৩৫৭ যে কুরুক্ষেত্র কখনই থামেনা

 ৩৫৭ যে কুরুক্ষেত্র কখনই থামেনা 


শব্দের বার্তা 

ভারতীয় দর্শন বলছে শরীর একটি জড় বস্তু। জ্বালানি ছাড়া যেমন ইঞ্জিন চলেনা, ঠিক তেমনি চৈতন্য ছাড়া শরীর অচল। কি অদ্ভুত তার গঠন, আর পরস্পরের সাথে  তাদের কি নিবিড় সম্পর্ক এবং ভাব ভালোবাসা। হৃদয় নামক মেশিনটি রক্ত নামক এক উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সর ইন্দ্রিয়কে জড়িয়ে রেখেছে।  মস্তিক শরীরের রাজ্যে রাজার মতো সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারী যে সব সংবাদ তার সহকারীদের থেকে সংগ্রহ করে ; যেমন, চোখের পাতা খুললেই ছবির ছড়াছড়ি; জিভের তো কোন কথাই নেই, মতামতের জন্য সে সদাই ব্যাকুল; কান যেন সর্বদাই গোয়েন্দার মতো, বাইরে থেকে কিছু পেলেই সে কালবিলম্ব না করে দেহের রাজার কাছে পাঠিয়ে দেয়, ত্বকের তো জবাব নেই স্পর্শ পেলেই সে চিহ্নিত করার জন্য রাজার কাছে পাঠিয়ে দেয়। বাকি রয়ে গেলো মন। যেহেতু হৃদয়ের তন্ত্রীতে প্রবাহিত রক্তের সাথে সে সম্পর্ক যুক্ত নয়, তাই তার কথা কেউ শুনতে পারে না।  

অরূপ মুখার্জি সেই শব্দটাই শুনে ফেলেছিল। কেউ তাকে ফোন করেনি, কেউ চিঠিও লেখেনি। তবু কে যেন একদিন বলল, “তুমি কি জানো, তোমার ভিতরে আমি থাকি?”

এ গল্পে ভূত নেই, তবু ভয় আছে। রোম্যান্স নেই, তবু একটা চিরচেনা আকর্ষণ আছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো — এই গল্পের চরিত্রগুলো সব তোমার চারপাশে হাঁটছে, আর কেউ কেউ হয়তো তুমি নিজেই।

কারণ, এই গল্প বাইরের ঘরের নয় — ভিতরের ঘরের। যেখানে আলো জ্বলে না, কিন্তু ছায়ারা খুব ব্যস্ত। যেখানে যুদ্ধ হয় প্রতিদিন, কিন্তু কেউ তার খোঁজ রাখে না।

তুমি যদি সাহস করো, তাহলে চল এই ঘরে ঢুকে পড়ো। সাবধান — দরজাটা একবার বন্ধ হয়ে গেলে, ফেরার রাস্তা নেই। কারণ, এই ঘরটা তোমার নিজের ভিতরেই।

 মুখোশের শহর

অরূপ মুখার্জি পেশায় এক সরকারি দফতরের ক্লার্ক, কিন্তু নিজেকে ভাবে আধা-দার্শনিক, আধা-কমেডিয়ান। অফিসে ঢুকেই বলে, “আজও বেঁচে গেলাম—অর্থাৎ অফিসে এসেছি!”
চারপাশের মানুষরা যেন মুখোশ পরে ঘোরে। কারও মুখে ক্লান্তির হাসি, কারও চোখে নকল গর্ব। 
অরূপ ভাবে—এই শহরে সবাই যেন নিজের ভিতরের ঘরটাকে তালা মেরে রেখেছে, বাইরে শুধু নাম-ঠিকানা ঝুলিয়ে রেখেছে।

বিকেলে ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে সে বলে উঠল, “আমাদের অফিসটা একটা চিড়িয়াখানার মতো।
সিংহ মানে বস, বাঁদর মানে আমরা, আর রেশন মানে ইনক্রিমেন্ট!” সবাই হেসে উঠল, কিন্তু হাসির আড়ালে এক অদ্ভুত চাপা ক্লান্তি।
অরূপ তখনই বুঝল — এই হাসিটা আসল নয়। এ যেন জীবনের মুখোশেরই এক দিক।

 অদৃশ্য ছায়া

অরূপ আজকাল নিজের ছায়াটাকে সন্দেহ করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ছায়াটা যেন তাকে অনুসরণ করছে না— বরং নেতৃত্ব দিচ্ছে। অফিসে ফাইল খুলে বসে সে ভাবে, “কাজটা আমি করছি, না কাজটাই আমাকে করছে?”

কখনও কখনও টেবিলের ওপরে বসে থাকা ঘড়িটার টিকটিক শব্দও যেন বলে ওঠে, “তুমি এখন নিজের সময়ের হাতে বন্দি।”

রাতে ঘরে ফিরে সে টেলিভিশনের পর্দায় দেখে “ডিপ্রেশন বাড়ছে, মানসিক রোগ নীরব মহামারি।”
অরূপ মুচকি হেসে মনে মনে  বলে, “এই মহামারির পেটেন্ট আমি।”

একদিন রাতে স্বপ্নে সে দেখে— ঘরের মধ্যে ঘর খুলে গেছে, ভিতরে অন্ধকার, কিন্তু কেউ বলছে, “তুমি কাকে বাঁচাতে চাও—নিজেকে না নিজের মুখোশকে?”
অরূপ ঘাম ভেজা শরীরে জেগে ওঠে। দেয়াল, জানালা, ঘড়ি—সব চুপচাপ,
তবু মনে হয় কেউ ফিসফিস করছে, “আমি তো তোমারই অংশ...”

ঘরের ভেতরের ডাক্তার

অরূপ অবশেষে গেল “মাইন্ডওয়েল ক্লিনিক”-এ।
দেয়ালে লেখা—“তোমার মনও চিকিৎসার যোগ্য!”
অরূপ ভাবল, “ভালো কথা, কিন্তু মন যদি লুকিয়ে থাকে, ডাক্তার তাকে ধরবে কীভাবে?”

ড. রুদ্র, মনোবিজ্ঞানী, আশ্চর্য শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “বলো অরূপ, কষ্ট কোথায়?” 
অরূপ বলল, “ডাক্তারবাবু, আমার ভিতরে কেউ আছে।
সে আমার হয়ে ভাবে, হাসে, কাঁদে।
মাঝে মাঝে দরজায় ঠকঠক করে।”

ড. রুদ্র বললেন, “সে আমিই।”
অরূপ অবাক— “মানে?”

ড. রুদ্র বললেন, “আমি তোমার ভিতরের সেই বুদ্ধিমান অংশ, যে কথা বলে না, শুধু বোঝে।
তুমি বাইরের যুদ্ধ লড়ছো, আর আমি ভিতরের অস্ত্রাগারে বসে আছি।”

অরূপ তখন প্রথম বুঝল— এই ডাক্তার বাস্তবে কেউ নয়, সে তার মনেরই তৈরি এক “অন্তরের-চিকিৎসক।”

অরূপ এখন সকাল বেলায় আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকায়। আগে যেখানে ক্লান্তি ছিল, এখন আছে সেখানে একরাশ প্রশ্ন। 

ড. রুদ্রর কণ্ঠস্বর আর আসে না, তবু মাঝে মাঝে নিজের মনেই সে শুনতে পায়—
“অন্ধকারে যুদ্ধ হয়, আলোয় হয় বোঝাপড়া।”

সে অফিসে তাকায় সবার মুখের দিকে। কেউ হেসে কাজ করছে, কেউ চুপচাপ টাইপ করছে, কিন্তু প্রত্যেকের চোখে এক অদৃশ্য ক্লান্তি।
অরূপ হঠাৎ উঠে গিয়ে এক সহকর্মীকে বলে, “চলো, আজ একটু হেসে নিই।”

সবাই প্রথমে ভেবেছিল লোকটা পুরো পাগল হয়ে গেছে।
কিন্তু অরূপ জানে— সে আজ নিজের ভিতরের আলোটা জ্বেলে দিয়েছে।

রাতে সে ঘরে ছোট ছোট বাতি জ্বালাল। প্রতিটা আলো জ্বালার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো,  একেকটা ভয় ভেঙে পড়ছে।
শেষে সে বলল, “আলোটা এবার ভিতরে জ্বলুক।”

বৃষ্টি, আলো আর অরূপ

বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি এল। অরূপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। রাস্তার মানুষ ছুটছে,  আর আকাশ যেন বলছে—“সব ঠিক হয়ে যাবে।”

তার ফোনে শুভ্রার মেসেজ— “মন ভালো আছে?”
অরূপ উত্তর দিল—“মন ছুটিতে গেছে। নিজের ঘরটা ঘুরে দেখছে।”

বাইরে বজ্রপাত, ভেতরে প্রশান্তি। অরূপ বুঝল—যুদ্ধ শেষ নয়, কিন্তু সে এখন জানে,
যুদ্ধ মানেই হার নয়, যুদ্ধ মানেই চেনা।

রাতে চা খেতে খেতে সে বলল, “যে আলো বাইরে খুঁজতাম, সেটা তো ভিতরেই ছিল।”

বৃষ্টি থেমে গেল। জানালায় এক ফোঁটা জলের ওপর সূর্যের আলো পড়ছে।
অরূপ তাকিয়ে দেখে— তার নিজের ছায়াটা আর আলাদা মনে হচ্ছে না। দু’জন এখন একই ঘরে, একই মনের আলোয় বসবাস করছে।

বাইরের শহরটা এখনও মুখোশে ঢাকা, অফিসে ফাইল এখনও জমে, চা এখনও ঠান্ডা হয়ে যায়।

কিন্তু অরূপ জানে— যে নিজের ভিতরের ঘরে আলো জ্বালাতে পারে, সে অন্ধকার শহরেও পথ হারায় না।

“ঘরের মধ্যে ঘর”—সেই ঘরটাই এখন তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।


ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -৩১/১০/২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

নামহীন বলেছেন…
মনের আমিত্ব আমার মনে পাক খায়।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)