৩৭৪ অভাব কি চেতনার প্রাচীনতম উপাদান ?

৩৭৪  অভাব কি চেতনার প্রাচীনতম উপাদান ?

শব্দ একটি কিন্তু পথ দুটি। অনিমেষ ভাবছিলো "অভাব কি মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে না চেতনা বিকাশের পথ প্রশস্ত করে? "- এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?অনিমেষ সকাল সকাল লাইব্রেরিতে গিয়ে উপস্থিত হলো। বইয়ের ক্যাটালগ দেখে ভারতীয় দর্শনের বিশেষ কতগুলি বাইকে শর্ট লিস্ট করল, ক্যাটালগটি লাইব্রেরিয়ানকে হস্তান্তর করার আগে, তার মনে হলো সমাজতত্ত্বের বইয়ের লম্বা লিস্টের মধ্যে কিছু বইকে সে সিলেক্ট করল। 

শুরু হলো তার পথ চলা। প্রথমেই সে বৌদ্ধ দর্শনের অনাত্মবাদ অধ্যায়ে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল। অনিমেষ দেখলো, এই দর্শনে বলছে আত্মার কোন অস্তিত্ব নেই আর যদি অস্তিত্ব না থাকে তাহলে অনন্তসত্তা নেই, দেহ ও মন এক পরিবর্তনশীল ও একান্ত ক্ষণস্থায়ী মিলনের সমষ্টি। 

মানব মনের বিশ্লেষণের সাথে সাথে মানবতা শব্দটি ভীষণ ভাবে যুক্ত। মানবতাকে নিয়ে  চর্চ্চার ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথের মতাদর্শকে অবশ্যিই প্রাধান্য দিতে হবে। স্বামীজীর মানবতাবাদের প্রধান মন্ত্র ছিল কর্মভিত্তিক আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিল সহমর্মিতাভিত্তিক। এই তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর নির্ভর করে ভারতীয় সমাজের দারিদ্র্য,শ্রম, অভিবাসন, অসংঘটিত ক্ষেত্র ও সামাজিক সংহতির বাস্তবতাকে যুক্ত করে হয়েছে। 

ভারতবর্ষের সামাজিক পরম্পরার মধ্যে দেখা যায় "অভাব" বহু ক্ষেত্রেই  আত্মকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে সমষ্টিগত চেতনা,পারস্পরিক নির্ভরতা ও নৈতিক সংহতিকে জোরালো করেছে।  উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে - এই ভারতে প্রাচীন ও মধ্যযুগে অর্থনৈতিক অভাব ছিল ভীষণ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অভাবকে পূর্ণতায় ভরিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ। যেমন, সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ, জলাশয়ের সমব্যবহার, দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টিতে   গ্রাম্যগোলার ব্যবহার। 

"আমি একা নোই "- জাতপাতভিত্তিক যে শ্রম বিভাজন জন্ম দিয়েছিলো নৈতিক দায়ব্ধতার। কামার, কুমোর, জেলে,চাষী -সবার শ্রম একে অপরের প্রয়োজনের উপর নির্ভরশীল। 

ভিক্ষা ও দানের সংস্কৃতি ছিল আত্মকেন্দ্রিকতার ঠিক বিপরীত মেরুতে। এইটা ছিল এক নৈতিক কর্তব্য- অন্নদান,জলদান, বস্ত্রদান ইত্যাদি। 

গৃহী থেকে সন্ন্যাস জীবন উত্তরণের প্রাথমিক ধাপ ছিল "অভাব"কে নিত্যসঙ্গী করার। 

অভাবের সাথে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনও জড়িত আছে। গ্রামীণ লোক সংস্কৃতি তো সমষ্টিগত চেতনার কথা বলে। 

অনিমেষ দেখলো, আত্মকেন্দ্রিকতার বিকাশ সমাজ জীবনে কি ভাবে ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে পড়ছে। যেখানে মানুষ সংগবদ্ধ নয় সেখানে মানুষ একা বোধ করছে আর সেই বোধ থেকে জন্ম নিচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা। আধুনিকতা নাম করে সমাজের সর্বস্তরে প্রবেশ করেছে যথেষ্ট ভোগ করার প্রবণতা। সেখানে প্রয়োজন গৌণ আর পণ্য ও পরিষেবাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই "ভোগবাদী উদ্বৃত্ত সংস্কৃতি"তে আক্রন্ত হচ্ছে সমাজ আর প্রায়শই প্রয়োজন অতিরিক্ত হয়ে বর্জ্যের জন্ম দিচ্ছে। 

সমাজবিজ্ঞানের একনিষ্ঠ ছাত্র অনিমেষ, সে ভারতীয় সমাজের মানচিত্রের গভীরে প্রবেশ করে একে একে খুঁজে পেয়েছে ,বহুবিধ বৈষম্য, যা দারিদ্র্য ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের মধ্য দিয়ে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি এখানে রয়েছে ব্যাপক অসংগঠিত শ্রম, গ্রামীণ–নগর বৈষম্য, বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক বঞ্চনা।

এই বাস্তবতায় অভাবকে প্রায়ই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা স্বার্থপরতার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের সমাজতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা ও দার্শনিক বিশ্লেষণ এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই প্রবন্ধের  লক্ষ্য হলো—সমসাময়িক ভারতীয় সমাজে অভাব কীভাবে ব্যক্তিকে আত্মকেন্দ্রিক না করে সামাজিক সত্তায় রূপান্তরিত করে, তা বিশ্লেষণ করা।

দর্শনে আত্মকেন্দ্রিকতা বলতে বোঝায় এমন এক সত্তাবোধ, যেখানে ‘আমি’ নিজেকে স্বতন্ত্র, নিরাপদ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করে। পাশ্চাত্য আধুনিকতায় এই ধারণা ব্যক্তিবাদী নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যে আত্ম কখনোই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; সে সম্পর্কনির্ভর।

বুদ্ধদর্শনের অনাত্মবাদ আত্মকে স্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে অস্বীকার করে। উপনিষদীয় ঐতিহ্যেও আত্ম একক নয়, সর্বব্যাপী ব্রহ্মের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভারতীয় দার্শনিক পরিসরে আত্মকেন্দ্রিকতা একটি প্রাকৃতিক অবস্থা নয়; এটি বিশেষ সামাজিক পরিস্থিতির ফল।

ভারতে অভাব ব্যক্তিগত নয়, প্রধানত কাঠামোগত। গ্রামীণ কৃষি সংকট, অসংগঠিত শ্রমের আধিক্য, নগর অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা অভাবকে সমষ্টিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।

গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারে জীবনধারণ মূলত যৌথ শ্রম, পারিবারিক সহযোগিতা ও প্রতিবেশী নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে। নগর বস্তিগুলোতেও দেখা যায়—জল, কাজ বা বিপদের সময়ে পারস্পরিক সহায়তার নেটওয়ার্ক। এই বাস্তবতা আত্মকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে সামাজিক নির্ভরতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

সমসাময়িক ভারতে অভ্যন্তরীণ শ্রম অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা। গ্রাম থেকে শহরে আগত শ্রমিকরা ব্যক্তিগতভাবে দুর্বল হলেও সমষ্টিগতভাবে সংগঠিত। কাজ, বাসস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে তারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়—অভাব ব্যক্তিকে ‘আমি’তে বন্দি করে না; বরং ‘আমরা’ গঠনের প্রয়োজন তৈরি করে। শ্রমিক বস্তি, নির্মাণক্ষেত্র বা কারখানায় গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক সংহতি তারই উদাহরণ।

বুদ্ধের অনাত্মবাদ ভারতীয় দরিদ্র সমাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। যেখানে ব্যক্তি জানে—সে একা টিকতে পারবে না—সেখানে অহং ক্ষীণ হয়। পারস্পরিক নির্ভরতা এক ধরনের সামাজিক অনাত্মবোধ সৃষ্টি করে।

দারিদ্র্যপীড়িত সমাজে তাই দেখা যায়—ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চেয়ে সমষ্টিগত টিকে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতা আত্মকেন্দ্রিকতার দার্শনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।

স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন সমসাময়িক ভারতীয় সমাজে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দারিদ্র্যকে ধর্মীয় বা নৈতিক ব্যর্থতা নয়, সামাজিক অবিচারের ফল হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর কর্মযোগ ব্যক্তি-মুক্তির চেয়ে সমাজ-পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়।

আজকের ভারতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক আন্দোলন ও তৃণমূল উদ্যোগে এই বিবেকানন্দীয় কর্মনৈতিকতা প্রতিফলিত হয়—যেখানে অভাব মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক নয়, দায়িত্বশীল করে তোলে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ ভারতীয় সমাজের বঞ্চিত মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর মতে, যে কষ্ট পেয়েছে, সেই কষ্ট বোঝে।

সমসাময়িক ভারতীয় সমাজে নারী, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলনে এই সহমর্মিতার নৈতিকতা স্পষ্ট—যেখানে ব্যক্তিগত দুঃখ সমষ্টিগত ন্যায়ের দাবিতে রূপান্তরিত হয়।

ভারতের উদীয়মান ভোগবাদী সংস্কৃতি আত্মকেন্দ্রিকতার নতুন রূপ তৈরি করেছে। এখানে অভাব নয়, বরং নিরাপত্তার ভাঙন ও তুলনামূলক বঞ্চনাবোধ আত্মকেন্দ্রিক আচরণ জন্ম দেয়।

এটি প্রমাণ করে—আত্মকেন্দ্রিকতা অভাবের সরল ফল নয়; এটি সামাজিক–সাংস্কৃতিক নির্মাণ।

অনিমেষ যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির  প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের একান্ত ফল স্বরূপ যেটা বেরিয়ে এলো যে সমসাময়িক ভারতীয় সমাজে অভাব মানুষকে স্বভাবত আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে না। বরং অভাব ব্যক্তি ও সমাজকে পারস্পরিক নির্ভরতা, নৈতিক সংহতি ও সমষ্টিগত চেতনার দিকে ঠেলে দেয়।

ভারতীয় বাস্তবতায় আত্মকেন্দ্রিকতা জন্মায় নিরাপত্তাহীন উদ্বৃত্ত সংস্কৃতি থেকে, আর মানবিক সামাজিকতা জন্ম নেয় অভাবের অভিজ্ঞতা থেকে।

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ১৫/০১/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 


 





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)