৩৭২ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৯)

 ৩৭২ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৯)



১৮৯৫ স্বামীজীর পত্রাবলী থেকে উদ্ধৃত -

“যখন মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তখন সৎ বিষয়ের জন্য দেহত্যাগই শ্রেয়ঃ।”

এই অত্যন্ত সহজ, সরল, অনাড়ম্বর অথচ বাস্তবের গভীর পটভূমি থেকে উঠে আসা অমোঘ সত্যনিষ্ঠ বাক্যটির মধ্য দিয়েই স্বামী বিবেকানন্দ দিগ্বিদিকশূন্য মানবমনের স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর জীবনব্রত ছিল—মানুষকে ভাবনার দাসত্ব থেকে মুক্ত করা, কুসংস্কার ও আত্মপ্রবঞ্চনার আবরণ সরিয়ে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানো।

যে সমাজ উদ্দেশ্যহীনভাবে কতকগুলি মিথ্যা আচার-আচরণের আড়ালে নিজের প্রকৃত কর্মবোধকে ঢেকে রেখেছিল, সেই সমাজকে যদি না জাগানো যায়, তবে দেশ ও জাতির কোনও প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়—এই বিশ্বাসে তিনি ছিলেন অটল। তাঁর দৃষ্টিতে সমস্যার একটি বড় কারণ ছিল বহু প্রচলিত শব্দের যথার্থ অর্থ অনুধাবনে আমাদের চরম ব্যর্থতা। শব্দ যদি মানুষকে জাগাতে না পারে, তবে সে শব্দ পাপ। ঈশ্বর যদি জাগেন মানুষের আর্তনাদে, তবে ধাতুর শব্দে তাঁর কী প্রয়োজন?

এই কারণেই স্বামীজী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন—
“যদি সত্যিই ভালো চাও, তবে ঘন্টা-ফন্টাগুলিকে গঙ্গার জলে সঁপে দিয়ে সাক্ষাৎ ভগবান নারায়ণের পূজা করো—যাঁরা মানবদেহধারী, বিরাট ও স্বরাট।”

স্বামীজীর এই উচ্চারণ আসলে আমাদের দৃশ্যমান জগতের সীমাবদ্ধ উপলব্ধিকে ভেঙে দেয়। এই জগৎ যতটা আমাদের চোখে ধরা পড়ে, তার চেয়েও বহুগুণ বিস্তৃত তার তাৎপর্য। ‘পূজা’ শব্দটির অর্থ তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই সংকীর্ণ আচারবদ্ধতা থেকে মুক্ত করেছেন। পূজা মানে কেবল ঘন্টা নাড়া নয়—পূজা মানে সেবা। আর সেই ‘তাঁর’—তিনি আর কেউ নন, মানুষ। সেবার বিস্তৃত অর্থে এসে মিশে যায় কর্ম—নিঃস্বার্থ, সচেতন ও মানবমুখী কর্ম। কারণ আচার সহজ, আত্মজাগরণ কঠিন। নিজের ভেতর তাকালে ভয় লাগে। তাই মানুষ দেবতাকে দূরে বসায়, যাতে নিজের দায় এড়ানো যায়। 

ভাব তখনই বাস্তবতা লাভ করে, যখন তা সর্বসাধারণের জীবনে প্রবাহিত হয়। ভারতবর্ষের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর বাস গ্রামে—এই বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেই স্বামীজী বলেছেন, চার দেওয়ালের মধ্যে বসে দেবতাকে জাগানোর চেয়ে প্রয়োজন গ্রামবাংলার নিদ্রাচ্ছন্ন মানুষগুলোর কানে গিয়ে ঘন্টা নাড়ানো—তাদের জাগিয়ে তোলা।

একই সঙ্গে তিনি তাঁর শিষ্যদের সতর্ক করে দিতে ভোলেননি—নিজেকে কেন্দ্র করে ভাবনার পরিণতি অবশ্যম্ভাবী অশান্তি। নিজের কথা ভাবতে ভাবতেই মানুষ দুর্বল হয়। আর দুর্বলতাই সব পাপের জননী। শক্ত হও—এই ছিল স্বামীজীর ডাক। শক্তি মানে দেহের নয়, চিত্তের। প্রেমকে তাই ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে সার্বজনীন করে তুলতে হবে। হিমাচল থেকে সাগর পর্যন্ত, অসীম অধ্যবসায়ে নিজের বিশ্বাসে অটল থেকে সেই প্রেম ও জাগরণের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে—যতক্ষণ না মানবমুক্তির কর্ম সম্পূর্ণ হচ্ছে।


ক্রমশঃ 
ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ০৫/০১/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)