৩৫৫ কাঁচের ঘরের মৃত প্রজাপতি

 ৩৫৫  কাঁচের ঘরের মৃত প্রজাপতি 


জীবনের সার্থকতার একমাত্র  মাপকাঠি হচ্ছে তুমি কতখানি স্থায়ী এবং অস্থায়ী সম্পদ  সঞ্চয় করতে পেরেছো তোমার আগামী প্রজন্মের জন্য আর কতখানি চাকচিক্য উপস্থাপন করতে পেরেছো বাইরে তার উপর। বিকাশের অভিমুখ তখনই অবক্ষয়ের হাত ধরে হয়ে পরে বাহ্যিক। এই বাহ্যিক উন্নতির ভিড়ে ভারতবর্ষের চিরন্তন সংকৃতি আর সেই আত্মজ্ঞানের উন্মেষ  আজ ব্যাহত। তার ফলে,  গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র ভীষণ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। 

আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাসের পাতায়  যদি আমরা চোখ বুলাই, তবে দেখা যাবে —মানবজাতি বাহ্যিক উন্নতির নেশায় যতই বুঁদ হয়ে উঠেছে, অন্তরের চিরন্তন সুরটা  ততই বেসুরো হয়ে বাজতে শুরু করেছে।   প্রযুক্তির ঝলকানির  হুঙ্কারে আত্মা হৃদয় থেকে ঘর ছাড়া হয়ে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  

 বেসুরো সুরের প্রতীকী তাৎপর্য

 একটানা কোলাহলে স্নায়ু আজ শ্রান্ত, চারিদিকে অবিশ্বাসের বাতাবরণ, যত্রতত্র ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতা সেখানে একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে সম্পত্তির প্রতিপত্তিকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। 
সেই যে লর্ড ম্যাকলে সাহেব শাসকের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে ভারতীয় প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতিকে পিছনে রেখে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে ছিল, সেটি বর্তমানে শিল্পপতিরা  শিল্প সহযোগী যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। যারা কৃতকার্য হয়ে সেই ব্যবস্থা থেকে বেরোচ্ছেন তারা কেউ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে উৎপাদনের সহযোগী উপাদান  হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। শাসন পরিচালন থেকে শুরু করে ব্যবসা পরিচালন পর্যন্ত এই মানবসম্পদকে ছাকনি দিয়ে ছেঁকে এই যান্ত্রিক সভ্যতায় বিশেষ বিশেষ টুলসে পরিণত করছে। এই মানবিক গুণ বিসর্জিত প্রাণীগুলি ভ্রমক্রমে সাধারণ মানুষের দ্বারা সম্মানিত হন।  সুতরাং, তাদের দ্বারা মানুষের জন্য উন্নত সমাজ  প্রতিষ্ঠার চিন্তা করা বৃথা।   
এই “বেসুরো গান” আসলে মানুষের আত্মবিচ্ছেদের রূপক—যেখানে প্রাণ ও আত্মা, দেহ ও চেতনা, বিজ্ঞাপন ও সত্য—সব মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অসামঞ্জস্যের যুগলবন্দি।

প্রাণশক্তি বনাম আত্মশক্তি

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “সভ্যতার সংকট”-এ লিখেছিলেন—“সভ্যতা যদি আত্মবিকাশের পথে না চলে, তবে সে অন্ধ শক্তির দাসত্বেই পরিণত হয়।”  রবীন্দ্র ভাবনার গভীর অনুসরণে বলতে হয়, মানুষ একদিন “প্রাণশক্তির জোরে” অজানাকে জয় করেছিল, কিন্তু আজ সেই শক্তি দেহে সীমাবদ্ধ—জিমের ঘামে, প্রোটিন সেকে, বাহ্যিক হাসিতে সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। সেখানে আত্মার প্রবেশ রোহিত , আছে শুধুই শরীরচর্চা ও প্রতিযোগিতার দৌড়।

এই দেহমুখী সংস্কৃতি মানুষের আত্মশক্তিকে বন্দি করেছে রাষ্ট্র, বাজার, ও ভোগের প্রলোভনে— যেখানে ‘চেতনা’ হয়ে গেছে অপ্রয়োজনীয়, কারণ সে তো লাভজনক নয় অর্থাৎ বস্তু মূল্যে, ভোটের মূল্যে প্রয়োজন নির্ভর করে।

রাষ্ট্র ও বাজার: 

আধুনিক কারাগারের দুই প্রাচীর। যে রাষ্ট্র একসময় নাগরিকের আত্মাকে স্বাধীন করতে চেয়েছিল, আজ সেই রাষ্ট্রই আত্মার বন্দিদশার রক্ষক।

রাজনৈতিক উন্নয়নের নামে নেতারা বলেন, “ঐ দেখো, বিকাশ হচ্ছে!”—কিন্তু সেই বিকাশ কাদের? বাহ্যিক পরিকাঠামোর না অন্তর্গত মানসিকতার? যে জাতি নিজের আত্মাকে বন্দি করে রাখে, তার বাহ্যিক চাকচিক্য কেবল কাচের ঘরে সাজানো মৃত প্রজাপতি। এই তুলনাটি কেবল কাব্যিক নয়, দার্শনিকও—এখানে জীবনের রূপ আছে, কিন্তু রস নেই; অস্তিত্ব আছে, কিন্তু অর্থ বহন করার শক্তি নেই।

আত্মজ্ঞান বনাম প্রযুক্তি-নির্ভরতা

অতীতে মানুষ নিজের অন্তরে প্রবেশ করত ধ্যানের মাধ্যমে, আজ সে সার্চ করে “কি করে শান্তি পাওয়া যায় ?” এই ব্যঙ্গচিত্রটি অসাধারণভাবে প্রকাশ করে আধুনিক জ্ঞানের সংকট—যেখানে ‘জানা’ মানেই ‘গুগলে খোঁজা’। জ্ঞান এখন বাহিরমুখী, তা আত্মা থেকে নয়, অ্যালগরিদম থেকে উৎপন্ন।

রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বলেছিলেন—“জ্ঞান যখন যন্ত্রে বন্দি হয়, তখন চেতনা হারায়”—এই লেখাটি সেই কথারই আধুনিক পুনর্লিখন।

আত্মার বন্দিদশা: সভ্যতার অন্তর্লীন ক্রন্দন

শহরের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বাতাসে বন্দি আত্মার হাহাকার এক গভীর ট্র্যাজিক প্রতীক। এই হাহাকার আমাদের সময়ের আত্মচেতনার নীরব আর্তনাদ—যেখানে মানুষ নিজেই নিজের কারারক্ষী।
“বেসুরো গান” তাই কেবল এক সময়ের উপমা নয়; এটি সভ্যতার এক সমগ্র মানসিক অবস্থার রূপক, যা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “মানুষের ভিতরের আলো নিভে যাওয়া”।

পুনরুত্থানের সম্ভাবনা

তবুও  আশাবাদী সুর বলে ওঠে — এক অদৃশ্য সুরকার হয়তো এখনো বাজিয়ে চলেছেন তাঁর শেষ সুর। এই আশাই আমাদের সময়ের মুক্তির ইঙ্গিত। যতদিন পৃথিবীতে একটিও মানুষ থাকবে যে নিজের ভিতরের আত্মাকে জাগ্রত করতে চায়—ততদিন মানবসভ্যতার সম্পূর্ণ অবক্ষয় অসম্ভব।

“আত্মার বন্দিদশা” আসলে আধুনিকতার সংকটের এক আত্মদর্শন। এখানে প্রযুক্তি, রাষ্ট্র, ভোগবাদ—সবই আমাদের রচিত এক অদৃশ্য কারাগার।

কিন্তু যতদিন কোনো কবি, সাধক, বা সাধারণ মানুষ নিঃশব্দে নিজের অন্তরের সুর খুঁজে যাবেন, ততদিন মানবসভ্যতার শেষ সুর কখনোই নিঃশেষ হবে না। এই প্রবন্ধ তাই কেবল অভিযোগ নয়, এক আত্ম-অন্বেষণের আহ্বান—“হে আত্মা, আবার জেগে ওঠো, এই মেকি বিকাশের কারাগার ভেঙে দাও।”

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -২৮/১০/২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)