৩২৩ ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ১ম পর্ব
৩২৩ ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ১ম পর্ব
ভোরবেলা পাখির ডাক আর দূরে মসজিদের আজান আবার কোথাও মন্দিরের ঘন্টা ধ্বনির শব্দে প্রত্যেক দিনের মতো মল্লারপুরের মেটেলডাঙ্গা গ্রামটা জেগে উঠে। দোতালা বাড়ির দক্ষিণ খোলা কোনের ঘরে আট বছরের শিশু মিতুন মা-বাবার সাথে ঘুমায়। পাখি, আজান ও ঘন্টা ধ্বনিতে যখন তাদের গ্রামটা জেগে ওঠে, তখন একই সাথে মিতুনও ঘুম থেকে উঠে খাটেই বসে থাকে।
মিতুন খাটের ধারে জানলায় বসে প্রত্যেকদিন জানালা দিয়ে যতটুকু বাইরের গ্রামটাকে দেখা যায়, সেই দেখে দেখে তার মনে অজস্র প্রশ্ন এসে ভিড় করে।
মিতুনের সামনে তার মা বসে যখন তার স্কুলের বই ও পোশাক গোছায়, তখন তার মন বাইরে রতন, পাপিয়া, সাজিয়াদের সাথে কাল্পনিক গল্পে মেতে ওঠে। সে যখন স্কুলের জন্য তৈয়ারি হচ্ছে, তখন রতন গতকালের বাসি হাড়ি ও বাসন নিয়ে ঠিক পুকুর পাড়ে ঠিক জলের কাছাকাছি যেখানে বাঁশের সিঁড়ির শেষ ধাপটা নেমে গেছে, সেখানে সে আপন মনে বাসন মাজছে। রতন, সাজিয়া, পাপিয়া এরা সকলেই প্রায় মিতুনের সমবয়সী।
স্কুলে যাবার আগে যখন মিতুনের মা যত্ন করে তার মুখে টিফিন তুলে দিচ্ছে, তখন নিচে দেখে, ধুপুস করে তার বাবা একটা কিল পাপিয়ার পিঠে মেরে দিল। পাপিয়ার বাবা বাজারের ফল বিক্রেতা , আপেল, লেবু ইত্যাদি ফলগুলি গুনতি করা পাপিয়ার প্রতিদিনের কাজ, কোন সময়ে কম-বেশি হলে মারটা তার কপালে জুটবেই জুটবে। আজও হয়তো কোন ভুল করেছে।
পুকুর পারে তিন চাকার ভ্যান এসে দাঁড়ালো, মিতুনকে স্কুলে নিয়ে যাবার জন্য। যাবার সময় মা'র দিকে হাত নাড়িয়ে আবার রতনের দিকে হাত নাড়ালো, প্রত্যুত্তরে রতনও হাত নাড়লো। কি এমন কারণ আছে, যাতে করে রতন কেন তার পাশে বসে স্কুলে যেতে পারছে না, এটা ভাবতে ভাবতে মিতুনের মনে এক হাহাকার রব উঠলো।
এইতো সেদিন খগেন কাকু বাবার কাছে এসেছিল কিছু টাকা নিতে, টিভির পর্দায় চোখ থাকলেও সে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে খগেন কাকুর ছেলেকে স্কুল থেকে বলেছে পরীক্ষার ফি না ভরলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে পারবে না , তাই টাকার খুব দরকার। তাহলে কি রতন, পাপিয়া, সাজিয়ারা স্কুলে যায়না শুধু মাত্র তাদের বাবাদের টাকা না থাকার জন্য। এই ভেবে এক রাশ কান্না যেন বুক ঠেলে বেরিয়ে আসছে। তাহলে মা যে বলেন, ধনী-দরিদ্র সবাইকে ঈশ্বর সমান চোখে দেখেন।
"তাহলে ওরা কেন আমার মতো স্কুলে পড়তে পারছে না ? দেবতা কি সবার ক্ষেত্রে সমান নন ?"
অবশেষে ভ্যানটা এসে স্কুলের দরজায় থামলো, মিতুন বেশ অনমনস্ক হয়ে ধীরে ধীরে ক্লাসরুমে এসে বেঞ্চে বসলো। স্যার এসে ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক লিখছেন -" ৭ x ৫= ৩৫। " কিন্তু মিতুনের চোখ জানালার বাইরে, ওই যে গাছের ডালে পাখিরা ঝটপট করতে করতে হয়তো কোন কিছুর সন্ধানে একে একে বাসা ছেড়ে স্বাধীনভাবে যে যার কাজে উড়ে যাচ্ছে। ঠিক এই স্বাধীনভাবে তাদের ঘরের গন্ডি ছেড়ে, ঠিক সময় মতো মিতুনের পাশে বসে রতনরা অঙ্ক করতো, তাহলে কি না মজা হতো।
টিফিনের ঘন্টা বেজে উঠল, সবাই যে যার টিফিন খেয়ে মাঠে খেলতে গেলো। মিতুন এক জায়গার খাতা আর পেন নিয়ে বসে রইলো।
পল্টন এসে বলল, "মিতুন খেলতে যাবিনা ?"
মিতুন বলল , " তোরা যা, আমি আজ যাবোনা। "
মিতুন মাঠের কোনে গাছতলায় বসে, খাতা পেন বের করে লিখতে বসলো - "আমার বন্ধু রতন কি সারা জীবন বাসন মেজে যাবে, পাপিয়া কি বাবার দোকানের ফল গুনতে গুনতে সময়টা কাটিয়ে দেবে আর সাজিয়া কি তার মা'র সাথে চিরকাল লোকের বাড়ি বাড়ি বাসন মাজার কাজ করবে। ওদের তো স্কুলে আসার ভীষণ দরকার। সেটা কি করে সম্ভব করা যায় ? এই প্রশ্নের উত্তর কোথায় পাবো? অবশেষে তার মনে হলো, ঠাকুমা বলতেন ঈশ্বরের কাছে কি তোর মনোবাসনা জানালে সে তোর কথা শুনবে। "
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর মিতুন বাড়ি থেকে একটু দূরে মাঠে গিয়ে, আমগাছ তলায় গিয়ে বসলো। আকাশে তখন লালচে রঙ ধরেছে, হয়তো কিছুক্ষনের মধ্যে অন্ধকার নেমে আসবে।
মিতুন কোন কিছু না ভেবে দুটি হাত জোড় করে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল -" হে ঈশ্বর, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ ? প্রত্যুত্তরে হালকা হওয়ায় গাছের কিছু শুকনো পাতা তার কোলের কাছে খসে পরলো। আমি শুধু তোমার কাছে চাই যে, আমার বন্ধুদের স্কুলে যাবার সুযোগ করে দাও। বই-খাতার ব্যবস্থা করে দাও, একা পড়ার মধ্যে কোন আনন্দ নেই, যে শিক্ষা কতকিছু জানতে সাহায্য করে , ঠিক যেন আঁধার হলে বাতি যেমন রাস্তা দেখায়, ঠিক সেই রকম। তাদের হাতেও সেই বাতি ধরিয়ে দাও। "
কিছুক্ষন বসার পর উত্তর কোন মিললো না। কিন্তু হঠাৎ একরাশ মিষ্টি হাওয়া এসে মিতুনের শরীরটাকে যেন জুড়িয়ে দিল, মনে হলো, ঈশ্বর যেন নীরব থেকেও তার কথা শুনতে পেয়েছে।
সেই রাতে এইসব কথা ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়লো। সে স্বপ্নে দেখলো, সকাল বেলা যখন তার স্কুল ভ্যানটা এসে তাকে নিয়ে যায়, তার থেকে একটা বড় ভ্যান এসে তাদের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। একে একে রতন, সাজিয়া, পাপিয়া আর সে ভ্যানে চেপে বসে স্কুলের দিকে রওনা দিলো। স্কুলে এসে সবাই প্রাথনা গৃহে গিয়ে একসাথে গান গাইছে - " প্রণমি তোমায় দেখিতে পাইনি-"
হঠাৎ যেন স্বপ্নের নীরবতা ভেঙে বহুদূর থেকে একটা বাণী ভেসে এলো -
" মিতুন, তুমি জেনে রাখো ঈশ্বর কোন কাজ নিজে হাতে করেন না। তাঁরা ঠিক তোমার মতো শিশুদের খোঁজে, যারা ঈশ্বরের হয়ে মানুষের উন্নতির জন্য কাজ করবে। তুমিই সেই শিশু যে আজ থেকে শুধু আমাদের কাজগুলিই পৃথিবীতে করবে। তুমিই সেই আলোর মশাল ওদের হাতে তুলে দেবে। "
হঠাৎই মিতুনের ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। এক অদ্ভুত উত্তেজনায় ভিতরটা আন্দোলিত হলো। সে একদিনেই যেন বেশ বড়ো হয়ে উঠলো এবং বুঝতে পারলো , ঈশ্বর কোন জাদু দেখান না বা কোন মন্ত্র দেন না। প্রার্থনা শুধু মনকে একত্রিত করে বিশেষ কাজের প্রতি একাগ্রতার জন্ম দেয়, সেটাই জাদু, সে যেন আজ থেকে মিতুনের অন্তরে জায়গা নিতে শুরু করেছে।
চলবে ...............
তারিখ ২৪/০৮/২৫
মন্তব্যসমূহ