বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

 ৪৩৬ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৯ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে --

  মানব মনের বৈচিত্রতা ও  সমাজে তার বাস্তব প্রতিফলনের  এক অদ্ভুত ককটেল এই মহাভারত। মহাভারতে দেখি যে দেবতারা  বেদে ভূমিষ্ঠ হলো, তারা এখানে এসে প্রতিষ্ঠা পেলো। এটাও দেবতাদের বিবর্তনের ইতিহাস বললেও অত্যুক্তি হবে না। কাব্য কখনো  কখনো বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়, কেননা কল্পনা কবির  কাব্য রচনার রসদ। তাই দেখি অস্ত্রের আধুনিকতা সময়কে  ছাপিয়ে গেছে, জন্ম তো জৈবিক নিয়মের ধার ধারেনি, অবশ্য অধিকাংশ রূপকে মোড়া , যত্রতত্র অলৌকিকতার হাতছানি  কিন্তু মহাজাগতিক দর্শন মহাভারতকে দীর্ঘজীবন দিয়েছে। তাইতো, একটা রাজনৈতিক সংঘাত সবকিছুকে ছাপিয়ে একটি নৈতিক মহাকাব্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  

১৯ তম  পর্বের শুরু - 

“যাই বলো ভাই, মহাভারতের অন্তস্থলে প্রবেশের দরজাটা সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু একবার ভিতরে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে বেরোনোর রাস্তাটা যেন আর খুঁজেই পাওয়া যায় না।”

মধুছন্দার কথাটা শুনে বিভাস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “ঠিক বলেছ। কথাটা আমার বেশ মনে ধরেছে।”

দার্জিলিংয়ে এসে অন্যেরা পাহাড় দেখে, মেঘ দেখে, কাঞ্চনজঙ্ঘার রং বদলানো দেখে। আর এরা এক অদ্ভুত দল—পাহাড়ের সৌন্দর্য চোখের সামনে রেখেও মহাভারতের পাতায় মুখ গুঁজে বসে আছে। কেউ দর্শন খুঁজছে, কেউ ইতিহাস, কেউ রাজনীতি, কেউ মানুষের মন। যেন পাহাড়ের চেয়েও বড় কোনও পর্বত তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—তার নাম মহাভারত।

দর্শনের অধ্যাপক বিভাস। ফলে পৃথিবীর দিকে তাঁর তাকানোর ভঙ্গিতেও দর্শনের ছায়া পড়বেই।

তিনি বললেন, “আসলে ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। মহাভারতে আমরা যখন প্রথম প্রবেশ করি, তখন আমরা জাগ্রত থাকি। গল্প শুনি, চরিত্র দেখি, যুদ্ধ দেখি, রাজনীতি বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু সময় যত এগোয়, আমরা ধীরে ধীরে জাগ্রত অবস্থা থেকে স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়ি। জতুগৃহের আগুন থেকে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গন পর্যন্ত ঘটনাগুলি তখন আর বাইরের ইতিহাস থাকে না—আমাদের নিজেদের মনের ভিতরে তারা একের পর এক দৃশ্য হয়ে উঠতে থাকে।

“জতুগৃহের আগুন যেন আমাদের ভিতরের ভয়কে জ্বালিয়ে দেয়। দ্রৌপদীর অপমান আমাদের বিবেকের দরজায় এসে ধাক্কা দেয়। পাশাখেলার শব্দে আমরা নিজেদের দুর্বলতার শব্দ শুনতে পাই। আর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ? সে তো আমাদের মনের ভিতরেই প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শুরু হয়ে যায়।

“তারপর আসে সুষুপ্তি। গভীর নিদ্রার মতো মহাভারত তখন আমাদের চেতনার ভিতরে স্থির হয়ে থাকে। আমরা আর মহাভারত পড়ি না—মহাভারত আমাদের ভিতরে পড়তে থাকে।

“মানুষের জীবনে কত কথা বলা হয় না, কত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায় না, কত অপরাধের বিচার হয় না, কত ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি পায় না—মহাভারতের কুশীলবরা সেই সমস্ত না-বলা কথাগুলিকে এমন জীবন্ত করে তুলেছে যে, একসময় মনে হয়, এরা আর কেউ নয়—এরা আমরাই।

“তাই তো মহাভারত থেকে মন সরে যেতে চায় না।”

লাবণ্য এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার বলল, “আপনি ঠিক বলেছেন বিভাসদা। আমার মনে হয়, মহাভারতকে আত্মস্থ করার পর একটা অদ্ভুত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। আমরা ঘটনা-প্রবাহে ভাসতে ভাসতে কখন যেন হস্তিনাপুরের রাজসভায় গিয়ে বসি। রাজসভার কোনও এক কোণে, বিধানসভার গ্যালারির মতো জায়গায় বসে দেখি—একজন নারীর অপমান হচ্ছে, আর চারদিকে জ্ঞানী, ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী পুরুষেরা নীরব।

“তখন দ্রৌপদী আর শুধু দ্রৌপদী থাকেন না। তাঁর মধ্যে আমরা আমাদের সময়ের অপমানিত নারীদের মুখ দেখতে পাই। বিলকিস বানু, কামদুনি, হাঁসখালি কিংবা আর জি কর—নামগুলি আলাদা, সময় আলাদা, পরিস্থিতি আলাদা; কিন্তু কোথাও যেন সেই একই রাজসভা ফিরে আসে। প্রশ্নটা একই—অন্যায় যখন চোখের সামনে ঘটে, তখন ক্ষমতাবানদের নীরবতার অর্থ কী?

“ভীষ্মের নীরবতা তখন আমাদের অস্বস্তি দেয়। দ্রোণের নীরবতা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। কারণ জ্ঞান যদি অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব হয়ে যায়, তবে সেই জ্ঞানের মূল্য কোথায়?

“আবার পাণ্ডব-কৌরবের রাজনৈতিক সমীকরণ দেখতে দেখতে মনে হয়, ক্ষমতা বোধহয় যুগ বদলালেও তার স্বভাব খুব বেশি বদলায় না। ক্ষমতাসীনরা বিরোধীকে কতটা জায়গা দেবে, কে কথা বলবে, কে চুপ থাকবে, কার কণ্ঠ সভায় পৌঁছবে—এই হিসাব হস্তিনাপুরেও ছিল, আজও আছে।

“আর হিড়িম্বার কথা ভাবলে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে। রাজপরিবারের সামাজিক পরিসরের বাইরে থাকা এক বনবাসী নারীকে ভীমের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা—এটিও তো মহাভারতের ভিতরের এক আশ্চর্য সামাজিক সীমানা অতিক্রম। অর্থাৎ মহাভারত একদিকে সামাজিক বিধিনিষেধকে দেখিয়েছে, অন্যদিকে সেই বিধিনিষেধ ভাঙার সম্ভাবনাও তার ভিতরেই রেখে দিয়েছে।

“সারা পৃথিবীর ইতিহাসে রাজধর্ম পালনের ব্যর্থতা থেকেই তো কত কুরুক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের ভয়াবহতা যখন মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে, তখন সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আবার জন্ম নিয়েছে অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধের নৈতিক শক্তি।

“এই তালিকার বোধহয় কোনও শেষ নেই।”

বিভাস এবার একটু হেসে বলল, “সেই জন্যই মহাভারত শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের চরিত্রের এক বিশাল পরীক্ষাগার।”

সে একটু থামল।

“দ্রোণের কথাই ধরো। তিনি জ্ঞানী, প্রতিভাবান, অস্ত্রশিক্ষায় অতুলনীয়। কিন্তু জ্ঞান যখন মানুষের মুক্তির পরিবর্তে ক্ষমতার সেবায় ব্যবহৃত হয়, তখন সেই জ্ঞানই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যে জ্ঞান সমাজের কোনও কাজে আসে না, অথচ জ্ঞানী মানুষটি নিজের বুদ্ধিকে নৈতিক সাহসের পরিবর্তে স্বার্থ ও পক্ষপাতের কাজে ব্যবহার করেন—দ্রোণ সেই চরিত্রের এক গভীর প্রতীক।”

লাবণ্য বলল, “আর যুধিষ্ঠির?”

“যুধিষ্ঠির আরও জটিল। সত্যবাদিতা তাঁকে মহান করেছে, কিন্তু সত্যের প্রতি আনুগত্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস—দুটো সবসময় এক জিনিস নয়। তিনি সত্য জানতেন, ন্যায় বুঝতেন, কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে তাঁর সেই নৈতিক সাহস বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন—কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া আর সাহসী মানুষ হওয়া যে এক কথা নয়, যুধিষ্ঠির আমাদের সেই অস্বস্তিকর সত্যটি শেখান।” এটা আজ থেকে ১৫ বছর আগেকার পশ্চিমবঙ্গের চেহারার মতো। 

“দুর্যোধন?” লাবণ্য জানতে চাইল।

বিভাস বলল, “দুর্যোধনের মধ্যে অন্যরকম এক বিপজ্জনক শক্তি ছিল। তিনি জানতেন যে তিনি অন্যায় করছেন। তাঁর সমস্যাটি অজ্ঞতা নয়—আত্মসংযমের অভাব। অন্যায় বুঝেও নিজেকে থামাতে তিনি রাজি নন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সাহসের অভাব ছিল না। অর্থাৎ যে সাহস ন্যায়ের কাজে লাগলে মহৎ হতে পারত, আত্মসংযমের অভাবে সেই সাহসই ধ্বংসের অস্ত্র হয়ে উঠল।”

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল।

দূরে পাহাড়ের গায়ে তখন সন্ধ্যা নামছে।

বিভাস ধীরে ধীরে বলল, “এইখানেই মহাভারতের সবচেয়ে বড় জটিলতা। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা সবসময় সাদা-কালো নয়। অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রয়োজন, বৃহত্তর বিপর্যয় ঠেকানো এবং মানুষের ভবিষ্যৎ—এই সমস্ত কিছু এসে ন্যায়ের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করে।

“শ্রীকৃষ্ণ সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ন্যায়ের পক্ষে, কিন্তু ন্যায়কে কোনও জড় বিধি হিসেবে দেখেন না। তিনি জানেন, কখনও কখনও অন্যায়কে ঠেকাতে প্রচলিত নীতির সীমারেখা অতিক্রম করতেও হয়। আর সেই কারণেই কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কুরুক্ষেত্রে নয়—নিজের ভিতরে।

“কারণ প্রয়োজনকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর নিজের নৈতিক সত্তারও একটা সংঘর্ষ ঘটে। এই দ্বন্দ্বই কৃষ্ণকে সহজ নায়ক হতে দেয় না; তাঁকে করে তোলে এক গভীর নৈতিক দার্শনিক।”

মধুছন্দা এতক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। পাহাড়ের গায়ে শেষ আলোটুকু তখন নিভে আসছে।

সে হঠাৎ বলল, “তাহলে কি মহাভারত থেকে সত্যিই বেরোনোর রাস্তা নেই?”

বিভাস এবার আর হাসল না।

“হয়তো নেই। কারণ আমরা মহাভারত থেকে বেরোতে চাই বলেই বেরোতে পারি না। আমরা যখন ভাবি, মহাভারত অতীতের কাহিনি, তখনই সে আমাদের বর্তমানের আয়না হয়ে সামনে দাঁড়ায়। রাজসভা বদলায়, পোশাক বদলায়, ভাষা বদলায়, রাজনীতির পদ্ধতি বদলায়—কিন্তু মানুষের লোভ, ভয়, ভালোবাসা, ঈর্ষা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, নৈতিক দ্বিধা—এসব খুব বেশি বদলায় না।

“তাই মহাভারত শেষ পর্যন্ত হস্তিনাপুরের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের নিজের ভিতরের হস্তিনাপুর।

“আর সেই কারণেই তার প্রবেশদ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু বেরোনোর পথটি কেউ খুঁজে পায় না।”

বাইরে তখন পাহাড় অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

কিন্তু মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।

 ক্রমশঃ 

কলমে - রবীন মজুমদার 
 ২০/০৮/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

বি: দ্রঃ "রবীন উজানের" নিজস্ব ওয়েব সাইটের মাধ্যমে  খুব শীঘ্রই আসতে চলছে তিনটি পৃথক সংস্করণ।  ১) পড়ার বদলে শুনতে পারা ( অডিও) , ২) কাহিনীর উপর ইলাস্ট্রেশন অডিও  এবং ৩) প্রত্যেকটি ব্লগের উপর ভিডিও কার্টুন। আপনাদের মতামত জানাবেন  .

কোন মন্তব্য নেই:

ujaan

  ৪৩৬  স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -১৯ তম   পর্ব )  ( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে ...