৪৩৪ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৭ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --
প্রতিজ্ঞার মধ্যে বাস্তবতা কম অন্ধত্ব বেশি আর অন্ধত্ব পারিপার্শিকতাকে বিশ্লেষেণ করে সিদ্ধান্ত নেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
১৭তম পর্বের শুরু -
কেউ ইতিহাসের আবার কেউ বা দর্শন নিয়ে আজীবন চর্চা করে আসছো। আমাকে তোমরা বলো, এই যে মহাভারত থেকে মাঝে মাঝে "সময়" কথাটা উচ্চারিত হয়, আসলে তার স্বরূপটা কি ? - নরেন প্রশ্নটা যেন হাউসের দিকে ছুড়ে দিল।
ইতিহাসের অধ্যাপিকা ও গবেষক মধুছন্দা প্রশ্নটা যেন লুপে নিলো - 'সময়'কে অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দিয়ে সীমারেখা টানার চেষ্টা করা হলে সেটা ব্যর্থ হবে কেননা তার ব্যাপ্তি বিশ্বজনীন। সব ধরণের পার্থিব ও অপার্থিব বিষয়ে যার নিরন্তর যাতায়াত তাকে তো কোন সীমিত পরিসরে বেঁধে রাখে কার সাধ্য।
নরেন দা, প্রশ্নটা সময়ের স্বরূপ হবে না বরং প্রশ্নটা যদি এমন হতো -"সময় কি বাস্তব, না মানুষ তার চেতনা দিয়ে নির্মাণ করেছে ?"
-আমি যদি বলি, মানুষ যখন কোন শব্দকে ব্যবহার করে তার পিছনে থাকে বিশেষ কিছু অবস্থাকে উপলদ্ধির জন্য, যেটা এখানে'পরিবর্তন'কে ইঙ্গিত করছে। আরেকটা মজার জিনিস হল অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের আলাদা আলাদা অস্তিত্ব আছে কি ? যদি না থাকে, তবে কি তারা একই সময়ের বিভিন্ন উপলদ্ধি হিসাবে চিহ্নিত ?
সময়ের এগিয়ে যাওয়াটা সরলরেখার মতো না সে আবার চক্রকারে ফিরে আসে ?
বস্তু জগতে সৃষ্টি থেকে লয়ের যাত্রা, আবার সৃষ্টি আবার লয় - আদি অনন্ত কাল ধরে প্রকৃতির জয়যাত্রার কোনো বিরাম নেই। এই যে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটগুলি সহজ সরল ভাবে সময় চিহ্নিত করে দেয়।
মানব মনে প্রশ্ন নাড়া দেয় - পরিবর্তন কি সময়ের কারণে ঘটে, নাকি পরিবর্তনকে মাপার জন্যিই মানুষ সময়ের ধারণা তৈরি করেছে ?
অর্থাৎ সময় ও পরিবর্তনের সম্পর্ক হলো দর্শনের একটা মৌলিক প্রশ্ন।
অস্তিত্বের বিশেষ অবস্থান নির্ণয় করে সময়। এর সাথে একটা প্রশ্ন উদয় হয় -"আমি কে " - এই প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত প্রশ্ন -"আমি কখন। "
একদিন এক মানবশিশু এই পৃথিবীতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করল, সময়ের সাথে সে ধীরে ধীরে তার শৈশবকে পিছনে ফেলে কৈশোরে গিয়ে উপস্থিত হল , তার চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছানোর বিরতি নেই, অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত বার্ধক্যের প্রান্তে এসে উপস্থিত হল। সময়ের সব পাল্টালো, এই ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ছবি প্রত্যক্ষ করে সে ভাবলো -এরা সবাই কি "আমি"?
একসাথে মিলে গেলো ব্যক্তির সত্তা, অস্তিত্ব ও সময়। বিচার যদি করতে হয়, তাহলে কাকে গ্রহণ করবো আর কাকে বাদ দেব ? সুতরাং সবাইকে নিয়েই চলতে হবে।
নরেন আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল - সময় কি বাইরে প্রবাহিত হয়, নাকি মানুষের চেতনার মধ্যে ?
এবার এই প্রসঙ্গটা বিভাসের ভীষণ ভালো লাগলো। সে বলতে লাগলো - অতীত তো স্মৃতিতে বেঁচে থাকে আর সে তো অপরিবর্তনীয়। অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গে যার মৃত্যু ঘন্টা বেজে যায় সেই তো বর্তমান। ভবিষ্যৎ -সে তো কল্পলোকের বাসিন্দা।
এই বিশ্বে মজার ব্যাপার হচ্ছে , ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাই একদিন মৃত্যুর পদতলে জীবনকে সমর্পিত করে কিন্তু এই বাস্তবতাকে কেউ মানতে চায় না।
এবার লাবণ্য জিজ্ঞাসা করলো, আচ্ছা বিভাস দা -"মৃত্যু না থাকলে কি জীবনের অর্থ থাকতো ?"
বিভাস সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে বলল - এই বিশ্ব সৃষ্টি ও লয়ের খেলা। শুধু কি মানুষ ! সভ্যতারও বিকাশ আছে, আর বিকাশের পিছন পিছন সংকট এসে হাজির হয় আবার এক সময় তারও পতন হয় আর সেই পতনের মধ্যে থেকে নতুন আর এক সভ্যতার বিকাশ ঘটে।
তাই সময়কে যদি বিচার করতে হয় , তাহলে, শুধু ব্যক্তিগত পরিসরে নয় তাকে ঐতিহাসিক পটভূমিতে নিয়ে আসতে হবে।
সব কিছুর অন্তরালে কিংবা প্রকাশ্যে মানুষ ও তার নৈতিকতা। কেননা নীতি নির্ধারণ মানুষই করে থাকে। আজ যে কর্মকে মনে হচ্ছে এইটাই আদর্শ কাজ , কাল সেটা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে বলবে - ওটা না হলেই ভালো হতো।
যুগে যুগে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাবান ব্যাক্তিরা নীতি নির্ধারণ করে এসেছেন। তাই অবধারিত ভাবে সেই প্রশ্নই উদিত হয় - নৈতিক সত্য কি চিরন্তন, না সেটা সময়ের সাথে সাথে নৈতিকতার সংজ্ঞা পাল্টায়। এখানেই নৈতিকতা বনাম ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
যেখানে ক্ষমতাবানের অঙ্গুলিলেহনে, নৈতিকতার চরিত্র সংশোধিত হয়, সেখানে ইতিহাস যে তাদের মতো করে লেখা হবেনা তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি ? শুধু পরাজিতরা মনে করে পার্থক্যটা কোথায় ? যেখানে দৈনন্দিন সত্য সংগ্রহীত শাসকের অপছন্দসই সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায় আর এরা ইতিহাসকে যে পাল্টে ফেলবে এ আর এমন কি।
" সময় কি কেবল চলে যায়, নাকি চলতে চলতে মানুষ, সভ্যতা ও ইতিহাসের উপর তার রায় লিখে যায় ?"
এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শন, মহাভারত এর উত্তর দিয়ে গেছে। সময়ের গভীর রায় যদি বলা হয় - 'তুমি কতদিন বেঁচে ছিলে তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তুমি তোমার সময়কে কি দিয়েছিলে - সেটাই শেষ প্রশ্ন। "
ক্রমশঃ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন