৩১৩ একটি জীবনের স্বাধীনতা
তেরঙ্গা পতাকার নিচে এক শিশু
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। কলকাতার রাস্তায় মানুষের ঢল, আকাশে ভাসছে ত্রিবর্ণ পতাকা।
বাবার কাঁধে বসে আছে এক বছরের হেমন্ত। বুঝবার বয়স হয়নি, কিন্তু সে দেখছে চারপাশে হইচই, লাল-সবুজ-গেরুয়া পতাকা, আর স্লোগান—
“বন্দে মাতরম!”
“জয় হিন্দ!”
বাবা ধীরে ধীরে বললেন—
— হেমু, আজ থেকে আমরা স্বাধীন। ব্রিটিশ শাসন শেষ। তোর জীবন আমার মতো হবে না।
মা পরে বলেছিলেন—
— তুই এমন এক দেশে বড় হবি যেখানে জমি হবে আমাদের, শিক্ষা হবে সবার, কেউ কারও উপর আর খবরদারি করবে না।
দেশের মানুষ তখন বিশ্বাস করত স্বাধীনতা মানে দুঃখের অবসান। কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা আসতে যে সময় লাগবে—এ কথা কেউ উচ্চস্বরে বলেনি। আসলে স্বাধীনতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণাই ছিল না।
১৯৫০-এর দশক আর নতুন ভারতের প্রথম স্বপ্ন
হেমন্তের শৈশব কাটে নদীর ধারের গ্রামে। বাঁশের বেঞ্চ, মাটির দেওয়ালের স্কুলঘর, শিক্ষক রমেন বাবু।
১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হয়, কাগজে, কলমে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হয়। কিন্তু গ্রামে তখনও বিদ্যুৎ নেই, কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় কর্দমাক্ত পথ, যোগাযোগ যেন সুদূরপরাহত।
দুপুরে বন্ধু রঘু বলত—
— শোন, রেডিওতে বলল দেশজুড়ে বড় বড় বাঁধ হবে, সবাই কাজ পাবে।
হেমন্তও স্বপ্ন দেখত— একদিন সে শহরে যাবে, ডাক্তার হবে, গরিবের চিকিৎসা করবে।
তখন নেহরুর “ফাইভ ইয়ার প্ল্যান” শুরু হয়েছে। কিন্তু গ্রামবাসীর কাছে উন্নয়ন মানে ছিল— হয়তো একদিন পাকা রাস্তা হবে, স্কুলে নতুন ছাদ হবে, গ্রামে বিনাচিকিৎসায় মানুষ মরবে না।
স্বপ্ন কি কখন সত্যি হয়েছে ?
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়। ভারতের উপর নেমে এল খাদ্য সংকট, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, তারপর খরা। বাবার ফসল একে একে নষ্ট হয়ে গেল।
মা এক সন্ধ্যায় বললেন—
— হেমু, তোর কলেজের ফি আমরা দিতে পারব না রে।
হেমন্ত চুপচাপ মাথা নিচু করল।
১৯৬4 সালে নেহরুর মৃত্যু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ক্ষমতায়, আবার যুদ্ধ। গ্রামে রাজনৈতিক আলোচনা জমে উঠত, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এসব মানে ছিল— রেশন কমে যাওয়া, বাজারদর বাড়া, আর কৃষকের ঋণ বৃদ্ধি।
হেমন্ত শহরে গিয়ে কাপড়ের দোকানে চাকরি নিল, রাতে কলেজে পড়াশুনা শুরু করল।
যৌবনের ডাক
সত্তরের শুরুতে কলকাতা যেন অগ্নিগর্ভ। নকশাল আন্দোলনের উত্তাপ, পুলিশের গুলি, হঠাৎ নিখোঁজ হওয়া তরুণেরা।
এই সময়ে হেমন্তের জীবনে এল সুলেখা— কলেজ পড়ুয়া, চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন।
এক বিকেলে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানে সুলেখা বলেছিল—
— হেমু, আমাদের সংসার হবে না শুধু চার দেওয়ালের, আমরা সমাজের জন্যও কাজ করব।
হেমন্ত হাসি চাপল।
কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতায় দোকান বন্ধ, চাকরি গেল। বেকার হেমন্তের ভাবনায় রইল শুধু একরাশ হতাশা।
১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর “জরুরি অবস্থা” এল— সংবাদপত্রে সেন্সর, বিরোধী নেতাদের জেল। সুলেখার পরিবার তখন তাড়াহুড়ো করে তার বিয়ে দিয়ে দিল।
হেমন্ত বুঝল, স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও অনেক সময় নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজের হাতে থাকে না।
সংসার বাঁচানোর সংগ্রাম (১৯৮০-এর দশক)
গ্রামে ফিরে রাধার সঙ্গে বিয়ে। দুই সন্তান।
বিদ্যুৎ এল গ্রামে, রঙিন টেলিভিশন শহর থেকে গ্রামে ঢুকতে শুরু করল। কিন্তু হাসপাতাল তখনও দূরে, কৃষি ঋণের বোঝা একটু একটু করে চেপে বসে আছে।
প্রতিবছর প্রকৃতির উদারতায় বন্যা আসে আর তারই ফলে কৃষকের ফসল নষ্ট, আর বাজারে দাম আর কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার ফারাকটা দিনকে দিন বাড়তে থাকে —এটাই ছিল কৃষকের জীবনের বাস্তবতা।
হেমন্ত মাঝে মধ্যে ভাবত— স্বাধীনতা আমাদের ভোট দেবার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু পেট ভরানোর নিশ্চয়তা দেয়নি।
বাজলো উন্মুক্ত অর্থনীতির দামামা আর সঙ্গে নিয়ে এলো নতুন স্বপ্ন (১৯৯০)
১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু হলো— বিদেশি পণ্য, নতুন চাকরির বাজার, মোবাইল ফোনের আগমন। শহরের মানুষদের জন্য সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু গ্রামের গরিব কৃষকের জীবনে পরিবর্তন কোমায় চলে গেছে।
হেমন্তের ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শহরে গেল, মেয়ে শিক্ষকতা শুরু করল।
একদিন ছেলে ফোনে বলল—
— বাবা, শহরে অনেক কাজের সুযোগ, তুমি গ্রাম ছাড়ো।
হেমন্ত হেসে বলল—
— আমার শিকড় এখানে, আমি এখানেই থাকব।
একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা (২০০০–২০২৫)
২০০০-এর দশকে রাস্তাঘাট ভালো হলো, ইন্টারনেট এল। কিন্তু কৃষির লাভ কমতে কমতে প্রায় শূন্য। রাজনীতিতে মেরুকরণ বাড়ল, বেকারত্ব বাড়ল, আর প্রযুক্তি গ্রাম-শহরের ফারাক স্পষ্ট করে দিল।
হেমন্ত দেখল, স্বাধীনতার ৭৮ বছরে দেশ পরমাণু শক্তিধর, মহাকাশ অভিযানে সক্ষম, কিন্তু গ্রামে এখনো মানুষ অসুখে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়।
ফিরে দেখা (২০২৫)
চায়ের দোকানে কিশোরেরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত।
একজন বলে—
— দাদু, আপনার সময়ে কি নেট ছিল না?
হেমন্ত মৃদু হেসে উত্তর দেয়—
— তখন নেট ছিল না, কিন্তু মানুষে মানুষের সংযোগ ছিল।
সে মনে মনে হিসাব করে—
যা পেয়েছি: ভোটাধিকার, নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগ, কিছুটা অবকাঠামো।
যা পাওয়ার ছিল: সবার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, দারিদ্র্যমুক্তি, দুর্নীতিমুক্ত শাসন।
হেমন্তের চোখে একরাশ বিষণ্নতা, কিন্তু আশার আলোও আছে—
— আমরা পুরো স্বাধীনতা পাইনি, কিন্তু তোমরা যদি চেষ্টা করো, হয়তো সত্যিকারের স্বাধীন মানুষ হওয়া সম্ভব হবে, স্বাধীনতার ১৬ কলা পূর্ণ হবে।
তারিখ ১৫/০৮/২৫
ভালো লাগলে পরিচিতদের কাছে শেয়ার করুন। খারাপ লাগলে ইগনোর করুন।
rabinujaan.blogspot.com ক্লিক করে যে কোন সার্চ ইঞ্জিন থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ