তু কবি কালিদাস  তার প্রতিভা, নিটোল কল্পনা আর নিপুন সৃষ্টির কৌশলে  যুগের স্থবিরতাকে অতিক্রম করে অসীমতার সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে তার কবি ভাবনাকে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন বলেই, তিনি তো সর্বকালের কবি হিসাবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন।  তাই মেঘদূত কাব্যে কালিদাস মেঘকে চলার পথে তার একাধিপত্যতাকে  প্রাধান্য দেননি.  বরং নেপথ্যে থেকে পরামর্শদাতা হিসাবে মেঘের যাত্রাপথ নির্দ্দিষ্ট করে দিয়ে,  মেঘের বিচরণে  যে সমাজজীবনের সর্বাঙ্গীন চিত্রটা আমাদের সামনে তুলে ধরে আসলে, কবি  তাঁর মনের অভিলাষ পূর্ণ করেছিলেন। 

 বিশ্বপ্রকৃতির চলার রাস্তাটি কখনই সোজাভাবে হয় না, কেননা সোজা লাইনের সমাপ্তি নেই বলে।  তাই বিশ্ব তার স্বভাব অনুযায়ী গোলাকার পথ ধরে গিয়ে তার  যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে। সাবলীল চলার রেখায় কখন তাল ও সুর রচিত হয় না, দুটি পৃথক ধারা যখন এক সূত্রে বাঁধতে চায় শুরু হয় দ্বন্দ্বের আর সেই দ্বন্দ্বই  সুর সৃষ্টির প্রাথমিক অভিব্যক্তি। প্রকৃতির ভিন্ন  চরিত্রের সংঘাতকে মানুষ কখন চেতনে, কখনো অবচেতনে নিজ অন্তরে জাগরিত করে, অপরের মাধ্যমে  এইভাবেই মানুষ নিজেদেরকে  বিকশিত করে। 

সৃষ্টি যদি কার্য্য হয়, তাহলে কারণ অবশ্যিই যৌনতা।  কার্য্যকে দেখা যায় অথচ কারণ থাকে আড়ালে। তাই সব কিছু বাধা নিষেধকে অতিক্রম করে মেঘকে দিয়ে মহাকবি কালিদাস উল্লেখযোগ্য স্থানগুলিতে নিয়ে গেছেন, পুরনারীদের সাথে মেঘের  চক্ষুদ্বারা রমন করিয়েছেন এবং সেই উষ্ণ মুহূর্তগুলির ধারাবিবরণী দিয়ে পাঠককে সেই উষ্ণতার আঁচে সেঁকে আজীবনের জন্য দাগ লাগিয়ে  দিয়েছেন।  

 চলবে ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

ব্লগার -রবীন মজুমদার 

তারিখ ২৭/ ০৭/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে  শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন। 
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)