৩২০ পরিবর্তনের পরিবর্তন-- তৃতীয় খন্ড

 ৩২০  পরিবর্তনের পরিবর্তন-- তৃতীয় খন্ড 



(একটি  সময়োপযোগী  বিশ্লেষণধর্মী গল্প )  


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর বামপন্থী অরিন্দমের আত্মবিশ্লেষেণ - দ্বিতীয়  খন্ডের পর ,,,,,,,,,,

ভিতর থেকে যেন একরাশ গভীর বেদনা অরিন্দমের গলায় ফুটে উঠলো। " না ! শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের মধ্যেই  বিপ্লব সীমাবদ্ধ রয়ে গেলো। জড় বস্তুর পরিবর্তন খুব সহজেই হতে পারে আর যেই জড়ের সাথে চেতন যখন জড়িয়ে যায় তখন  তার পরিবর্তন নিয়ে সংশয় আসবেই।
 ঐ যে লোভ, ভেদাভেদ , ক্ষমতার প্রতি অনুরাগ তো বাইরে থেকে কেউ এসে অন্তর থেকে মুক্ত করতে পারবে না। সে যে সাধনার বস্তু। তার পরিবর্তে যেটা দেখা গেল, শাসকের বেশে শোষক এসে গদিকে অলংকৃত করলো। 

রূপম উসখুস করতে লাগলো কিছু বলার জন্য।  সে বলল-" সাংস্কৃতিক চর্চা যেমন, কবিতা, গান, শিল্প, সাহিত্য এসব কি যথেষ্ট নয়, চেতনাকে জাগ্রত করতে ?"

রূপমের কথাটা লুফে নিয়ে প্রবাল বলল, অবশ্যিই শিল্প সংস্কৃতি চেতনার মানকে উন্নত  করতে পারে কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়।  তাছাড়া সমাজতন্ত্রে সেটা তো অলংকার হিসাবে  ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু মাত্র সেজেগুজে লোকদেখানো প্রোপাগান্ডায় পরিণত হয়েছিল।  শিল্পী, সাহিত্যিকরা তাদের মুক্ত চিন্তার খেঁই হারিয়ে পার্টির  দেওয়া নির্দেশের বেড়াজালে পরে গিয়ে স্বাধীনসত্তাকে হারিয়ে,  শিল্পসত্তার প্রকাশের উপুযুক্ত পরিবেশের অভাবে অনেকবেশি সরকারি ছাচে ফেলা কারিগর হয়ে  গিয়েছিলেন। 

সুচেতা বলল -"তাহলে  এই জন্যই মানুষের মধ্যে সত্যিকারের পরিবর্তন আর হলো না ?"
প্রবাল বলল- " তোমাদের আগেই বলেছি রাষ্ট্র একটা কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়, তার অন্তঃস্থলে যে মানুষরূপী দেবতারা বসে আছে, তাদের হৃদয়ের জগতে বিপ্লব দরকার। সেটাই সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বড্ড কঠিন এবং দুর্গম এবং দীর্ঘমেয়াদি পথ, কারা করবে এই ত্যাগ, চাই প্রচুর সার্বিক জ্ঞান আর অধ্যাবসায় আর  একদল সর্ব ত্যাগী জ্ঞানী মানুষ।  "

সবাই যেন একটু চুপচাপ হয়ে গেলো।  রূপমের একটু লেখা লেখি করার অভ্যাস আছে , চট করে খাতা আর পেন বের করে লিখলো - "বিপ্লব দীর্ঘজীবি হয়   রাজনীতিতে নয়, চেতনার উন্মেষে। "

অনেক্ষন অরিন্দমবাবু সবার কথা শুনছিলেন, এবার মনে হলো,  আত্মসমলোচনা  করার ভীষণ প্রয়োজন। 
"ব্যার্থতার দায় অবশ্যিই সেই  বিপ্লবীদের । অর্থনীতিতে পরিবর্তন এলো কিন্তু মানুষ আর বদলালো না, সেটা যে শেষ কথা নয়, তা তো প্রমাণিত। সবে  ভূমিষ্ঠ হওয়া বিপ্লবের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে, সরকারি মসনদে বসে তাকে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তাকে আর লালন পালন করা হয় নি।  তাতে যা হবার তাই-ই হয়েছে আর ভবিষ্যতে আর কেউ বিপ্লবকে ডেকে আনবে কিনা  এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।  যা আগামী দিনে মেহনতি মানুষের  মুক্তির প্রশ্নে একটা বিরাট জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে দাঁড়াবে । "

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী সুচেতার চোখে মুখে বিস্ময়তার ছাপ ফুটে উঠলো। সে প্রশ্ন  করলো, " আমাদের আলোচনাটা তো অসম্পূর্ন থেকে যাবে, যদি না  উত্তর দিতে  না পারি যে, কিভাবে মানুষ বদলাতে পারে ? কি এমন শক্তি আছে  যে ভিতরের বিপ্লব ঘটাতে পারে ?"

প্রবালের চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, মনে মনে ভাবছে, আগে যদি এই কারণটিকে নিয়ে আলোচনা করতাম, তাহলে, নির্ঘাত গুরুত্ব পেতো না।  এটাই উপযুক্ত সময়, আলোচনার মোড়টা নিয়ে প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর। 

প্রবাল  বলল - " এই প্রশ্নের উত্তর বহু শতাব্দী আগে ভারতীয় দর্শন ব্যাখ্যা  করে গেছেন। শুধু মানুষকে বোঝানো যে তুমি আর তোমার পাশের বাড়ির  মানুষটা স্বভাবগতভাবে একই, কোনো প্রভেদ নেই। এটাই অদ্বৈত বেদান্ত  আমাদের শেখায়। "

বাইরের বৃষ্টিটা এতক্ষনে ধরে এসেছে। বাইরে মন্দিরের পূজারী ঘন্টাধ্বনি  বাজিয়ে  আজকের মতো দেববন্দনার সমাপ্তি ঘোষণা করলো। শুধু ঘরের মধ্যে  চারজন চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু সবার মনে যেন অনাবিষ্কৃত নতুন পথের  দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করলো। ঐ যে রাজনৈতিক বিপ্লব আসলে  শ্লোগান তুলে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিপ্লব, যদিও সেখানে ত্যাগ আছে, আত্মবিসর্জন আছে, কিন্তু সেই ত্যাগ যদি লক্ষ্য মাত্রায় না পৌঁছাতে পারে, তবে সেটা অসম্পূর্ন আন্দোলন হিসাবে চিহ্নিত হবে। আসল বিপ্লব তো অন্তরের  বিপ্লব। 

ক্রমশঃ 

তারিখ ২১/০৮/২৫ 
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে  শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে


 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)