৩৯৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৬)
৩৯৯ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (২৬)
২২শে অক্টোবর,১৮৯৪ সালে বাল্টিমোর, আমেরিকা থেকে লেখা চিঠির ভাবার্থের অনুসরণে -জাগরণের শঙ্খধ্বনি: সমুদ্রপারের চিঠি ও কর্মযোগের অনন্ত আহ্বান।
জাগরণের শঙ্খধ্বনি কালের যাত্রাপথে মাঝে মাঝে এমন এক-একটি লগ্ন আসে, যখন সুদূর সিন্ধুপার হতে ভেসে আসা কোনো এক উদাত্ত আহ্বান আমাদের চিরচেনা জড়তাকে প্রবল বেগে আঘাত করে। রবীন্দ্রনাথে আমরা যে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’-এর সাধনা দেখি, স্বামীজীর চিঠির বাণীতে তারই এক প্রমূর্ত, কর্মোদ্দীপ্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
"লোহাকে ততক্ষণ আঘাত করো, যতক্ষণ না সে তপ্ত হয়"—এ কেবল কোনো সাধারণ কর্মের নির্দেশ নয়, এ হলো অন্তরাত্মাকে নিরন্তর শাণিত করার এক অগ্নিমন্ত্র। আমাদের ভেতরে যে সুপ্ত প্রাণশক্তি ঘুমিয়ে আছে, অলসতার মরচে পড়ে যা আজ মলিন, তাকে তো প্রবল ইচ্ছাশক্তির আঘাতেই জাগিয়ে তুলতে হবে। আঘাতের পর আঘাতে যখন চিত্তের লৌহ কঠিন থেকে তপ্ত হবে, তখনই তাকে দেওয়া যাবে যুগান্তরের নতুন আকার।
কিন্তু এ পথ তো কুসুমাস্তীর্ণ নয়! সার্থকতা আর ব্যর্থতার মাঝখানে যে দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, তার উপাদান হলো আমাদের কুঁড়েমি, পরশ্রীকাতরতা আর অহমিকা। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, "আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে"—এই ক্ষুদ্র 'আমি'র গণ্ডি না ভাঙতে পারলে বৃহৎ মানবসত্তার জন্ম হবে কী করে? স্বামীজী জানতেন, এই তুচ্ছতার খোলস যেদিন খসে পড়বে, যেদিন অপ্রয়োজনীয় অভ্যাসের বিসর্জন হবে, সেদিনই চিত্তাকাশে উদিত হবে লক্ষ্য পূরণের অরুণোদয়। পড়ে থাকবে কেবল একনিষ্ঠ কর্মের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ।
একজন প্রকৃত কর্মবীর তো সেই পথিক, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে ধরণীর বুকে রোপিত হয় নবজাগরণের বীজ। তিনি যেখানে পদচিহ্ন রেখে যান, সেখান থেকেই অঙ্কুরিত হয় নতুন প্রাণ, পল্লবিত হয় আগামী দিনের সম্ভাবনা। এই নবপল্লবেই সঞ্চিত থাকে সেই সঞ্জীবনী সুধা, যা মানুষের চিরন্তন ইপ্সিত ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপায়িত করার মন্ত্র জোগায়।
চলার পথে বাতাসে ভেসে আসে মহামতি বুদ্ধের সেই শাশ্বত বাণী। কেবল অন্নবস্ত্র দিয়ে এই মৃন্ময় দেহের লালনপালনই তো মানুষের চরম পরিণতি হতে পারে না! দেহের ক্ষুধার চেয়ে চেতনার ক্ষুধা অনেক বেশি সত্য, অনেক বেশি গভীর। তাই কেবল আহার্যের আয়োজনে আটকে না থেকে, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং আত্মার প্রসারণই হলো সেই আলো, যা আমাদের সমস্ত অন্তরায় দূর করে এগিয়ে নিয়ে যাবে অনন্তের পানে।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ