৩২২ পরিবর্তনের পরিবর্তন--পঞ্চম খন্ড
৩২২ পরিবর্তনের পরিবর্তন--পঞ্চম খন্ড
(একটি সময়োপযোগী বিশ্লেষণধর্মী গল্প )
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর বামপন্থী অরিন্দমের আত্মবিশ্লেষেণ -
চতুর্থ খন্ডের পর ,,,,,,,,,,
বাইরে ধীরে ধীরে আঁধার নেমে আসছে, একটু আগে বিদ্যুৎও এসে গেছে। অনেক দূরে নীরবতা ভেঙে ট্রেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে সবাই এক অদ্ভুত অনুভূতির আস্বাদ গ্রহণ করছে।
পূর্ব দিকের আকাশে রক্তিম আলোর ছটায় দিনমনি নতুন প্রভাতের বার্তা নিয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে অরিন্দমবাবুদের বসার ঘরটাকে আলোকিত করে দিলো।
টেবিলের এক প্রান্তে বসে সুচেতা খাতা ও পেন নিয়ে বসে লিখতে শুরু করলো-
" আমাদের ইতিহাসের প্রশ্নটা আসলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়। প্রতিটি পতনের পিছনে মানুষের অন্তর্দন্দ্ব লুকিয়ে আছে। ইতিহাসে বলছে, বিপ্লব শুধুমাত্র নতুন শাসকের জন্ম দেয় কিন্তু মানুষের মনকে পাল্টাতে পারেনা। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বাধা ধরা গদ সেই গান,নাটক কিংবা ছবি ইত্যাদিকে হয়তো ছুটি দেওয়া যেতে পারে কিন্তু অন্তরের বিপ্লবকে পরিবর্তনের আঙিনায় না নিয়ে আসলে পরিবর্তন যে তার বৃত্তকে সমূর্ণ করেছে, সেটা বলা যাবে না। "
লিখতে লিখতে হঠাৎ সুচেতার মনে পরে যায় প্রবাল দা'র সেই কথাটা -
" অন্যকে দমন করলে নিজেকেই আঘাত করা হয়। "
অনেক দিন ধরে তার গবেষণার পাঞ্চ লাইন খুঁজছিলো, এই বাক্যটা যেন সেই অভাবটা মিটিয়ে দিলো।
অন্য দিকে জানালার ধারে রূপম বসে তার ডায়েরিটা খুলেছে, মনের মধ্যে অসঙ্খ্য প্রশ্নের উত্তর এসে ভিড় করেছে, কলম হাতে কয়েক লাইন লিখে ফেলতে ইচ্ছা করছে -
" কে বলে তুমি আর আমি ভিন্ন
হৃদয় তন্ত্রীতে বেজে উঠবে সেই মিলনের মন্ত্র।
মোরা সেই একবৃন্তে ফুটে ওঠা অভিন্ন এক ফুল
যতই আমাদের ভাঙতে চাও, আমরা ভাববো সেটা তোমাদের ভুল।
আজ থেকে গাইবো মোরা, সেই অকুস্থলে বিপ্লবেরই গান -
সেই স্রোতে এক হয়ে যাবে সব বাধা ব্যবধান।"
পেনটা নামিয়ে, এক ধরনের শান্তির আবেশে রূপমের মনটা ভরে ওঠে। আগের কবিতাগুলিতে যেমন ফুটে উঠত রাগ, প্রতিবাদ আবার অসফলতার জন্য হতাশা, আজ যেন সেই শব্দদের বিদায় জানিয়ে এক শান্ত, সুন্দর, দৃঢ়তার নতুন সুর এসে দেহ ও মনকে আলিঙ্গন করল।
অরিন্দমবাবু এতক্ষণ স্থির হয়ে বসে দুজনের কাজকে দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল - "আমার স্বপ্ন ভাঙেনি, শুধু আকারটা বদলেছে। আমার স্বপ্নের বন্দুকেরা আজও লড়াই করবে, সেখানে বধ্য ভূমিতে থাকবে একদল হিংস্র ভেদাভেদের শত্রুরা, হিংসার মতো একদল দুর্যোধনেরা। এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে বিজয়ীর বরমাল্য অবশ্যিই আমার সুচিন্তক অদ্বৈতবাদের গলাকে অলংকৃত করবে।
অন্তরের শত্রু আবার অন্তরেই মিত্র, পুলিশি কোন ঝামেলা নেই , ঝড়-বৃষ্টি-গরম ইত্যাদি প্রতিকূলতার মধ্যে মিটিং-মিছিল ও নেই, অন্য দলকে নিচু দেখিয়ে নির্বাচনে নিজের দলের ভোটের বাক্স ভরানোর মতো কাজও আর থাকবেনা। শুধু নেতিবাচক ভাবনাগুলিকে বিসর্জন দিতে হবে, আশেপাশের মানুষেরা নাম আর রূপ দিয়ে আলাদা করলেও সে যে আমার মতোই এই বিশ্ব অস্তিত্বেরই অংশ বিশেষ, তাই তাদের সাথে আমার কোন প্রভেদ নেই। "
পুরাতনকে বিসর্জন দিতে গিয়ে হৃদয়টকে মুচড়ে দিলেও , একটা গুপ্তধন পাওয়ার অনুভবে, মুখে হালকা হাসির বিচ্ছুরণ দেখা গেলো অরিন্দমবাবুর মুখে।
আজ রবিবার, তাই সকাল থেকে যে আলোচনার আসর শুরু হয়ে ছিল, কখন যে সময় গড়িয়ে গেছে। বাইরের রৌদ্রের তাপ এসে মনে করিয়ে দিলো বেলা হয়েছে।
প্রবাল বলল - " পৃথিবীর ইতিহাসে বহু সামাজ্য গড়েছে আবার তার পতনের মধ্যে দিয়ে আরেকটি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। এই ভাঙাগড়ার খেলা চিরন্তন। ইতিহাসে যে পরিবর্তনগুলি টিকতে পারেনি, তার কারণ হলো, সেগুলি মানুষের অন্তরে আলো জ্বালাতে অক্ষম ছিল বলে। তোমরা যদি সত্যিই বদল আনতে চাও, তবে আর স্লোগান নয় - নিজেদের ভিতর সেই জ্ঞানের আলো জ্বালাও, ঘোচাও সেই বৈষম্যের, বিভেদের অন্ধকারকে। অদ্বৈতবেদান্ত শুধুমাত্র দর্শন নয়, এইটা একটা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মন্ত্র, জীবনের সুন্দরতার সাথে মিলিয়ে দেবার সোপান। একবার যদি সেটা ছড়িয়ে পড়ে, তবে তার অস্তমিত হবার সম্ভাবনা থাকবে না। "
ঘরের মধ্যে চারজন নিশ্চুপ। বাইরে শহরের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ঘরের ভিতর এক অন্য ধরনের নীরবতা বিরাজ করছে - কানপেতে সবাই চেষ্টা করছে আগামীর পদধ্বনিকে শুনবার।
ক্রমশঃ
তারিখ ২৩/০৮/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ