৩৩৯ ভাগবত গীতার ‘নিষ্কাম কর্ম’ ও পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থা : মিল ও অমিল

৩৩৯   ভাগবত গীতার ‘নিষ্কাম কর্ম’ ও পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থা : মিল ও অমিল 


ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ভাগবত গীতা কর্মের একটি অনন্য ব্যাখ্যা দিয়েছে—‘নিষ্কাম কর্ম’। অর্থাৎ, মানুষ তার কর্তব্যকর্ম করবে কিন্তু কর্মফলের প্রতি আসক্ত হবে না। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতি মূলত মার্কসবাদী মতাদর্শে প্রভাবিত, যেখানে কর্ম মানে সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম, আর লক্ষ্য হলো শ্রেণি-শোষণমুক্ত সমাজ গঠন। এই দুই ধারার মধ্যে কোথায় মিল, আর কোথায় মৌলিক অমিল, সেটাই এই আলোচনার বিষয়। 

১. গীতার নিষ্কাম কর্ম : মূল ধারণা

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দেন—

    👉নিজের স্বধর্ম বা কর্তব্যকর্ম পালন করো,
    👉 কিন্তু ফলের জন্য লোভ বা ভয় রেখো না।
    👉কর্মই প্রধান, ফলের প্রতি আসক্তি মানুষের বন্ধন।
এখানে আত্মার মুক্তি, অনাসক্তি, এবং ব্যক্তিগত নৈতিক শুদ্ধি বড় লক্ষ্য।

২. পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী কর্মদর্শন

বামপন্থীরা মূলত মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ।

  • শ্রেণি-সংগ্রামউৎপাদনের মাধ্যমের সামাজিকীকরণ তাদের মন্ত্র।

  • তারা ধর্মের আধ্যাত্মিক লক্ষ্য নয়, বস্তুবাদী ইতিহাস-চেতনায় বিশ্বাসী।

  • সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামো পাল্টানোই তাদের কর্তব্য।


৩. মিলের বিন্দু

কিন্তু দুই ধারার মধ্যে কিছু বিস্ময়কর সাদৃশ্যও আছে—

  1. কর্মের শ্রেষ্ঠত্ব : গীতা যেমন কর্মপরায়ণতার শিক্ষা দেয়, বামপন্থাও বলে, নিস্ক্রিয়তা নয়—সংগ্রামী কর্মই মুক্তির পথ।

  2. স্বার্থত্যাগ : ব্যক্তিগত লাভের ঊর্ধ্বে গিয়ে সমাজ বা আদর্শের জন্য কাজ করার আহ্বান, দুই মতেই গুরুত্বপূর্ণ।

  3. মানবকল্যাণের লক্ষ্য : গীতায় যদিও তা আধ্যাত্মিক, তবু মানুষের মঙ্গলকেই প্রধান বলে; বামপন্থাও মানবমুক্তির কথা বলে, যদিও বস্তুবাদী পথে।


৪. মৌলিক অমিল

তবু মৌলিক পার্থক্যগুলি তীব্র—

  • আধ্যাত্মিক বনাম বস্তুবাদী দৃষ্টি : গীতা আত্মার মুক্তিকে চরম লক্ষ্য মানে; বামপন্থা সমাজ–অর্থনীতির পরিবর্তনকেই উদ্দেশ্য ধরে।

  • ঈশ্বরবোধ বনাম নাস্তিক্যবাদ : গীতা ঈশ্বর-নির্ভর নৈতিকতা শেখায়; মার্কসবাদে ঈশ্বর ধারণা অপ্রাসঙ্গিক।

  • ফলবিমুখতা বনাম লক্ষ্যনির্দিষ্ট সংগ্রাম : গীতার মতে ফল নিয়ে চিন্তা নয়; বামপন্থা স্পষ্ট রাজনৈতিক ফল—শ্রেণিহীন রাষ্ট্র—পেতে চায়।

  • ব্যক্তিগত মুক্তি বনাম সমষ্টিগত বিপ্লব : গীতা ব্যক্তির আত্মিক মুক্তি কামনা করে; বামপন্থা গোটা সমাজব্যবস্থার রূপান্তর চায়।


৫. পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতি (বিশেষত ১৯৭৭–২০১১) কৃষি সংস্কার, শ্রমিক অধিকার, শিক্ষার প্রসার ইত্যাদিতে বাস্তব পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু গীতার নিষ্কাম কর্মের মতন অন্তর্মুখী বৈরাগ্য বা আধ্যাত্মিক শুদ্ধি সেখানে নেই। বরং রাজনৈতিক কৌশল, সংগঠন ও ক্ষমতা ধরে রাখাই ছিল মূল অভিপ্রায়, যা গীতার অনাসক্তির সঙ্গে বিরোধী।


উপসংহার

ভাগবত গীতার নিষ্কাম কর্ম ও পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থা উভয়েই কর্মের মাহাত্ম্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তাদের দর্শনের গভীরে মৌলিক তফাৎ—একদিকে আত্মার মুক্তি, অন্যদিকে বস্তুবাদী সমাজবিপ্লব। ফলে এই দুই ধারার মিল মূলত কর্মনিষ্ঠার উপরে সীমাবদ্ধ, আর অমিল নিহিত লক্ষ্য, পদ্ধতি ও চূড়ান্ত দর্শনে।

এই তুলনা দেখায়, একই ‘কর্মমুখী’ শব্দের অন্তরালে কত বৈচিত্র্য থাকতে পারে—একদিকে গীতার নিস্তব্ধ আধ্যাত্মিকতা, অন্যদিকে ইতিহাস-চালিত বিপ্লবের তেজ।

ব্লগার - রবীন মজুমদার
তারিখ - ২৩/০৯/২৫
 ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)