৩৮৫ যৌনতা কি একটি বহমান স্রোত ?

 ৩৮৫ যৌনতা কি একটি বহমান স্রোত ?



মানুষ আগে মানুষ হয়েছে, পরে আর্য্য হয়েছে। এটাই বাস্তবতা যে সভ্যতার প্রথম ভাষা শরীর। 

মানুষ যখন সভ্য হয়নি, তখনও সে জন্ম দিত। ধর্ম তখনও গড়ে ওঠেনি, কিন্তু পরিবার গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ সভ্যতার প্রথম প্রতিষ্ঠান—পরিবার, আর তার কেন্দ্রে—যৌনতা।

ধর্ম এসেছে পরে, শাস্ত্র এসেছে আরও পরে, কিন্তু জীবন তার আগেই নিজের পথ বানিয়ে নিয়েছে।

 আর্য্য আগমন: সংঘর্ষ নাকি সংমিশ্রণ?

ঐতিহাসিকভাবে (খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ অব্দে) ইন্দো-আর্য্য গোষ্ঠীর আগমন ঘটে উত্তর-পশ্চিম ভারতভূমিতে। কিন্তু তারা শূন্য দেশে আসেনি। এখানে ছিল—সিন্ধু-উপত্যকার উত্তরাধিকারী জনগোষ্ঠী, দ্রাবিড় ও অন্যান্য প্রাচীন জাতি, প্রকৃতি ও উর্বরতা-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি। 

আর্য্যরা নিয়ে এলো— যজ্ঞ ও বৈদিক দেবতা, পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক রূপ, বর্ণভিত্তিক শৃঙ্খলার সূচনা। 

প্রথমে সংঘর্ষ, কিন্তু ইতিহাসে সংঘর্ষ খুব কমই স্থায়ী—কারণ মানুষ বাঁচতে চায়, আর বাঁচতে হলে মিশতে হয়। অচিরেই মানুষ বুঝতে পারলো সংঘর্ষ মানে নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে তার গতিকে রুদ্ধ করা আর সেখানেই মানব সভ্যতার ইতি। অবশ্য একদল মূর্খ মানুষ এই সংঘর্ষকে  ভিন্ন ভিন্ন উপাধি দিয়ে তাকে জারি রেখেছে , যা মানব সভ্যতার অগ্রগতির প্রতিবন্ধী। 

নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতা — রক্ত কখনও দেয়াল মানে না। আজকের জেনেটিক গবেষণা (population genetics) দেখায়—ভারতীয় জনগোষ্ঠী একক নয়, বরং মিশ্র। আর্য্য ও প্রাচীন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বহু স্তরের মিশ্রণ ঘটেছে দীর্ঘ সময় ধরে।

এ মিশ্রণ কিভাবে হলো? 

যদি আমরা বাস্তবের পটভূমিতে বিশ্লেষণ করি তবে দেখা যাবে আংশিক মূল্য দিয়েছে যুদ্ধ এবং বাণিজ্য কিন্তু বিবাহ ও যৌনসম্পর্ক  সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ করেছে এই মিশ্রনে। কারণ জেনেটিক মিশ্রণ কেবল তখনই স্থায়ী হয়, যখন পরিবার গড়ে ওঠে। অর্থাৎ—সংস্কৃতির সবচেয়ে গভীর সংমিশ্রণ ঘটেছে সংসারে, রাজনীতিতে নয়।

বর্ণব্যবস্থা বনাম জীববিজ্ঞান

আর্য্য সমাজ রক্তের “শুদ্ধতা” রক্ষার জন্য বর্ণব্যবস্থা তৈরি করেছিল। কিন্তু সমস্যা হলো— শাস্ত্র সমাজ বানায়, প্রকৃতি মানুষ বানায়।

বহু নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়—প্রাথমিক বৈদিক যুগে বর্ণব্যবস্থা কঠোর ছিল না, পরবর্তী যুগে তা কঠিন হয় (সম্ভবত মিশ্রণ ঠেকাতে),কিন্তু বাস্তবে আন্তঃবিবাহ চলতেই থাকে ; অর্থাৎ বর্ণব্যবস্থা ছিল সামাজিক প্রকল্প, জৈব বাস্তবতা নয়।

 ধর্মের ভিতরে অনার্য্য প্রভাব — যৌনতার সাংস্কৃতিক ছাপ

যদি আমরা ভারতীয় ধর্মীয় প্রতীক দেখি, সেখানে স্পষ্ট সংমিশ্রণ দেখা যায়—

শিব — প্রাক্-আর্য্য দেবতার রূপান্তর। শিবের বহু বৈশিষ্ট্য (অরণ্যবাস, পশুপতি, যোগী, উর্বরতার প্রতীক) বৈদিক দেবতাদের থেকে আলাদা। বহু গবেষক মনে করেন—এখানে অনার্য্য প্রভাব প্রবল।

 লিঙ্গ–যোনি প্রতীক

এটি কেবল ধর্মীয় নয়, উর্বরতা ও সৃষ্টি প্রতীকের প্রাচীন রূপ—যা বহু প্রাক্-আর্য্য সংস্কৃতিতে ছিল।

 মাতৃশক্তির উত্থান

দুর্গা, কালী, শক্তি—এই মাতৃকেন্দ্রিক উপাসনা বৈদিক পিতৃতন্ত্রের বাইরে গিয়ে অনার্য্য উর্বরতা-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ যৌনতা কেবল শরীর নয়—ধর্মের প্রতীকেও ঢুকে পড়েছে।

 যৌনতা — সামাজিক সংমিশ্রণের নীরব শক্তি

ইতিহাসে যুদ্ধের কথা লেখা হয়, কিন্তু সমাজ বদলায় সবচেয়ে বেশি— বিবাহে, পরিবারে, সন্তানধারায়। 

যেখানে আর্য্য ও অনার্য্য পরিবার তৈরি হলো, সেখানে—ভাষা মিশল, খাদ্য মিশল, দেবতা মিশল। পরিচয় বদলালো। নতুন মানুষ জন্ম নিল—না পুরো আর্য্য, না পুরো অনার্য্য—পুরো ব্রাহ্মণ কিংবা পুরো শূদ্র নয়,  বরং একটাই পরিচয়  - সেটা ভারতবাসী। 

বিশ্লেষণের এই পর্য্যায়ে যৌনতা বনাম ধর্ম — কে এগিয়ে? 

তাহলে আলাদা করে প্রত্যেকের  কার্যপ্রণালীর পরিধিকে জানতে হবে। ধর্মের কাজের আওতায় পড়ছে  শৃঙ্খলা , নিয়ন্ত্রণ,পরিচয়।

যৌনতার কাজ: সৃষ্টি , প্রসার , সংমিশ্রণ। 

ধর্ম দেয় দেয়াল,
যৌনতা দেয় দরজা।

ধর্ম মানুষকে আলাদা করে,
যৌনতা মানুষকে আত্মীয় বানায়।

সবকিছুই যৌনতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল। ইতিহাসে আরও শক্তি কাজ করেছে—অর্থনীতি , রাজনীতি, যুদ্ধ, পরিবেশ। তবে গভীরতম সামাজিক সংমিশ্রণ ঘটেছে পরিবারে, এবং সেই পরিবারের ভিত্তি—যৌনতা।

সেতুর নাম “সংসার”

তাহলে কি যৌনতা আর্য্য ও অনার্য্যের মধ্যে সেতু গড়েছিল?

সম্পূর্ণ নয়, কিন্তু গভীরভাবে—হ্যাঁ।

কারণ— জেনেটিক মিশ্রণ ঘটেছে। ধর্মীয় প্রতীকে সংমিশ্রণ এসেছে। বর্ণের দেয়াল বাস্তবে টেকেনি। নতুন সমাজ তৈরি হয়েছে।  সভ্যতা তলোয়ারে বদলায় না, বদলায় সংসারে।

মুজতবা আলীর ঢঙে—
“মানুষ যখন তর্ক করে, তখন সে দার্শনিক;
যখন শাসন করে, তখন রাজা;
আর যখন প্রেম করে—তখন কেবল মানুষ।”
এটি গবেষণা নয় কিন্তু গবেষণার নির্যাস। 

ব্লগার- রবীন মজুমদার 

তারিখ -১৬/০২/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)