২৮৭ ইতিহাসের পূর্ণ আলোকে মেঘদূত দর্শন -সপ্তম পর্ব
পরাধীনতার নোনতা স্বাদ নিতে নিতে ক্লান্ত জাতি অমৃত ভাণ্ডারের খোঁজে এগোতে গিয়ে দেখে, সম্মুখে সমর আর পিছনে প্রাচীন কৃষ্টির অহংকার , এই দুইয়ের মধ্যে প্রাচীন কথকতার অহংকারকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসে জাতির বোধকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা চালালো। বলল, হে ভারতবাসী দেখ, আমরা হতে পারি পরাধীন, কেননা আমাদের সংস্কৃতি শিখায়নি অপরের রাজ্য হরণ করতে, যা দুস্যুবৃত্তির সামিল। তাই কোন কালে যুদ্ধবৃত্তি আমাদের গ্রাস করতে পারেনি, আমাদের ঋষি মুনিদের দৃষ্টি ছিল অন্তঃকরনের দিকে, জগত সৃষ্টির কারণ জানতে আর এই দুঃখময় পৃথিবীকে জয় করার মন্ত্র অনুসন্ধানে।
বেদের মতো সাহিত্যের আমরা উত্তরসূরি, বেদান্ত ও উপনিষদের মতো পৃথিবীর মানুষের অন্তরাত্মাকে শাসন করার মতো অস্ত্র আমাদের হাতে। হতে পারে তারা জোর করে রাজনৈতিকভাবে শাসন করছে কিন্তু বিনা রক্তপাতে আমরা সমগ্র বিশ্বকে শাসন করবো শুধু মাত্র প্রেমের প্লাবনে। শুধুমাত্র ধৈর্য্য প্রাথর্নীয়। কিন্তু সেই সাহিত্য ও দর্শনগুলির মাধ্যম ছিল সংস্কৃত, বর্তমানে সে প্রায় অতীতের গর্ভে অস্তমিত।
সে যেন এক মাহেন্দ্রক্ষণ, ভারতীয়দের তৎকালীন ভাবনার সাথে যুক্ত হল ইউরোপের পন্ডিতের ভারতীয় সাহিত্যের ভান্ডারের প্রতি অনুরাগ। সেই অনুরাগ পর্যবসিত হলো বাস্তবায়নে। তাদের আগ্রহ এবং আনুকূল্য, সংস্কৃত ভাষা আবার দীর্ঘদিনের বনবাস কাটিয়ে বঙ্গদেশে যে বিপুল চর্চা শুরু হয়েছিল, সেটি ১৯শ শতক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই ১৯শতকের মধ্যভাগে মেঘদূত অনুবাদ শুরু হয়।
"বিরহ" শব্দটির পিতৃত্বের দাবিদার সংস্কৃত ভাষা। " বি " শব্দটির অর্থ হলো " না থাকা " আর " রহ " শব্দটির অর্থ হল " অবস্থান করা বা থাকা।" রহ"র আগে "বি " যোগ করে দিলে শব্দের দ্বিতীয় ভাগের যে মাহাত্ম অর্থাৎ যে স্থিতি চেয়েছিল, সেই শব্দটার প্রথম ভাগ মিলে গিয়ে বিচ্ছেদের মতো একটা করুণ ভাবের জন্ম দিলো। আর এই টানাপোড়েন নিয়েই মেঘদূত। দীর্ঘদিন "রহ " অর্থাৎ দক্ষ ও তার প্রেমিকা এক সাথে 'অবস্থান করছিল' , হঠাৎ "বি " রূপে কুবের এসে "রহ"র পূর্বে "বি" যুক্ত হয়ে তাদের জীবনের বৃত্তটি "বিরহ" নামে এসে সংপৃক্ত হলো। সে এসে আপনকে করলো পর, দক্ষ এবং দক্ষিণীর মধ্যে ব্যবধান রচনা করে জীবনে সুখহরণকারী গোলকধাঁধায় ঠেলে ফেলে দিলো। মহাকবি কালিদাস কালবিলম্ব না করে দক্ষদের নিয়ে লিখে ফেললেন তার কালজয়ী খন্ড কাব্য "মেঘদূত"।
পূর্ব সংখ্যার পর ০০০০০০০০০০০
কাব্যে প্রকৃতির প্রভাব
কৌতূহল উদীপ্ত হয় সেখানে, যেখানে প্রকৃতিকে যুগে যুগে কি ভাবে মানুষেকে প্রভাবিত করে আসছে। তাই তাদের সৃষ্টির বর্ণনার মধ্যেই ফুটে উঠেছে প্রকৃতির উজ্জীবিত সময়ের মূর্ছনাগুলি। ইতিপূর্বে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে ভাষা এসে গেছে। মানুষই একমাত্র প্রাণী যাঁরা জন্মলগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত শুধু বিবর্তনের নৌকায় বসে একে একে অতীতের উপর ভর করে নতুনের সৌধ নির্মাণ করছে। এই বর্তমানও একদিন অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে আবার নতুন কোন এক রূপ নিয়ে আগামীতে আবির্ভূত হবে। আদি অনন্ত কাল ধরে এই বৃত্তের চাকাটি শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, আমাদের ফিরে দেখতে হবে এখনো পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীন সাহিত্য ঋগ্বেদ, তার রচনায় প্রকৃতিকে কি ভাবে বন জঙ্গল থেকে তুলে এনে অন্তঃপুরের দেবাসনে বসিয়ে তাঁর স্তুতি করেছে।
ঋগ্বেদ ও প্রকৃতি প্রেমের পরম্পরার প্রথম অঞ্জলি
কি অপরূপ কল্পনার মাধুর্য্য দিয়ে অরণ্য থেকে ভেসে আসা ভিন্ন ভিন্ন শব্দের রহস্য ভেদ করে তাকে সহজ সরল অনাড়ম্বর ভাবে প্রকাশ করছে। যেন প্রকৃতির সাথে মানবের বিরামহীন ভাববিনিময় চলছে। কোথায়ও আমরা দেখি পূজ্য দেবতারূপে প্রকৃতি মানুষের দ্বারা পুর্জিত হচ্ছে। এইটা আমরা দেখি ঋগ্বেদের দশম মন্ডলের অন্তর্গত "অরণ্য প্রশস্তি" কাব্যে।
ঋগ্বেদর যুগে মানুষের বসতির চারপাশে ছিল দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও জলাশয় বেষ্টিত অঞ্চল। সেখানেই সমগ্র বিশ্বের মঙ্গল কামনার জন্য যখন ব্রাহ্মণরা নিশুতি রাতে বেদমন্ত্র পাঠ করছেন, তার সাথে সুর মিলিয়ে ব্যাঙেরা গাংও গাংও শব্দে যেন যোগ্য সঙ্গত করতো। জীবন ছিল রহস্যে মোড়া। মনে ছিল অজস্র প্রশ্ন আর ছিল প্রকৃতি ও জীবন সম্পর্কে সীমাহীন কৌতূহল। মাথার উপর এক বিস্তৃত আকাশ, সেখানে সূর্য্য উদিত হয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় সবই আলোকময় হয়ে উঠে আবার একটা সময়ে আকাশ থেকে যখন হারিয়ে যায় , অন্ধকার নেমে আসে , ঝড় যখন ওঠে পাশের অরণ্য থেকে বিচিত্র এক কোলাহল ভেসে আসে তারপর একটানা বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে মনের গভীরে এক ছন্দের দোলা লাগে, এ সবই সেই যুগের মানুষেদের মনে এক আনন্দের সংবাদ বহন করে আনে। এই সব জীবন আর প্রকৃতির বৈচিত্রটাকে নিয়ে ঋগবেদের "অরণ্যানী সুক্ত" ভরে উঠেছিল। আবার আমরা দেখি ঋগ্বেদের অন্তর্গত "অরণ্য প্রশস্তি " কাব্যে, সেদিনের মানুষরা অরণ্যকে প্রশ্নে প্রশ্নে জৰ্জৰিত করছে, যেমন, শিশু তার পিতার হাত ধরে চলতে চলতে যা কিছু দেখে তাকে নিয়েই হাজারো প্রশ্ন করে, ঠিক সেই মতো। অরণ্য সেদিন তাদের কাছে ছিল এক দেবতা স্বরূপ, যে আত্মনির্ভরশীল। সে প্রতিনিয়ত তার অন্তঃকরণ থেকে সুধা বর্ষনের মতো তারই সৃষ্টির জীবদের চাহিদা অনুযায়ী যোগানের বন্দোবস্ত করে প্রকৃতি যেন মানব অস্তিত্বের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। ঋষিরা বুঝেছিলেন যে প্রকৃতি ও মানবজীবন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
চলবে ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০
ব্লগার -রবীন মজুমদার
তারিখ -০৮/০৭/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ