৩৭৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩)

 ৩৭৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৩)

১৮৯৫ শিষ্যকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে 

বিশ্বমঞ্চে মানবতার রণদুন্দুভি: স্বামীজীর কর্মযজ্ঞ ও আগামীর আহ্বান

স্বামী বিবেকানন্দের কাছে সন্ন্যাস কেবল গৈরিক বসন পরিধান বা সংসার থেকে পলায়ন ছিল না; তাঁর কাছে সন্ন্যাস ছিল এক জ্বলন্ত মশাল, যা দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে অজ্ঞানতা ও অন্যায়ের অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মানসপটে কোনো কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানা ছিল না। সমগ্র বিশ্বই ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। এক মহা কৃষকের মতো তিনি চেয়েছিলেন এমন এক বীজ বপন করতে, যা একদিন মহীরুহে পরিণত হয়ে ক্লান্ত পৃথিবীকে ছায়া দেবে—যে ছায়ায় জাতপাত, ধনী-দরিদ্র আর হিংসার কোনো স্থান থাকবে না, থাকবে কেবল মানবতার জয়গান।

রণকৌশল ও আস্তানা নির্মাণ যেকোনো মহৎ যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল প্রস্তুতি। স্বামীজী বুঝেছিলেন, কেবল আবেগের বশে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে জগত জয় করা যায় না। অনৈতিকতার বিরুদ্ধে নৈতিকতার এই সংগ্রাম এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। তাই একজন দক্ষ সেনাপতির মতোই তিনি যুদ্ধের রসদ ও সৈন্য সংগ্রহের জন্য দুর্গ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে নিউইয়র্ক, কলকাতা এবং মাদ্রাজ—এই তিনটি স্থানে গড়ে উঠল তাঁর কর্মযজ্ঞের তিনটি প্রধান 'সেনানিবাস' বা আস্তানা। এই কেন্দ্রগুলো কেবল মঠ বা আশ্রম ছিল না; এগুলো ছিল সেই আধ্যাত্মিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেখান থেকে আগামী দিনের মানুষদের মেরুদণ্ড সোজা করার শক্তি সঞ্চারিত হবে। তিনি জানতেন, পরনির্ভরশীল জাতি বা ব্যক্তি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তাই তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সাংগঠনিক ভিত্তি, যা কারো দয়ার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠবে।

পাশ্চাত্যের রণক্ষেত্র ও বিদ্যার অস্ত্র স্বামীজীর দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবসম্মত। তিনি তাঁর শিষ্যদের বারবার সতর্ক করেছেন এই বলে যে, প্রতিটি দেশের লড়াইয়ের নিয়ম আলাদা। ভারতের মাটি আর পাশ্চাত্যের মাটি এক নয়। ভারতের জলবায়ুতে ত্যাগের আদর্শ সহজাত, এখানে একজন কৌপীনধারী সন্ন্যাসীকে মানুষ ঈশ্বরের আসনে বসায়। কিন্তু পাশ্চাত্যের সমাজ ও সংস্কৃতি ভিন্ন। সেখানে ভোগবাদ প্রবল, আর সেখানে আধ্যাত্মিকতার পথে প্রধান প্রতিযোগী বা প্রতিপক্ষ হলো সুসংগঠিত যাজকতন্ত্র বা পাদ্রীকুল।

পাশ্চাত্যের সেই যান্ত্রিক ও জড়বাদী সভ্যতার বুকে দাঁড়িয়ে স্বামীজী বুঝেছিলেন, সেখানে কেবল ভক্তি বা ভাবের বন্যায় কাজ হবে না। সেখানে তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে বেদান্তের বিজয়তিলক পরাতে হলে প্রয়োজন ‘বিদ্যা’ নামক অমোঘ অস্ত্র। সেখানে লড়াইটা আবেগের নয়, ক্ষুরধার যুক্তির। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন—অবিরাম বিদ্যার ঝড় আর বক্তৃতার ধূম তুলেই সেই রণক্ষেত্র থেকে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে নির্বাসিত করতে হবে। নিজেদের জায়গা করে নিতে হবে মেধা ও মননের জোরে।

বীজ থেকে মহীরুহ: আগামীর দায়ভার কিন্তু কেবল নতুন পথের সন্ধান দেওয়া বা বীজ বপন করাই সব নয়। স্বামীজীর কথায়—"নব নব রাস্তার উদ্ভাবন যেমন একটি কাজ, তার থেকে কঠিন সেই রাস্তাকে পুষ্প-পল্লবে সাজিয়ে প্রশস্ত এবং সুন্দর করা।" একটি চারাগাছ পোঁতা সহজ, কিন্তু তাকে ঝড়-ঝঞ্ঝা, রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে একটি বিশাল বটবৃক্ষে বা মহীরুহে পরিণত করাই হলো আসল সাধনা। স্বামীজী সেই দায়িত্ব দিয়ে গেছেন আমাদের কাঁধে।

আজ যখন আমরা চারপাশে তাকাই, দেখি মানুষে মানুষে বিভেদ, অশান্ত মন আর হিংসার বাতাবরণ—তখন স্বামীজীর সেই রোপিত বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা আমরা মর্মে মর্মে অনুভব করি। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ, যেখানে এই বৃক্ষ শান্তি সুধা বর্ষণ করবে, যেখানে মানুষ জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে একে অপরকে আলিঙ্গন করবে।

দিনান্তে বলা যেতে পারে- স্বামী বিবেকানন্দের এই কর্মযজ্ঞ আজও শেষ হয়নি। নিউইয়র্ক থেকে কলকাতা—তাঁর তৈরি করা সেই আস্তানাগুলো আজও আমাদের ডাক দিচ্ছে। এ লড়াই অনৈতিকতার বিরুদ্ধে নৈতিকতার, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর। আমাদের কাজ হলো তাঁর দেখানো সেই অমসৃণ পথকে নিজেদের শ্রম, মেধা ও ভালোবাসা দিয়ে পুষ্প-পল্লবে সাজিয়ে তোলা। তবেই সেই বপন করা বীজ সার্থক হবে, তবেই বিশ্বমঞ্চে মানবতার প্রকৃত জয়গান ধ্বনিত হবে। স্বামীজী আমাদের হৃদয়ে কেবল একটি নাম নন, তিনি এক চিরস্থায়ী শক্তি, যিনি প্রতিনিয়ত আমাদের কানে মন্ত্র দিচ্ছেন— "ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।"

ক্রমশঃ 

ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ২১/০১/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

Ani বলেছেন…
যথারীতি খুব ভালো লিখেছো।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)