৩৭৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২২)

  ৩৭৮ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২২)

১৮৯৫ শিষ্যকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে 

পথ কখনও মসৃণ হয় না—স্বামী বিবেকানন্দ তা জানতেন। তবু তিনি ভীত হননি। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, বাধা মানেই পরাজয় নয়; বাধা মানেই মানুষের জাগরণের আহ্বান। যুগ যুগ ধরে প্রকৃতি তার ভয়ংকর রূপে মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছে, আবার মানুষও তার জ্ঞান নামক প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে পথ করে নিয়েছে। কখনও তা বন্যা, কখনও ভূমিকম্প, কখনও আবার মানুষেরই নির্মম হাতে গড়া সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ—সব কিছুর মধ্যেই মানুষ এগিয়েছে, কারণ সে জানে—জ্ঞানই তার শেষ আশ্রয়।

ইংল্যান্ডের হিমশীতল বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে স্বামীজী দেহের দুর্বলতাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন, কিন্তু আত্মার দীপ্তিকে নিভতে দেননি। শীত তাঁর শরীরকে বিদ্ধ করলেও মনকে করতে পারেনি অবসন্ন। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন—প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বুদ্ধির আলো জ্বেলে প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসই মানুষকে মানুষ করে তোলে।

নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি উপলব্ধি তিনি গোপন রাখেননি। তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন—সহকর্মী ও শিষ্যদের হাতে তুলে দিয়ে সমাজের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। কারণ তাঁর কাছে জীবন মানেই আত্মভোগ নয়, জীবন মানেই মানবকল্যাণের ধারাবাহিক সাধনা।

স্বামীজী বলেছিলেন—এই পৃথিবীতে দুঃখ ত্রিবিধ। দেহের ক্ষুধা, রোগ আর ক্লান্তি যেমন দুঃখ; তেমনি রিপুদের বাসনা পূরণ না হওয়ার যন্ত্রণা মনকে ক্ষতবিক্ষত করে। এই দুই মিলেই জন্ম নেয় আধ্যাত্মিক দুঃখ। আবার মানুষ, পশু কিংবা মানুষের হাতে তৈরি ধারালো অস্ত্র—যে আঘাত দেয় দেহে ও আত্মসম্মানে—তা আধিভৌতিক দুঃখ। আর যখন আকাশ ভেঙে পড়ে বজ্রের শব্দে, ভূমি কেঁপে ওঠে ভূমিকম্পে, নদী গ্রাস করে জনপদ—সে দুঃখ আধিদৈবিক।

বুদ্ধের বাণী স্মরণ করে স্বামীজী আমাদের সাবধান করে দেন—আধিভৌতিক দুঃখের গভীরে লুকিয়ে থাকে ভেদবুদ্ধির বিষ। জাত, জন্ম, গুণ বা ধনের অহংকার মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। অথচ আত্মার ভেতরে নেই কোনো স্ত্রী বা পুরুষ, নেই বর্ণাশ্রমের সীমারেখা। পাঁক দিয়ে যেমন পাঁক ধোয়া যায় না, তেমনি বিভাজনের হাতিয়ার দিয়ে ঐক্যের জন্ম হয় না।

কৃষ্ণের কণ্ঠস্বর যেন প্রতিধ্বনিত হয় স্বামীজীর বাণীতে—সব দুঃখের একমাত্র উৎস অবিদ্যা। অজ্ঞানই মানুষকে সংকীর্ণ করে, অন্ধ করে, হিংস্র করে তোলে। তাই তিনি বলেছিলেন—যে কর্ম আত্মভাবের বিকাশ ঘটায়, সেটাই কর্ম; আর যা মানুষকে অনন্তের দিকে টেনে নেয়, সেটাই অকর্ম। তরোয়াল যেখানে অধর্ম বিনাশ করে, জ্ঞানরূপ অসি সেখানে অজ্ঞানকে নির্মূল করে।

তিনি দেখিয়েছিলেন—এই জগতের অর্ধেক শক্তি নারী। সেই শক্তিকে অন্ধকারে বন্দি রেখে কোনো সভ্যতা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। নারীকে জাগাতে হবে, এগিয়ে আনতে হবে সমাজের কল্যাণকর কর্মযজ্ঞে—তবেই মানবজাতির সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব।

চলার পথে সাম্প্রদায়িক বিষ, অহংকারের কণ্টক, কলহের ধোঁয়া আসবেই। তবু স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের শিখিয়েছেন—সব বাধা অতিক্রম করে, ভেদ ভেঙে, হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাওয়াই মানবধর্ম। কারণ মানুষ তখনই মহান হয়, যখন সে একা নয়—সমস্ত মানবতাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পারে।

ক্রমশঃ 

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ২০/০১/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

Ani বলেছেন…
বাহ, দারুন চলছে তোমার এই সিরিজ। এইগুলো লোকদের মধ্যে আরো বেশি করে প্রচার হওয়া উচিত।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)