৩৭১ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৮)

 ৩৭১ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৮)



১৭ই ফেব্রুয়ারী, ১৮৯৫
স্বামীজীর পত্রাবলী থেকে উদ্ধৃত -
।। কর্মই ধর্ম: স্বামী বিবেকানন্দের ভাবানুবাদ ও পাশ্চাত্য গ্রহণযোগ্যতা ।।

কর্মই ধর্ম: স্বামী বিবেকানন্দের ভাবানুবাদ ও পাশ্চাত্য গ্রহণযোগ্যতা

কর্ম্মে আমাদের অধিকার, ফলে নহে”—গীতার এই বাণী স্বামী বিবেকানন্দের জীবনে কেবল একটি উদ্ধৃতি ছিল না, ছিল তাঁর ধর্মবোধের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর কাছে ধর্ম মানে আচার-অনুষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি নয়, ধর্ম ছিল কর্মে আত্মনিবেদন। মানুষের অন্তর্গত শক্তিকে জাগ্রত করে সমাজ ও মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করাই ছিল তাঁর ধর্মের সংজ্ঞা।

তবু স্বামীজী নিজেও অস্বীকার করতে পারেননি যে তাঁর কার্যকলাপ অনেক সময় দেহের গ্রহণযোগ্যতার সীমা অতিক্রম করেছে। এই আত্মস্বীকৃতিই তাঁর মহত্ত্ব—তিনি জানতেন, আদর্শ ও বাস্তবের সংঘর্ষ অনিবার্য। এই চিঠিতে আমরা সেই দ্বন্দ্বেরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। কোনো মহৎ কর্মই প্রতিকূলতা অতিক্রম না করে এগিয়ে যেতে পারে না—এ ইতিহাসের চিরন্তন সত্য।

প্রাচ্যকে পাশ্চাত্যের দরবারে উপস্থাপন করতে গিয়ে স্বামীজী উপলব্ধি করেছিলেন একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য—ভাব কেবল সত্য হলেই গ্রহণযোগ্য হয় না, তাকে গ্রহণকারীর মানসগঠনের সঙ্গে একাত্ম হতে হয়।

প্রাচ্যের মূল দর্শনকে যদি পাশ্চাত্যের মানুষের চিন্তা-পদ্ধতির সঙ্গে সংযোগ করানো না যায়, তবে ইপ্সিত লক্ষ্য কখনোই পূরণ হবে না।

তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন, হিন্দুদের শুষ্ক দার্শনিক তত্ত্ব, দুরূহ উপনিষদীয় ভাষা কিংবা জটিল পুরাণ-কথা হয়তো গ্রন্থাগারের শোভা বাড়াতে পারে, কিন্তু তার গম্ভীর ভার পাশ্চাত্যের মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারবে না। এই উপলব্ধিই তাঁকে অন্যদের থেকে পৃথক করেছে। স্বামীজী ধর্মকে গ্রন্থ থেকে জীবনে নামিয়ে এনেছিলেন।

তাই তিনি পুরাণ ও দর্শনের ভারী আবরণ সরিয়ে তার নির্যাস তুলে ধরলেন। সেই নির্যাসকে তিনি পাশ্চাত্যের মানুষের মানসিক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত করলেন—যুক্তি, মানবিকতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নৈতিক অনুসন্ধানের ভাষায়। ধর্মকে তিনি এক ভাষায় বেঁধে রাখেননি; বরং বিভিন্ন সংস্কৃতির অন্তর্গত প্রশ্নের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে তাকে নতুন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন।

স্বামীজী গভীরভাবে জানতেন—
নিজের ভাবকে অপরের হৃদয়ঙ্গম করানোর দায়িত্ব নিজেরই।
এই দায় তিনি এড়িয়ে যাননি।

পাশ্চাত্যের সমাজ কামিনী-কাঞ্চনকে আলাদা করে বিচার করেছে—এমন প্রমাণ ইতিহাসে দুর্লভ। ব্রহ্মচর্য ও পবিত্রতার আদর্শ তাদের সামাজিক চেতনায় তেমনভাবে প্রবেশ করেনি। তবু স্বামীজীর ভাব-আন্দোলনের প্রভাবে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে সংযম কেবল ত্যাগ নয়, সংযমই অন্তরের শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করতে পারে

এইখানেই স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মভাবনার সার্থকতা। তিনি ধর্মকে আরোপ করেননি, বরং উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি উপদেশ দেননি, তিনি প্রেরণা জাগিয়েছিলেন। কর্মের মধ্য দিয়েই যে ধর্মের প্রকৃত প্রকাশ—এই সত্যকে তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন।

ক্রমশঃ 
ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ -০৩/০১/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)