৩৮৪ একি লজ্জা না অন্যকিছু

৩৮৪ একি লজ্জা না অন্যকিছু 

 ধর্ম হতে হবে ইতিবাচক — এ কথা শুনলে আজকাল অনেকে ভয় পেয়ে যান। কারণ ইতিবাচক শব্দটা যেন খুব সন্দেহজনক। এতে না আছে তর্ক, না আছে রাগ, না আছে টিভি ডিবেটের চেঁচামেচি। যেন ধর্ম মানেই একটু হাসিমুখ, একটু আলো, আর একটু মানুষ হওয়া— এই বিপজ্জনক প্রস্তাব!

আমরা বিশ্লেষণ খুব ভালোবাসি। এমনভাবে বিশ্লেষণ করি যে শেষে জিনিসটার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না— শুধু নেগেটিভের কঙ্কালটা দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ যদি বলে, “দেখো, এই ঘটনার একটা ভালো দিকও আছে”— সঙ্গে সঙ্গে তাকে সন্দেহ করা হয়। যেন সে গোপনে ইতিবাচকতার চোরাচালান করছে। অথচ আমাদের জাতীয় অভ্যাস হলো— আম কেটে খেয়ে আঁটি গুনে বিচার করা, কিন্তু আমটা মিষ্টি ছিল কি না সেটা ভুলে যাওয়া।

বইয়ের শিক্ষা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। বই খুললেই জ্ঞান, বই বন্ধ করলেই অজ্ঞতা— এই সহজ সমীকরণে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু বাস্তব বড়ই অশিক্ষিত জিনিস। সে বইয়ের নিয়ম মানে না। বই বলে “সততা সর্বোত্তম নীতি”, আর বাস্তব বলে “আগে লাইনে ঢুকো, পরে নীতি দেখো।” ফলে ছাত্রটি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বেরোয়, কিন্তু বাসে সিট ছেড়ে দিতে গেলে তার গণিত মেলে না। শিক্ষা তখন সার্টিফিকেটে থাকে, আচরণে নয়। সেই শিক্ষাকে আমরা বলি— সম্পূর্ণ, কারণ সেটি ফ্রেমে বাঁধানো যায়।

মুখস্থ বিদ্যার প্রতি আমাদের দুর্বলতা ঐতিহাসিক। যে ছাত্র পুরো বই হুবহু গিলতে পারে, তাকে আমরা পুরস্কৃত করি— যেন সে মানুষ নয়, এক চলমান ফটোকপি মেশিন। পরীক্ষক প্রশ্নপত্রে প্রশ্ন দেন, ছাত্র উত্তরপত্রে বই উগরে দেয়— মাঝখানে চিন্তার কোনো ঝামেলা নেই। সমাজ নিশ্চিন্ত। ভাবতে হবে না, প্রশ্ন করতে হবে না, শুধু মনে রাখতে হবে— কে কখন কী বলেছিলেন, কেন বলেছিলেন সেটা না জানলেও চলবে।

অন্যদিকে, যে মানুষটি সত্যিই কাউকে মৃত্যু মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলো— ধরা যাক ডুবন্ত মানুষকে টেনে তুললো, বা দুর্ঘটনায় রক্ত দিয়ে বাঁচালো— তাকে আমরা একটু লজ্জা মিশ্রিত প্রশংসা করি। কারণ এই কাজ সিলেবাসে নেই, এর জন্য নম্বর নেই, সার্টিফিকেট নেই। সবচেয়ে বড় কথা— এটা মুখস্থ করা যায় না। ফলে এই ধরনের কাজ সমাজে খুব উৎসাহ পায় না; কারণ এতে পরিশ্রম আছে, ঝুঁকি আছে, এবং— ভয়ঙ্কর কথা— মানবিকতা আছে।

আমাদের ধর্মও অনেকটা পরীক্ষার খাতার মতো হয়ে গেছে। ঠিক নিয়মে লিখতে হবে, নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়াতে হবে, নির্দিষ্ট শব্দ বলতে হবে— তাহলেই নম্বর। কিন্তু কেউ যদি চুপচাপ কারও উপকার করে, কাউকে বাঁচায়, কাউকে হাসায়— তখন আমরা একটু বিভ্রান্ত হই। কারণ এই ধর্মটা বইয়ে নেই, কিন্তু জীবনে আছে।

তাই ইতিবাচক ধর্মের প্রস্তাব সত্যিই বিপজ্জনক। এতে মানুষ ভাবতে শুরু করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, এমনকি— অন্যের ভালোর জন্য কিছু করতেও পারে। তখন মুখস্থ বিদ্যার বাজারে মন্দা পড়বে, বিশ্লেষণের দোকানে ধুলো জমবে, আর আমরা হয়তো আবিষ্কার করব— ধর্ম আসলে মানুষের ভেতরেই ছিল, শুধু আমরা তাকে পরীক্ষার খাতায় খুঁজছিলাম।

তবে ভয় নেই। আমরা খুব সহজে বদলাই না। আগামীকালও কেউ নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবে—
“এই ইতিবাচকতার সংজ্ঞাটা একটু মুখস্থ করে বলো তো?”

ব্লগার- রবীন মজুমদার 

তারিখ -১৫/০২/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)