৩৮২ এক যে ছিল জ্ঞানী বুড়ো
গ্রামের প্রাচীন বটগাছটার নিচে প্রতিদিন বিকেলে বসতেন বৃদ্ধ শিক্ষক। চারপাশে ছেলেমেয়েরা খেলত, গরু ফিরত খামারে, আর বাতাসে ভেসে আসত শিউলি ফুলের গন্ধ। সেদিন তাঁর সামনে বসেছিল এক কৌতূহলী শিষ্য—নাম তার অনির্বাণ।
শিষ্য জিজ্ঞেস করল,
— গুরুজি, “শিক্ষা” আর “সাধনা” কি আলাদা জিনিস?
শিক্ষক মৃদু হেসে পাশে রাখা একটি মাটির হাঁড়ি আর একটি প্রদীপ দেখালেন।
— দেখ অনির্বাণ, এই হাঁড়িটা হলো তোমার মন। আর এই প্রদীপের আগুন তোমার চর্চা। আমি এখন হাঁড়িতে জল ঢালছি—এটা হলো শিক্ষা, বাইরের জগৎ থেকে সংগ্রহ করা অসম্পূর্ন জ্ঞান। বই, মানুষ, অভিজ্ঞতা—এ সব মিলিয়েই জল, সে বাড়তেই থাকে।
শিষ্য মন দিয়ে দেখছে।
শিক্ষক আবার বললেন,
— এখন হাঁড়িটা আগুনে বসাই। যখন জল ফুটতে শুরু করবে, তখন অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। যা থাকবে, সেটাই জ্ঞানের নির্যাস—এটাই সাধনা। শিক্ষা তোমাকে ভরায়, সাধনা তোমাকে পরিশুদ্ধ করে।
ঠিক তখন পাশ দিয়ে এক রাখাল ছেলে হাঁটছিল। সে হেসে বলল,
— গুরুজি, তাহলে বেশি পড়লে কি বেশি জ্ঞানী হওয়া যায়?
শিক্ষক হাসলেন,
— না রে, শুধু জল ভরলে হাঁড়ি উপচে পড়ে। আগুন না থাকলে কিছুই রূপ নেয় না। আবার শুধু আগুন থাকলেও হাঁড়ি পুড়ে যায়। তাই শিক্ষা আর সাধনা—দুই ভাইয়ের মতো, একসাথে থাকলেই জ্ঞান জন্মায়।
অনির্বাণ একটু ভেবে বলল,
— গুরুজি, তাহলে নদীর মতো চলতে হবে, থামা যাবে না?
শিক্ষক আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ঠিক তাই। যে শেখা থামায়, সে জমে যায়। যে সাধনা করে না, সে ঘোলা থাকে। কিন্তু যে শেখে আর নিজেকে শোধন করে, তার মনেই জ্বলে সত্যের আলো।
সন্ধ্যার ঘণ্টা বেজে উঠল। অনির্বাণের চোখে তখন নতুন আলো—সে বুঝল, শিক্ষা শুধু বই নয়, আর সাধনা শুধু ধ্যান নয়; এ দুয়ের মিলেই মানুষ আলোকিত হয়।
মন্তব্যসমূহ