৩৭৩ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২০)

 ৩৭৩ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২০)



১৮৯৫ স্বামীজীর পত্রাবলী থেকে উদ্ধৃত -

অরাজনৈতিক মঞ্চ থেকে ভারতীয়দের স্বাধীনতার মন্ত্রপাঠ
— স্বামী বিবেকানন্দের সমাজভাবনা ও কর্মদর্শন
ইতিপূর্বে ভারতবাসী স্বামী বিবেকানন্দের মতো সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীকে এইভাবে দেশের মানুষকে ভালোবাসতে এবং একই সঙ্গে সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে সেখান থেকে উত্তরণের পথ নির্দেশ করতে দেখেনি। তিনি কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার দাবি তোলেননি, অথচ তাঁর প্রতিটি উচ্চারণ, প্রতিটি নির্দেশ, প্রতিটি তিরস্কারই ছিল পরাধীনতার শেকল ভাঙার এক একটি মন্ত্র।

মনুষ্যজীবনের সঙ্গে ‘অভাব’ শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই অভাবের কিছু অংশ মনগড়া, কিছু আবার আশু প্রয়োজনভিত্তিক—যা পূরণ না হলে জীবনের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে। ১৮৯৫ সালে, মাত্র বত্রিশ বছর বয়সেই স্বামীজী এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, সমাজে কোন কোন অনুশীলন কেবল চর্চার জোরে টিকে আছে এবং কোনগুলো সত্যিই বর্জনীয়।

শ্রী রামকৃষ্ণের আদর্শকে মূলধন করে দেশ ও বিদেশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল অভিজ্ঞতা-ভাণ্ডার। এই তথ্য ও অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বিভিন্ন সমাজব্যবস্থাকে তুলনামূলকভাবে বিচার করতে পেরেছিলেন। ফলে তাঁর কার্যক্রম কেবল আবেগনির্ভর ছিল না—তা হয়ে উঠেছিল বাস্তববাদী ও বিজ্ঞানসম্মত। তিনি অনায়াসেই বলতে পেরেছিলেন, একটি পরাধীন দেশের সামাজিক প্রোটোকল কেমন হওয়া উচিত এবং একটি ভোগসর্বস্ব দেশের মানুষ কোন কোন অভ্যাস বর্জন করলে অন্তরের দৈন্য থেকে মুক্তি পেতে পারে। এই বোধই তাঁর অকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।

দেশ-বিদেশে অবস্থান করলেও স্বামীজীর সঙ্গে ভারতের নিরন্তর খবরের আদানপ্রদান চলত। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—আদর্শকে জনমানসে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সংগঠন। একটি নির্দিষ্ট স্থানে সংগঠন গড়ে তুলে তারপর ধীরে ধীরে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে তার শাখা বিস্তার করতে হবে।

ভারতীয় সমাজে কর্মে কুঁড়েমির প্রবণতা যে কতটা গভীর, স্বামীজী তা ভালোভাবেই জানতেন। তাই তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন—  “কথায় আর চিড়ে ভেজে না। যার মনে সাহস, হৃদয়ে ভালোবাসা আছে, সে আমার সঙ্গে আসুক। বাকি কাউকে আমি চাই না।”
কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি লিখেছিলেন—
“এদেশের লোক এককাট্টা হয়ে কাজ করে, আর আমাদের সকল কার্য বৈরাগ্য, হিংসা প্রভৃতির মধ্যে পড়ে চুরমার।”

গ্রামকে উপেক্ষা করে যে শহর বা দেশ গড়া যায় না—এই সত্যটি তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর নির্দেশ ছিল, যেখানে দশজন মানুষ পরমহংসদেবকে শ্রদ্ধা করে, সেখানেই একটি সভা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তিনি ধর্মের নামে ভণ্ডামি, ছুঁৎমার্গ ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে ছিলেন নির্মমভাবে স্পষ্ট। তাঁর ভাষা ছিল তীক্ষ্ণ, প্রায় নিষ্ঠুর—কারণ রোগ গভীর হলে শল্যচিকিৎসা প্রয়োজন।

ভারতীয় সমাজের ভয়াবহ কুসংস্কার, বিশেষত বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য আজও শিউরে ওঠার মতো। আট বছরের কন্যার সঙ্গে ত্রিশ বছরের পুরুষের বিবাহকে যারা ধর্মের মোড়কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়, তাদের দেশীয় ধর্ম নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। দোষ চাপানোর রাজনীতি নয়—স্বামীজী চেয়েছিলেন আত্মসমালোচনা।

তিনি জানতেন, সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ভালো ও মন্দের সহাবস্থানেই পৃথিবী চলছে। অতীতকে অন্ধভাবে পবিত্র বলা যেমন ভুল, তেমনই বর্তমানকে সম্পূর্ণ নাকচ করাও অন্যায়। এগিয়ে যাওয়ার পথে মন্দকে পিছনে ফেলে ভালোকে গ্রহণ করাই সভ্যতার ধর্ম।

স্বামী বিবেকানন্দ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—শ্রী রামকৃষ্ণের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে এক আধুনিক ভারতের সূচনা হয়েছে। এই নবযুগে দাঁড়িয়ে মানুষ ধীরে ধীরে ভালো-মন্দের মিশ্রণ থেকে ভালোকে বেছে নিতে সক্ষম হবে।

সমাজের অন্দরমহলে প্রবেশ করে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—শিক্ষার ক্ষেত্রে তথাকথিত নিচু শ্রেণীর মানুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া ব্রাহ্মণদের চেয়েও বেশি জরুরি। যুগ যুগ ধরে চলে আসা ছুঁৎমার্গ ও মানুষে মানুষে বিভেদের ধারণাকে তিনি দেখেছিলেন সভ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে। তাঁর তীক্ষ্ণ প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক—যারা অপরের নিঃশ্বাসে অপবিত্র হয়, তারা আবার কেমন করে অপরকে পবিত্র করবে?

স্বামীজীর দর্শনের সারকথা একটিই—

যেখানে বিস্তার, সেখানেই জীবন; যেখানে সংকীর্ণতা, সেখানেই মৃত্যু। যেখানে প্রেম, সেখানেই মুক্তি; যেখানে স্বার্থপরতা, সেখানেই অবক্ষয়। প্রেমই জীবনের একমাত্র বিধান। যিনি প্রেমিক, তিনিই জীবিত; যিনি স্বার্থপর, তিনিই মৃত।
ক্রমশঃ 
ব্লগার- রবীন মজুমদার 
তারিখ - ১০/০১/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)