৩১২ মুক্তি চেতনায় পল্লী কবি জসীমউদ্দীন
৩১২ মুক্তি চেতনায় পল্লী কবি জসীমউদ্দীন
কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের অন্তর্দৃষ্টির গভীরতা সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশি। সময়কালটা ছিল ১৯০৩ থেকে ১৯৭৬, এই দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিবেশ, সমাজ ও সামাজিক অব্যবস্থাকে তিনি ভীষণ কাছ থেকে লক্ষ্য করছেন। যখন তাঁর ক্যানভাসে গ্রামের জীবনযাত্রা উঠে এসেছে, তখন তিনি কবিতা, গান ও গল্পে তাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। সেখানেই উঠে এসেছে মানুষের মুক্তির আকাঙ্খা - সেটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, বরং দারিদ্য, কুসংস্কার, শোষণ ও সামাজিক অসাম্যের হাত থেকে মুক্ত হবার স্বপ্ন। তাই তার সৃষ্টির লব-কুশরা মূলত সাধারণ মানুষ বিশেষত শ্রমিক-কৃষকদের জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
বন্ধন যদি প্রবল হয় তখন মুক্তিই একমাত্র যাত্রার অভিমুখ হয়। যারা এই রশি দিয়ে সমাজকে বেঁধে রেখেছে, সেই বন্দিদের দায়িত্ব বর্তায় সেই রশিকে তাদের হাতেই ফেরত দেবার, তবেই তো রশির ঋণ শোধ হবে।
সেই সময়টা ছিল দেশে ব্রিটিশ শাসন আর গ্রামে জমিদারের শোষণ, যার ফসল হলো অশিক্ষা আর তাকে আঁকড়ে বেড়ে ওঠা কুসংস্কার, ঋণ ছিল জন্মজন্মান্তরের সঙ্গী আর দেহটা ছিল হতদরিদ্রের আবরনে ঢাকা।
শহর থেকে গ্রামে ভেসে আসছিলো রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি আর গ্রামীণ সমাজও বন্দিত্বের প্রশ্নে এই দাবিকে নিজেদের দাবি হিসাবে ভাবতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলোনা।
এর সাথে যুক্ত হলো দেশভাগ এবং তার পরে পরেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। জীবনের অনিশ্চয়তা দেশ বিভাজন বাড়িয়ে দিয়েছিলো।
ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষার প্রশ্নে কবির অন্তরের ভাবনা প্রকাশ পায়, তাঁর রচনা ও তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায়।
কবির কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা শুধুমাত্র দেশের পতাকা আর শাসকের চেহারার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেটা হবে সার্বিক স্বাধীনতা। যেখানে অর্থনীতির মান উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার আর সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠাই হবে একমাত্র মুক্তির পথ। তার কবিতায় আর গানে সেই সুর চারিদিকে বেজে উঠেছিল।
কবির অসাধারন সেই কবিতা "নকশী কাঁথার মাঠ" যেখনে প্রকৃতি আর মানুষ এক ভাবনার অংশীদার। গ্রামীণ নারীর স্বপ্ন ভাঙা গড়ার গল্প, সে যে এক ভালোবাসা আর শৃঙ্খলমুক্ত জীবনের আকাঙ্খার কথা শোনায়। কবির বিশ্বাস ছিল, লোকসংস্কৃতি, লোকগাথা সংরক্ষণের মধ্যে দিয়ে ঐতিহ্যকে যেমন ধরে রাখা যায়, তেমনি শৃঙ্খলমুক্ত সমাজের আকাঙ্খারও জন্মকে বাস্তবায়িত করা যায়।
সমাজে সে সময়ে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার কুফল হিসাবে কুসংকারকে লালন-পালন, বাল্যবিবাহ, নারীর প্রতি অবিচার ইত্যাদি প্রচলিত ছিল। তাঁর সাহিত্যের ক্ষুরধার রচনা মানুষের মননকে জাগিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
সামাজিক ভেদাভেদ কি ভাবে দুটি গ্রামের মধ্যে রেষারেষির সৃষ্টি করে ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে বসে। সেখানে ছটি পর্বে লেখা "সোজন বাদিয়ার ঘাট "- সেই সামাজিক মুক্তির গান শোনায়।
পল্লী কবি জসীমউদ্দীন তার কবিতার রস সংগ্রহ করেছিল সাধারণ মানুষের জীবন থেকে , গ্রামবাংলার মাটি থেকে, অবহেলিত মানুষের বেদনা থেকে, সমাজের নিষ্পেষণে ক্রন্দনরত নারীর অশ্রুজল থেকে তাই তাঁর কথা ছিল সার্বিক মুক্তির কথা। তাঁকে শুধুমাত্র পল্লীর কবে বলে বেঁধে রাখলে চলবে না, তার কন্ঠস্বর যে সর্বদা মুক্তির কথা শোনায়।
তারিখ ১৪/০৮/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ