৩৭৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২১)
৩৭৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২১)
১৮৯৫ : ইংল্যান্ড থেকে লেখা এক পত্র, আর এক জাতির আত্মসমালোচনা
১৮৯৫ সাল। ইংল্যান্ডের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বামী বিবেকানন্দ তখন শুধু একজন ভারতীয় সন্ন্যাসী নন—তিনি এক সচেতন জাতিসত্তার কণ্ঠস্বর। স্বামী অখণ্ডানন্দকে লেখা তাঁর তৃতীয় পত্রটি পড়লে বোঝা যায়, দূরদেশে থেকেও তাঁর দৃষ্টি অবিচল ছিল দেশের মাটিতে, দেশের মানুষের কাজে, আর সেই কাজের অন্তর্নিহিত দুর্বলতায়।
তিনি নিয়মিত খবর নিতেন—কে কী কাজ করছে, কোথায় অগ্রগতি, কোথায় স্থবিরতা। স্বামী অখণ্ডানন্দের পত্রে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার আভাস পেলেও স্বামীজীর মনে স্বস্তি আসেনি। কারণ সমস্যাটা ছিল পরিকল্পনার অভাব নয়, ছিল সংঘবদ্ধ মানসিকতার অভাব। তাঁর চোখে এটাই ছিল জাতির সব অনর্থের মূল।
স্বামী বিবেকানন্দ স্পষ্ট বুঝেছিলেন—একক সাধনা মানুষকে মহান করতে পারে, কিন্তু জাতিকে জাগাতে পারে না। জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে চাই সংগঠন। আর সংগঠন মানে শুধু লোক জড়ো করা নয়; সংগঠনের মেরুদণ্ড হলো লক্ষ্যপূরণের আদর্শের প্রতি নিঃশর্ত নিষ্ঠা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ আজ্ঞাপালন। তাঁর কাছে আজ্ঞাপালন ছিল অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং বৃহত্তর লক্ষ্যের প্রতি ব্যক্তিস্বার্থকে নত করা।
এই কারণেই তিনি দৈনন্দিন কাজের নথি লেখার উপর এত জোর দিয়েছিলেন। কাজের হিসাব রাখা, অগ্রগতির খতিয়ান তৈরি করা—এসব তাঁর কাছে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সংগঠনকে আত্মসমালোচনার আয়না ধরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি। কোথায় শক্তি, কোথায় দুর্বলতা—তা নিরূপণ না করলে কোনো কাজই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না, এ তিনি জানতেন হাড়ে হাড়ে।
স্বামীজীর লক্ষ্য ছিল বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী। প্রথমে দেশ—তার দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও আত্মবিস্মৃতিকে দূর করা। তারপর দেশের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র পৃথিবীর কাছে মানবতার এক নতুন দর্শন পৌঁছে দেওয়া। তাই তিনি তাঁর শিষ্য ও সহকর্মীদের কাছে বারবার সেই ‘ম্যাপ’ খুলে ধরতেন—কোথা থেকে শুরু, কোথায় গন্তব্য, আর কোন পথে গেলে বিচ্যুতি অনিবার্য।
এই একটি পত্রেই ধরা পড়ে স্বামী বিবেকানন্দের প্রকৃত রূপ—তিনি শুধু ভাবুক নন, তিনি সংগঠক; শুধু সাধক নন, তিনি কৌশলী নির্মাতা; শুধু ভারতের ঋষি নন, তিনি আধুনিক বিশ্বের পথপ্রদর্শক।
আজ, যখন আমরা বারবার সংগঠনের অভাব, দায়বদ্ধতার সংকট ও লক্ষ্যচ্যুতির অভিযোগ করি—তখন ১৮৯৫ সালের সেই পত্র আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাই স্বামী বিবেকানন্দকে আজও জানা প্রয়োজন, শুধু শ্রদ্ধা জানাতে নয়—বরং নিজেদের ব্যর্থতার ভাষা বুঝতে এবং উত্তরণের পথ খুঁজে পেতে।
মন্তব্যসমূহ