৩৬৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৬)
৫৪১, ডিয়ারবর্ন এভিনিউ, চিকাগো।
৩রা জানুয়ারী,১৮৯৫
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
স্বামীজীর পত্রাবলী থেকে উদ্ধৃত
আত্মিক উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন
স্বামী বিবেকানন্দের অন্তর্দৃষ্টিতে আজকের ভারতবর্ষ
আজ পর্যন্ত কোন সন্যাসীকে দেশবাসী দেখেন নি, নিঃস্বার্থভাবে ভারতবর্ষের মানুষকে ভালোবাসতে। দেশের মানুষের অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দেবার জন্য পৃথিবীর যে প্রান্তে তাঁর অবস্থান হউক না কেন, সে কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তাঁর পত্রবর্ষণকে জারি রাখতে।
যে শিক্ষা আজ ভারতবর্ষে পদে পদে লাঞ্ছিত,অবহেলিত এবং প্রতারিত,তাকেই স্বামীজী সমাদরে আহবান করেছিলেন ভারতবাসীদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে। স্বামীজীর প্রদর্শিত পাঠ্যসূচীকে অলংকৃত করেছিল যেমন ভারতের প্রাচীন সাহিত্য, দর্শন ও ভাষা এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছিল অবৈদিক ও অন্যান্য ধর্মসমূহের তত্ত্ব।
স্বামীজী তাঁর চিঠিতে বলছেন -" এত দিন তোমরা যাহা করিয়াছ, তাহা বেশ হইয়াছে, এখন আরো ভাল করিবার সময় আসিয়াছে। এই জাতিবিভাগের কথাই ধরুন - সংস্কৃতে জাতি শব্দের অর্থ শ্রেণীবিশেষ। এখন সৃষ্টির মূলেই ইহা বিদ্যমান। বিচিত্রতা অর্থাৎ জাতির অর্থ ই সৃষ্টি। ' আমি এক বহু হইব ' - বিভিন্ন বেদে এইরূপ কথা দেখা যায়। সৃষ্টির পূর্বে এক থাকে - বহুত্ত্ব বা বিচিত্রতাই সৃষ্টি। যদি এই বিচিত্রতা না থাকে , তবে সৃষ্টিই লোপ পাইবে। গীতা বলিতেছেন, জাতি বিনষ্ট হইলে জগৎও বিনষ্ট হইবে। এখন ইহা আমাদের সত্য বলিয়াই বোধ হয় যে , এই বিচিত্রতা বাদ করিয়া দিলে জগৎও নষ্ট হইবে। আধুনিক জাতিভেদ প্রকৃত জাতিভেদ নহে, উহা প্রকৃত জাতির উন্নতির প্রতিবন্ধকস্বরূপ। উহা প্রকৃত জাতির অর্থাৎ বিচিত্রতার স্বাধীন গতির ব্যাঘাত করিয়াছে। "
প্রত্যেক জাতির জীবনে একটা মূল সুর কারণ হিসাবে অব্যক্ত থেকে যায়। সেই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন- "প্রত্যেক জাতির জীবনে একটি করিয়া মূল প্রবাহ থাকে। ভারতের মূল স্রোত ধর্ম্ম। "
স্বামীজীর এই চিঠি একই সাথে তিনটি স্রোতকে একত্রিত করেছে - সেখানে আছে গভীর ভাবনা, জাতি ও ধর্মের দর্শন এবং আত্মিক উন্নয়ন বনাম বাহ্যিক উন্নয়নের দ্বন্দ্ব।
রাজনৈতিক বক্তিতা, জ্ঞানীজনের উদাসীনতা আর একচেটিয়া প্রচার মাধ্যমের একঘেয়েমি প্রচারে ভারতবাসী একরকম ভুলতে বসেছিল উন্নয়নের সঠিক সংজ্ঞা কি হতে পারে।
যে দেশে আত্মিক উৎকর্ষ একদিন সভ্যতার মূল ভিত্তি ছিল, সেই ভারতেই আজ সে শিক্ষাই পদে পদে উপেক্ষিত এবং ধারাবাহিকভাবে সরকারি উদাসীনতায় সংকুচিত। তবু ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস এই যে, উন্নয়নের নামে আমরা অর্জন করেছি বাহ্যিক চাকচিক্য, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি অন্তরের দীপশিখা। কালের নিয়মে ' উন্নয়ন ' শব্দের বাহ্যিক জৌলুশ তার মেকী উজ্জ্বলতাকে হারিয়ে সত্য বস্তুকে পুনরুদ্ধার করেছে। তাই আজ আত্মিক উন্নয়নই যে প্রকৃত উন্নয়ন—এই সত্যটি উচ্চারণ করতে আর কারও দ্বিধা থাকার কথা নয়।
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন সেই বিরল সন্ন্যাসী, যাঁর দেশপ্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিনি অবস্থান করুন না কেন, তাঁর চিঠিগুলি অবিরামভাবে বর্ষিত হয়েছে ভারতবাসীর উদ্দেশে—বিশেষ করে তাঁর শিষ্যদের উপর। এই পত্রসমূহ ছিল কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; ছিল একটি সুসংহত কার্যক্রম, একটি বৌদ্ধিক ও নৈতিক পাঠ্যসূচি।
যে শিক্ষা আজ সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের অনুকম্পায় প্রান্তিক, তাকেই স্বামীজী আহ্বান করেছিলেন ভারতকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক সোপান হিসেবে। তাঁর কল্পিত পাঠ্যসূচিতে যেমন স্থান পেয়েছিল ভারতের প্রাচীন সাহিত্য, দর্শন ও ভাষা, তেমনি যুক্ত হয়েছিল অবৈদিক দর্শন ও অন্যান্য ধর্মীয় তত্ত্ব। কারণ স্বামীজীর কাছে ভারত কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের নাম নয়—ভারত ছিল বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত সাধনা।
স্বামী বিবেকানন্দ গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, পরিবর্তন জড়জগতের অবশ্যম্ভাবী নিয়ম। নদী যদি তার গতিপথ পরিবর্তন না করে, তবে সে নব্যতা হারায়; সমাজও তেমনি। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার সমাজকে এগোয় না—বরং তাকে পঙ্গু করে তোলে। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কার্য্য যদি পরিবর্তন হয় তবে তার কারণ হচ্ছে সমাজবদ্ধ মানুষের সঙ্গবদ্ধ ইচ্ছা।
স্বামীজী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যতদিন কোনো শ্রেণী সক্রিয় ও সৃজনশীল থাকে, ততদিন সে নতুন বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। কিন্তু যখন সেই সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ হয়—তখনই অবক্ষয় শুরু হয়। আধুনিক জাতিভেদ তাই প্রকৃত জাতিভেদ নয়; বরং তা জাতির প্রকৃত অর্থ—ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বকীয়তার বিকাশ—এর পরিপন্থী।
ধর্ম কোনো সম্প্রদায়গত অনুশাসন নয়; এটি এক অন্তর্লীন নৈতিক ও আত্মিক অনুসন্ধান। ভারতের ধর্ম মানে প্রশ্ন করার সাহস, সহনশীলতা, এবং বহুত্বকে ধারণ করার ক্ষমতা।
আজকের ভারতে উন্নয়নের সংজ্ঞা যদি কেবল পরিকাঠামো, অর্থনীতি বা ক্ষমতার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা হবে এক বিপজ্জনক একমুখী যাত্রা। স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—আত্মিক উন্নয়ন ছাড়া কোনো জাতির স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাহ্যিক সাফল্য ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু অন্তরের জাগরণই সভ্যতাকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখে।
ক্রমশঃ
ব্লগার- রবীন মজুমদার
তারিখ -৩১/১২/২৫
ভালো লাগলে শেয়ার করুণ -
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ