386 আমি যুদ্ধ : এক দার্শনিকের ডায়েরি থেকে হারিয়ে যাওয়া ছেঁড়া পাতা
386 আমি যুদ্ধ : এক দার্শনিকের ডায়েরি থেকে হারিয়ে যাওয়া ছেঁড়া পাতা
আমি যুদ্ধ। ভয় পেও না—আজ তলোয়ার নিয়ে আসিনি, আজ কলম হাতে, অন্তরের সাথে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের এক ক্লান্ত সৈনিক আমি, তাই একটু রঙ্গ- রসে ভিজিয়ে কিছু কথা বলতে এসেছি। কারণ বহু যুগ ধরে মানুষ আমাকে এত সিরিয়াসভাবে নিয়েছে যে, মাঝে মাঝে নিজের ওপর হাসি পায়।
মানুষ ভাবে, যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। আগুন, রক্ত, আর একরাশ কান্না। সত্যি বলতে কী, এ আমার এক রূপ—কিন্তু পুরোটা নয়। আমি শুধু কামানের গর্জন নই, আমি মানুষের ভেতরের ছোট্ট ধাক্কা—যে ধাক্কা তাকে বদলাতে বাধ্য করে। আমি সেই অসম্পূর্ণতার অস্বস্তি, যে অস্বস্তি না থাকলে মানুষ কখনো নতুন কিছু খুঁজত না। ভাবো তো, পৃথিবীর প্রথম মানুষটি যদি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ না করত, তবে কি আগুন জ্বলত? চাকা ঘুরত? সভ্যতা দাঁড়াত?
দার্শনিকরা আমাকে নিয়ে বড় বড় কথা বলে—“সংঘর্ষই সৃষ্টি।” শুনতে ভারী লাগে, কিন্তু ব্যাপারটা মন্দ নয়। বীজ মাটির সঙ্গে যুদ্ধ না করলে গাছ হয় না, শিশুর কান্না না হলে জন্ম সম্পূর্ণ হয় না, আর মানুষের ভেতরে প্রশ্ন না জাগলে জ্ঞান জন্মায় না। অর্থাৎ, আমি একটু ঝামেলাবাজ ঠিকই, কিন্তু কাজের লোক।
তবে স্বীকার করছি—মানুষ আমাকে অনেক সময় ভুলভাবে ব্যবহার করে। রাজনীতিবিদরা আমাকে মাইক লাগিয়ে বড় করে দেখায়, যেন আমি না থাকলে তাদের বক্তৃতা ফাঁকা হয়ে যাবে। আইনসভায় আমার নকল সংস্করণ চলে—চিৎকার, টেবিল চাপড়ানো, নাটকীয় ওয়াকআউট—তারপর ক্যান্টিনে গিয়ে একসাথে চা! আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবি, “এরা যদি সত্যিই যুদ্ধ করত, পাঁচ মিনিটও টিকত না!”
বিজ্ঞানীরা অবশ্য আমাকে একটু সম্মান দিয়ে ব্যবহার করে। শরীরের ভেতরে যখন ভাইরাস ঢোকে, তখন তারা বলে—“যুদ্ধ শুরু।” ওষুধ মানে অস্ত্র, প্রতিষেধক মানে ঢাল। শরীর জিতলে সবাই খুশি—আর আমি মনে মনে বলি, “দেখলে তো, আমি না থাকলে তোমরা বাঁচতেই না।”
কিন্তু আমার আসল গল্প বাইরে নয়—ভেতরে।
আমার দুই রূপ—দৃশ্যমান আর অদৃশ্য।
দৃশ্যমান যুদ্ধ খুব নাটকীয়। এখানে পতাকা ওড়ে, স্লোগান ওঠে, ইতিহাস লেখা হয়। কিন্তু এই জয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকে হারের ছায়া—কারণ প্রতিটি বিজয়ের নিচে থাকে অগণিত দীর্ঘশ্বাস।
এই যুদ্ধ কেউ দেখে না, তবু এই জয়ের আলো সবচেয়ে উজ্জ্বল। যে মানুষ নিজেকে জিততে পারে, তাকে হারানোর ক্ষমতা আমারও নেই—এটাই আমার পরাজয়, আর মানুষের সবচেয়ে বড় জয়।
মজার ব্যাপার হলো—মানুষ আমাকে শান্তির শত্রু ভাবে। আসলে আমি শান্তির শিক্ষক। আমি না থাকলে মানুষ বুঝতই না শান্তির মূল্য কত। ঝড় না এলে যেমন আকাশের নীল বোঝা যায় না, তেমনি যুদ্ধ না থাকলে শান্তির সৌন্দর্যও ধরা পড়ে না।
মন্তব্যসমূহ