৩৩৭ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (৭)
দেওঘর, বৈদ্যনাথ
দয়া ও প্রেম
মানুষের হৃদয়ের দুটি প্রবাহ—দয়া ও প্রেম। যখন আমরা অপর জীবের মধ্যে কেবল দেহমাত্র দেখি, সেবার মধ্য দিয়ে আমাদের দয়া প্রকাশিত হয়; আর যখন সেই দেহের আড়ালে চিরন্তন আত্মাকে অনুভব করি, তখন সে সেবা প্রেম হয়ে ওঠে। তাই মহাপ্রভু চৈতন্য বলেছেন—“জীবে দয়া, ঈশ্বরে প্রেম।” মানুষের সাথে ঈশ্বরের এই দ্বারকেই উন্মুক্ত করে প্রকৃত ভক্তি।
সমাজের নিয়ম-কানুন
সমাজের নিয়ম এসেছে মানুষের নিরাপত্তার প্রয়োজনে, কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তার জন্মকথা আজ বিস্মৃত। প্রাচীনকালে রাজসভায় ‘মাগধ’ নামক কর্মচারীরা রাজ্যের ঘটনাবলী লিখে রাখত, ‘সূত’রা নিরপেক্ষ কণ্ঠে সেই ইতিবৃত্ত পাঠ করত, ঋষিরা লিপিবদ্ধ করতেন। কিন্তু ঋষিরা কোনোদিন আইনরচয়িতা ছিলেন না। মানুষ নিজেই সময়ের তাড়নায় নানা বিধি গড়ে তুলেছে, আত্মরক্ষার তৎকালীন প্রয়োজন থেকে। অথচ সেই সাময়িক ব্যবস্থা যখন পরবর্তীকালে স্থায়ী শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়ায়, তখনই ঘটে বিপর্যয়।
বিধবা-বিবাহের বাধা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এক সময়ে কন্যার সংখ্যা ছিল অধিক, পাত্রের অভাব ছিল তীব্র; সেই কঠিন প্রেক্ষাপটে বিধবার জন্য পুনরায় বর খুঁজে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এককালের এই সমাজগত অস্বস্তি পরে নীতির নামে গাঁথা হয়ে নারীর স্বাধীনতাকে বন্দী করল। সমাজের কোনো আচার পরিবর্তন করতে হলে তার মূলে যে প্রয়োজন লুকিয়ে আছে, তাকে বুঝতে হবে—কারণ দূর না করলে কেবল সমালোচনায় তার অবসান ঘটে না।
ধন, বিদ্যা ও সমাজ
মানুষের ধনলাভ ও জ্ঞানার্জনের অধিকার স্বাভাবিক। তবু কত লোক গোপনে ভয় পায়—“সবাই শিক্ষিত হলে আমাদের চাকরি করবে কে?” তাদের এই সংকীর্ণতা সমাজের প্রকৃত রূপকে আড়াল করে রাখে। সমাজ তাদের কাছে কিছু সংখ্যক স্বার্থপর পরিবারের নামমাত্র; অগণিত মানুষের কল্যাণ তারা দেখতে চায় না।
মুক্তির পথ
মুক্তি বাহিরে নয়, অন্তরে। “আপনিই আপনার উদ্ধারকর্তা”—এই বাণী শুধু ব্যক্তির নয়, সমগ্র মানবসমাজের জন্য সত্য। স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হওয়াই মানুষের পুরুষার্থ; আর সেই পুরুষার্থের পরিপূর্ণতা তখনই, যখন আমরা অপরের দেহ, মন ও আত্মার মুক্তির সহায় হই।
ধর্মের মর্ম
সব ধর্মের সার কথা এক—বাসনার অবসান। ইচ্ছা দুই রকম: এক উচ্চ, এক নীচ। বৌদ্ধের ভাষায় বাসনাই দুঃখের মূল, কিন্তু ইচ্ছা শক্তি-সৃষ্টিকারী। নিম্ন ইচ্ছাকে ত্যাগের মধ্য দিয়েই উচ্চ ইচ্ছা প্রস্ফুটিত হয়।
স্বাধীনতা ও সমাজ
যে মত বলে, “সমষ্টির কল্যাণে ব্যক্তিকে বিসর্জন দাও”—সে সমাজতন্ত্রের; যে জোর করে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে—সে স্বৈরাচার; আর যে ব্যক্তি-ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ আসনে বসায়—সে চরম ব্যক্তিবাদী। মানুষকে এই তিন ধারার মধ্যেই সমতা খুঁজে পেতে হবে।
ভারতীয় চিত্ত
ভারতের মাটিতে গৌরব যেমন আছে, তেমনি তপস্যার ধৈর্যও আছে। কেউ অল্প আলো-অল্প অন্ন নিয়ে পাণ্ডিত্য রচনা করেছে, কেউ খেঁদা বোচা স্ত্রীর প্রতি নিঃশেষ মমতা বিলিয়েছে, আবার নির্লজ্জ স্বামীর প্রতিও অনন্ত ভক্তি উৎসর্গ করেছে। এইসব মানুষের জীবনে বহিরঙ্গের আভা নেই, কিন্তু অন্তরালের শান্ত ছায়া আছে। তাদের মন আকাশের নীলিমার মতোই গভীর, যেখানে নতুনের স্পন্দন নিঃশব্দে আসে—কোলাহলহীন, কিন্তু অনন্ত।
মন্তব্যসমূহ