৩৭৭ মনের দুয়ারে জ্ঞানবাবুর প্রহরা
৩৭৭ মনের দুয়ারে জ্ঞানবাবুর প্রহরা
শহরের এক কোণে থাকেন শিবু কাকু। মানুষটা ভীষণই সংবেদনশীল। সামান্য কিছু হলেই তাঁর মনের ভেতরে কখনো স্বর্গ, কখনো নরক খুলে বসে।
চা বেশি গরম হলে—নরক।
পাড়ার ছেলে নমস্কার করলে—স্বর্গ।
একদিন শিবু কাকু হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন—
“এই ভালো-মন্দের ঝামেলা আর না! এবার জ্ঞান চর্চা করবো।”
পরদিন থেকেই তিনি শুরু করলেন বই পড়া। উপনিষদ, গীতা, দর্শনের বই—সব এনে ফেললেন। আর মনের দরজায় বসালেন এক কল্পিত পাহারাদার— জ্ঞানবাবু।
জ্ঞানবাবুর কাজ একটাই—
মন্দ অনুভূতিকে ঢুকতে না দেওয়া।
একদিন সকালবেলা শিবু কাকু হাঁটতে বেরিয়েছেন। হঠাৎ পেছন থেকে একটা কুকুর “ঘেউ” করে উঠল।
ভয় নামক মন্দ অনুভূতি দৌড়ে এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ল।
জ্ঞানবাবু গম্ভীর গলায় বললেন—
“আপনি কে?”
ভয় বলল,
“আমি ভয়। একটু ঢুকতে দেবেন? হার্টটা একটু কাঁপিয়ে দিই।”
জ্ঞানবাবু হেসে উত্তর দিলেন—
“দুঃখিত। এখানে লেখা আছে— ‘ভয়ং ত্যজ’। আপনি যেতে পারেন।”
ভয় ফিরে গেল।
শিবু কাকু অবাক—“আরে! আমি তো ভয়ই পেলাম না!”
কয়েকদিন পর বাজারে গিয়ে আলু কেজি ৫০ টাকা শুনে রাগ এল। রাগ সোজা মনের দরজায় হাজির।
জ্ঞানবাবু বললেন—
“ভাই, আপনি তো অহেতুক উত্তেজনা। ভিতরে ঢুকলে রক্তচাপ বাড়বে।”
রাগ গজগজ করতে করতে বলল—
“আচ্ছা, আমি তাহলে পাশের বাড়ির লোকটার মনে ঢুকছি।”
শিবু কাকু শান্তভাবে বললেন—
“৫০ টাকা হোক, আলু তো আলুই!”
পাড়ার লোক অবাক—
“শিবুদা, আজ আপনি এত ঠান্ডা কেন?”
শিবু কাকু গম্ভীর মুখে বললেন—
“মনের দরজায় জ্ঞান বসেছে।”
কিন্তু বিপত্তি বাধল একদিন।
শিবু কাকুর স্ত্রী হঠাৎ বললেন—
“আজ আপনার প্রিয় রসগোল্লা শেষ।”
দুঃখ নামক অনুভূতি কান্নাকাটি করতে করতে মনের দরজায় এল।
জ্ঞানবাবু এবার একটু থমকালেন।
বললেন—
“দুঃখ… তুমি খুব শক্তিশালী। পুরোপুরি আটকানো মুশকিল।”
দুঃখ ঢুকল ঠিকই, তবে অল্প করে।
আর সেই অল্প দুঃখেই শিবু কাকু বুঝলেন—
“রসগোল্লা না পেলেও জীবন শেষ হয় না।”
সেদিন রাতে শিবু কাকু ডায়েরিতে লিখলেন—
“বেঁচে থাকলে ভালো-মন্দ আসবেই।
কিন্তু জ্ঞান থাকলে মন্দ আর রাজা হয়ে বসতে পারে না।
তখন স্বর্গ-নরক দুটোই থাকে—মনের ভেতর, আমার নিয়ন্ত্রণে।”
আর মনের দরজায় জ্ঞানবাবু আজও বসে আছেন—
হাতে বই, মুখে মুচকি হাসি।
মন্তব্যসমূহ