৩২৫ ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ৩য় পর্ব
৩২৫ ছোট্ট মিতুনের প্রার্থনা - ৩য় পর্ব
দ্বিতীয় পর্বের পর .........................
ঈশ্বর মিতুনকে আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে যে মানুষের মধ্যে দিয়ে তারা কাজ করে থাকে। তাহলে আমার হেরে যাওয়া মানে ঈশ্বরের হেরে যাওয়া। সেটা তো করতে দেওয়া যায় না। আবার সে রাতের বেলায় ছাদে গিয়ে আকাশ পানে চেয়ে বলল -
" হে ঈশ্বর আরো বল দাও, আমি কাউকে হেরে যেতে দেব না। এই ছোট ছোট বাচ্চাদের দলটিকে নিয়ে শিক্ষার আলো দেখানোই আমার স্বপ্ন আর এই উদ্দেশ্যের সফলতাই আমার লক্ষ্য। "
হঠাৎ মনে হলো একটা তারা একটু বেশি আলোকিত হয়ে উঠলো, মিতুনের মনে হলো ঐ আলোর পথ ধরে তাকে চলতে হবে, সেটাই ঈশ্বর তাকে ইঙ্গিত করলো।
মিতুনের ছাত্র সংখ্যা ধীর গতিতে বেড়ে যাচ্ছে। এই সঙ্গে তার চিন্তাও বেড়ে যাচ্ছে। তার এখন দরকার একটা বড় জায়গা। ভাবতে ভাবতে মিতুন কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের মধ্যে সে দেখলো সারি সারি আম গাছেরা ডাল পালা মেলে একটা নিঝুম শান্ত পরিবেশ , সেখানে গাছের গায়ে একটা ব্ল্যাক বোর্ড আর তার পাশে বাঁশের একটা বেঞ্চ, সেখানে চক, ডাস্টার এবং কটা বই রয়েছে। মাটির উপর খালি বস্তা পেতে হাতে পেন্সিল খাতা নিয়ে পড়ুয়ারা বসে এক মনে বোর্ডের লেখা অংকের প্রশ্ন দেখছে আর খাতায় সেগুলির সমাধান করছে। এই সব ভাবতে ভাবতে তার ঘুমটা ভেঙে গেলো কিন্তু তার রেশটাকে সে আস্টেপিস্টে ধরে রাখলো। মনে মনে ভাবলো এইটা করতেই হবে।
স্কুলে পূজার ছুটি পরে গেছে। সেদিন দুপুরে সবাইকে মিতুন আমবাগানে আসতে বলল।
যথারীতি রতন, সাজিয়া, পাপিয়ারা তো এলোই সঙ্গে এলো আরও চার জন নতুন বন্ধু যারা পড়তে উৎসাহী।
সবার মধ্যে মিতুন কি বলবে তা জানার জন্য উৎসাহের কোন অভাব নেই।
মিতুন বলল -"লেখাপড়ার জন্য একটা জায়গা বানানোর বিশেষ প্রয়োজন, তোমরা সবাই রাজি আছো তো ? "
সবার আগে রতন এগিয়ে এসে তার সম্মতি জানালো।
সে বলল - "বাবা যদি একবার জানে, তবে কতগুলি মার যে পিঠে পড়বে, তা বলতে পারবো না। "
মিতুন এ কদিনে আগাম কি হতে পারে, তা বুঝতে শিখে গেছে। তাই হেসে বলল - " ঠিক আছে, অনেক বন্ধুদের ক্ষেত্রে এগুলি হতেই পারে, তাই আমরা একটু লুকিয়ে করব। কেউ জানতে পারবে না আর আমাদের স্কুলের নাম হবে- 'জ্ঞানের আলো'। "
আসছে দিনে নতুন রাস্তায় তারা হাঁটবে, সবার চোখের আড়ালে গিয়ে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশে এসে তাদের পরিচয় হবে নিত্যনতুন পাঠ শিক্ষার সাথে, এই জগতকে চিনতে পারবে। এইসব ধারণা করে তাদের চোখগুলি আনন্দে চকচক করতে লাগলো।
জ্ঞানের আলো পাঠশালা শুরু হলো হ্যারিকেনের আলোতে-
যে হেতু রতনের বাবা-মা'র সম্মতি আছে, কিন্তু জায়গা কম হলেও রতনের বাড়িতেই অন্য দিনের মতো ক্লাস শুরু হলো। নতুন চারজন বন্ধু আজ এসেছে এই গ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। শিবুর বাবা ভাগচাষী, পরীর বাবা জনমজুর , বিনুর বাবা চাষ করে আর সুভাষের বাবার দোকান আছে। তাই আজ প্রথম থেকে স্বর বর্ণ ও ব্যঞ্জন বর্ণ দিয়েই শুরু করতে হবে।
সবাই একসাথে মিতুনের সাথে বলতে লাগলো -"
অ... আ... ক... খ। "
সাজিয়া আবেগতাড়িত হয়ে প্রশ্ন করলো- "হ্যাঁরে মিতুন, আমরা কি কোনদিন স্কুলে ভর্তি হতে পারবো না?"
মিতুন বেশ দৃঢ় গলায় বলল বলল -
- "নিশ্চয়ই আমাদের জ্ঞানের আলো- স্কুল একদিন বিশাল বড় হবে, আশেপাশের গ্রামের বাচ্চারা এখানে পড়তে আসবে। "
গান , কবিতা ও গল্প -
ছোট্ট মিতুন এই অল্প সময়ে বুঝতে পেরেছে, নিরস পাঠের মাধ্যমে ক্লাসের ছাত্রদের বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না, তাই দরকার কখন গল্প বলা, গান করা কিংবা কবিতা পড়া ইত্যাদির মাধ্যমে পড়াশুনাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলো। মিতুনের গানের গলাটা বেশ ভালো আর ছোট বেলা থেকে তার গান জানা মা'র কাছ থেকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেও শিখে গেছে। আজ মিতুন রবীন্দ্রনাথের শিশু বইটা খুলে বীরপুরুষ কবিতাটি পড়তে শুরু করলো -
" মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে ....... "
পড়ার শেষে মিতুন বলল -
" কবি রবীন্দ্রনাথে ঠাকুর তার কবিতার মাধ্যমে আমাদের যেটা বলতে চাইলো, যদিও সেটা কল্পনা তবুও সেটা প্রেরণা ,একটা শিশু শুধুমাত্র তার আত্মবিশ্বাসের উপর নির্ভর করে তার মা'কে দস্যুদের হাত রক্ষা করলো। এই কবিতার মধ্যে দিয়ে কি আমাদের স্কুল তৈরি করে অজ্ঞান নামক দস্যুদের হাত থেকে বন্দি জ্ঞানকে উদ্ধার করতে পারবোনা ?"
সবাই মিলে তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতকে উপরে তুলে সম্মতি জানালো। এই সঙ্গে মিতুনও আগামী দিনে তার স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার অনেক সহযোগী পেয়ে গেলো।
চলবে ...............
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ