২৯৯  ইতিহাসের পূর্ণ আলোকে মেঘদূত দর্শন -  ১৯ তম   পর্ব  

রামায়ণ ও কালিদাসের মেঘদূত  এবং পরবর্তী সময়   (৯) 

হিন্দুদের শাস্ত্রে মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপাদানের জন্য একজন দেবতাকে নির্দ্দিষ্ট  দায়িত্ব দেওয়া  হয়েছিল। তেমনি, ধন, সম্পত্তি, ও ঐশর্য্য সম্পর্কীয় যা কিছু আছে তার একমাত্র প্রতীকী দেবতা ছিল কুবের। যদি ধন সম্পত্তি লাভ করতে যাঁরা চাইতেন, তারা কুবেরের উপাসনা করতেন। ধন থাকলেই যে ঐশর্য্য থাকবে এমন কোন মানে নেই।  

কুবের শব্দটির অর্থ হচ্ছে, যাকে দেখতে কুৎসিত। তাই যে ভাবে পা দেবার ব্যাপারে ব্রহ্মা কার্পণ্য করেন নি কিন্তু দাঁতের ব্যাপারে যথেষ্ট  কার্পণ্য করে মাত্র আটটা দাঁত দিয়েছিলেন সেখানে পা দিয়েছিলেন মাত্র তিনটি। মনে হয়, সেই যুগে ধনী আর নির্ধনের মধ্যে একটা সুক্ষ সীমারেখা ছিল। কেউ  কেউ হয়তো বলতে পারেন, তার চেহারাটা একটা রূপক মাত্র, আসলে কর্ম করে  যারা উপার্জন করেন আর অলসভাবে যারা অর্থ সম্পত্তির অধিকারী হন তারা  সুন্দর হতে পারেন না, এই দৃষ্টিভঙ্গির ফারাকটা কুবেরকে অসুন্দর হিসাবে চিত্রায়ন  করেছেন। 

আষাঢ় মাসের প্রারম্ভে মেঘদূত কাব্যের সূচনা। আষাঢ়ের সাথে বর্ষার যুগযুগান্তের  সম্পর্ক। যার জন্য অপেক্ষা সইতে পারা যায় না, সেটাই বিরহ। মন মিলতে চায় প্রেমাস্পদের সাথে কিন্তু  দুইয়ের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বর্ষা যে  মিলনকে ক্রমাগত বিলম্বিত করে যাচ্ছে। 

বিরহের কাজই হচ্ছে দুঃখ উৎপাদন করা। বাল্মীকির রামায়নে দেখি রামের সীতাকে উদ্ধার বিলম্বিত হলো বৃষ্টির কারণে। মানুষ পরম্পরার ব্যাতিক্রম চায় না, মূলত যাঁরা কবি। বর্ষার আগমন  আর জীবন থেকে আনন্দের নির্গমনের পিছনে প্রাচীন কালে মানুষের জীবনবোধ থেকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা সেই কথাই বলে। যেমন, বর্ষার কারণে প্রধানত জলপথে এবং তারসাথে স্থলপথেও  ব্যবসা বাণিজ্যের পক্ষে অন্তরায় হয়ে উঠতো। প্রবাসে  যাদের পতিরা কাজ করতেন, তারা বর্ষার পূর্বে সাধারণত বাড়ি ফিরে আসতেন। ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে যাঁরা আসতে পারতেন না, স্বামী-স্ত্রী উভবেই বিরহজনিত কারণে দুঃখী  হতেন। এইরকম কিছু কারণ বশত বর্ষা ঋতুকে কর্মহীন ঋতুর তকমা লাগিয়ে দিয়েছিলো।  পাশাপাশি এই বৃষ্টি কিন্তু বেশকিছু প্রাণীদের সৃষ্টির প্রেরণা  জোগাতো, এই সময়টি ছিল তাদের মিলনের উপযুক্ত সময়। 

মহাকবি কালিদাসের কৃতিত্ব সেইখানে, যেখানে বিশ্ব প্রকৃতির জড় অংশটাকে  কোন অবস্থায় মূল অংশের সাথে পৃথক করতে পারেনি।  আসলে চৈতন্য কোন অংশ নয়, সে তো সমগ্র। এই সহজ সরল অনাড়ম্বরভাবে একসূত্রে জড় আর চৈতন্যকে তার কাব্যে বেঁধে ফেলেছিলেন। দ্বৈতবাদীরা যেমন জড় ও চৈতন্যকে আলাদা ভাবে দেখে থাকেন কিন্তু বেদান্তের  দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে জড় ও চেতনকে শুধুমাত্র চেতন হিসাবে অদ্বৈতবাদীরা বলে থাকেন, তারই প্রতিফলন কবির কাব্য প্রতিধ্বনিত হয়েছে।  পরবর্তী প্রজন্মের কবি  রবীন্দ্রনাথের বহু গানে ও কবিতায় আমরা এইরকম দার্শনিক ভাবনার সাথে পরিচিত হব।   

 চলবে ০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

ব্লগার -রবীন মজুমদার 

তারিখ ৩০/ ০৭/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে  শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন। 
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)