৩৮০ বাঘের পিঠের সওয়ারী
৩৮০ বাঘের পিঠের সওয়ারী
কিছুক্ষন অন্তর অন্তর কলিং বেলের শব্দ। দরজা খুলে দেখি পার্শেল। অতীতে বিশেষ কোনো জরুরি কারণে পার্শেলটি যে এসেছে সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের এক গভীর ধারণা ছিল। আজ সেই শব্দটির মাহাত্ম কিভাবে হারিয়ে গেলো, তার বাস্তবতাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখি সমাজটা কি ভাবে আধুনিক শিল্পায়নের এক কঠিন বিচ্যুতির আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে।
সম্ভবতঃ আজ থেকে ২৫-৩০ বছরের আগের কথা , বাজার দখলের কথা প্রসঙ্গে, এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ফার্স্ট লাইন ম্যানেজারের সাথে কথা হচ্ছিলো। প্রসঙ্গটা ছিল বিদেশী কোম্পানিদের দৃষ্টিতে ভারতীয় মার্কেটে প্রবেশ করার প্রাথমিক এসেসমেন্ট নিয়ে। তাঁরা ভাবে ভারতের যা জনসংখ্যা তার ১০ শতাংশ বাজার ধরতে পারলে ১০ টা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সমান।
আজ শুধু কি তাই ? এর সঙ্গে আমরা পেয়েছি এক নতুন সংস্কৃতিকে যা আজ "ভোগবাদী উদ্বৃত্ত সংস্কৃতি " হিসাবে বেশ পরিচিত। এক সংস্কৃতি মানব সভ্যতার বিকাশে দানব হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। তারই বাস্তবতা কি সেটাই আমরা জানার চেষ্টা করবো। হয়তো আমরা সবাই এই অবস্থার সাথে কম-বেশি পরিচিত। পার্সেলের কলিংবেলটা নিজের বাড়িতে না হলেও পাশের কিংবা তার পাশের বাড়িতে বেজে উঠে।
একটি পরিধেয় বস্ত্রের নীরব ক্রন্দন-
বেশ ঘটা করে ঊলূ ধ্বনি (বেল) বাজিয়ে আপাদমস্তক ঘোমটা ( প্যাকিঙ ) জড়িয়ে তোমার ঘরে এসে উপস্থিত হলাম। তুমি একে একে আমার বাহ্যিক আবরণ থেকে মুক্ত করে আমায় কোলে তুলে নিলে। সেই দিন আমি আমার শাড়ি হয়ে জন্মের স্বার্থকথা খুঁজে পেলাম। মাত্র ক'দিনের রেশ কাটতে না কাটতে আমাকেই পরিধান করে মোবাইলের পর্দায় আমাদের মতো আরেকজনকে তোমার ভালো লেগে গেলো। তুমি আহবান জানালে তাকে তোমার গাত্রকে অলংকৃত করবার জন্য। আর আমি ধীরে ধীরে তোমার অব্যবহৃত আলমারির এক কোনে অপেক্ষা করলাম কোন এক দিন আমার এই গৃহ থেকে অপাংতেয় হয়ে অপর একজনের শরীরকে ঢাকার অবলম্বন হয়ে যাবার অপেক্ষায় কিংবা আরো কিছু । হয়ত এটাই ছিল আমাদের জীবনের ভবিতব্য।
ঠাকুমা-দিদিমার কাছে শুনেছিলাম, আমরা যখন বৃদ্ধা হয়ে যেতাম, তখন নিদেন পক্ষে আমাদের মতো কয়েকজন মিলিত হয়ে শীত কালে বিছানায় আমার প্রভুদের সাথে জড়িয়ে পেঁচিয়ে থাকতাম আমাদের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত ।
তারপর একদিন এলো, শিল্পপতির বেশ ধরে একদল বণিক , তারা যতটা মানুষের প্রয়োজন, তার থেকে অনেকে বেশি উৎপাদন করতে শুরু করলো। পুরাতন শিল্পপতিরা বুঝতেই পারলোনা এই অতিরিক্ত সামগ্রী কি করে বিক্রীত হবে। নতুন নতুন ধোপদুরস্ত কিছু বেচারাম এলো -" তারা বললো আমরা নতুন কিছু যন্ত্রপাতি এনেছি যাতে করে মানুষের মনে কৃত্তিম চাহিদার ভাইরাস ঢুকিয়ে দেওয়া যায় আর এক ভাইরাসটা মানব সমাজে আগামী দিনে মহীরুহের মতো সর্বস্তরের মানুষের মনের অন্দরে বাসা বাধবে আর মজার ব্যাপার হলো সে ভাইরাসকে হারাতে পারবে এমন ডাক্তার ও এই পৃথিবীতে নেই।
পুরাতনের উপর দাঁড়িয়ে থেকে তাকে মাড়িয়ে নতুনকে ছুতে যাবার গোপন বাসনা উপযুক্ত পরিবেশে এসে যখন বিকশিত হয় তখন পুরাতনের নিবাস হয়ে আস্তাকুড়ে। সেটা যেমন বস্তু বিশেষের হয়, তেমনি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। সেটি আজ বিরল কিংবা আঁতকে ওঠার মতো ঘটনা নয়। এর পিছনে আছে সেই কৃত্রিম অভাব যা নির্দয় ভাবে প্রকৃত অভাবকে দূরে সরিয়ে রেখে মানুষের মনের উপর রাজত্ব করে থাকে। এখান থেকেই উৎপত্তি হলো এক নতুন সংস্কৃতির যার নাম " উদ্বৃত্ত সংস্কৃতি। " প্রকৃত পক্ষে উদ্বৃত্ত উৎপাদন , বিজ্ঞাপন , কৃত্রিম অভাব আর বিলাসিতার প্রবণতার যৌথ প্রচেষ্টা এর পিতৃত্বের দাবিদার। যা আগামী দিনে এক মানসিক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে মানুষের জীবনকে জর্জরিত করে তুলবে।
মন্তব্যসমূহ